Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > সাইফুল ইসলামের গল্প : খালাস

সাইফুল ইসলামের গল্প : খালাস

পড়তে পারবেন 5 মিনিটে

দেশে কী শুরু হয়ে গেল এসব! হাজারে হাজার মানুষ ছুটছে, কোলে শিশু, মাথায় পোটলা; বুড়ি মাকে বেতের ধামায় তুলে, বাবাকে শিকেয় বসিয়ে কাঁধে নিয়ে ছুটে চলেছে ছেলেরা, গরু ছাগল নিয়ে চলেছে কেউ কেউ, কারো কোলে মুরগি, আবার কেউ তার হাঁসটি হাতে নিয়ে ঝুড়ির মধ্যে ভরে নিয়েছে বাচ্চাগুলো, কিশোরী তার প্রিয় বেড়ালটি সামলাচ্ছে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিয়ে, প্রায় সব দলের পিছে পিছে দৌড়াচ্ছে পরিবারের নেড়ি কুত্তাটি। কোনও কোনও দলে কুড়ি/পঁচিশ জন, আবার কোনও মিছিলে পাঁচ/ছয় শ’। সবার চোখে-মুখে আতঙ্ক, ভীতি।

হরিণা গাঁয়ের সব চেয়ে বড় বাড়ি দিনেশ চৌধুরীর। কয়েক শ’ বছর আগে এই চৌধুরী বাড়িকে ঘিরেই গড়ে ওঠে হরিণা গাঁও। বসে ঘোষপাড়া, কামারপাড়া, কুমারপাড়া। গাঁয়ের পাশে ইছামতী নদীর ধারে লাগে হাটবাজার। বছর পঞ্চাশেক আগে গাঁয়ে কয়েকটি মুসলমান পরিবার বসতি গড়ে চৌধুরী বাড়ির জমিজমা চাষের জন্য। সেই চৌধুরী বাড়ির সামনে দিয়ে ডিস্ট্রিক্ট বোর্ডের সড়কের পাশে বটতলায় বসে বসে শান্তি মণ্ডল, যোগেন বিশ্বাস, দশরথ ঠাকুরদাস, তারক অধিকারী, ফণীভূষন, সুরেশ বিশ্বাস, জাহের আলী, আলতাফ মুন্সী তাড়া খাওয়া মানুষের মিছিল দেখে। কাচারি ঘরের বারান্দায় বসে মিছিল দেখে দিনেশ চৌধুরী।

মানুষগুলো একটু জিরিয়ে নিতে বসতে চায় বটতলায়, কিন্তু সাহস পায় না। দুর্বৃত্তরা রাস্তাঘাটে কখন হামলে পড়ে এই আতঙ্কে তাড়াতাড়ি পৌঁছতে চায় শুভগাছা বা তাড়াকান্দি যমুনার ঘাটে। সেখানে নৌকায় উঠে উজান ঠেলে চলে যাবে মাইনকারচর-আসামে। তখনই বাঁচবে তাদের জান-মান। কিন্তু সবাই এক টানে চলতে পারে না, ব্যথায় পা টনটন করে। তারা বটতলায় বসে বলেÑ তোরা যা, আমি একটু জিরায়া নেই। তারপর জোরে হাইটা তোগোরে ধইরা ফালামুনি। সামনে এগিয়ে যায় অন্যরা। যারা বটতলায় বসে পড়ে তাদের ঘিরে ধরে শান্তি ম-লরা। জল পান করায়। ক্ষুধা থাকলে একটু চিড়াগুড় দেয়। জিজ্ঞেস করে, কাকা বাড়ি কোন গাঁয়ে?

মথুরাপুর।

পশ্চিমের অবস্থা কী খুব খারাপ?

হুম।

কী অবস্থা কন চেন দেহি।

শয়ে শয়ে মিলিটারির গাড়ি যাইতাছে সড়ক দিয়া। পয়লা সড়কের পাশের গাঁওগুলায় আগুন দিল; আমরা দূর থাইকা দেইখলাম। হেদিন রাইতেই ৫০/৬০ জন মোসলমান আমাগোর গাঁয়ে আইল। কইল, এইডো মোসলমানের দেশ পাকিস্তান, তোমরা মান-সম্মান থাকতি থাকতি ইন্ডিয়া চইলা যাও। গাঁয়ের নরেশের ব্যাটা প্রানেশ কইল, এডো আমগোর বাপ-দাদা চৌদ্দ গুষ্টির দ্যাশ, আমরা নিজের দ্যাশ ছাইড়া ইন্ডিয়া যামু ক্যা? ওগোরে একজন প্রানেশেক এমুন থাপ্পুড় মারলো যে তা দেইহা পুরা গাঁও টাসকি মাইরা গেলো। একজন জগদীশের মাইয়া মালতির হাত ধইরা কয়, মালডো খাসা, নিয়া যাই। আরেক জন কয়, না রে আইজক্যা না, ওরা গাঁও না ছাড়লি তহুন পামুনি। যাওয়ার সময় আগুন দিল মন্দিরে। ওগোরে এই সব কাণ্ড-কারখানা দেইখ্যা পুরা গাঁয়ে একটো ব্যারাছ্যাড়া লাইগা গেল। তারপরও মানুষ দুই দিন গাঁয়ে থাইকলো। নানা গুজবে পইচা গেলো কান। তাই সয়সম্পত্বির লালস ছাইড়া জান আর মানডো নিয়ে গাঁও ছাইড়া আইলাম। এই বলে ডুকরে কেঁদে ওঠে মানুষটি। কাঁদতে কাঁদতে রওনা দেয় পুব দিকে।

দিন শেষে সন্ধ্যা নামে। ডাকাতি-ছিনতাইয়ের ভয়ে আর চলার সাহস থাকে না ঘর ছাড়া মানুষের। কারো কাচারি ঘরে, কারো গোয়ালঘরে ঠাঁই নেয় তারা। বউ-ঝিয়েরা ঠাঁই পায় গৃহস্থ বাড়ির ভেতরে। পাড়ার ছেলেরা গাঁও পাহারা দেয়। ভোর রাতে ইয়াকুব, সাইদ ও জয়নালকে নিয়ে বাড়ি ফেরে দিনেশ চৌধুরীর ছেলে শ্যামল। ওদের বাড়ি পাশ্ববর্তী পিপুলবাড়িয়ায়, কলেজে পড়ে এক সাথে। চৌধুরী বাড়ির কাচারি ঘরের বারান্দায় ওদের বসিয়ে ভেতরে যায় শ্যামল। বাড়ির ভেতর থেকে আসে দিনেশ চৌধুরী। আসে গাঁয়ের অন্যরাও। বউ-ঝিয়েরা ঝোপের আড়ালে দাঁড়ায় দ্যাশের খবর শোনার জন্য। ওরা খবর দেয়, গঞ্জে মিলিটারি এসে গেছে। মুসলিম লীগের যারা এ ক’দিন আওয়ামী লীগ নেতাদের সাথে যোগ দিয়েছিল তারা এখন মিলিটারিদের সাথে যোগ দিয়েছে। বাইরে থেকে আসা বিহারীদের সাথে স্থানীয় বিহারীরা এক হয়েছে। সব চেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে ডাকাত সামাল-জসমত জেল ভেঙে বেরিয়ে এসে যোগ দিয়েছে মিলিটারিদের সাথে। তারা গ্রামে গ্রামে ডাকাতি, নারী নির্যাতন করছে, আগুন দিচ্ছে বাড়িঘরে। নানা ভয় দেখিয়ে দিশেহারা করছে গাঁয়ের মানুষকে।

নেতাগোর হাতে দেহা অয় নাই? দিনেশ চৌধুরী জিজ্ঞেস করে।

আরে দূর কাকা, মাইনসের জানের ভয় আছে তাগোরে নাই? সব আত্মগোপনে গেছে। কাউরে পাওয়া যাইত্যাছে না। মনে রাইহেন, নিজের বল বড় বল ভাইয়ের বল পাছে। এভাবেই কথায় কথায় ভোর হয়। গাঁয়ের মানুষকে কোনো আশার কথা না শুনিয়েই ইয়াকুবরা তিনজন হরিণা ছাড়ে। থেকে যায় শ্যামল। আশ্রয় নেয়া মানুষগুলো রওনা দেয় যমুনার ঘাটের দিকে।

বেলা বাড়তে থাকে। কিন্তু গতকালের মতো মানুষের স্রোত আর দেখা যায় না। যে দুই একটি পরিবার আসে তারাও নিয়ে আসে নানা গুজব। ব্রহ্মগাছার পুবে ফাঁকা মাঠে যা পাচ্ছে লুটে নিচ্ছে ছিনাতাইকারী। লোকজন ঘুরে যাচ্ছে গোপালনগর একডালা হয়ে। ধীরে ধীরে নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে হরিণা গ্রাম। কেউ পথে নামার বা ক্ষেতে যাওয়ার সাহস পায় না। যে গাঁয়ে পূজা-পার্বণে আশেপাশের মুসলমান গ্রাম থেকে মানুষের ঢল নামতো, ভাগাভাগি করে নিত উৎসব-আনন্দ। সেই গ্রামের মানুষ হিন্দু হয়ে যেন মহাঅপরাধ করে ফেলেছে।

দুপুরে প্রসব ব্যথায় কঁকিয়ে ওঠে চৌধুরী বাড়িতে আসা নিতাইয়ের মেয়ে অনিতা। নিস্তরঙ্গ গ্রামটি আবার চঞ্চল হয়ে ওঠে। শ্যামল সাইকেল নিয়ে ছোটে পিপুলবাড়িয়ার দিকে। শাহকামাল ডাক্তারকে পাওয়া গেলেও সে বলে, এটা ধাইদের ব্যাপার। তুমি দত্তবাড়ির রহিমা ধাইকে নিয়ে যাও। অবশেষে তাকে নিয়ে বাড়ি ফেরে শ্যামল। এই বিপদে ধর্ম টুটে যায়, বেঁচে থাকার যুদ্ধটাই হয়ে ওঠে প্রধান। রহিমা ধাই ঢুকে পড়ে অনিতার আঁতুরঘরে। 

নিতাই টাকার প্রয়োজনে তার পরিবারের কিছু গহনা পানির দামে বেচে দেয় গাঁয়ের আলতাব মুন্সীর কাছে। এ খবর অন্যান্য গাঁয়ে গুজব হয়ে ছড়িয়ে পড়ে যে, হরিণা গাঁয়ের হিন্দুরা গহনা-গাটি বেচে ইন্ডিয়া চলে যাচ্ছে। অনিতা সন্তান বিয়োতে না বিয়োতেই আশেপাশের গ্রামের মুসলমানেরা ঘুরঘুর করতে শুরু করে হরিণা গ্রামে। তারা চায়, হিন্দুরা গয়না-গাটি, বাসন-কোসন, সয়-সম্পদ সস্তায় বেচে চলে যাক ইন্ডিয়া। একে ওকে জিজ্ঞেস করতে থাকে, কেউ কিছু বেচবে কি না? ভয় পেয়ে যায় হিন্দুরা, জিনিসপত্র বেচতে শুরু করে পানির দরে। কারণ, নগদ টাকা ট্যাকে ফেলে চলা যায়, কিন্তু সয়সম্পদ নিয়ে বসে থাকলেই বিপদ।

ঘুরঘুর করতে দেখা যা শ্যামপুরের তোরাব মহুরীকে। শোনা যায়. সাদা স্ট্যাম্পের ওপর সই দিয়ে টাকা নিচ্ছে কেউ কেউ। ভেতরে ভেতরে সবাই প্রস্তুত হচ্ছে ইন্ডিয়া যাওয়ার জন্য। এতো কিছু ঘটছে কিন্তু দিনেশ চৌধুরীকে কেউ কিছু বলছে না। অথচ এ গ্রামের কোনো কাজের শুরুতে চৌধুরী মশাইয়ের সাথে পরামর্শ করাটা নিয়ম। এমন কী কারো মেয়ে বিয়েতে তার পরামর্শ অপরিহার্য। হয়তো তাকে কেউ কিছু বলারই সাহস পাচ্ছে না। গ্রামের সবাই জানে যে, স্বাধীনতার জন্য এ এলাকায় ইয়াকুবদের আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতা সেই। আর সেই স্বাধীনতা যুদ্ধ যখন শুরু হচ্ছে তখন দেশ ছেড়ে যাওয়ার কথা তাকে বলবে কীভাবে! শ্যামলের মা মাঝেমধ্যে চৌধুরীর সামনে এসে দাঁড়ায়, কিছু বলতেও চায় কিন্তু বলে না। শ্যামলও সামনে এসে দাঁড়ায়। সে অবশ্য কিছু বলবে না, কারণ ইয়াকুব আর শ্যামল হরিহর আত্মা। এই এলাকায় ওরা এক সাথে স্বাধীনতার পতাকা বহন করবে এমনটাই জানে দিনেশ চৌধুরী।

বাড়ির মধ্যে পোয়াতি নারীর গোঙানি, বাইরে গ্রামের বিশৃঙ্খলা দিশেহারা করে ফেলে দিনেশ চৌধুরীকে। বেলা যখন মাথার উপর তখন খবর গাঁয়ে খবর আসে, ইয়াকুবকে খুন করে লাশ ফেলে রাখা হয়েছে ইছামতীর চরে। এখন কে তাদের বলবে যে, দেশটি একদিন স্বাধীন হবে, সেই স্বাধীন দেশটি হবে অসাম্প্রদায়িক, ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ইয়াকুবের খুন হওয়ার খবরে দিশেহারা হয়ে পড়ে দিনেশ চৌধুরীও। সবার বারণ ঠেলে সাইকেল নিয়ে বের হয়ে যায় শ্যামল। ছেলেকে ঠেকাতে না পেরে মা চিৎকার করে এবং বাবা নীরবে কাঁদতে থাকে।

শ্যামল সাইকেল টান দিয়ে সোজা চলে যায় ইছামতীর চরে। দশ গ্রামের মানুষ ভেঙে পড়েছে সে লাশ দেখতে। শ্যামল লাশ দেখে নিশ্চিত হয়, এ ইয়াকুব নয়। শ্যামল সেখান থেকে বহুলি, ছোনগাছা হয়ে আরো কয়েক গ্রাম ঘুরে দেখে, কিন্তু কোথাও খুঁজে পায় না ইয়াকুবদের। সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরে শ্যামল। নিজের বাড়ি যেন নিজের কাছেই অপরিচিত মনে হয়। মনে হয়, এ বাড়িতে কেউ মারা গেছে কিছুক্ষণ আগেই। রান্নাবান্না হয়নি, বাবা ঘরে শুয়ে আছে কাঁথা মুড়ি দিয়ে। মা বাড়ির পেছনে কদমতলায় বসে আছে পথ চেয়ে। নিতাই দা গালে হাত দিয়ে বসে আছে আঁতুড়ঘরের সামনে। আর পোঁয়াতি অনিতা গোঙাচ্ছে আঁতুড়ঘরের মধ্যে। শ্যামল ফিরে আসায় বাবা ঘর থেকে উঠে আসে, মা ফিরে আসে। গ্রামেরও অনেকেই চলে আসে চৌধুরী বাড়ির উঠোনে। সবার চোখে-মুখে প্রশ্ন, এখন কী হবে? এখন কী করবো সবাই। এ সময়ে বাইরে শোরগোল ওঠে, আগুন আগুন।

শোরগোল শুনে বের হয়ে আসে সব বাড়ির মানুষ। যার যার বাড়ির পুবপাশে এসে দাঁড়ায় সবাই। যাদের বাড়ির সামনে থেকে আগুন দেখা যায় না তারা অন্য বাড়ির সামনে এসে দাঁড়ায়। হরিণা থেকে দুই মাইল পুবে বালিঘুরঘুরি গ্রামের সব চেয়ে বড় রাধাকান্তর বাড়িতে জ্বলছে আগুন। এতো দূর থেকে শোনা যায় চিৎকার চেঁচামেচি আর গুলির শব্দ। গভীর রাত পর্যন্ত জ্বলে সে আগুন। এক সময় আগুন নিভে গিয়ে স্তব্ধ হয়ে যায় সবকিছু। গাঁয়ের মানুষ যার যার বাড়িতে না ফিরে চলে আসে চৌধুরী বাড়িতে। ভরে ওঠে উঠোন। উঠোনের মাঝখানে বসে আছে শ্যামল, তার সামনে দিনেশ চৌধুরী। কেউ কোনো কথা বলে না। এতো দিন কথা বলেছে দিনেশ চৌধুরী, কিন্তু আজ শুধু গাঁয়ের মানুষই নয়, সেও চায় এই বিপদে শ্যামল কিছু বলুক। এতো মানুষের দীর্ঘ নীরবতায় এক সময় দিনেশ চৌধুরী বলেই ফেলে, তুই একটা কিছু ক’ শ্যামল। আমরা এখন কী করবো?

আমি ভাবতাছি অনিতার কথা, অরে থুইয়া তোমাগোরে কনে নিয়া যামু! বলে শ্যামল।

এ কথা শুনে উসখুস করতে থাকে নিতাই। ভাবে, সে এখানে এসে গ্রামটাকে বিপদে ফেলে দিয়েছে। আবার গাঁয়ের মানুষের মধ্যে নীরবতা নেমে আসে। এর নীরবতার মধ্যে চিৎকার করে ওঠে এক নবজাতক। উঠোনে বসে থাকা সবাই তাকায় আঁতুড়ঘরের দিকে। রহিমা ধাই সে ঘর থেকে বের হয়ে আসে, চিৎকার করে বলে, অনিমা খালাস অইছে, মাইয়া অইছে, দুর্গার মতো।

উঠে দাঁড়ায় শ্যামল। প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে আসে হরিণা গাঁয়ে।

অলংকরণ : রাজিব রায়

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: