।। তারিক স্বপন ।।

কী নিকষ কালো আর মদির অনন্ত রাত! আমাদের এবং আমাদের পূর্বজদের স্মৃতির জন্মেরও অনেক আগে এই রাতের শুরু। ফলে আমরা কখনো দেখিনি কাউকে, কেউ দেখেনি আমাদের। আমরা শুনি। দূরাগত যেকোনো শব্দের তরজমা জমা হয় আমাদের মগজে। আমরা শুনতে পাই বিবিধ কৃষ্ণকণার অনুরণন, কালোত্তর অর্কেস্ট্রা। আমরা গন্ধ পাই। পাথুরে মাটির অনেক গভীরে ঘুমন্ত বা সাঁতাররত বিবিধ জীবকণা, ভবিষ্যতে পচে উঠবে এমন যাবতীয় মেদ-মাংস সবকিছুর গন্ধ বহুদিন জমে থাকে আমাদের নাকে। এই দীর্ঘস্থায়ী ঘ্রাণ আমাদের প্রায়শই বিভ্রান্তিতে ছুঁড়ে দেয়। যেমন, অনেক কাল আগে, আমাদের হাতে খুন হয়ে যাওয়া আমাদেরই জন্মদাতা বা জন্মদাত্রির একান্ত ঘ্রাণ এখনো সমান জাগ্রত। অথবা কিছুকাল আগে ধর্ষণ পরবর্তি মৃত মেয়েটির গলিত স্তন কিংবা জঙ্ঘার ঘ্রাণ ফিকে হতে হতে আবার হামলে পড়লে, ঘ্রাণতাড়িত আমাদের আরেকটি শিকার অবশ্যাম্ভাবী হয়ে পড়ে। অনিঃশেষ অন্ধকারে অভিযোজিত আমরা বুকে হাঁটার কৌশল রপ্ত করে ফেলেছি কয়েক জন্ম আগেই, ফলে মাটির কাছাকাছি প্রাণীগুলোর সঙ্গে আমাদের সরিসৃপতা জমে উঠেছে বেশ। যে প্রাণীরা তাদের প্রস্রাব ছিটিয়ে অধিকারে রাখতো এলাকার নির্দিষ্টতা, তাদের শিকার করে শেষ করে ফেলেছি অনেক আগেই এবং তাদের সেই দখলিস্বত্বের কৌশলটিকেও ভালো রপ্ত করেছি। বলে রাখা ভালো, এই সুমিষ্ট অন্ধকার আমাদের শিখিয়েছে গোষ্ঠীবদ্ধতা, আরেক গোষ্ঠীর কাছ থেকে অধিকতর অন্ধকার জায়গাগুলো ছিনিয়ে নেয়ার কৌশল। আমরা একসঙ্গে থাকি, কালোঝড়, কালোবৃষ্টি বা কালোবরফের কালে। দুর্যোগের রোমাঞ্চকর সময়গুলোতে আমরা পরস্পরের ভেতরে প্রোথিত হতে থাকি আরো বেশি। আমাদের মাংসাণুতে পরস্পরের ঢুকে পড়া, দলগত রমণপ্রক্রিয়া আমাদের যুথবদ্ধতাকে বহুমাত্রিকতা দিয়েছে।

আমাদের মাঝে সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন ও বয়সীজন, স্বীয় বর্জ্য-বিষ্ঠার নান্দনিক ঘ্রাণ নিয়ে আমাদের ঘনিষ্ট হয় এবং আমাদের এক শঙ্কার কথা জানায়। প্রথাগতভাবে আমরা বেশি বয়সীদের কালোবরফপাতের সময়টাতে গোষ্ঠীর চর্বির চাহিদার কথা ভেবে হত্যা করি ও পুঁতে রাখি গুহার অনেক গভীরে। তবে এই বয়সীজন আমাদের শিখিয়েছে অন্ধকারের নিঃশর্ত আনুগত্য মেনে কীভাবে নতজানু হতে হয়, সবার উপর কালো সত্য তার উপর কেউ নাই— এই আপ্ত বাক্যটি তার কাছেই শিখেছি ও মেনেছি আমরা। কালোত্তের একত্ববাদের বিপরীত চিন্তার কথা কারো মাথায় আসলে সেই মাথা কেটে ফেলার পন্থাও সে শিখিয়েছে আমাদের। সে আমাদের আরো শিখিয়েছে কীভাবে সদ্য ভূমিষ্ঠ দুর্বল মেয়ে বাচ্চাদের বলি দিতে হয়— অন্ধকার ফিকে হয়ে আসার সম্ভাবনা দেখা দিলে, অন্য গোষ্ঠীর গুহা বা মেয়ে বা বুড়ো শিকার কীভাবে করতে হয়। ফলে প্রতি কালোবরফপাতের কালে এই বয়সীজন তার সমসাময়িক অন্যান্য বয়সীদের মেদ-মাংসে ফুলে-ফেঁপে ওঠার সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে। সে আমাদের জানালো, এক ব্যাখ্যাতীত গন্ধ পেয়েছে সে। আমরা কী পেয়েছি এমন কোনো ঘ্রাণ? আমরা নাসারন্ধ্র ছড়িয়ে দীর্ঘশ্বাস নিই। গোষ্ঠীর প্রতিটি মৃত বা জীবিত জনের আলাদা-আলাদা গন্ধ, প্রতিযোগী গোষ্ঠী প্রধানের তীব্র প্রস্রাবের গন্ধ, কয়েক প্রজাতির সরিসৃপ ও মাকড়ের গন্ধ ছাড়াও আমরা অনিশ্চিৎ কালো ভবিষ্যতের কিছুটা ঘ্রাণ পাই। বয়সীজন সেসব নাকচ করে দিয়ে আমাদের অজ্ঞতায় কর্কশ হাসে।

