Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > সাবরিনা আনামের গল্প : পাবলিক নুইসেন্স

সাবরিনা আনামের গল্প : পাবলিক নুইসেন্স

পড়তে পারবেন 8 মিনিটে

ফরহাদের চাকরিটাই এমন, কোথাও একটু স্থির হয়ে ঠাঁই গড়ার উপায় নেই। যখনই কোথাও মনটা বসলো, লোকজনের সাথে সখ্য গড়ে উঠলো অমনি ওর বদলির অর্ডার এসে হাজির হলো। বিয়ের পর গত চৌদ্দ বছর ধরে এটাই চলছে। এতে বাড়ি বদল, মালপত্র গোছ-গাছের ঝক্কি-ঝামেলা তো থাকেই, সেই সাথে থাকে নতুন জায়গার সাথে খাপ খাওয়ানোর বাড়তি টেনশন। বিশেষ করে বাড়িওয়ালার মেজাজ মর্জি, প্রতিবেশিদের ব্যবহার, কাজের মানুষের সহজলভ্যতা এ ব্যাপারগুলোও রীতিমতো ভাবিয়ে তোলে নিরুপমাকে। ইদানিং এর সাথে যুক্ত হয়েছে বাচ্চাদের স্কুলিংয়ের বিষয়টাও। প্রতিবার নতুন স্কুল, নতুন শিক্ষকের সাথে বাচ্চাদের বোঝাপড়াটা একই রকম থাকে না। নিরুপমা তাই ফরহাদকে জানিয়ে দিয়েছেÑ ‘তোমার সাথে বন বন করে ঘোরার এটাই শেষবার। তুমি ভাই নিজের পথ দেখো, আমি এবার ছেলেমেয়ে দুটোকে নিয়ে একটু থিতোই।’ ফরহাদও আপত্তি করেনি। মাথা নেড়ে সায় দিয়েছেÑ ‘হ্যাঁ তুমি ঠিকই বলেছো। আমিও ভেবেছি ব্যাপারটা নিয়ে। বাচ্চাদের ভালো কোনো স্কুলে এখনই ভর্তি করিয়ে দিতে না পারলে পরে মুশকিল হবে।’

সে সিদ্ধান্ত মতোই এবার রাজশাহীতে বদলি হয়ে আসার পর নিরুপমা যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছে। যাক্ বাবা বাক্স প্যাটরা নিয়ে আর তো কোথাও যেতে হবে না, পদ্মা নদীর পাড় ঘেষে গড়ে ওঠা সাততলা এপার্টমেন্টের তিন তলাটা গুছাতে গুছাতে বলেছে সে। এ এপার্টমেন্টের মালিক থাকেন বিদেশে। সুতরাং বাড়িওয়ালার খবরদারি থেকে নিরাপদ এখানকার ভাড়াটিয়া ফ্যামিলিগুলো। আর সে কারণে কিনা, এদের নিজেদের মধ্যে সখ্যও বেশ! প্রত্যেকে প্রত্যেকের নিয়মিত খোঁজ খবর রাখছে, উৎসব পার্বনে খাবার দাবার আদান প্রদান করছে। এ যেন নিরুপমার সেই মফস্বলের পাড়া গাঁয়ের সৌহার্দ্যরে মতো। রংপুরের তাজহাট। পুরাতন রাজবাড়ির কোল ঘেষে বড় বড় পাম, নারকেল আর সুপারি গাছের ছায়ায় নিরুপমাদের পাড়াটা গড়ে উঠেছিল। রাজবাড়ির লোকেদের সাথে ওদের কোনো আত্মীয়তার বন্ধন কোনো কালে ছিল কীনা নিরুপমার জানা নেই, কিন্তু ওটাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠা পাড়া-প্রতিবেশিদের মধ্যে ছিল অদৃশ্য বন্ধন। দুর্গাপূজায় রেণুর মা-ঠাকুরমা যেমন অবধারিতভাবে নারকেলের সন্দেশ পাঠাতেন নিরুপমাদের বাড়ি, ঈদের ফিরনি সেমাই তেমনি নিরুপমার মা পাঠাতেন রেণুদের বাড়ি। যতোই দিন গেছে এ ব্যাপারগুলো ধীরে ধীরে শেষ হয়ে গেছে। বড় অসময়ে মা-বাবা দুনিয়ার মায়া ছেড়ে চলে গেছেন। মা-বাবার মৃত্যুর পর ভাইবোনদের মাঝে আর কোনো বন্ধন খুঁজে পায় না নিরুপমা। তাজহাটের বাড়িটা ওর কাছে আজ শুধুই স্মৃতিকাতরতার একটা জায়গা মাত্র। ফরহাদের সাথে দেশের বিভিন্ন শহরে ঘুরতে ঘুরতেও নিরুপমার মনে হয়েছে মানুষগুলো বদলে গেছে। যন্ত্র হয়ে গেছে। প্রতিটা বাড়িতে মানুষজন বাস করছে ঠিক যেন বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মতো। দু’হাত দূরের জানালার ওপাশে কি আছে এপাশের মানুষগুলো জানতে পারছে না। তবে এখানে আসার পর দম বন্ধ করা এমন পরিবেশ থেকে অনেকটা মুক্ত হয়েছে নিরুপমা। বিশেষ করে পাশের ফ্ল্যাটের বয়স্ক ভদ্রমহিলা ভালো লাগাটা যেন আরও বাড়িয়ে দিয়েছেন। ভদ্রমহিলা ছেলে-ছেলের বউয়ের সঙ্গে থাকেন বললে ভুল হবে বরং ছেলের বউ থাকেন শাশুড়ির সঙ্গে। স্থানীয় একটি মাধ্যমিক স্কুলে পড়ান ছেলের বউ। চমৎকার বোঝাপড়া তাদের নিজেদের মধ্যে। এই ভদ্রমহিলাই অসম্ভব উষ্ণতা দিয়ে নিরুপমার পরিবারকে ঘিরে রেখেছেন। নিরুপমার দুই ছেলে-মেয়ে তানিশা, তমাল নানুমনি বলতে এখন উনাকেই চেনে। তানিশা, তমালকে স্কুলে আনা নেয়া, সংসারের কাজের ফাঁকে ফাঁকে ভদ্রমহিলার কাছে গিয়ে সময় কাটাতে বেশ লাগে নিরুপমার। পারিবারিক জীবনের নানান ঘটনা, রান্নাঘরের ছোট ছোট টিপস, বাজার সদাই সবই থাকে ওদের আলোচনায়। এসব আলোচনা যে মোটেও ফেলনা নয় নিজেকে দিয়েই উপলব্ধি করে নিরুপমা। অসময়ে মা চলে যাওয়ায় নিজের সংসারে অনেকটা একাকী হাঁটতে হয়েছে নিরুপমাকে। ফরহাদের বাড়ির লোকজনও সম্পর্কের ক্ষেত্রে তেমন আন্তরিক ছিল না কোনোদিনই। বিয়ের পর একবার শখের বসে তেল পিঠা বানাতে গিয়ে কী নাকাল দশা! বাটির বাটি চালের গুঁড়ো আর চিনি ডাস্টবিনে ফেলে দিতে হলো। ব্যারপারটা এমন দাঁড়ালো যে, নিরুপমা যতোই যত্ন করে গরম তেলে ব্যাটার ঢালে সেটা ততোই নানান আকৃতি নিয়ে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু কোনো রকমেই পিঠের আদল পায় না। সকালের নাস্তায় আটার রুটি, সেও কি কম লজ্জায় ফেলেছে নিরুপমাকে! কিছুতেই গোল আকৃতি নিতে চায় না, আবার আকার ঠিক হয় তো খেতে লাগে চিমড়ে।

ফরহাদ একবার অফিসের ক’জনকে বাসায় দাওয়াত করলো। জনা চারেক এলেন তারা। মেন্যু ঠিক হলো কাচ্চি বিরিয়ানি, বোরহানি আর টিকিয়া কাবাব। বাচ্চারা তখন বেশ ছোটো। ওদের দু’জনসহ ছ’সাতজনের বিরিয়ানিতে ঠিক কী পরিমাণ চাল আর মাংস দিতে হবে, পানির পরিমাণ কতটুকু হবে এটা জানতে রান্নার বই ঘেঁটে একাকার হলো নিরুপমা কিন্তু সঠিক তথ্য পাওয়া গেলো না কোথাও। শেষ পর্যন্ত ভয় ভাবনা মিশিয়ে একটা কিছু হলো, গেস্ট বিদেয় করা গেলো আর কী! এই ঘটনাগুলোর কথা ভাবলে যদিও এখন হাসি পায় কিন্তু নিরুপমাই শুধু জানে শুনতে গুরুত্বহীন এই অজানা তথ্য ওকে কত ভুগিয়েছে। এখন যেকোনো প্রয়োজনে নিরুপমা সোজা চলে যেতে পারে পাশের ফ্ল্যাটে— ‘খালাম্মা জলপাইয়ের আচার খাবে আপনার নাতনি। কি করবো বলেন  তো!’ ভদ্রমহিলা যত্ন করে বুঝিয়ে দেন কী করতে হবে। অনেক সময় উনি নিজেই অনেক কিছু শেখান— ‘নিরু সেদ্ধ আটার রুটি যখন করবা কুসুম গরম পানিতে আটা মাখবা। আর পরোটার কাইয়ে তেল পানি পরিমাণ মতো দিয়ে কিছুক্ষণ সেটা ঢাকনা চাপা দিয়ে রাখতে পারলে পরোটা খাস্তা হবে।’ এই রকম সহজ আন্তরিক জীবন ওদের। এখানে এসে আরেকটি চমৎকার অভ্যেস তৈরি হয়েছে নিরুপমার। মর্নিং ওয়াক। পদ্মা নদীর পাড় পুরোটাই একটা ওয়াকিং ট্র্যাক বলা চলে। নানান বয়সের মানুষ সূর্য ওঠার আগেই সকালের মিষ্টি আলোয় এখানে হাঁটতে আসে। ফরহাদ অফিসের কাজে বাইরে কোথাও না গেলে ওরাও দু’জন এই ওয়াকিং ট্র্যাকে চলে আসে। এক সকালে হাঁটতে হাঁটতে নিরুমপা ফরহাদের কাছে অনেকটা আবদারের সুরে বলে— ‘শোনো আমরা কিন্তু এখানেই সেটল্ করবো। তুমি বাড়ি করবার মতো একটা জমি দেখো কেমন।’ ফরহাদও দুষ্টুমী করে জবাব দেয়— ‘ম্যাডাম তো দেখছি এ শহরের মিষ্টি আমের প্রেমে পড়ে গেছেন। মিষ্টি আমের মতো মিষ্টি গরম সহ্য করতে পারবেন তো!’

‘হ্যাঁ হ্যাঁ খুব পারবো।’ এভাবে খুঁনসুটি করতে করতে নিরুপমার মনে পড়ে অল্প ক’দিনের মধ্যে পহেলা বৈশাখ। চৈত্রের শেষ সপ্তাহে সকাল বেলার গরম আবহাওয়া সেটা বলে দিচ্ছে। ওয়াকিং ট্র্যাকের ঠিক উল্টো দিকে পুলিশের একটি দফতর। মাঝারি উচ্চতার বাউ-ারি ওয়াল দিয়ে দফতরটা ঘিরে রাখা। নিরুপমাদের ফ্ল্যাটের একদম লাগোয়া এটি। হয়তো সে কারণে এলাকার মানুষের ভেতর একটা নিরাপত্তা বোধও আছে। নিরুপমা লক্ষ্য করে দফতরের প্রধান গেটে বিশাল আকারের এক ফেস্টুন দাঁড় করানো। ওতে পুলিশের ইউনিফরম পরা এক ব্যক্তির ছবি প্রিন্ট করা। হয়তো পুলিশের কোনো বড় কর্তা। তাঁকে সংবর্ধনা জানাতে তৈরি হয়েছে এই ফেস্টুন। গেট পেরিয়ে সামনের মাঠে প্যান্ডেল এবং মঞ্চ বানানোর কাজ চলছে এই সকাল বেলাতেই। ছবিটার দিকে এক পলক তাকিয়ে নিরুপমা দ্রুত নিজের ফ্ল্যাটে চলে আসে। আজ তমাল, তানিশা দু’জনেরই ফার্স্ট টার্ম পরীক্ষা শুরু হচ্ছে। নিরুপমা ঠিক করে বাচ্চাদের স্কুলে দিয়ে পহেলা বৈশাখের কিছু গিফট কিনে ফেলবে আজই। সে মোতাবেক সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার এক সঙ্গে তৈরি করে ওকে বাইরে বেরোতে হবে। প্রতিবেশি খালাম্মা একদিন গল্পে গল্পে বলেছিলেন— ‘জানো নিরু তোমার খালুজানের খুব পছন্দ ছিল সরু লাল পেড়ে সাদা শাড়ি। তোমার খালুজান চলে যাবার পর আর ওরকম একখানা শাড়ি পরিনি আমি।’ খুব সাধারণ একটি কথা, তারপরও নিরুপমা একটু অবাক হয় শুনে। ছেলের বউয়ের সাথে ভদ্রমহিলার সম্পর্কটা যথেষ্ট ভালো। কখনো কেউ একে অপরের বিরুদ্ধে কিছু বলেছেন বলে শোনেনি নিরুপমা। ছেলের বউ ব্যাপারটি জানতে পারলে অবশ্যই শাশুড়ির জন্য এই উপহার নিয়ে আসতো। তবে কী প্রতিটি মানুষ তার ভালো লাগার জায়গাটা শুধু তার একান্ত ভালোবাসার মানুষের জন্যই লুকিয়ে রাখে! নিরুপমা তো ভদ্রমহিলার রক্তের কেউ নয়, অথচ একান্ত ভালো লাগার কথাটা তিনি ওকেই বললেন। সেদিন থেকেই নিরুপমা ভেবে রেখেছে চিকন লালপেড়ে একটা সাদা শাড়ি খুঁজে আনতেই হবে ওকে। ফরহাদ অফিসে চলে গেলে বাচ্চাদের নিয়ে নিরুপমা বের হয়। ওদের স্কুলে দিয়ে প্রথমে চলে আসে আরডিএ মার্কেট। সকাল সকাল দোকানগুলো কেবল খুলছে। দিনের শুরুতে প্রথম কাস্টমারকে প্রতিটি দোকানদারই ভাবছে লক্ষ্মীমন্ত। ‘আসেন আপা এদিকে আসেন’, ‘কি দেখাবো?’, ‘পহেলা বৈশাখের দারুণ সব মাল আসছে আপা।’ অন্যদিন হলে বিক্রেতাদের এই অতিকথনে হয়তো বিরক্ত হতো নিরুপমা। আজ কিন্তু ওর ভালোই লাগে এসব। ধৈর্য নিয়ে একটার পর একটা দোকানে শাড়ি দেখতে থাকে সে। তবে সরু লাল পাড়ের শাড়ি খুঁজে পাওয়া যায় না। বাচ্চাদের জামা-কাপড়, ফরহাদের জন্য ফতুয়া আর নিজের জন্য একটা শাড়ি কিনতে গিয়েই একদম ঘেমে নেয়ে ওঠে নিরুপমা। কিন্তু প্রতিবেশী ভদ্রমহিলার জন্য কিছুতেই গিফট পছন্দ করতে পারে না। বেশ কয়েকটা শপিংমল, নিউমার্কেট ঘুরে সপুরা শো রুমে গিয়ে শেষ পর্যন্ত সোনালী-লাল সরু পাড়ের একটা শাড়ি পছন্দ হয়। দেরী না করে ওটাই কিনে নেয় নিরুপমা। তবে এখনই নয়, একদম পহেলা বৈশাখেই উপহারটি সে তুলে দেবে ভদ্রমহিলার হাতে এমনটাই সিদ্ধান্ত নেয়। বাজারের প্রচুর হাঁটাহাঁটির কারণে কীনা একটা বেশ দিবানিদ্রা হয়ে যায় দুপুর বেলাটা। নিরুপমার ঘুম ভাঙে মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের শব্দে। কোনো প্রোগ্রামের প্রস্তুতিমূলক আবহ এটি। সকালে পুলিশ দফতরে মঞ্চ সাজানোর ব্যাপারটা এবার মনে পড়ে ওর।

এদিকে আজ সারাদিন পাশের ফ্ল্যাটে যাওয়া পড়েনি। বিকেলের নাস্তা, সংসারের টুকিটাকি সেরে নিরুপমা এবার পাশের ফ্ল্যাটের ডোর বেলে চাপ দেয়। অন্যদিন ভদ্রমহিলাই দরজা খোলেন, আজ সেটা হয় না। ছোটখাটো কাজে সাহায্য করার জন্য যে কিশোরী মেয়েটি এ বাড়িতে থাকে সেই খোলে দরজা। ‘খালাম্মা কি করছে রে টুম্পা?’ ‘দাদির শরীর খারাপ করছে আন্টি, দাদি ঘুমায় আছে।’ উত্তর দেয় মেয়েটি। ‘কি বলিস! কখন থেকে?’ নিরুপমা দ্রুত এগিয়ে যায় ভদ্রমহিলার ঘরের দিকে। চুপচাপ শুয়ে আছেন ভদ্রমহিলা। বাড়ির অন্যরা আজ তাদের কোনো আত্মীয়ের বিয়েতে গেছেন। নিরুপমা ভদ্রমহিলার কপালে হাত রাখেÑ ‘খালাম্মা শরীর খারাপ লাগছে আপনার? আমাকে ডেকে পাঠাননি কেন?’ ভদ্রমহিলা শুকনো মুখে হাসার চেষ্টা করেন— ‘একটু খারাপ লাগছে নিরু। বোধ হয় প্রেসারটা বেড়েছে।’

‘ভাই-ভাবীকে খবর দেই খালাম্মা?’ ‘না নিরু দরকার নেই। ওরা আজই বৌমার বোনের বিয়েতে সিরাজগঞ্জ গেছে। তুমি বরং আমাকে প্রেসারের ওষুধটা খাইয়ে দাও। একটু ঘুমাতে পারলে ঠিক হয়ে যাবো।’ মনের ভেতরটা খচখচ করে নিরুপমার কিন্তু কি করবে বুঝতে পারে না ও। বিছানার পাশের ছোট টেবিলে রাখা ওষুধের বক্স থেকে প্রেসারের ওষুধটা খাইয়ে দিয়ে মাথার কাছে এসে বসে। ‘খালাম্মা আমি আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেই, আপনি ঘুমান।’ সাদা কালোয় মেশানো নরম চুল নাড়তে নাড়তে নিজের মায়ের মুখটা মনে পড়ে নিরুপমার। নিরুপমার ইচ্ছা করে শাড়িটার কথা বলতে, কিন্তু ভদ্রমহিলা ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করেন। নিরুপমা আর কথা বাড়ায় না। ভদ্রমহিলা পুরোপুরি ঘুমিয়ে গেলে টুম্পাকে পাশে বসিয়ে রেখে নিরুপমা আবার নিজের ফ্ল্যাটে ফিরে আসে। তখন প্রায় সন্ধ্যা। আলো দেবার জন্য সে ঘরে ঢোকে। কিন্তু নিজের বেডরুমে এসে নিরুপমা হোঁচট খায়। সন্ধ্যায় ঘরে আলো জ্বালা হয়নি অথচ বাইরের মঞ্চ থেকে ফোকাস করা এলিডি আলো দিয়ে বিছানা দেয়াল আলোতে ভরে গেছে। ব্যাপারটা ওকে বেশ অস্বস্তিতে ফেলে। ওর মনে হয় একান্ত নিজের এই জায়গাটা যেন নিজের নয়। অল্প সময়ের মধ্যে মাইকের কণ্ঠস্বরে গমগম করে ওঠে ঘরের ভেতর। পুলিশের বড়কর্তা এসে মঞ্চে বসেছেন, সঞ্চালকের বক্তব্যে তা ঘরের ভেতর থেকেও বুঝতে পারে নিরুপমা। শুরু হয় বক্তৃতা পর্ব। নিরুপমা ঠিক কী করবে বুঝতে পারে না। ছেলেমেয়ে দুটোকে পড়তে বসতে হবে। কাল সকালেই ওদের পরীক্ষা। কিন্তু বাড়িটা এখন অপেন এয়ার মঞ্চ। ঘরের জানালা-দরজা বন্ধ করে ফ্যানের স্পিড যতোটা সম্ভব বাড়িয়ে দেয় নিরুপমা। তাতে আওয়াজ সামান্য কমে তারপরেও খুব একটা লাভ হয় না। বক্তৃতা পর্ব শেষে আরম্ভ হয় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। নানান রকম ইলেক্ট্রোনিক মিউজিক্যাল ইন্সট্রুমেন্টের শব্দ বাড়ির প্রতিটি কর্নার কাঁপিয়ে তোলে। ক্লাস থ্রিতে পড়া তমাল ব্যাপারটা এনজয় করে কিন্তু ক্লাস নাইনে পড়া তানিশার চোখ মুখ লাল হয়ে যায়। বেচারা মুখ নিচু করে পড়ার টেবিলে বসে থাকে। ঠিক কতক্ষণ চলবে এই সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কে জানে! এদেশে এসব অনুষ্ঠানের কোনো সময়সীমা থাকে না। দর্শকদের মন ভরানো নিয়ে কথা! পুলিশ দফতরের লোকজনের সাথে কিছু জনতাও ইতিমধ্যে জড়ো হয়েছে দফতরের গেটের সামনে, বেলকুনি থেকে সেটা দেখতে পায় নিরুপমা। ওর হঠাৎ মনে হয় তমাল, তানিশা যেমন পড়তে পারছে না, প্রতিবেশি খালাম্মারও নিশ্চয়ই অসুবিধে হচ্ছে। অল্প কিছুক্ষণ আগে মানুষটিকে ঘুমের ওষুধ দেয়া হয়েছে। নিরুপমার ভাবনা শেষ হতে না হতেই টুম্পা দৌড়ে আসে—

‘আন্টি তাড়াতাড়ি চলেন। দাদি য্যান কি রকম করে!’ ‘চল টুম্পা তাড়াতাড়ি চল।’ নিরুপমা টুম্পাকে নিয়ে অনেকটা দৌড়ে পাশের ফ্ল্যাটে যায়।

ভদ্রমহিলা দু’হাতে মাথা চেপে ধরে আছেন। তাকে ভীষণ অসুস্থ দেখায়।

‘খালাম্মা আপনার খুব খারাপ লাগছে?’ নিরুপমা ভদ্রমহিলার পাশে বসে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু উনি কথা বলতে পারেন না, কেবল মাথা নাড়েন। কিংকর্তব্যবিমূঢ় নিরুপমা প্রথমে ফরহাদকে ফোন করে সবকিছু জানায়। তারপর ফোন করে ভদ্রমহিলার ছেলের বৌকে। ‘ভাবী খালাম্মা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। ঠিক কী করবো বুঝতে পারছি না। বাধ্য হয়ে আপনাদের বিরক্ত করছি।’ ‘না না আপা আপনি একদম ঠিক কাজটি করেছেন। আমরাই তো আপনাকে বিপদে ফেলে দিয়েছি। এখন কি করি বলেন তো! আচ্ছা ওনাকে কি ওষুধ দেয়া হয়েছে? মানে, আমার শাশুড়িমার হাইব্লাড প্রেসার এবং মাইগ্রেন আছে। মাইগ্রেনের পেইন উঠলে ওনার প্রেসারটাও বেড়ে যায়। এসময় ওনাকে একটা বিশেষ ওষুধ দেয়া হয়, যেটাতে ওনার ঘুম আসে।’ ছেলের বউ উৎকণ্ঠিত হয়ে কথা বলে ফোনের ওপাশে। 

‘ওষুধ দেয়া হয়েছে ভাবী। কিন্তু ওষুধটা কাজ করছে না।’ ‘কী সাংঘাতিক! কিন্তু কেন?’ ‘জানি না। তবে হয়েছে কী, পাশের পুলিশ দফতরে অনুষ্ঠান চলছে। সে অনুষ্ঠানের শব্দ আমাদের বিল্ডিংকে একদম কাঁপিয়ে দিচ্ছে। হয়তো সে কারণে উনি ঘুমাতে পারছেন না।’ ‘তাহলে তো ওনাকে হসপিটালে নিতে হবে। আপনি একা কিভাবে কী করবেন! বিল্ডিংয়ের কারো সহযোগিতা নিয়ে পুলিশ দফতরকে একটু রিকোয়েস্ট করেন আপা। আমরা এখনই রওনা হয়ে যাচ্ছি।’

এরমধ্যে অন্যান্য ফ্ল্যাটের প্রতিবেশিরাও এগিয়ে আসে। কেউ কেউ অ্যাম্বুলেন্সের জন্য ফোন লাগায় বিভিন্ন হসপিটালে। মাঝ বয়সী দোতলার ভদ্রলোক রাগে গজগজ করতে থাকেন— ‘এক ঘণ্টা ধরে জায়নামাজে বসেছি বৌমা, দোয়া মনে আনতে পারছি না। সাউন্ড পলিউশন! পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন! সব কেবল বক্তৃতা বিবৃতিতেই থেকে গেলো সারাটা কাল। যারা এসবের প্রয়োগ ঘটাবে তাদের আচরণ দেখো বৌমা!’ ‘জ্বি চাচা আপনি ঠিকই বলেছেন।’ নিরুপমা মাথা নেড়ে ভদ্রলোকের কথায় সায় দেয়। এদিকে বেশ কয়েকটি হসপিটালে ফোন করেও যখন অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা হয় না তখন নিরুপমা রীতিমতো ভয় পেয়ে যায়। ভদ্রমহিলার অবস্থা ক্রমান্বয়ে খারাপ হতে থাকে। একবার নিরুপমাভাবে অনুষ্ঠানস্থলে গিয়ে সরাসরি এর প্রতিবাদ করে আসে। পরে চিন্তাটা বাদ দেয়। পুলিশ তো ওকে স্টেজ পর্যন্ত পৌঁছতেই দেবে না। তবে হসপিটালে ফোন করতে করতে টেলিফোন ডাইরেক্টোরিতে লোকাল একটি পত্রিকার নম্বরে চোখ পড়ে। নিরুপমা ঐ নম্বরে ফোন দেয়। এক ভদ্রলোক ফোন ধরেন ও প্রান্তে— ‘হ্যালো কে বলছেন?’ নিরুপমা যতোদূর সম্ভব নিজেকে শান্ত করে বলেÑ ‘ভাই আমি একজন সাধারণ নাগরিক। একটা বিশেষ প্রয়োজনে আপনাকে ফোন করছি।’ ‘হ্যাঁ বলুন কি প্রয়োজন?’ ‘আসলে জেলা পুলিশ দফতরের পাশেই আমার বাসা। পুলিশ দফতর ওপেন এয়ার মঞ্চে একটা অনুষ্ঠান করছে। এটা আবাসিক এলাকা। গান-বাজনার প্রচ- শব্দে  ছেলেমেয়েরা পড়তে পারছে না। একজন বয়ষ্ক ভদ্রমহিলা ঘুমোতে না পেরে অসুস্থ হয়ে গেছেন। ভাই আপনার একটু সহযোগিতা চাই।’ ‘কি বলছেন ম্যাডাম! গান বাজনার শব্দে আবার কেউ অসুস্থ হয় নাকি! আমি তো জানি গান বাজনা মানুষকে সুস্থ করে তোলে। আর পুলিশ দফতর যা করছে তা সরকারি প্রোগ্রাম। সরকারি কাজে তো বাধা দেয়া যাবে না। আপনারা মহিলাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান।’ পত্রিকা অফিসের ভদ্রলোক ফোন রেখে দেন। নিরুপমা যেন অথৈজলে পড়ে। তবে এর মাঝে ফরহাদ বাড়িতে ফেরে এবং সে অফিসের মাইক্রোবাসটা সঙ্গে করে নিয়ে আসে। তখন প্রায় রাত দশটা। প্রতিবেশিরা মিলে ধরাধরি করে ভদ্রমহিলাকে গাড়িতে ঊঠায়। নিরুপমা একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। গাড়ির সিটে শুয়ে ভদ্রমহিলা শক্ত করে ধরেন নিরুপমার হাত। নিরুপমার চোখে পানি চলে আসে। ও কোনো কথা বলতে পারে না। ফরহাদ কথা বলে— ‘খালাম্মা আমরা ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি, আপনি ঠিক সুস্থ হয়ে যাবেন।’

এদিকে রাত বাড়ার সাথে সাথে অনুষ্ঠানস্থল আরও সরগরম হয়ে ওঠে। সাইকেল, মোটরসাইকেল, অটোরিকশার প্রচণ্ড ভিড় ঠেলে গাড়িটা যখন পুলিশ দফতরের গেটটা পার হয় তখন ওরা শুনতে পায় কোনো মহিলা কণ্ঠশিল্পী প্যারোডি টাইপের গান গাইতে গাইতে দর্শক জনতাকে উদ্দেশ্য করে ফ্লাইং কিস ছুঁড়ে দিচ্ছেন— ‘লাভ ইউ’ ‘লাভ ইউ’। আর দর্শক জনতা হাততালি দিয়ে সে বিকৃত অভিনন্দন গ্রহণ করছে…

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: