Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > সাইকোসিস কি পাগলামি?

সাইকোসিস কি পাগলামি?

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। ডা. তনয় মাইতি ।।

“আমার ছেলে কি তাহলে পাগল হয়ে গেলো?”

প্রশ্নটা শুনে ডাক্তারবাবু কি এক মুহূর্ত থমকে গেলেন? পরিচিত স্মিত হাসিখানি অবশ্য পরের মুহূর্তেই ফিরে এলো।

“পাগল বলতে আপনি ঠিক কি বোঝেন অমিতাভ বাবু?”

একটু থতমত খেলেও, সন্তানের ভালো থাকার সামনে আজ  কোনোকিছুই না। সমস্ত উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা একসাথে ঝরে পড়লো অমিতাভ সেনের গলায়।

“কেন, ওই পাগল বলতে আমরা সবাই যা বুঝি, মাথার ঠিক নেই, জামা কাপড় পোশাক পরিচ্ছদের কোনো ঠিক নেই, কখন কী করবে কেউ জানে না, একা একা বিড়বিড় করছে কি হাসছে, এরকম পাগলদেরই তো আমরা রাস্তাঘাটে দেখি। লোকে তো এদেরকেই পাগল বলে।”

ভরসা দেওয়া সেই হাসিটা হেসে ডা. সুপ্রিয় বললেন,

“লোকে তো অনেক কিছুই বলে, অমিতাভ বাবু। চিলে কান নিয়ে গেছে শুনলে আগে নিজের কানে হাত দেবেন না কি চিলের পেছনে ছুটবেন?”

পরিস্থিতি আর সময়টা হাল্কা করার চেষ্টাটা বিশেষ কাজে দিলো না,অমিতাভ একটু উষ্নস্বরেই বললেন,

“তাহলে আপনিই বলুন, আপনার প্রেশক্রিপশনে লেখা এই সাইকোসিস শব্দটির মানে কী?”

“দেখুন, সাইকোসিস (Psychosis)বলতে বিজ্ঞানের ভাষায় আমরা মানুষের সেই মানসিক অবস্থা বুঝি যেখানে মানুষ বাস্তবের সাথে সংযোগ হারিয়ে ফেলে এবং একই সাথে সেই সম্বন্ধে চেতনাও তার থাকে না। অর্থাৎ loosing touch with reality and loss of insigh; পারিপার্শ্বিক সমস্ত বিপরীত তথ্যপ্রমাণ সত্ত্বেও নিজের ভ্রান্ত ধারণাকেই বিশ্বাস করে চলে আর সেই অনুযায়ী কাজ করে চলে। আমার আপনার কারুর কোনো বোঝানোই তখন কোনো কাজ করবে না।”

“কেন হয় এরকম? ওর মস্তিষ্ক চিন্তাশক্তি কি চিরতরে খারাপ হয়ে গেলো? ও কি আর কখনো ঠিক হবে না?” উদ্বেগ স্পষ্ট অমিতাভ সেনের গলায়।

ডাক্তারবাবু ঠাণ্ডা মাথায় বুঝিয়ে চলেন,

“মস্তিষ্কের কিছু অংশে কিছু বিশেষ রাসায়নিক বেড়ে যাওয়ার কারণেই এই বিপত্তি ঘটে, যা ঠিক ওষুধের সাহায্যে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব। রাসায়নিক কেন বেড়ে যায় তার কোনো একটা বিশেষ কারণ নির্দিষ্ট করা সম্ভব না,তবে জিন থেকে পরিবেশ আর স্ট্রেস সবই গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে।”

“তাহলে কি ওকে সারাজীবন ওষুধ খেয়ে যেতে হবে? এইসব ওষুধ তো শুনেছি একবার শুরু করলে আর ছাড়া যায় না,সারাজীবন খেয়ে যেতে হয়।” 

২০ বছর এই প্রশ্নটির মুখোমুখি হতে হয়েছে অজস্রবার। ডাক্তারবাবু ধৈর্য হারালেন না। শান্তভাবে বলতে লাগলেন,

“না। সবক্ষেত্রে এরকম একেবারেই না৷ মানসিক স্বাস্থ্যে অসুখ ও অসুবিধা অনেকক্ষেত্রেই সময়ের সাথে বদলে যায়। তবে আজকের দিনে আপনার ছেলেকে যা দেখলাম তার উপর নির্ভর করে এটুকু বলা যায় ওকে হয়ত কাছাকাছি দেড়-দুবছর ওষুধ খেতে হবে। তবে পুরো ব্যাপারখানি আগামী ছয়মাস ও কেমন থাকছে তার উপর নির্ভর করছে।”

অমিতাভবাবু অনেকটা নিশ্চিন্তভাবে বেরিয়ে এলেন। ডাক্তারবাবুর কথায় ভরসা পেলেন;অসুখ সম্পর্কে অনেক ধারনা পরিস্কার হলো, অন্ততপক্ষে যে ভয়গুলো ছিলো সেগুলো কমলো। ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলে যে বিষয়গুলি জানা গেলো-

১.মানসিক অসুখ মানেই সারাজীবন মাথা খারাপ হয়ে যাওয়া নয় 

২.রোগী হিংস্র হয়ে যাওয়া অনেকক্ষেত্রেই অসুখের লক্ষণমাত্র, এতে অযথা আতঙ্কিত না হয়ে ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক চিকিৎসা করানো উচিত

৩.সম্পূর্ণ ঠিক হয়ে যেতে পারে, সঠিক চিকিৎসায় ও সঠিক সময় ধরে চিকিৎসায়

৪.আর পাঁচটা অসুখের মতন, যে কারুর হতে পারে, তা নিয়ে অহেতুক আর অতিরিক্ত ভয় পাওয়ার কোনো দরকার নেই। 

৫.  এই ভরসাটুকুই বা আজ কে দেয়, মনের ভেতরে থাকা প্রশ্নের উত্তর পাওয়া, আর সঠিক চিকিৎসার দিশাটুকু পাওয়া! এটাইআজকেরদিনেঅনেক!

চেম্বার থেকে বেরিয়েই গিন্নিকে ফোন লাগালেন অমিতাভবাবু। গত এক সপ্তাহের লাগাতার টেনশনে তাদের দুজনেরই শরীর মনের অবস্থা কহতব্য না। তবে ছেলের মা’র অবস্থা স্বভাবতই বেশি খারাপ। এই খবরটুকুনই, অন্ততপক্ষে মা’র চিন্তাগুলি কম করবে; সাথে সাথে ছেলে একটু ঠিক হলে সিমলা না উটি কোথায়  ঘুরে আসা যায় সেটাও জিজ্ঞেস করতে হবে। নিজের অজান্তেই মনটা একটু হাল্কা হয়ে আসে অমিতাভ সেনের। 

ডা. তনয় মাইতি ভারতের ভুবনেশ্বরের অল ইন্ডিয়া ইনস্টিউট মেডিকেল সায়েন্সেসের (AIIMS) মনোচিকিৎসক। তিনি উত্তরকালে নিয়মিত লিখছেন প্রতি মাসের দ্বিতীয় ও শেষ শনিবারে।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: