Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > মতামত > ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ নয়, রাজনৈতিক দলকে হাত সরাতে হবে

ছাত্র সংগঠন নিষিদ্ধ নয়, রাজনৈতিক দলকে হাত সরাতে হবে

পড়তে পারবেন 2 মিনিটে

।। মোজাম্মেল হোসেন ।।

সমিতি ও সংঘ গঠন নাগরিকদের মৌলিক অধিকার (সংবিধানের ৩৮ অনুচ্ছেদ)। জনশৃঙ্খলা ও নৈতিকতার স্বার্থে সরকার অবশ্য আইন দ্বারা কোনো সংগঠন নিষিদ্ধ করতে পারে। সন্ত্রাসী ও উগ্র ধর্মান্ধ সংগঠন সে-কারণে নিষিদ্ধ হয়। দেশের কোনো ছাত্র সংগঠন ওই কাতারে নেই যে নিষিদ্ধ করতে হবে।

১৯৪৮ থেকে ‘৭১ পর্যন্ত ছাত্র আন্দোলন শিক্ষার অধিকার ছাড়াও জনগণের অধিকার আদায়, রাষ্ট্র ও সমাজের প্রগতিমুখি পরিবর্তন আনতে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। তখন ‘ছাত্র আন্দোলন’ বলা হতো। এখনকার মতো ‘ছাত্ররাজনীতি’ নয়।

১৯৯০-এর পর থেকে দেশে বড় ছাত্র সংগঠনগুলো (ছাত্র লীগ, ছাত্র দল, ছাত্র শিবির) ছাত্রদের স্বার্থে কোনো আন্দোলন করেনি। জনগণ ও সমাজের কল্যানে তাদের কোনো ভূমিকা নেই। তারা নিছক তিনটি রাজনৈতিক দলের ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী। তারা ভয়াবহ চাঁদাবাজি, অর্থ ও সম্পত্তি দখল করার নানা বেআইনি ও কিছু ক্ষেত্রে সন্ত্রাসী কাজে জড়িত। তাদের জন্য শিক্ষাংগন তছনছ হয়ে গেছে। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের মদদ এর মূল কারণ। ওই কারণটি সরাতে হবে।

সমাধান হলো রাজনৈতিক দল শিক্ষাংগনের/ক্যাম্পাসের কোনো ছাত্র সংগঠনে নাক গলাবে না, পৃষ্ঠপোষকতা বা অভিভাবকত্ব করবে না। ১৮ বছরের ঊর্ধ্বের ছাত্র-ছাত্রী অন্য নাগরিকদের মতোই রাজনৈতিক দলের সদস্য হতে পারে। তবে ওই পরিচয়ে ক্যাম্পাসে কোনো তৎপরতা করবে না। রাজনৈতিক দল ছাত্র সদস্যদের নিয়ে দলের ছাত্র ব্রিগেড গঠন করতে পারে। যেমন রাজনৈতিক দলের নারী কর্মী, যুব কর্মী, শ্রমিক কর্মী তেমনি ছাত্র কর্মী। ক্যাম্পাসে তাদের কোনো কাজ নেই। কখনো (জাতীয় নির্বাচনের সময়) ক্যাম্পাসে নিজ দলের পক্ষে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক প্রচার চালাতে চাইলে (স্লোগানযুক্ত মিছিল নয়) কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করে অনুমতি নিতে হবে।

ছাত্রদের সংগঠন ক্যম্পাসভিত্তিক বা জাতীয়ভিত্তিক থাকতে পারে। রাজনৈতিক অভিমত তারাও প্রচার করতে পারে তবে তাদের কাজের ক্ষেত্র হবে ছাত্রদের শিক্ষাজীবনের বিষয়গুলো– শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ক্রিড়া, সংস্কৃতি, বিতর্ক, ম্যাগাজিন প্রভৃতি। এসব নিয়েই প্রতিযোগিতা হবে। ছাত্র সংসদের নির্বাচনে ব্যক্তিগত বা সংগঠনের পরিচয়ে প্রার্থিতা চলবে।