‘শোনো তবে। বহুকাল আগে চিরঅন্ধকার যুগের সময়; কোন এক ভ্রষ্ট পবিত্র অন্ধকারকে অস্বীকার করে আগুন জ্বালানোর কৌশল শিখেছিল। আগুন কী বুঝলে না তো? আগুন হচ্ছে সেই অমোচনীয় পাপ, যে পাপে পবিত্র অন্ধকার কুলষিত হয়, অন্ধকারের কোল থেকে তার অমৃতের সন্তানদের কেড়ে নিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। সেই ভ্রষ্ট আদিমানুষের জ্বালানো আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল অনেক পাপিষ্ঠ মানুষ। তারপরের ইতিহাস খুব বেদনার। আমাদের মাংসের স্বাদ গেল কমে, কারণ সবাই শিখলো আগুনে ঝলসে খাওয়ার নিয়ম, ফলে দাঁতের ধার গেল কমে, ভোঁতা হয়ে গেল নখ, দুর্বল হয়ে গেলাম আমরা, কমে গেল শিকার দক্ষতা। আমিষ ছেড়ে ঘাস-লতা-পাতা-শাক-সবজি-ফলমূল খাওয়ার শুরু হয়ে গেল। আরো ভয়ংকর ব্যাপার হলো, ঐ অপবিত্র আগুনের ঔজ্জ্বলে সবাই সবার উত্থিত-নির্জীব শিশ্ন, ভেজা-শুকনো যোনী, উন্নত-অনুন্নত স্তন দেখে লজ্জায় পড়ে গেল, ছাল-চামড়া দিয়ে ঢেকে ফেললো নিজেদের। না, না, এটিই শেষ নয়। এর চাইতেও ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল। তারা সেই অপবিত্র আগুনের উপাসনা শুরু করেছিল, যুগপৎ ভয়ে ও শ্রদ্ধায়।’

এই ইতিহাসের কিছু কিছু আমাদের জানা। বয়সীজন আমাদের আরো জানায় এই অপবিত্র আগুন সভ্যতা নামের যে মেকি মুক্তির আশা দেখিয়েছিল, তা আদতে ছিল; এই মহান অন্ধকার থেকে সবাইকে দূরে রাখার অভিসন্ধি। আগুনের সভ্যতা সাময়িক জিতে গেলেও, মহান অন্ধকার ঠোঁট বেঁকিয়ে হেসেছিলেন। কারণ তিনি জানতেন, আগুনের বিপরীতেই তার অবস্থান এবং তিনি আরো জানতেন, কোনো আগুনই অনন্তকাল জ্বলে থাকতে পারে না, তাকে হাওয়া দিয়ে, কাঠের শুস্কতা দিয়ে বাঁচিয়ে রাখতে হয়। একসময় এই হাওয়া আর কাঠের জোগানদার ক্লান্ত ও বিষণ্ন হয়ে পড়বে, প্রবল ঘৃণায় ঝাঁপিয়ে পড়বে একে অন্যের ওপর এবং ঠিক তখনই মহান অন্ধকার গিলে ফেলবেন নিভু নিভু আগুনের শেষটুকুও।

তো, সেই বয়সীজন আমাদের জানায়; ঐ অপ্রাকৃত গন্ধ যা সে পেয়েছে, তা ঐ অভিশপ্ত আগুনের উপজাত, যাকে বলে ধোঁয়া!

অলংকরণ : রাজিব রায়