Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > হলিদাগাছির মরিচখেকো

হলিদাগাছির মরিচখেকো

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। শিরিন সুলতানা কেয়া ।।

আগে লোকেরা মোবারক মোল্লার সঙ্গে মরিচ খাওয়া নিয়ে বাজি ধরতেন। কিন্তু এখন আর কেউ সেই সাহস পান না। কারণ, বাজি ধরলেই নিশ্চিত পরাজয়। মরিচ খাওয়াটা যে তার কাছে কোনো ব্যাপারই নয়। একটি বা দুটিও নয়, পেট না ভরা পর্যন্ত মোবারক মোল্লা মরিচ খেতে পারেন। মোবারকের কথায়, তার কাছে মরিচের স্বাদ চকলেটের মতো। তাই কারও বাড়ি বেড়াতে গেলে মোবারক নাস্তার বদলে কাঁচামরিচই চেয়ে খান।

রাজশাহীর চারঘাট উপজেলার হলিদাগাছি পশ্চিমপাড়া গ্রামে মোবারকের বাড়ি। তার বয়স এখন প্রায় ৭০ বছর। তিন মেয়ে আর এক ছেলের বাবা তিনি। মেয়েদের বিয়ে দিয়েছেন। ছেলেকেও বিয়ে করিয়েছেন। এখন স্ত্রী, ছেলে, পুত্রবধূ এবং দুই নাতি-নাতনির সঙ্গে থাকেন মোবারক মোল্লা। এক যুগ হলো মোবারক মোল্লা কোনো কাজ করেন না। তবে সেই ছেলেবেলায় যে মরিচ খাওয়ার নেশাটা জন্মেছিল তা এখনও আছে। শুধু মরিচ খাওয়ার এই ক্ষমতার কারণে গ্রামের সব মানুষই তাকে চেনেন।

সম্প্রতি এক বিকালে হলিদাগাছি বাজারে গিয়ে সবজি বিক্রেতা রইস উদ্দিনের কাছে জানতে চাওয়া হয় মোবারক মোল্লার বাড়ির ঠিকানা। তিনি চিনতে পারলেন না। গ্রামে মরিচ খান এমন কেউ আছে কি না জানতে চাইলেই একগাল হেসে রইস উদ্দিন বললেন, ‘ওই মরিচ খাওয়া মোবারক মোল্লা। আরেকটু সামনেই তার বাড়ি।’ হলিদাগাছি বাজার থেকে রেললাইন পার হয়ে আরেকটু সামনে গেলেই একটা চায়ের দোকান। দোকানে বসে থাকা লোকজনের কাছে মোবারক মোল্লার বাড়িটি কোনটা জানতে চাইলে সবাই একসাথে বলে ওঠেন, সামনেই বাড়ি। এক-দেড় কেজি মরিচ খাওয়া তার কাছে কয়েক মিনিটের ব্যাপার।

শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও মোবারক মোল্লার সঙ্গে দেখা হবার পরই এই অবিশ্বাস কেটে গেল। তার বাড়িতে যাওয়ার পর মরিচ খাওয়ার আয়োজন করা হলো। মোবারক মোল্লার বাড়ির উঠোনে প্রতিবেশিদের ভিড় জমে গেল। এক থালা কাঁচামরিচ বের করে দিলেন পুত্রবধূ নাসিমা বেগম। মোবারক মোল্লা খাওয়া শুরু করলেন। কচমচিয়ে চিবিয়ে একটার পর একটা মরিচ খাওয়া শুরু করলেন মোবারক। অল্প কিছু সময়ের মধ্যেই কমপক্ষে এক কেজি মরিচ সাবাড় করলেন তিনি। এবার বাঁধা দিলেন স্ত্রী জাহানারা বেগম। বললেন, বয়স হয়েছে। থাক আর খেতে হবে না। পেটের সমস্যা হতে পারে।

মরিচখেকো মোবারক থামলেন। তারপর একটা হাসি দিলেন। এ হাসিতে প্রমাণ করলেন নিজের মরিচ খাওয়ার সক্ষমতার কথা। মোবারক মোল্লা কাঁচামরিচকে বলে থাকেন ‘গাছ মরিচ’। এতগুলো মরিচ খেতে কেমন লাগলো জানতে চাইলে তিনি বললেন, ‘লজেন্সের মতো। ঝাল লাগে না। জবর লাগে। মরিচ খেয়ে কোনো সমস্যা হয় কিনা জানতে চাইলে মোবারক বলেন, মরিচ খেতে ঝাল লাগে কিনা লাগে জানতে চাইলে বলেন, আমি অসুস্থ হই না, মরিচ খেলেই আমার সব অসুখ ভাল হয়ে যায়।

মরিচ খাওয়ার শুরুর গল্পটাও শোনালেন মোবারক মোল্লা। তার ভাষ্যমতে, ছোটবেলায় একদিন মাঠে কাজ করছিলেন। হঠাৎ একটা গাছে দেখেন অনেক বড় বড় কাঁচামরিচ। মোবারক একটা মুখে দেন। তারপর দেখেন, ঝাল লাগছে না। নিজেই অবাক হন মোবারক। যারা সঙ্গে ছিলেন তাদের বিষয়টি জানালেন মোবারক। কেউ বিশ্বাস করতে চাইল না। তারা চ্যালেঞ্জ করে বসল। মোবারক তাদের মরিচ খেয়ে দেখিয়ে দিলেন। সেই থেকেই শুরু। এভাবে মোবারকের প্রিয় খাবারের তালিকায় স্থান করে নিয়েছে কাঁচামরিচ।

মোবারক বলেন, আমি এখন পর্যন্ত দুই কেজি পর্যন্ত গাছমরিচ খেয়েছি। এর বেশিও পারবো। কিন্তু কেউই সাহস করে দেয় না। আমি যেমন বাড়িতে খাই তেমনি কলেজ গেট, হলিদাগাছি বাজার, বানেশ্বর বাজার, পুঠিয়া বাজারসহ যেখানে যাই সবখানেই শুধু গাছমরিচ খাই। প্রথম প্রথম খেতে দিত সবাই। এখন সবাই জানে, তাই আর কেউ খেতে দেয় না। বাজারের সবজি বিক্রেতারা আগে বলত, যত পারেন খান। এখন দেয় না।

তিনি বলেন, একবার গাছমরিচের দাম ২০০ টাকা কেজি হলো। তখন বাড়িতে কেউ খেতে দেয় না। আবার কোনো বাড়িতে গিয়ে চাইলেও দেয় না। আমার তো মরিচ না খেলে ভালো লাগে না। তাই একদিন এক দোকানে গিয়ে বললাম, আপনার দোকানের মরিচ দেখেই মনে হচ্ছে ঝাল না। দোকানদার বললেন, ঝাল না তো একটা খেয়ে দেখেন। তখন আমি একের পর এক খেতে লাগলাম। একটু পর দোকানদার আর খেতে দিলেন না।

মোবারক মোল্লার স্ত্রী জাহানারা বেগম বলেন, আমার বিয়ের আগে থেকেই শুনেছি মরিচ খেতে পারে। তখন বিশ্বাস করতাম না। বিয়ের পরে দেখলাম সত্যিই তাই। সবসময়ই মরিচ খায়। পুত্রবধূ নাসিমা বেগম বলেন, আমার বাপের বাড়ি নাটোরের সিংড়া। আমার শ্বশুর সেখানে গেলে নাস্তা দেয়া হয়। কিন্তু তিনি বলেন, মরিচ থাকলে দেন। তিনি মরিচই খান। এখন এই এলাকার সবাই আমাকে ‘মরিচ খাওয়ার বেটার বউ’ বলে চেনে।

মোবারক মোল্লার মেয়ে বেলী বেগম বলেন, ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছি আব্বা মরিচ খান। নিষেধ করলে আরো বেশি খান। লোকজন সবাই আমাকে ‘মরিচ খাওয়ার বিটি’ বলে ডাকেন। নাতি আলেক মোল্লা বলেন, আমার জ্ঞান হবার পর থেকেই নানাকে মরিচ খেতে দেখি। চাচা তজিবর মোল্লা বলেন, ভাতিজা আমার ছোটবেলা থেকেই মরিচ খায়। তখন বয়স ৭-৮ বছর হবে। একমাত্র মরিচই ওর প্রিয় খাবার।

মরিচ খেয়ে দেখিয়ে বাজিতে সবাইকে পরাজিত করে আনন্দ পান মোবারক। কিন্তু এখন আর কেউ মোবারকের সঙ্গে বাজি ধরেন না। মোবারক বলেন, একবার এক বাড়িতে মরিচ খেতে চাইলাম। কয়েকটা খাওয়ার পর বাড়ির লোকজন বললো, আমি নাকি গিলে খাচ্ছি। তাই বললাম পাটায় মরিচ বেটে আনতে। তারা আনলো। সেই মরিচও খেয়ে দেখালাম। এখন কেউ ভুল করেও মরিচ খাওয়া নিয়ে আমাকে চ্যালেঞ্জ করে না। মরিচই আমার ভালো লাগে। স্ত্রীর দিকে ইশারা করে মোবারক বললেন, ও এখন বেশি খেতে দেয় না।

মোবারক মোল্লাকে মরিচ কেন ঝাল লাগে না জানতে চাইলে পুষ্টিবিদ আনসিয়া পারভিন সুরভি বলেন, কাঁচামরিচে ক্যাপসাসিন নামের একটি পদার্থের উপস্থিতির জন্য ঝাল লাগে। মানুষের জিহ্বার প্রতি মিলিমিটারে চার হাজার থেকে পাঁচ হাজার স্বাদগ্রন্থি থাকে। এই স্বাদগ্রন্থির মাধ্যমে ক্যাপসাসিন ভেতরে ঢুকে ঝাল লাগে। কিন্তু জিহ্বায় স্বাদগ্রন্থি কম থাকলে ঝাল কম লাগবে। যেমন পাখিদের জিহ্বার প্রতি মিলিমিটারে মাত্র চারশ থেকে পাঁচশ স্বাদগ্রন্থি থাকে। তাই তাদের ঝাল লাগে না।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: