Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ১২

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ১২

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। ডা. সায়ন পাল ।।

‘তোমার স্পাইডারম্যান মাস্ক বানিয়েছে?’

প্রশ্নটা এলো পাশে বসা বছর পাঁচেকের ফুটফুটে ছেলেটির থেকে । অবাক হয়ে বললাম 
‘স্পাইডারম্যান মাস্ক? কই না তো?’

‘বানায়নি? তাহলে তুমি যুদ্ধ করবে কীভাবে?’

‘যুদ্ধ?’

‘হ্যাঁ দুষ্টু দুষ্টু ক্যান্সার রাক্ষসের সঙ্গে যুদ্ধ। প্রথমে আমাকে ভেতরে নিয়ে যায়। তারপর স্পাইডারম্যান মাস্ক পরিয়ে দেয়। তারপর ঘরটা অন্ধকার হয়ে যায়। একটা বিরাট বড় মেশিন থেকে গুলি চলে।  ব্যথা লাগে না। গুলিগুলো আমার চোখের ভেতর যে ক্যান্সার রাক্ষসটা ঢুকে আছে তাকে মেরে দেয়। এইটাই তো যুদ্ধ। তোমার মাস্ক বানায়নি তাহলে তুমি যুদ্ধ করবে কীভাবে?’

এতক্ষণে বুঝলাম সে রেডিওথেরাপি দেয়ার জন্য যে বিশেষ প্লাস্টিকের মাস্ক বানানো হয় তার কথা বলছে। এখন যেহেতু রেডিও থেরাপি খুবই উন্নত আর টার্গেটেড তাই যাতে রেডিওথেরাপি দেয়ার সময় পেশেন্টরা নড়াচড়া না করে তাই এই মাস্কটা বানানো হয়। এমন সময় রেডিওথেরাপি টেকনোলজিস্ট হাতে একটা ছোট বাচ্চাদের মাস্ক নিয়ে রেডিওথেরাপি রুম থেকে বেরিয়ে পেশেন্ট ওয়েটিং এরিয়াতে এলেন। হাতের মাস্কটা সত্যিই লাল কালো রঙ করে স্পাইডারম্যানের মতো বানানো। পেছনে পেছনে টিটুদা।

টিটুদা বললো, ‘স্পাইডারম্যান ফারজান যুদ্ধের জন্য রেডি?’

ছোট্ট ফারজান বললো ‘ইয়েস স্যার।’

তারপর টিটুদার সঙ্গে হাই ফাইভ করে রেডিওথেরাপি রুমে ঢুকে গেল।

টিটুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, ‘এই ছোট্ট বাচ্চাটারও রেডিওথেরাপি হবে? ওর ক্যান্সার?’

টিটুদা বললো, ‘ওর এক ধরনের চোখের ক্যান্সার। একে বলে রেটিনোব্লাস্টওমা। ওর একটা চোখ অপারেশন করে বাদ দিতে হয়েছে। ওই চোখে প্রস্থেসিস বসানো বলে তুই বুঝতে পারিস নি। আমরা ওর অন্য চোখটা বাঁচানোর চেষ্টা করছি রেডিওথেরাপি দিয়ে।’

‘চোখটা বাচবে টিটুদা? ও দেখতে পাবে তো?’

‘সেরকমই তো আশা। রেটিনোব্লাস্টওমা চোখের এক ধরনের টিউমার। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তা বংশগত হয়। অথবা কোন কোন জেনেটিক সিন্ড্রোমের সঙ্গে অ্যাসোসিয়েট থাকে। ওর ক্ষেত্রে যেমন দুটো চোখেই এই অসুখটা হয়েছে। কেমোথেরাপি দেয়া হয়েছে, অন্য চোখটা খুব অ্যাডভানস স্টেজের ক্যান্সার ছিল বলে বাঁচানো যায়নি। এই চোখটা রেডিওথেরাপি দিয়ে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছে।’

‘এই ক্যান্সার প্রিভেন্ট করা যায় না?’

‘সত্যি বলতে কি সেটা আমাদের জানা নেই। হয়তোবা জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এর সাহায্যে ভ্রূণ অবস্থায় কোনোদিন সম্ভব হবে ডিফেক্টিভ জিনটাকে ঠিক করে দেয়া।’

‘কিন্তু আর্লি ডায়াগনোসিস কি করে হবে? তুমিতো বলছো আর্লি ডায়াগনোসিস করলে চোখের দৃষ্টি বাঁচিয়ে দেয়া সম্ভব।’

‘সাধারণত চোখের মণির কালো অংশে এক ধরনের সাদা ডট দেখা যায়। যাকে বলে ক্যাটস আই রিফ্লেক্স। বাচ্চার চোখে এইরকম কিছু দেখা গেলে, অথবা বাচ্চার দেখতে অসুবিধা হলে সঙ্গে সঙ্গে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত। একদম ছোট শিশুদের ক্ষেত্রে যেমন এক বছরের কম বাচ্চা তারা কিছু বলতে পারে না, তাদের ক্ষেত্রে এই চোখের সাদা বিন্দুটা দেখতে পেলেই সঙ্গে সঙ্গে চোখের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাওয়া উচিত।’

‘আর এর চিকিৎসা কী? এত ছোট ছোট শিশুদের চিকিৎসা তো খুবই কঠিন।’

‘হ্যাঁ তা কঠিন তো বটেই। কেমোথেরাপি দিতে হয়, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খুব ছোট টিউমারের ক্ষেত্রে ব্রাকিথেরাপি ব্যবহার করা যায়। যাকে আমরা প্লাক ব্রাকিথেরাপি বলি। অথবা রেডিওথেরাপি মানে এক্সটার্নাল বিম রেডিও থেরাপি। আর অপারেশন করে চোখ কেটে বাদ দেয়া তো অবশ্যই একটা অপশন। এবং দুর্ভাগ্যবশত অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে ডায়াগনোসিস হওয়ার ফলে চোখ কেটে বাদ দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকে না।’

‘টিটুদা, ও বাঁচবে তো?’

‘অবশ্যই বাঁচবে। আমার চিন্তা ওর চোখের ভিশনটা বাঁচানো নিয়ে।’

‘এই ছোট ছোট বাচ্চাদের এই ধরনের ক্যান্সার টিউমার। উপরওয়ালা বলে যদি কেউ থেকে থাকেন তিনি বড়ই নিষ্ঠুর।’

‘বাচ্চাদের আরো অনেক ধরনের ব্রেইন টিউমার হয়। যেমন মেডুলোব্লাস্টোমা, পাইলসাইটিক অ্যাস্ট্রো সাইটোমা, নিউরোব্লাস্টোমা, পিনিয়াল গ্ল্যান্ড টিউমার। এমনকি গ্লাওমাও হতে পারে।’

‘মানে আমার যে টিউমারটা হয়েছে?’

‘হ্যাঁ এবং অনেক ক্ষেত্রে সেটা তোর মতো লো গ্রেড না হয়ে হাই গ্রেড হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অপারেশন আর রেডিওথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। কেমথেরাপি কিছু কিছু সময় লাগে। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অসুখটা সম্পূর্ণ সেরে যায়। এটাই আশার কথা।’

আমার টিউমারটা সফলভাবে অপারেশন হয়েছে। অপারেশনের পর প্যাথলজি রিপোর্ট দেখা গেছে আমার টিউমারটা লো গ্রেড হওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু রিস্ক ফ্যাক্টর থাকার দরুন আমার রেডিওথেরাপি প্রয়োজন। তাই আমার মাস্ক তৈরি করে সিটি স্ক্যান এবং এম আর আই করা হয়। তারপর কম্পিউটারে টিটুদা এবং ওর টিম আমার রেডিওথেরাপির প্ল্যানিংটা করে। আজ প্রথম দিন রেডিওথেরাপির। একটু ভয় ভয় লাগছিলো কিন্তু পাঁচ বছরের ফারজান এর কথা ভেবে নিজের অসুখ খুবই অকিঞ্চিৎকর লাগলো।

টিটুদা বলে যাচ্ছিল ‘এজন্যেই বাচ্চারা যদি কোনো সমস্যার কথা বলে যেমন ধর মাথাব্যথা, গা গোলানো বমি বমি ভাব অথবা ইনভলান্তারি মুভমেন্ট, চোখে কম দেখা, কানে কম শোনা, ব্যালেন্স এর অভাব চলতে চলতে পড়ে যাওয়া, সেগুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে ছোটখাটো সমস্যা বাচ্চাদের দুষ্টুমি বলে উড়িয়ে দেয়ার প্রবণতা থাকে। সেটা ঠিক নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই বাচ্চারা কোনো সমস্যার কথা বললে সেটা সত্যি কথাই বলে।’ বলতে বলতে টিটুদার মুখে বিষাদের ছায়া।

কথা বলতে বলতে ফারজান বেরিয়ে এলো। সঙ্গের টেকনোলজিস্টকে বললো, ‘আমার স্পাইডারম্যান মাস্কটা কিন্তু আলাদা জায়গায় রাখবে, হারিয়ে না যায়।’

ফারজানকে দেখামাত্র টিটুদা নিজের মনের ডিপ্রেস ভাবটা মুখ থেকে হটিয়ে দিয়ে হেসে বললো, ‘স্পাইডারম্যান যুদ্ধ কেমন হলো? তুমি জিতলে তো?’

‘ইয়েস ইয়েস, সবকটা দুষ্টু ক্যান্সার রাক্ষসকে রে দিয়ে মেরে ফেলেছি।’

টিটুদার সঙ্গে আবার একটা হাইফাইভ করে ফারজান মায়ের সঙ্গে চলে গেল।

এরপরের সিরিয়াল নাম্বার আমার। টিটুদার সঙ্গে আমিও রেডিওথেরাপি রুমে ঢুকলাম ক্যান্সার নামক রাক্ষসটার সঙ্গে যুদ্ধ করতে। আমার মাস্কটা টারজানের মতো রঙচঙে স্পাইডারম্যানের নয় কিন্তু আমি জানি আমার অস্ত্রটা মানে রেডিওথেরাপি প্রচণ্ড শক্তিশালী। ক্যান্সারকে সে মেরে দেবেই।

ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখছেন উত্তরকালে

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: