।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবার হত্যা করা হলেও এই চক্রান্তের বীজ বোনা হয় আরও আগে থেকে। স্বাধীনতার পর পাকিস্তান কারাগার থেকে বঙ্গবন্ধু দেশে ফেরার সময় থেকেই চলে তাকে হত্যার প্রচেষ্টা। এই চেষ্টার নেপথ্যে সরাসরি সম্পৃক্ত ছিলো পাকিস্তানের এসপিওনাজ সংস্থা সিআইএ ও দেশটির প্রতিরক্ষা দফতর।

১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি। পাকিস্তান জেল থেকে ছাড়া পেয়ে বঙ্গবন্ধু লন্ডন যাত্রা করেন। আমরা দেখি যে বঙ্গবন্ধুকে জুলফিকার আলী ভুট্টো কারাগার থেকে মুক্ত করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। এ জন্য তিনি আন্তর্জাতিকভাবে বাহবা কুড়ানোরও চেষ্টা করেছেন। কিন্তু ভুট্টোর মতো একজন নির্দয়, নিষ্ঠুর ঘাতক যিনি ষড়যন্ত্রমূলক হত্যাকাণ্ডের জন্য পরবর্তীতে ফাঁসির কাষ্ঠেও ঝুলেছিলেন, তার সেখানেই থেমে থাকার কথা নয়। ভুট্টোর পরবর্তী পরিকল্পনাটি ছিল একটু ভিন্ন ধরনের। বঙ্গবন্ধুকে সেই সময় কারাগার থেকে মুক্ত করা হয়েছিল ঠিকই, নানাভাবে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্কের কথাও প্রকাশ করা হয়েছিল তখনকার পত্রপত্রিকায়। কিন্তু সেটা ছিল আরেকটি সাজানো ছক। বঙ্গবন্ধু ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি লন্ডন যাত্রা করেন, সেই একই দিনে এবং একই বিমানে লন্ডনে পাঠানো হয় পাকিস্তানের একটি হকি দলকে। এই একই বিমানে হকি দলটিকে লন্ডনে পাঠানোর পরিকল্পনাও ছিল ষড়যন্ত্রের একটি অংশ। এই দলের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল এমন কয়েকজন ছদ্মবেশী ব্যক্তিকে, যারা হকি খেলোয়াড় ছিল না। তারা ছিল ভুট্টোর গোপন আদেশ কার্যকর করার সংঘবদ্ধ ঘাতক চক্র। তাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল বঙ্গবন্ধু বিমানে আরোহণ কিংবা বিমান অবতরণের কোনো এক মুহূর্তে যেন হত্যাকাণ্ড ঘটানো হয়। বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য যাদের লন্ডনে পাঠানো হয়েছিল, এই ঘাতক দলের প্রধান ছিল এই দেশেরই একজন। তার নাম দবির উদ্দিন সিদ্দিকী। এই দবির উদ্দিন সিদ্দিকী ঢাকা জেলার বলিয়াদী গ্রামের এক ধনী পরিবারের সন্তান।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১০ জানুয়ারি লন্ডন থেকে দিল্লি হয়ে ঢাকায় আসেন। সেই ঘাতক দল একই বিমানে থাকা সত্ত্বেও লন্ডনে তার ওপর আঘাত করার কোনো সুযোগ পায়নি। কারণ, লন্ডনে শেখ মুজিবের ওপর গোয়েন্দা নজরদারি ছিল খুবই তীব্র এবং তীক্ষè। ভারতীয় গোয়েন্দারা আগে থেকে পুরো ব্যাপারটির খবর পেয়েছিল যে বঙ্গবন্ধু নিরাপদ নন। কাজেই তারা তাঁর নিরাপত্তার ওপর সতর্ক দৃষ্টি রেখেছিল। পরবর্তীতে বঙ্গবন্ধু যখন ১০ জানুয়ারি নয়াদিল্লি থেকে ঢাকায় চলে এলেন, তখন ঘাতক দল তাকে আর আক্রমণ করার সুযোগ পেল না। কিন্তু তাই বলে সেখানেই তারা বসে থাকেনি।

বঙ্গবন্ধুর আবার কলকাতা যাওয়ার কথা ছিল ১৯৭২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি। কলকাতার ব্রিগেড প্যারেড গ্রাউন্ডে তিনি ভাষণ দিলেন। এই সময়ও পাকিস্তানি গুপ্তঘাতক দল একটা ষড়যন্ত্র করার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সেই পরিকল্পনা নস্যাৎ করা হয় এবং তাদেরকে ভারতীয় কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা গ্রেফতার করে। গ্রেফতারের পর জেরার মুখে সেই দবির উদ্দিন সিদ্দিকী ওই গোয়েন্দাদের কাছে একটি দীর্ঘ জবানবন্দি দেয়। ১২৭ পৃষ্ঠার ফুলস্কেপ কাগজে টাইপ করা ওই জবানবন্দিতে সে তার জীবনের বিভিন্ন ঘটনার কথা উল্লেখ করে। বিবৃতিতে সে জানায়, সে পাকিস্তানি গোয়েন্দা চক্রের লোক। শেখ মুজিবকে হত্যা করার জন্য পাকিস্তানের প্রতিরক্ষা দপ্তর তাকে নিয়োগ করেছিল। বঙ্গবন্ধু যখন কলকাতায় যান, তখনই তাকে দবির উদ্দিনের কথা বলা হয় এবং ভারত সরকারের পক্ষ থেকে তাঁকে বিস্তারিত জানানো হয়। দবির উদ্দিন সিদ্দিকীকে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশ পুলিশের হাতে তুলে দেয়ার জন্য ভারত সরকারকে অনুরোধ করেন। পরবর্তী পর্যায়ে সেই দবির উদ্দিন সিদ্দিকী জেলের বাইরে চলে এসেছিল একটি বিশেষ ক্ষমার সুযোগ নিয়ে। বঙ্গবন্ধুকে সপরিবার হত্যার পর সে পরপর তিনবার বাংলাদেশের একটি অভিজাত ক্লাবের সভাপতির পদে নির্বাচিত হয়েছিল। পল্টন মোড়ে অবস্থিত একটি অভিজাত হোটেলের মালিকানাও তার ছিল। এই দবির উদ্দিন সিদ্দিকী সব সময় খুব রহস্যজনকভাবে চলাফেরা করত। বর্তমানে সে প্রয়াত। কিন্তু ষড়যন্ত্রের জালের প্রাথমিক যে চিহ্ন রেখে গেছে, তা থেকেই বোঝা যায় এই ষড়যন্ত্রের শেকড় কত গভীরে ছিল।

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্টের তিন মাস আগেই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে একবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। ১৯৭৫ সালের ২১ আগস্ট এই গুপ্তহত্যার চেষ্টা করা হয় বলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উইকিলিকসের ফাঁস করা মার্কিন তারবার্তায় বলা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা চেষ্টার পর মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারকে একটি গোপন তারবার্তা পাঠান বাংলাদেশে নিযুক্ত তৎকালীন যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিড ইউজিন বোস্টার। এ হত্যা চেষ্টার বিষয়টি গণমাধ্যমে প্রকাশ না করার জন্য তখন বাংলাদেশ সরকার নির্দেশ দিয়েছিল।

উইকিলিকসের ফাঁস করা মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের গোপন তারবার্তায় বোস্টার বলেন, ১৯৭৫ সালের ২১ মে সন্ধ্যায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা চেষ্টার বিষয়ে আমরা দুটি সোর্স থেকে তথ্য পেয়েছি। প্রথম সোর্স হলো, মার্কিন দূতাবাসের একজন বাঙালি রাজনৈতিক সহকারী। তিনি এ তথ্য জেনেছিলেন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানের নিরাপত্তা ইউনিটে দায়িত্বে থাকা পুলিশের একজন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্টের কাছ থেকে। অন্য তথ্যদাতা হলো একজন সাংবাদিক। যিনি দূতাবাসের তথ্য কর্মকর্তাকে এ বিষয়টি নিশ্চিত করেছিলেন। তিনি জানান, এ খবরটি প্রকাশ না করতে তখন গণমাধ্যমকে তথ্য অধিদপ্তর (প্রেস ইনফরমেশন ডিপার্টমেন্ট) কঠোরভাবে নিষেধ করেছিল। দুটি সূত্রই জানায়, ঢাকার পার্শ্ববর্তী এলাকায় একটি টেলিভিশন ভবন উদ্বোধন শেষে বাসায় ফেরার পথে ঐদিন সন্ধ্যায় শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার চেষ্টা চালানো হয়। হামলায় গ্রেনেড ব্যবহার করা হয়েছিল। এতে দুই ব্যক্তি আহত হলেও শেখ মুজিবুর রহমান অক্ষত ছিলেন। ঘটনার দুদিন পর ২৩ মে তারবার্তাটি মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের কাছে পৌঁছে।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার পরশেখ মুজিবুর রহমান ও মার্কিন প্রশাসনের সম্পর্কে টানাপোড়েন চলছিল। কারণ নিক্সন প্রশাসনের সঙ্গে পাকিস্তানের সুসম্পর্ক ছিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়া ও সামরিক অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেও একটি তারবার্তা পাঠিয়েছিলেন তৎকালীন মার্কিন রাষ্ট্রদূত। এ তারবার্তায় বলা হয়, বাংলাদেশের জনগণ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর কোনো আনন্দ উদযাপন করেনি।

এরপর তারবার্তায় যা বলা হয়, তা থেকে এই ঘটনায় মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্ট ফুটে ওঠে। সেখানে আরো বলা হয়, হত্যাকাণ্ডের পর নতুন সরকারের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরকে তুলনামূলক স্বস্তির মনে হচ্ছিল। যতদূর বোঝা যায়, বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষা পূরণে শেখ মুজিবুর রহমান ব্যর্থ হওয়ায় জনগণের সঙ্গে এক ধরনের দূরত্ব তৈরি হয়েছিল। এছাড়া রাজনৈতিকভাবে নিজেকে আরও শক্তিশালী অবস্থানে নেয়ার আকাঙ্ক্ষা এর কারণ হতে পারে। জুনের প্রথমদিক থেকেই বঙ্গবন্ধু নিজের ক্ষমতা সুদৃঢ় করার চেষ্টা চালান। হয়তো এ কারণেই অভ্যুত্থানকারীরা আরো বেশি দেরি করতে চায়নি। হয়তো হত্যাকা-ের জন্য ভারতের স্বাধীনতা দিবসকে বেছে নেয়ার বিষয়টি প্রাসঙ্গিক, তবে আমাদের কাছে একে কাকতালীয় বলে মনে হয়।

এ ঘটনার পর বাংলাদেশে আবারো ভারতের হস্তক্ষেপ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল যুক্তরাষ্ট্র। পরে নয়াদিল্লিস্থ মার্কিন দূতাবাস জানায়, বাংলাদেশে অভ্যুত্থানের পর ভারতীয় সেনাবাহিনীর কোনো পদক্ষেপের বিষয়ে আমরা এখনো কিছু শুনতে পাইনি। যদিও এ বিষয়ে খোঁজ-খবর নেয়ার সুযোগ আমাদের কম। পূর্বাঞ্চলীয় আর্মি কমান্ডার জেনারেল জ্যাকব ও মেজর সেহগালের সঙ্গে কথা বলে তাদের নিরুদ্বেগ ও স্বাভাবিক মনে হয়েছে। যদিও এ অভ্যুত্থানে ভারতের আপত্তি ছিল। ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে দূতাবাসের কর্মকর্তাদের এমনটাই মনে হয়েছিল। বিশেষ করে বাংলাদেশে হত্যাকা- পরবর্তী নতুন সরকারের পররাষ্ট্র নীতি নিয়েই উদ্বেগ ছিল ভারতের। এ ঘটনার পর বাংলাদেশের গণমাধ্যমকে যেমন নিরব থাকতে বলা হয়েছিল, তেমনি ভারতও তাদের দেশের গণমাধ্যমগুলোকে শান্ত থাকতে বলেছিল।

এ তারবার্তায় খন্দকার মুশতাক আহমেদের গঠিত সরকারের বিষয়ে মন্তব্য করা হয়। বলা হয়, নতুন রাষ্ট্রপতি ভারত বিদ্বেষী হিসাবে পরিচিত। সরকারের মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, তারা পাকিস্তানসহ মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করতে চাইবে। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই সরকারের সম্পর্ক বিষয়ে রাষ্ট্রদূত লিখেছিলেন, মুজিব সরকারের চেয়ে আরো বেশি আন্তরিক সম্পর্ক হতে পারে। বাংলাদেশ সরকার আমাদের কাছে আরো বেশি সহায়তা চাইতে পারে।