ছাত্রলীগ, ছাত্রদল নামগুলো নিয়ে শিক্ষাংগনে সংগঠন না থাকাই ভালো। এই নামেই রাজনৈতিক দলের ছাত্র ব্রিগেড থাকতে পারে শিক্ষংগনের বাইরে। দলীয় ব্রিগেডের কাজই তারা করছে কিন্তু শিক্ষংগন, ছাত্রাবাস, টেন্ডার ইত্যাদি দখল করে শিক্ষার সর্বনাশ ঘটিয়ে। এটা বন্ধ হবে। ক্যাম্পাসে নতুন নামে ছাত্র সংগঠন হবে। যেমন অগ্রদূত, অগ্রগামী প্রভৃতি কোনো কোনো কলেজে একসময় ছিল।

এই নতুন সংগঠনের ধারণার প্রতি যদি ছাত্রসমাজ আকর্ষণ বোধ না করে তাহলে হবে না। এবং তাতে শিক্ষার কোনো ক্ষতি হবে না। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত ছাত্রসংসদের নির্বাচন হবে যে সংসদ এক্সট্রা কারিকুলার কাজগুলো করবে। ক্যাম্পাসে ছাত্রদের ক্লাব থাকতে পারে ক্রীড়া, বিতর্ক করার জন্য। ক্লাবগুলো চাইলে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ফান্ড পেতে পারে। এভাবে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যকর পরিবেশ তৈরি হবে।

এগুলো এখন আকাশ-কুসুম মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো করা দরকার শিক্ষা, দেশ ও জাতির স্বার্থে। রাজনৈতিক নেতারা দেশপ্রেমিক হলে, চাইলে, এসবের উপযুক্ত নীতিগত ও আইনি কাঠামো অবশ্যই তৈরি করতে পারেন।

তবে তার আগে, এই মুহূর্তে, বুয়েটের ছাত্র আবরার আহাদের অচিন্তনীয় বীভৎস হত্যাকান্ডের পটভূমিতে বলছি, দয়া করে, আল্লাহর ওয়াস্তে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা একটু মেরুদণ্ড সোজা করে দাঁড়ান। আপনারা ক্যাম্পাসের, হলগুলোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণভার নিজেদের হাতে নেন। ছাত্রলীগের দৌরাত্ম ছুড়ে ফেলে দেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দৃঢ় অবস্থানের কারণে এখন অনুকূল সময়। আপনাদের ভয় নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়মকানুন আপনাদের জানা আছে। একবার সাহস দেখান, পুরো ছাত্রসমাজ ও দেশবাসী আপনাদের সমর্থন দেবে। উচ্চশিক্ষা বাঁচাতে, আপনাদের মান-মর্যাদা, দেশ ও জাতির স্বার্থে একবার সোজা হয়ে দাঁড়ান।

আরও একটা আকাশ-কুসুম হতে পারে, উচ্চশিক্ষা, দেশ ও জাতির ভবিষ্যৎ রক্ষায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যরা পদত্যাগ করুন। ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের হস্তক্ষেপমুক্ত, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব আইন অনুযায়ী সিনেট-সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্যানেল করে উপযুক্ত শিক্ষাবিদকে উপাচার্য নিয়োগ দেওয়া হোক। সময় লাগলেও প্রথম পদক্ষেপটা দেওয়া হোক। এতে আচার্য তথা রাষ্ট্রপতির সাহায্য লাগবে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী এই ছোট্ট বৈপ্লবিক কাজটি করতে পারেন দেশের স্বার্থে। যে প্রধানমন্ত্রী ছাত্রলীগের সভাপতি-সাধারণ সম্পাদককে ফেলে দিয়েছেন, দেশব্যাপী নিজ দলের লোককে আঘাত করেই দুর্নীতিবিরোধী অভিযান শুরু করিয়েছেন তিনি নিশ্চয়ই বুঝবেন যে ‘ক্যাডার ভিসি’রা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ধ্বংসের প্রান্তে নিয়ে এসেছেন। উচ্চশিক্ষা বাঁচাতে সত্যিকার অর্থে বৈপ্লবিক সংস্কার দরকার।

মোজাম্মেল হোসেন: লেখক ও জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: