Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিরোনাম > বাংলা সিনেমার তিন দিকপালের পৈত্রিক ভিটা সংরক্ষণের দাবি

বাংলা সিনেমার তিন দিকপালের পৈত্রিক ভিটা সংরক্ষণের দাবি

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। কনটেন্ট এডিটর, সোশ্যাল মিডিয়া ডেস্ক ।।

বাংলা সিনেমার তিন দিকপাল সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক ও মৃণাল সেনের পৈত্রিক ভিটা সংরক্ষণের দাবি নিয়ে এবার মাঠে নামছেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের কর্মীরা।

বুধবার ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ অব বাংলাদেশের (এফএফএসবি) সাধারণ সম্পাদক বেলায়েত হোসেন মামুন তার ফেসবুক পাতায় জানান, আগামী ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশে অবস্থিত এই তিন চলচ্চিত্র নির্মাতার পৈত্রিক ভিটা উদ্ধার ও সংরক্ষণের দাবিতে তারা সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ে স্মারকলিপি দেবেন।

মামুন তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, “সাংস্কৃতিক ইতিহাস এবং স্মৃতিস্থাপনা উদ্ধার ও সংরক্ষণের এই লড়াইয়ে কেবল ঋত্বিক কুমার ঘটকের পৈত্রিক ভিটা রক্ষার দাবি নয়; আসুন দাবি করি সত্যজিৎ, ঋত্বিক ও মৃণালের পৈত্রিক ভিটা উদ্ধার ও সংরক্ষণ করা হোক।”

সত্যজিতের পৈত্রিক ভিটা কিশোরগঞ্জে

কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার ছোট্ট একটি গ্রাম মসুয়া। বিশ্বনন্দিত চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের পৈত্রিক এবং শিশু সাহিত্যিক সুকুমার রায় ও তার বাবা আরেক শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরীর ঐতিহাসিক বাড়ি এই মসূয়া গ্রামে। এ বাড়িতে রয়েছে একটি পুকুর ও শান বাঁধানো ঘাট। পশ্চিম দিকে রয়েছে কয়েক একর জায়গাজুড়ে বাড়ি। পূর্বে প্রাচীর ও সিংহ দরজা ছিল যা এখন বিলুপ্ত। পশ্চিমে জরাজীর্ণ ভবন, এখন যেটি ভূমি অফিস নামে পরিচিত। তার একটু পশ্চিমে গেলেই ডাকঘর। বাড়ির ভিতরে রয়েছে কারুকার্যখচিত প্রাচীন দালান, বাগানবাড়ি, হাতির পুকুর ও খেলার মাঠ।

সত্যজিৎ রায়ের পিতামোহের স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি এখন সরকারের রাজস্ব বিভাগের তত্ত্বাবধানে আছে। বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের উদ্যোগে ২০১২ সালে ৫৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি রেস্ট হাউজসহ বাড়ির সীমানা প্রাচীর ও রাস্তাঘাট সংস্কার করা হয়। যেটি এখন কোনো কাজেই আসছে না। এই বাড়িতে ১৮৬০ সালের ১২ মে জন্মগ্রহণ করেন সত্যজিৎ রায়ের পিতামহ প্রখ্যাত শিশুসাহিত্যিক উপেন্দ্রকিশোর রায় চৌধুরী। তিনি ছিলেন বিখ্যাত শিশুকিশোর পত্রিকা ‘সন্দেশ’র (১৯১৩) প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক। ১৮৮৭ সালে এই বাড়িতেই জন্ম নেন সত্যজিৎ রায়ের পিতা সুকুমার রায়।

ভাঙাচোরা এই বাড়িটি দিন দিন ধ্বংস হচ্ছে। বাড়িটি রাজস্ব বিভাগের দখলে থাকলেও বহু জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। অস্কার বিজয়ী বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায়ের ঐতিহাসিক পৈতৃক বাড়িকে একসময় বলা হতো ‘পূর্ব বাংলার জোড়াসাঁকো’। প্রতি বছর বৈশাখ মাসের শেষ বুধবার এ ঐতিহাসিক বাড়িতে অনুষ্ঠিত হয় বৈশাখী মেলা। মসুয়া গ্রামে সত্যজিৎ রায়ের পরিবারের স্মৃতি চিহ্নটুকু ধরে রাখার জন্য গঠিত হয়েছে সত্যজিৎ রায় স্মৃতি সংসদ। প্রতি বছর ৫ মে পালন করা হয় সত্যজিৎ রায়ের জন্মদিবস।

ঋত্বিক ঘটকের জন্মস্থানের অস্তিত্ব নেই, পৈত্রিক ভিটাও ভাঙা পড়ছে

“ক্যান যামু? বুঝা আমারে। এমন কোমল দ্যাশটা ছাইড়া, আমার নদী পদ্মা ছাইড়া, আমি যামু ক্যান?” এমন আকুতিভরা সংলাপ তো শুধু সিনেমার সংলাপ নয়, এ ঋত্বিক ঘটকের অন্তরের আর্তনাদ। কেন তাকে নিজের ভিটা ছেড়ে যেতে হলো, সেই প্রশ্নের জবাব আজীবন খুঁজে ফেরা মানুষটির জন্মস্থানের অস্তিত্বও নেই আজ। আদিবাড়ি বিলীন হয়েছে সেই পদ্মার বুকেই। আর রাজশাহীর পৈত্রিক ভিটা, যেখানে ঋত্বিক কাটিয়েছেন শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্য, সেটিও আর অবিকৃত নেই।

পাবনার বেড়া উপজেলার পুরান ভারেঙ্গা গ্রাম ঋত্বিক ঘটকের আদি পিতৃভূমি। কিন্তু সেখানে আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। সবই বিলীন হয়েছে পদ্মার ভাঙনে। তবে ঋত্বিকের জন্ম পুরান ঢাকার লক্ষীবাজারে। সেই স্মৃতিবিজড়িত ঝুলন বাড়িও ভাঙা পড়েছে।

বাবা সুরেশ কুমার ঘটকের চাকরিসূত্রে রাজশাহীতে দীর্ঘ সময় কাটে ঋত্বিক ঘটকের। নগরীর মিঞাপাড়ায় ছিলো তাদের বাড়ি। বাংলা কথাসাহিত্যের আরেক উল্লেখযোগ্য নাম মহাশ্বেতা দেবীর স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এখানে। দেশভাগের পর এই বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে হয় তাদের। শত্রু সম্পত্তি হিসেবে চিহ্নিত এই বসতভিটা আশির দশকে সরকারি বন্দোবস্ত দেয়া হয় রাজশাহী হোমিওপ্যাথিক মেডিকেল কলেজকে। একাধিকবার এই ভিটা ভাঙার চেষ্টা হয়েছে। প্রতিবারই স্থানীয় চলচ্চিত্রকর্মীদের আন্দোলনের মুখে কোনোমতে ঠেকানো গেছে পুরোপুরি ধ্বংস। স্থানীয়ভাবে গঠিত ঋত্বিক ঘটক চলচ্চিত্র সংসদের উদ্যোগে এখানে প্রতি বছর ঋত্বিক চলচ্চিত্র উৎসব আয়োজন করা হয়।

মৃণালের পৈত্রিক বাড়ি ফরিদপুরে

গেলো বছর মারা গেছেন বাংলা সিনেমার আরেক কিংবদন্তি মৃণাল সেন। ফরিদপুর শহরের ঝিলটুলী মহল্লায় তার পৈত্রিক বাড়ি। ১৯২৩ সালের ১৪ মে তিনি সে বাড়িতেই জন্ম নেন।

তার শিক্ষাজীবনের একটা অংশ কেটেছে এখানকারই ফরিদপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও রাজেন্দ্র কলেজে। পরে তিনি সপরিবার কলকাতা চলে যান। ঝিলটুলিতে সেই বাড়িটি এখনও আছে। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে জীর্ন।

রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি চলচ্চিত্র নির্মাতা আহসান কবির লিটন বলেন, “এই তিন নির্মাতা শুধু সিনেমার কারিগরই নন, আমাদের অনুপ্রেরণার উৎস। অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ বিনির্মাণে এই মানুষগুলোর স্মৃতিবিজড়িত পৈত্রিক ভিটা সংরক্ষণের পাশাপাশি সেগুলোতে জাদুঘর ও চলচ্চিত্র কেন্দ্র নির্মাণ করা জরুরি।”

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় চলচ্চিত্র সংসদের সভাপতি ড. সাজ্জাদ বকুল বলেন, “বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের বিকাশের স্বার্থেই কিংবদন্তি এই তিন নির্মাতার পৈত্রিক ভিটা নিয়ে আমাদের রাষ্ট্রের ভাবনার প্রয়োজন আছে।”

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: