।। কামরুল হাসান ।।

এমন ফাইনাল আর কখনো দেখেনি ক্রিকেট বিশ্ব! কী বলা যায় তাকে? রোমাঞ্চকর, উত্তেজনায় টানটান, নখ-কামড়ানো, শ্বাসরুদ্ধকর, আড়াআড়ি আঙুলের প্রার্থনা, হৃদপিণ্ডের ধুকপুক বন্ধ করা, গগণবিদারী শব্দে ঠাঁসা, সিট থেকে বারংবার লাফিয়ে ওঠা গ্যালারি, অবিশ্বাস্য, স্নায়ুক্ষয়ী? কোন বিশেষণ, কোন উপমা, কোন উপাধি তার পূর্ণরূপ তুলে ধরতে পারে না। বস্তুত সে ঐ সকল বিশেষণ, উপমা, উপাধির মিলিত নাম।

আগেই বলেছি এমন ফাইনাল আর কখনো দেখেনি ক্রিকেট বিশ্ব।

এখন সীমিত ওভারের ক্রিকেট মানেই রানবন্যা, বোলারদের তুলোধুনো করে ব্যাটসম্যানদের কীর্তি। এই বিশ্বকাপেই তিনশ পেরুনো ইনিংস হলো বেশ কটি। বাংলাদেশই করলো তিনটি, যার একটি সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জেতার দ্বিতীয় রেকর্ড। লিগ ম্যাচের রানবন্যা বহানো ইংল্যান্ডের পিচগুলো ফাইনালে এসে জাদুকরীরূপে বদলে গেল, তারা ব্যাটসম্যানদের স্ফীত বেলুনগুলো ফুটো করতে লাগল। আর চুপসে যাওয়া বোলারদের মুখে ফোটাতে লাগল হাসি।

নইলে ভারতের তিন সেরা ব্যাটসম্যান, যার ভেতরে আছে সেই পাঁচ সেঞ্চুরি হাঁকানো রোহিত শর্মা, কি না পরপর আউট হয়ে গেল ১, ১, ১ রান করে? বিশ্বখ্যাত ব্যাটিং লাইনআপ নিয়ে ভারত মাত্র ২৪০ রান করতে পারে না? আরেক বিশ্বকাপ মাস্তান অস্ট্রেলিয়া মুখ থুবড়ে পড়ে ২২৩ রানে? ঐ পরাশক্তিদের ভেঙেপড়া রথের উপর বিজয়পতাকা উড়িয়ে ফাইনালে চলে আসে নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ড। ক্রিকেট বিশ্ব স্বস্তি পায় নতুন এক দেশ বিশ্বকাপ জয় করতে যাচ্ছে দেখে।

ক্রিকেটের মক্কাখ্যাত লর্ডস মাঠে সেই স্বপ্নের ফাইনাল যেখানে খেলা যেকোনো ক্রিকেটারের সৌভাগ্য। ২৭ বছর পরে ইংল্যান্ড খেলছে ফাইনালে, লর্ডসের অভিজাত গ্যালারিতে চলে এসেছেন প্রাক্তণ রথী মহারথীরা। ক্রিকেটের এই সীমিত ভার্সনটির প্রতি তাদের খুব যে অনুরাগ আছে তা নয়, তারা এসেছেন স্বদেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে। সাত সমুদ্র পার হয়ে সেই সুদূর নিউজিল্যান্ড থেকে এসেছে অনুরাগীরা, তবে লর্ডসের দর্শকসমুদ্রে তারা সংখ্যালঘু।

দু-একটি ফাইনাল ছাড়া আগের বিশ্বকাপ ফাইনালগুলো হয়েছে একপেশে, যেখানে খেলে সবদলই, কিন্তু জেতে অস্ট্রেলিয়া। ওয়েস্ট ইণ্ডিজের প্রতাপের যুগে সে ট্রফিতে হাত লাগাতে পারেনি অন্য কেউ। ১৯৮৩ সালে ভারতের বিশ্বকাপ জয় ছিল অভাবিত। আমি তখন ভারতে। দেখেছি একটি বিশ্বকাপ জয় কী করে ভারতকে বদলে দিল, যেমন বদলে দিয়েছিল ১৯৯৬ সালে জয়ের পর শ্রীলঙ্কাকে।

টসে জিতে নিউজিল্যান্ড ব্যাটিং নিল, ইংল্যান্ড জিতলেও তাই নিত। বিশ্ববিদ্যালয়ের আমার দুটো ক্লাস ছিল, দুটোই দিবসের প্রথমার্ধে। সেই রুটিন আমাকে সুযোগ করে দিল দ্বিতীয়ার্ধে বাড়ি এসে খেলা দেখার। ইংলিশ বোলারদের তোপের মুখে নিউজিল্যান্ডের বাঘা বাঘা ব্যাটসম্যানরা গুটিয়ে রইল, সমুখ থেকে নেতৃত্ব দেওয়া কেন উলিয়ামসন ৫৮ বল খেলে করতে পারলেন কেবল ৩০। টেনেটুনে ইনিংস শেষ হলো ২৪১ রানে।

আমরা ভাবলাম ইংল্যান্ড সহজেই জিতে যাবে। ২৪১, এ আর এমন কী? তাদের উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান জেসন রয় আছেন খুনে মেজাজে, দ্বিতীয় সেমিফাইনালে তিনি অস্ট্রেলিয়ার বিধ্বংসী বোলিংকে ধ্বংস করেছিলেন ব্যাটকে তলোয়ার বানিয়ে। ইংল্যান্ড দলে আছে জো রুট নামের আরেক মারকুটে ব্যাটসম্যান, এ টুর্নামেন্টে যার সংগ্রহ ৫৫৬, যিনি সেঞ্চুরি পেলে এক বিশ্বকাপে শচীন টেন্ডুলকারের ৬৭৩ রানের রেকর্ডকে হুমকির মুখে ফেলতে পারতেন। সে সম্ভাবনা ছিল কেন উলিয়ামসনেরও। তার সংগ্রহ তখন ছিল ৫৪৮।

শুরু থেকেই আগুনঝরা বোলিং করতে লাগল নিউজিল্যান্ড। ব্যাটসম্যানদের সামান্য পুঁজিকে অসামান্য করে তুলতে তারা জানপ্রাণ লড়িয়ে দিল। ইংল্যান্ডের সাহসী বয় জেসন রয়ও ভয়ে সিঁটিয়ে রইল। আজ আর তার ডানা মেলা হলো না। ইংল্যান্ডের ব্যাটিং ভরসা রুটও উইকেটে শেকড় গজিয়ে থিতু হতে পারলো না, ম্যাচের ভাগ্য গড়িয়ে গেল অন্যপাশে।

৮৬ রান তুলতেই নেই ৪ উইকেট, তখন ২৪১ রানকে মনে হচ্ছিল হিমালয় চূড়া। সেখানে উঠতে চোয়ালবদ্ধ প্রতিজ্ঞা নিয়ে নামলেন বেন স্টোকস, যার নামের কাছাকাছি স্ট্রোকস শব্দটি আর বাটলার। ইনিংস মেরামত করে তারা পেণ্ডুলামের কাঁটাটি ইংল্যান্ডের ঘরে আনার চেষ্টা করছিলেন। গড়ে উঠল ১১০ রানের জুটি। বাটলারের আউট আর দ্রুত দুটি উইকেট খুইয়ে ইংল্যান্ড আবার ব্যাকফুটে। শেষ ওভারে দরকার ছিল ১৫ রান। সেই প্রতিবলে উত্তেজনায় ঠাঁসা শেষ ওভারে আর একটি রান হলেই ইংল্যান্ড জিতে যায়, হলো কাঁটায় কাঁটায় ২৪১। ম্যাচ টাই!

এখন কী করা? ট্রফি যেহেতু একটাই বানানো হয়েছে, দুদলকে তো আর একটা দেওয়া যায় না, করাত দিয়ে কেটে সমান দু’ভাগ করলেও ঠিক হবে না। মীমাংসা হতেই হবে, পঞ্চাশ ওভারের মীমাংসা হবে এক ওভারে। একে বলে সুপার ওভার।

ভাগ্যদেবী অন্তত দুবার হেসেছেন ইংল্যান্ডের দিকে। পঞ্চাশতম ওভারে স্ট্রোকসের হাঁকানো এক ছক্কা নিউজিল্যান্ডের ফিল্ডার সীমান্তে ধরলেন ঠিকই, কিন্তু তাল সামলাতে না পেরে পা পড়ে গেল রোপের উপর। আউট না হয়ে হলো ছক্কা। দ্বিতীয়বারে ছিল অকৃপণ কৃপা। দ্বিতীয় রান নিতে ছুটতে থাকা বেন স্টোকসের বাড়িয়ে ধরা ব্যাটে লেগে বলটি সীমানা পার। হলো ছয় রান। কেবল ঐ দুটি টাই নয়, আরেকটি অদ্ভুত মিল ছিল শেষ দুই ওভারেই জেতার জন্য দরকার ছিল ১৫ রান, শেষ রানটি নিতে গিয়ে রান আউট হন পড়িমরি দৌড়ানো ব্যাটসম্যান। মিড উইকেট থেকে ছুঁড়ে দেয়া বলটি তালুবন্দী করেই উইকেট ভেঙে দিলেন উইকেটরক্ষক জস বাটলার। তার উল্লাস প্রকাশ ছিল দেখবার মতোই, কেবল তার নয় পুরো ইংল্যান্ড দল তখন ভেসে যাচ্ছে উল্লাসে। এই প্রথম ক্রিকেটের জন্মভূমিতে কাপ এলো, উল্লাস তো হবেই!

আমার বড় মেয়ে টিয়ানা থাকে নিউজিল্যান্ডে। সে সুবাদে আমার ঘরের সবাই, এমনকি লুবনা যে ক্রিকেট বোঝে না, জিজ্ঞেস করে একদলের এগারজন, অন্যদলের মাত্র দুজন কেন, সেও নিউজিল্যান্ডকে সমর্থন দিতে লাগল। একমাত্র আমি ছিলাম ইংল্যান্ডের সমর্থক। ক্রিকেটের জন্মভূমি হিসেবে ইংল্যান্ডের এই ট্রফিটি জেতার অধিকার আছে, আর ওরা হলো হোস্ট নেশন। হোস্ট নেশনের ট্রফি জেতা তাদের উদ্যোগ, প্রচেষ্টা ও আত্মত্যাগের পুরস্কার।

মূল ম্যাচে টাই, সুপার ওভারেও টাই। ইংল্যান্ড জিতল বেশি বাউণ্ডারি মারার কৃতিত্বে। ফল আসলে অমীমাংসিত। নিয়মের মারপ্যাচেই জিতেছে ইংল্যান্ড। জিতেছে ক্রিকেট! এমন রোমাঞ্চকর ফাইনাল যারা দেখতে পেয়েছে সার্থক তাদের জীবন।

কামরুল হাসান : কবি ও শিক্ষক।