Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > আনিফ রুবেদের গল্প : চেরাইকল

আনিফ রুবেদের গল্প : চেরাইকল

পড়তে পারবেন 11 মিনিটে

মতিজার শরীর ছিল চিকন পাতলা। মরা মানুষের মতো, আধপোড়া কাঠের চেলার মতো। কিন্তু কয়েক বছর পার না হতেই, এই মরা শরীরেই ভরা যৌবন উথাল পাথাল করছে। উথাল পাথাল যৌবন তাকে তাল সামলাতে দিচ্ছে না। বেতালের বোতলে রেখে তরলের মতো ঝাঁকানি দিচ্ছে থেকে থেকে।

তাকে তার শরীর অস্থির করে। তার খুব ইচ্ছে, কেউ তাকে বিয়ে করে নিয়ে গিয়ে শরীরটাকে শরীরের চাপে একেবারে পিষে ফেলুক। কিন্তু তার বিয়ে দেবার মতো সামর্থ্য তার বাবার নেই। আর পুরুষগুলোও আজব স্বভাবের, টাকা নেওয়া ছাড়া বিয়ে করতে চায় না, টাকাওয়ালা বাড়ি ছাড়া বিয়ে করতে চায় না। আরে পরের টাকা দিয়ে কী করবি! নিজে টাকা কামাবি, বউ বাচ্চা নিয়ে খাবি। অন্যের টাকার উপর লোভ কেন। মানুষ বিয়ে করে টাকার জন্য? মানুষ মানুষের মন চায়, দেহ চায়, এ জন্যই তো বিয়ে।

তার শরীর মন তাকে অস্থির করে তোলে। সে স্থির থাকার চেষ্টা করে। স্থির থাকাটাও একটা যুদ্ধ। স্থির থাকার জন্য কত যুদ্ধ করতে হচ্ছে নিজের সাথে, পরের সাথে— বাইরের সাথে। কত রকমের যুদ্ধ মানুষের। যুদ্ধ এক জানোয়ারের মতো চেপে ধরে আছে মানুষের জীবন।

রাতে শরীরটার ভার বহন করা কঠিন হয়ে যায়। বারবার মনে হয়, যাকে পাব তাকেই চেপে ধরব। কিন্তু সকাল হলে পুরুষগুলোর দিকে সে ড্যাবড্যাব করে চেয়ে থাকে, কাউকে কিছু বলতে পারে না। সে জানে, সে দেখতে তেমন কোনো খারাপ নয়। তার দিকে অনেকেই চেয়ে দেখে, হাসি ছড়িয়ে চলে যায়। নিজে থেকে সে কাউকে সাহস করে কিছু বলতে পারে না। তার শুধু মনে হয়, কেউ একজন এগিয়ে এসে কথা বললেই মন-শরীর উজাড় করে তার সাথে সে মিশবে। দুএকজন কেউ কেউ তার দিকে এগিয়ে আসে কথা বলতে। সে খুশি হয়ে তাদের সাথে কথা বলে।

গুমশাটে গরম, প্রচণ্ড রোদের তাপে শুকনো মাটি মরা মানুষের মতো ঠোঁট ফাঁক করে রয়েছে মাঠে মাঠে। অকালেই পাকছে তাল। চালের ওপর তাল পড়ে চাল তালের পরিধিতে ফুটো হয়ে যায়। পুরাতন ছনের চাল। ঘরের মেঝে থেকে তাল সরিয়ে নিলে সেখানে রোদ দেখা যায়। গোলাকার রোদ। তালের মতো গোলাকার, মাথার মতো গোলাকার, মাস্টারের ভূগোলকের মতো গোলাকার।

ভুলুয়া বিশ্বাস করে না পৃথিবী ফুটবল বা কমলালেবু বা তালের মতো গোলাকার। কিন্তু চাঁদ সূর্য গোল এটা ঠিক, চক্ষে দেখা ঠিক। চাঁদের মতো গোলাকার রোদ পড়ে আছে মেঝের মাটিতে। আকাশে চাঁদ যেমন গোল হয়ে থাকে এখানে ঘরের মেঝেতে পড়ে থাকা গোল রোদকে মাটির বুকে থাকা চাঁদ মনে হচ্ছে। আকাশের চাঁদ ছোঁয়া যাবে না। ভুলুয়া তাদের ঘরের মেঝের মাটিতে থাকা চাঁদ ছুঁয়ে দেখতে পারে। সে ছুঁয়ে দেখে তালের গন্ধমাখা গোল রোদ। মাটির চাঁদে হাত দিয়ে থাকতে থাকতে হাত গরম হয়ে ওঠে। ভুলুয়া চাঁদের গা থেকে হাত সরিয়ে নেয়।

সে বিশ্বাস করে না পৃথিবী গোল। তার বন্ধু স্কুলের মাস্টার, সে-ই একটা ভূগোলক দেখিয়ে বলেছিল—‘দেখ্, পৃথিবী গোলাকার’। ভুলুয়া বলেছিল—‘তুই শিক্ষিত মানুষ হয়ে পাগলার মতো কথা বলছিস কেন? এমন গোলের ওপর মানুষ ঘরবাড়ি করে থাকতে পারে, হুড়মুড় করে পড়ে যাবে না?’ তার রুক্ষ মূর্খতায় বন্ধু হেসেছিল, মেলারকমভাবে বোঝাতে চেয়েছিল—‘পৃথিবী গোল’। ভুলুয়া বুঝেনি। বলেছিল—‘তোর হাতের গোলক গোল হতে পারে, পৃথিবী কখনোই গোল নয়’।

ভুলুয়াদের এখানে আসা প্রায় দশ বছর। আগে ছিল দিয়াড়ের প্রত্যন্ত অঞ্চলে। পদ্মার চরে। সেখানে খুব বেশি কষ্ট ছিল। দুমুঠো ঠিকমত খেতেও পাওয়া যেত না। বরেন্দ্র থেকে যে ক’টা ধান পাওয়া যেত ঋণ শোধ করতেই চলে যেত। আত্মরক্ষণ যখন কষ্টকর হয়ে গেল, তখন ভুলুয়া সে জায়গা ছেড়ে চলে এলো। প্রায় ১০ বছর হলো।

কয়েক বছর এখানে ভালোই চলছিল কিন্তু আবার যেই জালমাছ, সেই ইচা, সেই চিংড়ি অবস্থা। কষ্ট যেতে চায় না, সেই যে ধরেছিল দিয়াড়ে। কষ্টরা এখানের বাড়িঘরও চিনে ফেলেছে আবার এরই মধ্যে। ওখানের কষ্ট পথ চিনে চিনে ঠিক এসে হাজির হয়েছে এখানে। পরপর দুবছর অজন্মা না হলে বোধ হয় হতো। এমনিতেই জমি একেবারে নেই বললেই চলে, তারপরেও কোনোরকমে দিনে দুবার খেয়ে চলে যেত। এখন সেটাও হচ্ছে না। জীবন নামতে নামতে পায়ের তলে চলে এলো।

বড় মেয়েটা বড় হয়েছে। বিয়ে হচ্ছে না শুধু টাকার জন্য। ভুলুয়ার মায়া লাগে। সংসারের এমন হীন অবস্থা দেখে বাড়িতে বেশিক্ষণ থাকতে ভালো লাগে না ভুলুয়ার। বাইরেই ঘুরে বেড়ায় বা কোনো এক জায়গাতে বসে থাকে। তার এই বাইরে ঘুরে বেড়ানো বা বসে থাকার ভাবটা এমন— ‘সমস্যাকে বাড়িতে রেখে সে চলে এসেছে। সমস্যা বাড়ির বাইরে আসার পথ চেনে না।’ কিন্তু সমস্যাও বাড়ির বাইরের পথ চেনে। বাড়ির সমস্যা বাড়ির বাইরে বেরিয়ে আসে। কারো বাড়ির সমস্যা বাইরে বেরিয়ে এলে সেটা পুরো গ্রামের, পুরো সমাজের আনন্দের অন্ন হয়ে ওঠে। একজনের সমস্যায় পড়া মানে অন্যের রসের রসগোল্লা খাওয়ার স্বাদ পাওয়া। একের দুর্দশা-ই তো আরেকের আনন্দ, এছাড়া আর আনন্দ কোথায় পাবে মানুষ!

পথে বরফওয়ালার ক্যাসেট বাজছে—‘আসেন আসেন বরফ খান, শরীর জুড়ান, দুধ-চিনি-নারকেলের বরফ জলের দরে, মাত্র একটাকা আট আনা করে। একটা খেলেই আত্মা তাজা, কলজে ঠাণ্ডা, প্রাণ শান্তি।’ বরফওয়ালার মাইকে মাঝে মাঝে বড় হুজুরের ওয়াজ বাজছে। আল্লাহ ছয় দিনে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করেছেন এবং সপ্তম দিনে আরশে বিশ্রাম নেন। কুন, ফায়াকুন। যে আল্লার ‘কুন’ বলার সাথে সাথে ‘ফায়াকুন’ হয়ে যায়, সেই আল্লাকে মহাবিশ্ব সৃষ্টি করতে ছয়দিন সময় লেগেছিল আর একদিন বিশ্রাম নিতে হয়েছিল। কিন্তু ভুলুয়া ভেবে দেখে, জ্ঞান হবার পর থেকে তার একদিনের জন্যও জিরানোর সময় হয়নি। স্থিরানোর সুখ পায়নি।

সে বাড়ির বাইরে গাবগাছের নিচে বসে ঢেরাতে পাটের দড়ি কাটছে। বন বন করে ঘুরছে ঢেরা। মাস্টার বলেছিল, পৃথিবীও নাকি বন বন করে ঘুরছে। ঢেরা ঘোরাতে যেমন পাট মুচড়ে মুচড়ে দড়ি তৈরি হয়, পৃথিবী ঘোরাতে নাকি তেমনই দিন আর রাত তৈরি হয়। এসব কথা ভুলুয়া বিশ্বাস করে না। পৃথিবী কেমন করে ঘুরতে পারে, তার মাথায় ঢোকে না। ঢেরা ছেড়ে সে টিনের জগ থেকে সরাসরি গলায় পানি ঢালে। কিছু পানি গড়িয়ে পড়ে কাঁচা পাকা দাড়ির ওপর। জলবিন্দু মুক্তা বা শিশিরবিন্দুর মতো লেগে থাকে। ঘাড়ের গামছা দিয়ে দাড়ি থেকে শিশিরবিন্দু বা মুক্তা মুছে ফেলে ভুলুয়া। মুছা হয়ে গেলেও আনমনে আরো কিছুক্ষণ মুছতে থাকে। উদাস হয়ে বসে থাকে। মাঝে মাঝে দাড়ির ভেতর পাঁচ আঙুল ঢুকিয়ে নাড়াচাড়া করে, যেন দাড়িজলে মাছ ধরার চেষ্টা করছে, যেন দাড়িজঙ্গলে খরগোশ ধরার চেষ্টা করছে। মাছ, খরগোশ কোনোটাই না পেয়ে যেন হতাশ হয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। দীর্ঘশ্বাসের বাতাসের চাপে পাতলা গোঁফেরা শুধু একটু নড়ে, ভেতরের বেদনা একটু নড়ে না। পাথরের মতো চেপেই থাকে। এই একঘেঁয়ে চাপ থেকে বাঁচতে সে ঢেরাতে পাক দিতে আবার মনোযোগী হয়। মনোযোগ দিয়ে অমনোযোগী হয়, অমনোযোগ দিয়ে মনোযোগী থাকে।

বাড়ি থেকে কয়েকশ গজ দূরে, রাস্তার পাশে নতুন চেরাইকল বসেছে। কোথা কোথা থেকে লোকজন গরুরগাড়ি, মোষের গাড়ি করে ইয়া মোটা মোটা গাছ কেটে কাঠ নিয়ে আসছে। চোখের পলকেই মোটা মোটা গাছের গুঁড়ি চিকন তক্তা বা খুঁটি হয়ে যাচ্ছে। কাঠের গুঁড়া বাতাসে উড়ে। ঐখান দিয়ে হেঁটে যাওয়া মানুষের চোখে কাঠের গুঁড়া উড়ে পড়ে চোখ খচ খচ করে। অবশ্য কয়েকদিনে মানুষ কৌশল বুঝে নিয়েছে। চেরাইকলের কাছ দিয়ে যাবার সময় চোখ বুজে বা আধবোজা করে দ্রুত হেঁটে চলে যায়। যদিও তারা তাদের চোখ বাঁচানোর জন্য চোখ বুঁজে নেয় তারপরেও তাদের দেখে মনে হয়, তারা গাছের শরীর ফাড়া দেখতে পারছে না বলে চোখ বুজে নিচ্ছে।

কাঠ চেরাইয়ের শব্দ খুব বিরক্তির লাগে। কিন্তু যেমনই থেমে যায় অনেক ভালো লাগে। চেরাইকল থেমে যাবার ফলে তৈরি হওয়া নিঃশব্দতা মধুর আর আরামের অনুভূতি দেয় কানের ভেতর, মনের ভেতর। নিঃশব্দতা যে এত ভালো লাগার তা এর আগে বোঝা যায়নি। বিরক্তির অনুপস্থিতিটাই তবে ভালো লাগা। ‘খারাপ লাগা’ না থাকাটাই তবে ‘ভালো লাগা’। ‘ভালো লাগা’ আলাদা কিছু নয়।

গাবগাছের নিচে বসে পাটের দড়ি পাকাচ্ছে ভুলুয়া। পাটের দড়ি পাকাতে পাকাতে মেয়েকে ডাকে—‘মতিজা, এ মতিজা একবার বাইরে আয় তো রে মা।’ মতিজা বড় মেয়ে। ‘কী বলছ আব্বা? মতিজা তো বাইরেই আছে তবে আর বাইরে আসবে কেমন করে?’ মতিজা আসেনি, কথা বলতে বলতে ছোট মেয়ে তমিজা এসে তার বাবার সামনে দাঁড়ায়। ভুলুয়া বলে—‘মতিজা কই?’ তমিজা বলে—  ‘সে বাড়িতে নেই। কোথা কোথা সারাদিন ঘুরে বেড়ায়। রাতেও নদীর দিকে হাঁটতে যায়, মাঠের দিকে হাঁটতে যায়। দেখিও তোমার মেয়েকে কখন ভূতে ধরবে। নদীর ধারে, বন-বাদাড়ে, ক্ষেতে-মাঠে তো ভূত থাকে, থাকে নাকি আব্বা, বলো?’ ভুলুয়া কিছু বলে না। মতিজার উপর মন খারাপ হয়, মেয়েটা বড্ড ঘুরেবেড়ানি হয়েছে। তার উপর তাকে নিয়ে কী কী বাজে কথা মাঝে মাঝে কানে আসে। তাকে বেশ করে বকা দিতে হবে, এখানে ওখানে সবসময় ঘুরঘুরানির ভূত ভালো না। ভুলুয়া তমিজাকে বলে—‘মা, জগের পানি শেষ, পানি নিয়ে আয়। তোর মা কী করছে?’ ‘মা রাঁধছে’— বলে জগ হাতে করে মুন্সিবাড়ির টিউবওয়েলের দিকে তমিজা হাঁটা ধরে। তমিজার হাঁটার দিকে চেয়ে থাকে সে, কাঁটা বেঁধার মতো বুক খচখচ করে— এ মেয়েটাও বড় হয়ে যাচ্ছে।

ভুলুয়া সূর্যের দিকে তাকিয়ে দেখে— দুপুর হতে আর বেশি নাই। সূর্য ভুলুয়ার দিকে তাকিয়ে দেখে— লোকটা বড্ড পিপাসার্ত, পিপাসাতে পিপাসাতে তার শরীর জীর্ণ হয়ে গেছে। ভুলুয়া সূর্যের দিক থেকে চোখ নামিয়ে চেরাইকলের দিকে তাকায়। সূর্য ভুলুয়ার দিক হতে চোখ সরিয়ে সমগ্র পৃথিবীর দিকে তাকায়। সমগ্র পৃথিবীর দিকে তাকালেই সমগ্র পৃথিবী দেখা যায় না। সমগ্র পৃথিবীর অতিতর সামান্য দেখা যায়। সূর্যও ঐ সামান্য অংশই দেখছে।

চেরাইকলে সাতজন শ্রমিক কাজ করে। মোটা মোটা কাঠের গুঁড়ি তারা শক্তি দিয়ে চেরাইকলের কাছে নিয়ে যায়। চেরাইকলের করাতের টেবিলে গাছের বিশাল কাণ্ড বসাতে তাদের ঘাম ছুটে যায়। দূরে বসে থেকে চেরাইকলের মালিক তাদের কাজ দেখে। মালিক কাঠচেরায়ের মাশুলের টাকা থুথু দিয়ে আঙুল ভিজিয়ে গুণে নেয়। ভুলুয়াও কাজ করেছিল এখানে গত অজন্মার সময়। কিন্তু কয়েকদিন পরেই তারা তাকে বাদ দিয়ে দেয়। তাদেরই আর দোষ কী, অন্যদের মতো শক্তি দিয়ে তো সে কাজ করতে পারে না। শক্তির পায়ের তলে মানুষের বেহেশত। শক্তি না থাকা মানে নরকে থাকা। সে নরকে আছে।

মসজিদের মাইক থেকে আজান আছড়ে পড়ল পুরো এলাকাতে। চেরাইকল বন্ধ হয়ে গেল। দুপুরের খাবারের বিরতি। ভুলুয়াও ওঠে—দুপুরের খাবার খেতে হবে। চেরাইকল থামতেই, কান যেন আরামের নিঃশব্দ গান পান করতে লাগল। নিঃশব্দতা এক মধুর গান। নৈঃশব্দ্য এক ফুলের বাগান।

মতিজা দুপুরের খাবার খেয়ে উঠে। তার শরীর ঘেমে গায়ের পোশাক একেবারে গায়ের সাথে লেগে গেছে। সে বাড়ি থেকে বের হয়। ইদ্রিশ চৌধুরীর আমবাগানে গিয়ে বসতে হবে। বাড়ি থেকে বাগানের পথ কয়েক মিনিটের। এর মধ্যেই কয়েক যুবক, মধ্যবয়স্কর তার সাথে ইয়ারকি করা হয়ে গেছে। মতিজাকে সবাই একবার চায় কিন্তু একেবারে চায় না। মতিজা এদের সাথে হেসে হেসেই কথা বলে। ভাত খেয়ে বাগানে আসার পর সে প্রায় মাটি ছুঁয়ে থাকা একটা নিচু আমডালে বসে। তার একবার বমি হয়। সে কিছু একটা সন্দেহ করে। সন্দেহ যদি সত্য হয় তবে, এটা কার হতে পারে? পুরুষের সংখ্যা লেখাজোখা নাই। যে-ই বলে কাউকেই সে নিরাশ করে না। প্রথমে যখন তাকে কেউ এসে প্রস্তাব দেয় তখন মতিজা তাকে বলে— ‘আমাকে তোমার ইচ্ছেই যখন করছে তখন বিয়ে করো আমাকে।’ যাকে বিয়ের কথা বলা হয়, সে তখন মুখ ফিরিয়ে নিলে মতিজা নরম হয়ে বলে—‘আচ্ছা ঠিক আছে বিয়ে করতে হবে না, কখন কোথায় আসব বলো।’ ত্রিশ চল্লিশের বেশি জনের সাথে সে এ কয়েকবছরে মিশেছে। অনেকেই টাকা দিতে চায়, সে নিতে চায় না—‘আরে টাকা দিয়ে কী করব? আমার তো আসলে বিয়ে করা দরকার। যেহেতু তুমি বিয়ে করবে না কিন্তু বিয়ের কাম করবে, তো করো। টাকা দিতে চাইছ কেন? আমি বেশ্যা নাকি?’

এটাকে সে অনেকটা আনন্দের মতো নিয়েছে। বিয়ের বিকল্প হিসেবে নিয়েছে। কিন্তু সে আসল আনন্দ পায় কাঠচেরাইকলের শ্রমিকদের সাথে। নদীর ধারে তারা প্রায় পরস্পর একসাথে মিলে। এর বাহু থেকে ওর বাহু, ওর বাহু থেকে তার বাহু। মতিজার বেশ লাগে। তারা সাতজন। তবে তারা জোরাজুরি করে না। কখনো যদি বলে—‘আজ দুজন বা তিনজনের বেশিকে পারব না’ তবে তারা তাই মেনে নেয় আর পছন্দের ভারটা মতিজাকেই দেয়। এসব ভাবতে ভাবতে তার আবার বমি আসে। সে ওয়াক করে বমি করে। সে হাঁপায়, সে আমগাছের ডালে হেলান দিয়ে বসে থাকে। সাতজনের মধ্যে একজনের মুখ তার মনে ভেসে ওঠে বেশি করে। যখন সে এ সাতজনের ভেতর থেকে দুতিন জনকে বেছে নেয় তখন সে একে রাখেই ঐ দুতিনজনের মধ্যে। যদি সে একজনকে বেছে নেয় তবে সে একেই বেছে নেয়। সাতজনের মধ্যে থেকে বিশেষ একজনের মুখ মনে পড়াতে তার ভালো লাগছে। সেইজন তার সাদা মধুতরলকে সবচে বেশি ভেতরে পিচকারী করতে পারে।

তার আবার বমি আসে। দুশ্চিন্তার মশা-মাছি তার ভেতরে ভন ভন করতে থাকে। সে বমি লুকানোর চেষ্টা করে। বমি গিলে ফেলে পেটের বাচ্চাটার কাছে লুকিয়ে ফেলতে চেষ্টা করে। বমি সে তার বগলের নিচে, যোনির ভেতর লুকাতে চেষ্টা করে। বমি সে লুকাতে চেষ্টা করে তার স্তনের ভেতর। স্তন আরো ফুলে ওঠে। সে বমি গাছের খোঁদলে, মাটির গর্তে, নদীর জলে লুকিয়ে ফেলতে চেষ্টা করে। পুরো পৃথিবীর বুক খুঁড়ে ফেলে বমি লুকিয়ে ফেলতে চেষ্টা করে।

বমি সে বেশিদিন লুকিয়ে রাখতে পারে না। কয়েকদিন পর সে বাড়িতে বমি করে ফেলে। তার বাবার দাড়িতে বমি করে ফেলে। তার মায়ের শাড়িতে বমি করে ফেলে। তার বোনের চুড়িতে বমি করে ফেলে। সে তার নিজের চোখের ওপর, পেটের ওপর বমি করে ফেলে। সমগ্র জগতের গা ভাসিয়ে দেয় বমিতে বমিতে। আগ্নেয়গিরির লাভার মতো গরম বমি বেরিয়ে আসছে তার ঠোঁট থেকে, স্তন থেকে, যোনি থেকে, চোখ থেকে, কান থেকে, পেট থেকে, পিঠ থেকে। বমিময় ধরণী। এত বমি এ ধরা কোথায় লুকিয়ে রাখবে! বাবার বন্ধু মাস্টার কাকার ভূগোলক সে দেখেছে। ঐ গোলকে তিনভাগ নীলজল আর একভাগ মাটি ছাপা থাকে। এখন বমিতে ডুবে আছে গোলকটার চারভাগই, সে বসে আছে বমির ওপর। তার বাপ, মা, বোন বসে আছে বমির ওপরে। আর সব মানুষ বমির বাইরে, পৃথিবীর বাইরে হেসে খেলে, হেলেদুলে বেড়াচ্ছে।

ভুলুয়ার মাস্টার বন্ধু, যে, পৃথিবী গোল বলেছিল, সে গতকাল সন্ধ্যায় এসেছে। এসেছে মানে ভুলুয়ায় তাকে ডেকে এনেছে, হাজার হোক শিক্ষিত মানুষ, বিচারে দুটা কথা বলতে পারবে। মাস্টারের সাথে তার ছোটকাল থেকে সুখ। যদিও ভুলুয়া কোনোদিন স্কুলে পা দেয়নি। স্কুলের সময়টুকু ছাড়া তারা প্রায় একসাথেই কাটাত। ভুলুয়া গ্রাম ছাড়লেও মাস্টার স্কুলে চাকরি নিয়ে ঐ গ্রামেই থেকে গেছে।

মতিজার পেটে বাচ্চা আছে। গত কয়েকদিন থেকে সে থেকে থেকে বমি করছে। ‘কে এমন করেছে?’— এ প্রশ্নের উত্তর সে করে না। শুধু বলছে—‘আমি বলব না।’ কিন্তু যখন জানাজানি হয়ে গেল আর সমাজের লোক বিচারে বসবে বলে কথা হয়ে গেল, তখন সে বলল—‘বিচারের দিন ছাড়া আমি কথা বলব না।’

এ বিচার উপলক্ষেই বিচারের আগের সন্ধ্যায় মাস্টার এসে হাজির হয়েছে। আগামীকাল বিচার। পথে পথে মহিলা-পুরুষদের মধ্যে হাস্যোৎসব শুরু হয়ে গেছে। তবে কিছু পুরুষ চিন্তিত আছে। তারা তাদের দুশ্চিন্তাকে বুঝতে দেবে না বলে অন্যদের চেয়ে বেশি হাসছে। সবাই মনে মনে বলছে—‘আল্লা গো, আমার কথা যেন মতিজা না বলে, আমার নাম মতিজার মন থেকে ভুলিয়ে দিও মাবুদ।’

কিন্তু বিচারের দিন সকালে ঘুম থেকে ওঠার পর মতিজাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না। তমিজা বলে—‘বুবুকে মাঝরাতের দিকে একবার বিছানা ছেড়ে উঠতে দেখেছিলাম বলে মনে হচ্ছে। তারপর আর ফিরেছে কিনা মনে পড়ছে না। আমার ঘুম ছিল খুব। আমার মনে হয়, সে নদীর ধারে যেমনভাবে মাঝে মাঝে হাঁটতে যায় তেমনটাই গেছে। আমি তো আগেই বলেছিলাম তাকে একদিন ভূতে ধরবে। মনে হচ্ছে তাকে ভূতেই ধরেছে। রাতের নদীতে তো মাছের চেয়ে ভূতই থাকে বেশি।’

মাস্টার ভূত বিশ্বাস করে না। তারপরেও সে অন্যদের সাথে নদীর দিকে হাঁটতে থাকে। অন্যরাও বুঝতে পারে না—তারা তমিজার কথা শুনে কেন নদীর দিকে হাঁটতে লাগল? নদীর দিকে রাতে সে গেছিল আর ভূতে তাকে ধরে জলের মধ্যে নিয়ে গেছে? তাকে ভূতেরা জলের নিচে জলগাছের সাথে বেঁধে রেখেছে? জলের নিচে জলগাছের জঙ্গল আছে। বিশাল বিশাল জলগাছ।

খুব ছোট্ট নদী। নদীর ধারে এসে একজন বলল—‘এই যে’।

সবাই চমকে তার দিকে তাকাল। সে নদীর কিনার দেখাল। সকলের চোখ একসঙ্গে গিয়ে পড়ল। যেন একসঙ্গে অনেকগুলো জ্বলন্ত টর্চের আলোকফলা একসাথে একটা বস্তুর উপর পড়ল।

অন্য একজন বলল­—‘ঐ যে’। সে নদীর মাঝখানে দেখাল। সকলের চোখ সঙ্গে সঙ্গে নদীর মাঝখানে চলে গেল। নদীর মাঝখানটা চর, দুতিন আঙুল করে জল। এসব জলের ওপর সবার চোখ বালিতে ঠেঁকে ঠেঁকে ভেসে বেড়াতে লাগল।

আর একজন বলল—‘হুইই যে’। সে নদীর অপর কিনার দেখাল। সকলের চোখ সঙ্গে সঙ্গে একসঙ্গে অপর কিনারে গিয়ে হাজির হলো। একটা বস্তুর ওপর অনেকগুলো ব্যাঙ যেন একসাথে লাফিয়ে পড়ল।

সকলের চোখ চলাচল করছিল কিন্তু পা স্থির ছিল। পটলের মতো বা নৌকার মতো মানুষের চোখ। মানুষের নৌকাকার চোখগুলো গোলাকার হয়ে গেছে। মাস্টারের মনে পড়ছে, আলমাস বাউল বলছিল একদিন—‘মানুষের চোখ তো নৌকাকার নয় বাবা, গোল। কমলালেবুর মতো গোল। তোমার ভূগোলকের মতো গোল। দেখছ না, গোলাকার চোখকে হাড়ের ঘরে ভরে দিয়ে চামড়া টেনে টুনে, সেলাই ফোঁড়ায় করে বেঁধে রেখেছে। যাতে দেখার সীমা থাকে। যাতে সবকিছু দেখতে না হয় মানুষকে। সবদিক দেখতে গেলে যে মানুষ পাগল হয়ে যাবে বাবা। তাই তো সাঁই এমন করে রেখেছে। গোল চোখকে অর্ধ পটলের মতো করে রেখেছে।’ কিন্তু নদীর পাড়ের দৃশ্য দেখে মানুষের চোখগুলো এখন ঐ সেলাই করা চামড়া ছিঁড়ে ছুঁড়ে একেবারে বেরিয়ে পড়েছে। জবাই দেবার পর গরুর চোখ, চোখগর্ত থেকে টেনে বের করে দেখলে যেমন গোল দেখা যায় তেমন গোলাকার হয়ে গেছে। চোখ গোল গোল করে মানুষ তাকিয়ে আছে।

‘এই যে’, ‘ঐ যে’ আর ‘হুইই যে’ কে এক করা হলো।

মাস্টার অবাক বিস্ময়ে ‘ঐ যে’ আর ‘হুইই যে’র দিকে তাকিয়ে থাকল। ‘এই যে’ আর ‘হুই যে’ কে যোগ করা হলো।

এই যে=নদীর এ কিনার।

ঐ যে=নদীর মাঝখানের ডুবু ডুবু চর।

হুইই যে=নদীর অপর কিনার।

এই যে + হুইই যে=মতিজার মরদেহ।

অর্থাৎ—

নদীর এ কিনার + নদীর ঐ কিনার=মতিজার মরদেহ।

মাস্টার খুব ভালো করে দেখল, মতিজার শরীর। কী নিখুঁতভাবে দ্বিখণ্ডিত করা হয়েছে। ডান পা, ডান স্তন, নাকের ডান ফুটো, ডান চোখ একদিকে। বাম পা, বাম স্তন, নাকের বাম ফুটো, বাম চোখ আরেকদিকে। শরীর কেঁপে ওঠে সকলের। মাস্টারের মনে পড়ল ছাত্রকালে কলেজে পড়া জীববিজ্ঞান—‘মানুষ সমাঙ্গদেহী জীব’। তার মনজীভ বলে উঠল—‘মানুষ অসহায়তম জীব। মানুষ নৃশংসতম জীব’।

নদীর এ কিনার=এই যে=মতিজার ডান দিক।

নদীর ঐ কিনার=হুইই যে=মতিজার বামদিক।

তাহলে, নদীর মাঝখানের ডুবু ডুবু চর=ঐ যে=?

‘ঐ যে’ টা যখন আধাডোবা আধাভাসাভাবে চরে পড়েছিল আর জলের ঢেউয়ে দুলছিল তখন সেটা বড়সড় একটা তালশ্বাসের মতো দেখাচ্ছিল। এটা তালশ্বাস নয়, মতিজার পেটের অপূর্ণ বাচ্চা।

অর্থাৎ—

নদীর মাঝখানের ডুবু ডুবু চর=ঐ যে=মতিজার পেটের বাচ্চা

সুতরাং এই যে + হুইই যে + ঐ যে=মতিজা ও মতিজার পেটের বাচ্চার মরদেহ।

মতিজার শরীরের লাশ খুঁজে পাওয়া গেল, তার প্রাণ বা প্রাণের লাশকে পাওয়া গেল না।

এককান দুকান হতে হতে মতিজাকথা নদীর কিনার থেকে গাঁয়ের কিনার, গাঁয়ের কিনার থেকে গাঁয়ের ভেতর, গাঁয়ের সকলের কানের কিনার থেকে আর সকলের কানের কিনারে ঢুকে পড়ে আর সবাই চেরাইকল ছাড়িয়ে, মাঠ মাড়িয়ে, কাজ পাড়িয়ে নদীর দিকে আসতে থাকে। যারা বিচার করত তারাও এসেছে। একজন বলল—‘এখন আর বিচার হবে না।’ সবাই বলাবলি করতে লাগল— ‘এটা এখন পুলিশ কেস’।

আজ চেরাইকল চলছে না। কিন্তু ভুলুয়ার কানে চেরাইকলের বিরক্তিকর একঘেঁয়ে শব্দ বাজতেই আছে। তার বুকের ভেতর চেরাইকল চলছে। তার বুকের ভেতর চলতে থাকা চেরাইকল পুরো পৃথিবীকে চিড়ে ফেলছে।

তার কান্নার চেরাইকলের কাছে মানুষ দাঁড়াতে পারে না। যেমনভাবে কাঠ চেরাইকলের পাশ দিয়ে মানুষজন চোখ বুজে, না তাকানোর ভান করে চলে যায় তেমনভাবে চলে যাচ্ছে…

[ডোম সংবাদ : মতিজার লাশ মর্গে গিয়ে নাকি বেশ ঝামেলা করেছিল। যখন ময়নাতদন্তের পর জোড়া দেয়া হচ্ছিল তখন। মাথাটা, মুখটা জোড়া দেয়া মাত্র মৃত মতিজা বলে উঠেছিল— ‘তোমরা আমাকে জিন্দা করো না, তোমাদের পায়ে ধরি।’ মদন ডোম তখন বলেছিল—‘তোমাকে কে জিন্দা করছে! তোমার ডানদিক আর বামদিক জোড়া দেয়া হচ্ছে মাত্র। যাতে কবর দেবার সুবিধা হয়।’ তখন মতিজা বলেছিল—‘তাহলে সত্য করে বলো, আমার ডানদিক আর বামদিক জোড়া দিলেও আমি জিন্দা হব না।’মদন ডোম তাকে আশ্বস্ত করেছিল। যতক্ষণ আশ্বস্ত করেনি ততক্ষণ মতিজা সেলাইগুলো খুলে ফেলছিল, ছিঁড়ে ফেলছিল এবং যাতে সেলাই দিতে না পারে তার জন্য দুপাশকে দুপাশে বার বার সরিয়ে নিচ্ছিল। মদন ডোম সেলাইয়ের গিঁট দিতে পারছিল না।

শেষে শেষ সেলাইটি দেবার পর ঘর্মাক্ত মদন ডোম জিজ্ঞাসা করেছিল মৃত মতিজাকে—‘আচ্ছা তুমি তো আর জিন্দা হবেই না কারণ এটা সম্ভব না কিন্তু জিন্দা হতে তোমার এত ভয় কেন?’ মতিজা বলেছিল—‘শোনো ডোম দাদা, বেঁচে থাকা বড়ই যাতনার গো। যৌবন খালি যৌনতা চায়। মৌবন খালি মৌমাছি চায়। এজন্য আল্লা বিয়ার বিধান দিয়েছে। কিন্তু আমার তো বিয়ে হয়নি। তাই এমনি এমনি সকলের সাথে দেহ মেলাতাম। কী করব! আমার দেহ আমার সাথে খুব কলহ করত। আর পুরুষগুলোও ভালো নয় গো ডোমদাদা, কাম করতে চায়, বিয়ে করতে চায় না। তা না করুকগে! কিন্তু আল্লাও ভালো মানুষ নয় গো ডোম দাদা। আমার বিয়ে হয়নি, আমার বাচ্চা নেবার ইচ্ছে নাই তবু সে পেটে বাচ্চা দিয়ে দিল কেন! এটা তার কেমন বিধান গো ডোম দাদা? শরীর পাবার জন্য শরীরের, মন পাবার জন্য মনের বড্ড কষ্ট হয়েছে গো দাদা, খুন হবার সময় বড্ড কষ্ট হচ্ছিল গো দাদা। তাই তো আমি এ জগতে বেঁচে থাকার মতো আর ভুল কাজ করতে চায় না। একেবারে মরতে প্রচুর কষ্ট পেয়েছি কিন্তু বেঁচে থাকলে প্রতিদিনই কষ্ট।’ একসঙ্গে এতগুলো কথা বলার পর মৃত মতিজা থামে। মদন ডোম তাকে আবার বলে—‘ধুরো! তুমি ভুল বলছ। আবোল তাবোল বলছ। মানুষ হাজার কষ্ট পেলেও তো বেঁচে থাকতে চায়।’ মতিজা সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠেছিল—‘মানুষ জানে না তাই বেঁচে থাকে আর মরে যাবার আনন্দ থেকে বঞ্চিত হয়। অবশ্য অনেকেই আছে যারা মরতে পারে না বলে বেঁচে আছে। যেমন, আমিই আত্মহত্যা করতে সাহস করিনি বলে বেঁচে ছিলাম।’

কিছুক্ষণ পর মৃত মতিজা আবার বলে উঠেছিল—‘আচ্ছা ডোম দাদা, আমার পেটের বাচ্চাটা কই? সেটা আমার পেটে ভরে দিয়ে সেলাই দাওনি কেন?’ মদন ডোম বলেছিল—‘ওটা পড়ে আছে ঐ তো ঐ কোণে।’ সে লাশকাটা টেবিলের এক কোণের দিকে আঙুলের ইশারা করে। তখন মতিজা বলে উঠে—‘জানি, তোমার লাশ কাটতে কাটতে আর টানতে টানতে আর সেলাই করতে করতে বিরক্তি ধরে গেছে। তবু বলছি, আমার পেটের সেলাই খুলে বাচ্চাটাকে পেটের ভেতর ঢুকিয়ে সেলাই করে দাও। বাচ্চাটাকে বাইরে না রেখে নিজের পেটের ভেতরে নিয়ে পৃথিবীর পেটের ভেতরে চলে যাব। মদন ডোম ‘ঠিক আছে, তাই করছি’ বলে বাচ্চাটাকে পেটের ভেতর ঢুকিয়ে দিয়ে পেটের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিল।

মতিজাকে কবরে দেবার পরদিন থেকে, মর্গের ডোম মদন এসব বলে বেড়াচ্ছিল। অবশ্য আমরা তার কথা বিশ্বাস করিনি। মদন সবসময় মদ পান করে থাকে, কে তার কথা বিশ্বাস করবে!]

অলংকরণ : রাজিব রায়

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: