Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > সাহিত্যের দারিদ্র্য ।। মোহাম্মদ নূরুল হক

সাহিত্যের দারিদ্র্য ।। মোহাম্মদ নূরুল হক

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। মুক্তগদ্য ।।

শিল্প-সাহিত্য অবশ্যই সমাজের অগ্রসর চিন্তক ও কল্পনাশক্তির অধিকারীর চর্চার বিষয়। কোনোভাবেই তা সব শ্রেণী-পেশার নয়। কোনো কিছু যখনই গণচর্চার বিষয় হয়ে ওঠে, তখনই তার মূল্য কমতে শুরু করে। সমাজ তাদের আর সম্মান করে না। তারা হয়ে পড়ে সবচেয়ে অবহেলা-অবজ্ঞার পাত্র। কোনো কিছুকে সহজলভ্য-অনায়াসসাধ্য করে ফেললে তার আর সামাজিক-অর্থনৈতিক মূল্য থাকে না। সহজে পাওয়া যায়, এমন বস্তুর প্রতি মানুষের আকর্ষণ থাকে না, তাই সহজলভ্য বস্তু যত্নহীন পড়ে থাকে, তার যথাযথ সংরক্ষণ হয় না।

মানুষ বাসাবাড়িতে যে পশু-পাখি পোষে, তা দেখতে বাইরের লোক দূরের কথা, ঘরের লোকও খাবার দেওয়ার সময়টুকু ছাড়া আর কখনো ফিরেও তাকায় না। কিন্তু ওই একই পশুপাখি যখন চিড়িয়াখানায় রাখা হয়, তখন দর্শনীর বিনিময়েও সেগুলো লোকে দেখতে যায়। এছাড়া বাড়িতে পোষা অতিকায় গরু-মহিষও ধরতে বিশেষ কোনো ব্যবস্থার দরকার হয় না, কিন্তু বন মুরগি শিকারের জন্যও বিশেষ আয়োজনের ব্যবস্থা করে লোকে।

অর্থাৎ, বস্তু-বিষয়-স্থান-কাল বুঝে লোকে তার কদর করে, মর্যাদা দেয়। যথাস্থানে যথাবস্তু রাখলে তবেই তার যথাযথ ভোক্তা-শ্রেণীর দৃষ্টি আকর্ষণ সম্ভব। বিশেষত শিল্প-সাহিত্য যেহেতু কখনোই গণরুচির জোগান দেয়নি, সেহেতু তা কখনোই গণমানুষের চর্চার বিষয় হতে পারেনি। যেমন, একটি বিমূর্ত ছবি এঁকে যদি গণচৌশাগারের সামনে ঝুলিয়ে রাখা হয়, লোকে সেদিকে শিল্পতৃষ্ণা নিয়ে তো তাকাবেই না, পরন্তু যে ওই ছবি ঝুলিয়ে রেখেছে, তারই মানসিক সুস্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলবে। আবার ছবিও নিশ্চয় কোনো রিকশাচালক আঁকবে না। ছবি আঁকার জন্যও শিল্পীকে বিশেষ ধরনের বিদ্যার্জন করতে হয়, দীর্ঘদিন শেখার পরই তিনি আঁকেন। এই কারণে শিল্পীও জানেন, তিনি কোন ধরনের ছবি কোথায় রাখবেন, কোন ধরনের লোক তার কাজের সমঝদার।

যিনি রাজনীতিবিদ, তিনি জানেন, কী কথা, কোথায় বলতে হবে। সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি যে কথা বলবেন, সে কথা নিশ্চয় গণজমায়েতে বলবেন না। নিজের ড্রয়িংরুমে বসে ‘অব দ্য রেকর্ডধর্মী’ যে কথা বলবেন, সে কথা ভুলেও জনসভায় বলবেন না। যদি বলেন, তাহলে তাতে সমাজে-রাষ্ট্রে বিশৃঙ্খলা তো সৃষ্টি হবেই, পরন্তু চিরকালের জন্য সম্মানহানির সঙ্গে সঙ্গে তিনি ক্ষমতাচ্যুতও হতে পারেন।

সঙ্গতকারণে যার কাজ, তারই করা উচিত। জাদুকরকে তার জাদু দেখাতে দেওয়া উচিত, দর্শকের উচিত তা দেখা। অতি উৎসাহী হয়ে দর্শকের উচিত হবে না জ্বলন্ত আগুনের ভেতর হাঁটার চেষ্টা করা। তাতে কেবল লোকে তাকে পাগলই বলবে না, পরন্তু দর্শকের প্রাণটাও যাবে।

অমূল্য বস্তু-বিষয়কে মানুষ যতই কদর করুক, মূল্যহীন বস্তু-বিষয়ের প্রতি তার তেমন আগ্রহ থাকে না। যে বিষয়-প্রপঞ্চ চোর থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান, সবারই হস্তগত হয়, সেটি যতই প্রয়োজনীয় হোক না কেন, তাকে মানুষ বিশেষভাবে আর যত্ন করে না।

যেমন হীরা। এই বস্তুটি পৃথিবীতে পরিমাণে অল্প বলেই তার মূল্য অনেক। আর খুব অল্পসংখ্যক কারিগর হীরার আকৃতি ও ধরনের বিশেষত্ব আনতে পারেন বলে সমাজে তাদেরও কদর বেশি। আবার হীরার মধ্যেও সব হীরার মূল্য-সম্মান-কদর সমান নয়।

কোহিনুর বা দরিয়া-ই নুরের যে মর্যাদা পৃথিবীতে, অভিজাত পরিবারের গৃহিণী বা ধনীকন্যাদের নাকফুল-কানের দুলের সঙ্গে শোভা পাওয়া হীরকখণ্ডের নিশ্চয় সে মূল্য-গুরুত্ব নেই।

আরেকটি কথা, হীরক বা সোনার অলঙ্কার তৈরির জন্য মানুষ স্বর্ণকারের শরণাপন্ন হয়, দা-কুড়াল বানাতে যায় কামারের দোকানে। কামারের দোকানে হীরক-স্বর্ণখণ্ড নিয়ে হাজির হলে, তার দশ কেজি ওজনের হাতুড়ির আঘাতে এক রতি ওজনের হীরক বা স্বর্ণটুকরো মুহূর্তে হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে। এই হাওয়ায় মিলিয়ে যাওয়ার জন্য কামার দায়ী নয়, যিনি তার কাছে যান, তিনিই দায়ী।

এতক্ষণ যে কথাগুলো বললাম, সেগুলোর উদ্দেশ্য একটাই—সাহিত্যচর্চা গণমানুষের কাজ নয়, এটি বিশেষ শ্রেণীর সংবেদনশীল প্রাজ্ঞলোকের কাজ। এটি অনায়াসসাধ্য কোনো বিলাসকর্মও নয়, কঠোর সাধনার কর্ম।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ সহজ হওয়ায়, তাৎক্ষণিকতার সুবাদে গণহারে আপন মনের বাসনা প্রকাশের সুযোগ পাওয়ায় বর্তমানে পাঠকের চেয়ে লেখকের সংখ্যা বেড়েছে। বিস্ময়কর হলেও সত্য, এই অপ্রস্তুত লেখকদের সিদ্ধিহীন রচনার নিচে তাৎক্ষণিক পাওয়া লাইক-কমেন্টকেই গণলেখকরা নিজেদের সৃষ্টির স্বীকৃতি-সার্থকতা মনে করেন।

এতে কী হচ্ছে?

প্রকৃত রচনা চিনতে বা শনাক্ত করতে পাঠক বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। একসময় বিরক্ত হয়ে সাহিত্যের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বিশ বছর আগেও সাহিত্যের পাঠক যে হারে কবিতা পাঠ করতেন, আজকে তা করেন না। এমনকী, যিনি গোটা পঞ্চাশেক রচনা তৈরি করে সেগুলোকে ‘কবিতা’ দাবি করে ফেসবুকে দিয়েছেন, তিনিও তার সারাজীবনে বিশটি প্রকৃত কবিতা পাঠ করেননি। কালজয়ী কবিদের কবিতা সৃষ্টির প্রকরণ, আঙ্গিক, বিষয়, কিছুই জানেননি। কবিতা রচনার কলাকৌশল আয়ত্ত করার জন্য অন্তত একযুগ সাধনা করেননি, একটি হৃদয়নিঙ্ড়ানো ছন্দবদ্ধ শুদ্ধ পঙ্‌ক্তি রচনার জন্য রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটাননি। কেবল কম্প্যুটার, ল্যাপটপ, স্মার্টফোনের মনিটর-স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েছেন, আর কি-বোর্ড বা বাটন চাপতে চাপতে ভুল বাক্যে-ভুল বানানে, ভুল প্রকরণে লিখে ফেলেছেন মনের কথাগুলো। আর এসব অর্থহীন, অসাহিত্যকর্মকেই দাবি করেছেন ‘কবিতা’, ‘গল্প’, ‘উপন্যাস’ বলে। এতে তাদের বন্ধুরা, সহপাঠী, সহকর্মীরা নগদ হাততালি দিয়েছেন, তাতেই তার সাহিত্যিক জীবন ধন্য হয়ে গেছে। সে আনন্দে-অহঙ্কারে তিনি অস্বীকার করে বসেছেন, শিল্পের তাবৎ নিয়ম-কানুন, কঠোর সাধনার বিষয়কে। অস্বীকার করে বসেছেন বিশ্বসাহিত্যে থেকে শুরু স্বভাষার মহামুনিদেরও।

আমার মনে হয়, সময় এসেছে শুদ্ধি অভিযানের। এখনই কঠোরভাবে গণসাহিত্যিক উৎপাদনে নিরুৎসাহিত না করলে অচিরেই সাহিত্যের পাঠক বলে কোনো শ্রেণী আর খুঁজে পাওয়া যাবে না। এখন পর্যন্ত যেমন কালজয়ী সাহিত্যিকের জীবন ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে গবেষণা হচ্ছে, অদূর ভবিষ্যতে আর তেমনটি হবে না। তখন গণসাহিত্যিকেরা প্রকৃত পাঠকের ওপর অভিসন্ধর্ভ রচনা করবেন। কেউ কেউ প্রকৃত পাঠক আবিষ্কারের কৃতিত্ব স্বরূপ পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করলেও তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।

অলংকরণ : রাজিব রায়

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: