Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > সমসাময়িক > রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ ভারতের

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে কূটনৈতিক উদ্যোগ ভারতের

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

রাখাইনে রোহিঙ্গাদের জন্য ২৫০টি বাড়ি নির্মাণের পর বাংলাদেশের শরণার্থী শিবিরে অবস্থানরতদের প্রত্যাবাসন নিশ্চিতে কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে ভারত। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, সেই প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে জুলাইয়ের শেষের দিকে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শনে আসতে পারেন মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব। ভারত মনে করছে, পররাষ্ট্র সচিব শরণার্থী শিবির পরিদর্শনে এলে রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসনকে নিরাপদ ও সুরক্ষিত বিবেচনা করা যাবে। কূটনৈতিক সূত্রকে উদ্ধৃত করে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, বন্ধুপ্রতিম প্রতিবেশী ঢাকার ওপর চাপ কমানোর অংশ হিসেবে ভারত প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার উদ্যোগ নিয়েছে।

২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইনের কয়েকটি নিরাপত্তা চৌকিতে হামলার পর পূর্বপরিকল্পিত ও কাঠামোগত সহিংসতা জোরালো করে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। হত্যা-ধর্ষণসহ বিভিন্ন ধারার সহিংসতা ও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নতুন করে বাংলাদেশে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর ৭ লাখেরও বেশি মানুষ। বর্তমানে বাংলাদেশের কক্সবাজারের বিভিন্ন শরণার্থী শিবিরে বাস করা রোহিঙ্গার সংখ্যা ১০ লাখেরও বেশি। মিয়ানমারে ফিরলে আবারও নিপীড়নের শিকার হতে পারেন এমন শঙ্কায় রয়েছেন এসব রোহিঙ্গা।

রোহিঙ্গাদের মধ্যে যারা স্বেচ্ছায় রাখাইনে ফিরতে চায় তাদের জন্য সম্প্রতি ২৫০টি বাড়ি নির্মাণ করে মিয়ানমারের কাছে হস্তান্তর করেছে ভারত। এছাড়াও রাখাইনে আরও বেশ কিছু উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার কথা রয়েছে তাদের। প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করতে রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ দূর করতে চায় ভারত।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানিয়েছে, ভারতের বিশ্বাস, মিয়ানমারের শীর্ষ কূটনীতিক বাংলাদেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গা শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বললে তা প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ তৈরিতে সহায়ক হবে। এর মাধ্যমে রাখাইনে ফিরতে ইচ্ছুক পরিবারগুলো আত্মবিশ্বাস ফিরে পাবে। দিল্লির প্রত্যাশা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারাও রোহিঙ্গাদের সঙ্গে কথা বলার মধ্য দিয়ে তাদের সুরক্ষা আর নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগ দূর করবে।

১০ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দেয়ার ক্ষেত্রে ঢাকার সীমিত সামর্থ্যের কথা উল্লেখ করে দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস বলছে, প্রত্যাবাসনের উদ্যোগ নেয়ার মধ্য দিয়ে ঢাকার ওপর থেকে সামাজিক ও অর্থনৈতিক চাপ কমাতে চায় ভারত।

২০১৭ সালের আগস্টের পর কোনও রোহিঙ্গা শরণার্থীকে আশ্রয় না দেয়ায় সমালোচনার মুখে পড়ে ভারত। যদিও আগে থেকেই দেশটিতে প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা অবস্থান করছে। গত দুই বছরে ১৬ জন রোহিঙ্গাকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠিয়েছে দেশটি। তবে মিয়ানমারের চিহ্নিত করা উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে ভারত এখন পর্যন্ত সেখানে আড়াই কোটি মার্কিন ডলার বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

বাড়ি নির্মাণ ছাড়াও ভারত রাখাইনে হাসপাতাল, স্কুল, ছোট সেতু ও কালভার্ট নির্মাণের পরিকল্পনা করেছে। দিল্লি চায় চীন, জাপান এবং অন্য আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোও সেখানে সামাজিক ও অর্থনৈতিক বাস্তুসংস্থান তৈরির কাজে যোগ দিক। ওই সূত্রটি বলেছে, ‘এই বৃহত্তর বার্তাটিই আমরা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে পৌঁছে দিতে চাই’।

ভারতের তৈরি করা বাড়িগুলো তিনটি গ্রামে অবস্থিত। সুয়ে জার গ্রামে ১৪৮টি, কেইন চাং তুং গ্রামে ৬০টি এবং নান্ট থার টং গ্রামে ৪২টি। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ এসব বাড়ি হিন্দু, মুসলমান এবং রাখাইন সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে বিতরণ করেছে। সূত্র বলছে, নতুন বাড়িগুলো গ্রামবাসীদের আগের বাড়ির তিন কিলোমিটারের মধ্যে অবস্থিত। এতে তারা তাদের নিজস্ব বাস্তুসংস্থানে ফিরে যেতে পারবে। এসব পরিবার মূলত কৃষি ও মাছ ধরার কাজ করে থাকে।

প্রতিটি বাড়ির অংশগুলো আলাদা স্থানে তৈরি করে পরে নির্মাণ স্থলে নিয়ে সন্নিবেশ করা হয়েছে। বাড়িগুলো প্রতিটির আয়তন ৪০ স্কয়ার মিটার। ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড় প্রতিরোধক বাড়িগুলো ধুলা ও পানিরোধী করে নির্মাণ করা হয়েছে।

২০১৭ সালের ডিসেম্বরে ভারতের তৎকালীন পররাষ্ট্র সচিব এস জয়শঙ্করের (বর্তমান পররাষ্ট্রমন্ত্রী) মিয়ানমার সফরের সময় দুই দেশের মধ্যে স্বাক্ষরিত এক চুক্তির অংশ হিসেবে এসব বাড়ি নির্মাণ করা হয়েছে।

বাংলাদেশ থেকে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বিলম্বের পাশাপাশি এ বছরে রাখাইনের বিভিন্ন অংশে আরাকান আর্মির সঙ্গে সশস্ত্র বিরোধ চলছে মিয়ানমারের নিরাপত্তা বাহিনীর। এরইমধ্যে রাখাইনের উত্তরাঞ্চলে কিছুটা স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফেরানোর চেষ্টা করছে মিয়ানমার সরকার। তারই মধ্যে বাড়ি হস্তান্তর করে ভারত।

২০১৮ সালের ডিসেম্বরে প্রেসিডেন্ট রামনাথ কোবিন্দের মিয়ানমার সফরের সময়ে ৫০টি বাড়ি প্রথম হস্তান্তর করে ভারত। বাকি বাড়িগুলো ভারতের রাষ্ট্রদূত সৌরভ কুমার গত ৯ জুলাই হস্তান্তর করেন। হস্তান্তর অনুষ্ঠানে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সমাজকল্যাণ, ত্রাণ ও পুর্নবাসন মন্ত্রী ড. উইন মিয়া আয়েসহ দেশটির উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।

ভারত শুরু করলেও চীন আরও এক হাজার বাড়ি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের সূত্র বলেছে, চীন, জাপান ও অন্য আসিয়ানভুক্ত দেশগুলো ওই এলাকায় আরও নানা অবকাঠামো নির্মাণকাজে যোগ দিতে পারে। একই সঙ্গে ফিরে আসা পরিবারগুলোর নিরাপত্তা দেয়ার ক্ষেত্রে মিয়ানমার সরকারের ওপর নির্ভর করতে পারে তারা।

প্রসঙ্গত, পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফিরিয়ে নিতে আন্তর্জাতিক চাপের মুখে ২০১৮ সালের জানুয়ারিতে বাংলাদেশ-মিয়ানমার প্রত্যাবাসন চুক্তি সম্পন্ন হয়। একই বছরের ৬ জুন নেপিদোতে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমার ও জাতিসংঘের সংস্থাগুলোর মধ্যেও সমঝোতা চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইস্যুতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে চুক্তি স্বাক্ষরের পর দীর্ঘদিন পার হলেও এর আওতায় কোনও শরণার্থী নিজ দেশে ফিরে যায়নি। মানবাধিকার গ্রুপগুলো দাবি করে আসছে, রাখাইনে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে বসবাসের মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।             

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: