Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > হুইটম্যানের কবিতা: উচ্চকিত আবেগের বলিষ্ঠ উচ্চারণ

হুইটম্যানের কবিতা: উচ্চকিত আবেগের বলিষ্ঠ উচ্চারণ

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। আশরাফ জুয়েল ।।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট জন আব্রাহাম লিংকন কোনো এক বক্তব্যে বলেছিলেন, ‘আমরা বর্তমানে এক শঙ্কার ভেতর বাস করছি। নানাবিধ ভয় এবং শঙ্কা আমাদের ভবিষ্যতকে মেঘাবৃত করেছে। প্রতিদিনই আমরা একটি অনিবার্য ধ্বংসের আশংকার মধ্যে বাস করছি।’ এমন এক যুগ-অন্ধকার সময়, যখন আমেরিকা শিল্প বাণিজ্য অর্থনীতি রাজনীতি সব দিকেই এক চূড়ান্ত হতাশার ভেতর স্থবির হয়ে পড়েছিলো ঠিক তখনই আমেরিকান সাহিত্যে তথা বিশ্ব সাহিত্যে আবির্ভাব ঘটে ওয়াল্ট হুইটম্যানের। হতাশা জর্জর আমেরিকাকে হুইটম্যান নতুন স্বরে সম্ভাষণ করেন- হয়ে ওঠেন নবজাগৃতির কবি। হুইটম্যান মাত্র ২৬ বছর বয়সে ‘Leaves of Grass’ নিয়ে হাজির হলে ভ্রান্ত- বিক্ষত আমেরিকানরা হুইটম্যানের ভেতর এক নতুন কণ্ঠস্বর খুঁজে পেলেন। কিন্তু কি নতুন বার্তা ছিল এই তরুণ কবির কণ্ঠস্বরে? শুধুই কি নতুন কবি হিসেবে তিনি আলোড়ন তুলেছিলেন? না- হুইটম্যান তার কবিতায় অবক্ষয় অবনমনের সময়কালকে সুন্দর শক্তির সাথে পরিচয় করিয়ে দিলেন।

১৮৫৫ সালে তিনি নিজের অর্থে তাঁর প্রধান গ্রন্থ ‘Leaves of Grass’ প্রকাশ করেন। ‘Leaves of Grass’ কাব্যগ্রন্থটি পড়ে এমারসন যারপরনাই আনন্দিত হন এবং কবিকে সংবর্ধনা দেন, তিনি বলেন, ‘I greet you at the beginning of a great career.’  পরবর্তীতে তাঁকে আমেরিকার জাতীয় কবি হিসেবে গণ্য করা হয়, তিনি ক্রমান্বয়ে নিজেকে ভবিষ্যদ্বক্তা কবি রূপে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হন। হুইটম্যানের আকাঙ্ক্ষা ছিলো আকাশ সমান। সেই অস্থির সময়ে তিনি গেয়েছেন সাম্যের গান, আশার কথা শুনিয়েছেন, গেয়েছেন সুন্দর জীবনের জয়গান। একজন মহত্তম কবির কল্পনা কতটা সুবিস্তৃত হতে পারে সেটা না হুইটম্যানের কবিতার ভেতর দিয়ে না গেলে বোঝা প্রায় অসম্ভব।

‘Lover divide and perfect Comrade,/ Waiting content, invisible yet, but certain,/ Be thou my God.’ (GODS) বা ‘প্রেমিক স্বর্গীয় এবং পরিপূর্ণ হৃদয়ের মিত্র/ পরিতৃপ্তিতে অপেক্ষমাণ, অদৃশ্য যদিও কিন্তু সুনিশ্চয়,/ তুমি আমার ঈশ্বর।’ (ঈশ্বর)। উপরোক্ত পঙক্তিগুলোতে হুইটম্যান ঈশ্বরে পূর্ণ বিশ্বাস স্থাপন করেন। যেন সত্যের প্রতিষ্ঠায় তিনি তার রচিত পঙক্তিমালাকে নিবেদন করেছেন বর্তমানের পদ তলে। তিনিই পুনরায় বলছেন, ‘Of life immense in passion, pulse and power,/ Cheerfull, for freest action form’d under laws divine/ The Modern Man I sing. (ONE’S- SELF I SING)। ‘আমি একক সত্তার গান গাই- একজন সহজ বিচ্ছিন্ন পুরুষের তবুও উচ্চারণ করি শব্দ দুটি- গণতন্ত্র ও গণলোক।’ (একক সত্তার গান)। কবিতা সত্যের জন্য, কবিতা মানুষের জন্য। গণমানুষের জন্য তাঁর সর্বোচ্চ উচ্চারণ আমাদের এক নতুনত্বর পৃথিবীর দিকে এগিয়ে যাবার প্রেরণা যোগায়। হুইটম্যান তাঁর কবিতায় তাঁর সত্তার যুক্তির দ্বারা, উপমা উৎপ্রেক্ষার দ্বারা এবং ছন্দের অনুরণনে অনিবার্য সত্যের প্রতিষ্ঠা ঘটাতে প্রত্যয়ী হয়ে উঠেছিলেন।

হুইটম্যানের কবিতায় বাইবেলের প্রকট প্রভাব লক্ষ্য করা যায়। ‘Song of Myself’ পঙক্তিতে পঙক্তিতে তিনি এর ছাপ রেখে গেছেন। ‘Showing the best and dividing it from the worst age vexes age,/ knowing the perfect fitness and equanimity of things,/ While they discuss I am silent, and go bathe and admire myself.’ ‘সর্বোত্তম পন্থাকে প্রদর্শন করানো এবং নিকৃষ্ট সময়কাল থেকে তাঁকে বিচ্ছিন্ন করা একটি যুগলব্ধ নিপীড়ন।/বস্তু ধর্মের সমতাকে এবং পরিপূর্ণ সঙ্গতিকে জানা- যখন তাড়া এসব কিছু আলোচনা করে আমি নীরব থাকি।/ অবগাহন করি এবং আত্মপ্রশংসা করি।’ হুইটম্যান এই সব সত্য উচ্চারণের কারণেই অন্যদের তুলনায় পৃথক। নিজের ভালোত্বের কাছে তিনি নিজেকে বারবার সমর্পণ করেছেন নির্দ্বিধায়। আবার তিনি বলছেন, ‘I celebrate myself, and I sing myself,/ And what I assume you shall assume,/ For every atom belonging to me as good as belongs to you./ I loafe and invite my soul, /I lean and ease observing a spear of summer grass.’ ‘আমি নিজেকে উদযাপন করি এবং গান গাই নিজস্বতার।/ এবং পরিগৃহীত যে রূপ আমার সে রূপ তোমারও,/ প্রত্যেকটি কণা যতটা আমার জন্য মঙ্গলময় তা তোমার জন্যও,/ আমি অলস চেতনায় হারিয়ে যাই এবং আপন সত্তাকে আমন্ত্রণ জানাই।/গ্রীষ্মকালের ঘাসের পাতায় কৃপাণ দেখি অবসরে অক্ষমতায় এবং বিনয়ে।’ সংশয়বাদীরা সময়কালকে সবসময় এক দোদুল্যমান ঘড়ির কাঁটার উপর চাপিয়ে দিয়ে মজা দেখাকেই পৃথিবীর প্রতি তাদের দায়িত্ব ভেবেছে। কিন্তু একজন কবি যে সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য নিজের ভাবনা জগতকে উৎসর্গ করে দেন, তিনি হয় সত্য উচ্চারণ করবেন নয়তো চুপ থাকেন, উপযুক্ত সময়ে তাঁর সত্যবাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেবার প্রচেষ্টায় নিজেকে নিক্ষেপ করেন। হুইটম্যান শুধু নিজ আত্মার কাছেই দায়বদ্ধ থেকে কবিতা লেখেননি, বরং তিনি বিশ্বমানবতার মুক্তির প্রয়াস চালিয়ে গেছেন তাঁর কবিতা ভাষণে।         

উনবিংশ শতাব্দীতে আমেরিকা তথা বিশ্বসাহিত্যে যে কয়জন অসামান্য কবির পদচারণে মুখরিত ছিল সাহিত্যাঙ্গন, তাঁদের ভেতর হুইটম্যান অন্যতম। এক উত্তম পুরুষ হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। তাঁর কবিতা তৎকালীন আমেরিকাবাসীদের এক নতুন জীবন ধর্মবোধের সন্ধান দিতে সক্ষম হয়েছিলো।

Leaves of Grass’ কাব্যগ্রন্থের ভূমিকায় হুইটম্যান বলেছিলেন, “কবি শুধু সুন্দর সুসংবদ্ধ কবিতা রচনা করেই ক্ষান্ত হবেন না; তিনি হবেন ভবিষ্যদ্বক্তা, দূরদর্শী, চারণ ও নীতিবাদী। অবশ্য নীতিবাদী হবার অর্থ এই নয় যে তিনি ন্যায়নিষ্ঠা এবং সাধুতার বাণী মাত্র প্রচার করবেন। তিনি নীতিবাদকে প্রশ্রয় দেবেন প্রচারণার ক্ষেত্রে- ভবিষ্যৎ ও গণতন্ত্রের উদ্দেশ্যে। কবির লক্ষ্য হবে দাসত্ব জর্জর যারা তাঁদের আনন্দিত করা এবং তাদেরকে শঙ্কিত করা যারা স্বেচ্ছাচারী। তিনি আধাত্ম গুরুর পদও অলঙ্কৃত করবে। মানসিক এবং দৈহিক স্বাভাবিকতায় তিনি নিজেকে পূর্ণতম মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবেন। মানব জাতির মধ্যে মহৎ কবি সুষম মানুষ। তাঁর মধ্যে নয় বরং তাঁর বাইরের সকল সকল বস্তু অদ্ভুত, উৎকেন্দ্রিক এবং কাণ্ড জ্ঞানবর্জিত। তিনি বিভিন্নতার মধ্যে সমতাবিধায়ক, এবং তিনিই মূল কুঞ্জিকা। দৃশ্যমান জগতের সৌন্দর্য ও পবিত্রতা উপলব্ধির মাধ্যমে সনাতন উপকথাকে ভাবীকালের দৃঢ় ও শোভন ভিত্তির উপর প্রতিষ্ঠিত করবেন।”

সারাজীবনই হুইটম্যান ছিলেন রাজনীতি সচেতন। তিনি সাধারণভাবে দাসত্বপ্রথার বিস্তারের বিরোধিতা করেন। তাঁর কবিতায় জাতিগোষ্ঠীগুলি সম্পর্কে সমতাবাদী সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি পাওয়া যায়।

ওয়াল্ট হুইটম্যানের জন্ম ১৮১৭ খৃস্টাব্দে। জন্মস্থান, ওয়েস্ট হিলস, লং আইল্যান্ড, আমেরিকা। কিন্তু শিশু বয়সেই তিনি তাঁর পিতামাতার সঙ্গে ব্রুকলিন শহরে বসবাস করতে থাকেন। পড়াশোনা শেষ করে তিনি স্কুল শিক্ষক হিসেবে তাঁর কর্মজীবন আরম্ভ করেন। এর পাঁচ বছর পর ১৮৪১ সাল থেকে তিনি সাংবাদিকতার দিকে ঝুঁকে পড়েন। ‘ডেইলি ব্রুকলিন ঈগল’ নামক পত্রিকার সম্পাদক হিসেবে নিয়োজিত হন। পরবর্তীতে হুইটম্যান সাংবাদিক এবং পুস্তক বিক্রেতা হিসেবে সবার কাছে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ১৮৫৫ সালে তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘Leaves of Grass’ প্রকাশিত হয়। তিনি এক নতুন আশা সঞ্চারী কাব্যভাষার মাধ্যমে পৃথিবীকে সম্ভাষণ করেন। তাঁকে আমেরিকার জাতীয় কবি হিসেবে মানা হয়। দীর্ঘকাল অসুস্থ থেকে জীবনের শেষ পর্বে একবার হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পর তিনি নিউ জার্সির ক্যামডেনে চলে যান। সেখানেই ৭২ বছর বয়সে তাঁর জীবনাবসান হয়। কিন্তু কবির মৃত্যু নেই- কবি বেঁচে থাকেন তাঁর কর্মে তাঁর কাব্য সত্যে। হুইটম্যান তাই বেঁচে আছেন মানুষের শোষিত মানুষের হৃদয়ে।   

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: