Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > একটি ডকুফিকশনের খসড়া ।। নূরুননবী শান্ত

একটি ডকুফিকশনের খসড়া ।। নূরুননবী শান্ত

পড়তে পারবেন 12 মিনিটে

।। ছোটগল্প ।।

‘আকাশের, হৃদয়ের যাবতীয় বিখ্যাত নীলিমা

আপাতত কোনো-এক স্থির অন্ধকারে শুয়ে

আছে।’— নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

মিসেস দিরহামের ফোন। মেয়েটি বললো— আমাদের বৃষ্টিটা খুব জোরে হচ্ছে!

তাই?

হুম।

জানো, আমাদের বারান্দায়ও তোমাদের বৃষ্টিটা হচ্ছে!

না, না, আমাদেরটা আমাদের, তোমাদেরটা তোমাদের।

ও।

এমন সময় গুরুম করে একটা শব্দ হলো।

এই মোবাইলটা বন্ধ রাখো, বজ্রপাত হচ্ছে তোমার বৃষ্টির উপর।

না, না। শব্দ শুনে বোঝ না! বোকা! এখানে তো বোমা ফাটার শব্দ হলো।

বলিস কি?

ও মা, তুমি কিচ্ছু জানো না! আমাদের পাড়ায় তো বোমা ফাটে। কালকেও ফেটেছে তো। তার আগেরদিনও…

এই কি বলো! কিসের বোমা?

ও মা, তুমি কিচ্ছু দেখ না! টিভি দেখ না?

না গো।

আমাদের পাড়ায় দুই দল লোক আছে। দুই দলের কাছেই অনেক অনেক বোমা আছে। তারা বোমা মারামারি করে!

তোমার ভয় করে না?

না, না। মা বলেছে, আমাদের বাড়িতে বোমা আসবে না। আমাদের বাড়ির চতুর্দিকে দেয়াল আছে তো, দেয়ালের উপর বড় বড় কাঁটা মারা আছে।

তুমি যে সারাদিন একা থাকো, মন খারাপ করে না?

না! তবে আজ মন খারাপ। আন্টি, জান? পাশের বাড়ির বাবরি চুলআলা ভাইয়াটা কাল মরে গেছে। ঐ যে আমাকে গান শেখাতো, চিনতে পেরেছ?

কি? কি করে? বোমা লেগে?

না, না। বাসের ধাক্কায়।

আহ হা। বাসগুলো ক্রেজি হয়ে যাচ্ছে। শোনো, তুমি কিন্তু সাবধানে থাকবা। একা একা বাইরে যাইও না। মামনি অফিস থেকে এলে আমার কথা বলো। বলো যে… সন্ধ্যায় যেন ক্লাবে আসে। মিটিং আছে।

আচ্ছা।

আর শোনো, বৃষ্টিতে ভিজবা না আবার যেন। সর্দ্দি লাগবে!

না, না। বৃষ্টি তো ঘরে আসে না। তুমি শুধু শুধু ভয় পাও।

ইস্, বেশি সাহস ভালো না, বুঝলা! রাখলাম। মাকে বলতে ভুইলো না কিন্তু।

বিছানায় মোবাইল ফোন ছুড়ে দিয়ে সিঙ্গেল মাদার রেবার বিয়াল্লিশ বছর বয়সী কন্যাটি কাচের জানালা দিয়ে বাইরে, বারান্দার ওপারের বৃষ্টির দিকে চেয়ে রইলো। একা।

মেয়েটি চল্লিশ পেরিয়েছে বটে। আচরণে দশ!

দশ বছরের পর আর বাড়েনি। না শরীরে, না কথা-বার্তায়, না কাজে-কর্মে। কুড়ি বছর বয়স পর্যন্ত দুনিয়ার নানান দেশে চিকিৎসা হয়েছে, কাজ হয়নি। তারপর রেবা মেনে নিয়েছেন। তিনি বলেন, নিয়তি। তবু যাহোক, মেয়েটি বেঁচে থাকুক, রেবার আর কিছু চাই না। রেবাও বেঁচে থাকতে চান। শুধু মেয়েটির জন্য। রেবা মরে গেলে, মেয়েটিও মরে যাবে। কিংবা কে জানে, হয়তো অনেক বেশি বেঁচে থাকবে। যেমন রেবা বাঁচেন।  নিজের উপর ভর করে। ব্যবসা করেন। বিলবোর্ডের। বাসাতেই অফিস। সারাদিন পড়ে থাকেন সিটি কর্পোরেশনের অফিসে আর মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিগুলোর ব্র্যান্ডিং সেকশনে। আর ক্লাবে যান। হৈ চৈ করেন। তখন মেয়েটি একা থাকে। ঘরে। টিভি দেখে। জানালার বাইরে রাস্তার দিকে তাকিয়ে একা একা কথা বলে। তারপর হরেক পুতুল আর টেডি বিয়ারদের সাথে গল্প করে। ট্যাবের টকিং সফ্টওয়ারের সাথেও নানা কথা বলে। 

একাত্তরে, দেশ স্বাধীন হবার আগে আগে, ময়মনসিং থেকে হারিয়ে যাওয়া রেবা কমলাপুরের বাসায় ফিরে এসেছিলেন বাহাত্তর সালের জানুয়ারি মাসে। তখন ওনার বয়স পনের। দেখতে পঁচিশ-টচিশ লাগে। বাড়বাড়ন্ত শরীর। এদিকে, ততদিনে রেবাকে খুঁজতে এসে না পেয়ে রাজাকার আকবর আলী রেবার মাকে কুড়াল দিয়ে কুপিয়ে মেরে ফেলে। ময়মনসিং স্টেশন থেকে রেবার হারিয়ে যাবার ব্যাপারটা আকবর রাজাকার বিশ্বাস করেনি। আকবরের এককথা— রেবাকে না-পেলে মেজর সাব সবাইকে মেরে ফেলবে। রেবার বাবা সেদিনের পর থেকে ভয়েই আর ঘরে ফেরেননি। সত্তর সালে ভোটের সময় রেবার বাবা মোহাম্মদ রফিক শেখ মুজিবুরের নামে দিনরাত ক্যানভাস করে বেড়াতেন। চাচির অনুমান রেবার বাবাও আর ফিরবেন না। হয় পাক আর্মির হাতে শহীদ হয়েছেন, নয় রাজাকারেররা তাকে কচুকাটা করেছে। তিনি সত্যিই ফেরেননি। চাচির আরও অনুমান, রেবাকে বাড়িতে ঢুকতে দেয়া যাবে না। রেবার পেটে বাচ্চা। রেবা বাড়িতে থাকলে বাড়ির অন্য মেয়েদের নামে বদনাম হবে!

দিনের পর দিন ধর্ষিত হতে হতে রেবা অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রেবাকে দেখলেই সে অপ্রকৃতিস্থতা স্পষ্ট বোঝা যায়। দরজার বাইরে দাঁড় করিয়ে রেখে চাচি বললেন— এতকিছুর পর বাঁইচা থাকতে তোর শরম করে না, ক্যান, শহীদ হইলে কি হইতো? রেবার চোখমুখে নির্যাতনের চিহ্ন ছাড়া আর কিছু ছিল না। চাচির আচরণে মনটা ভেঙে যায় রেবার। কিন্তু মরতে ইচ্ছে করে না। ভয় করে। মরণকে রেবার ভয়ঙ্কর মনে হয়। আর রেবা মরবেনই বা কেন? তার কি দোষ?

ক্যাম্পের দিনগুলোয় তার বয়সী অসংখ্য কিশোরীর মৃত্যু সে চোখের সামনে দেখেছেন। কারো গলা টিপে মারা হয়েছে, কারো যৌনাঙ্গে বেয়োনেট ঢুকিয়ে মারা হয়েছে, কারো স্তন কেটে নিয়ে দূরে ছুড়ে ফেলা হয়েছে— বহুদূর পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে রক্ত, কাউকে করা হয়েছে গুলি, কেউ কেউ বেয়েনেটের উপর ঝাপিয়ে পড়ে আত্মহত্যা করেছে। রেবা বেঁচে থাকতে চেয়েছেন প্রাণপণে। তাই, প্রথমবার ধর্ষণে রক্তাক্ত হবার পর, রেবা ঠিক করেছিলেন— বাধা দেবে না! নিজের কাপড় নিজেই খুলে দিতেন রেবা। তবু আঁচড়-কামড়ের হাত থেকে রেহাই পাননি। দাঁতে দাঁত কামড়ে বেঁচে থেকেছেন। রেবা চেয়েছেন বেঁচে থাকতে, যেকোনো মূল্যে। বাবা মোহাম্মদ রফিক বলতেন— বাঁইচা থাকাটাই আনন্দের! কিন্তু ধর্ষিত হবার অপরাধে নিজের বাড়িতে আশ্রয় না পেয়ে, মা আর বেঁচে নেই জেনে, রেবা যেন বাঁচার শক্তি হারিয়ে ফেলেন। জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে পড়ে যান। তারপর যখন চোখ খোলেন, তখন হাসপাতালের নোংরা মেঝেতে। কোন্ হাসপাতাল, কে তাকে ওখানে নিয়ে গেল তার কিছুই রেবা জানতে পারেননি। খানিকটা সুস্থ হতেই হাসপাতাল ছাড়তে হয় রেবাকে। হাসপাতালের জায়গা খালি করা দরকার হয়ে পড়ে। রেবা আর অতীতে ফেরার চেষ্টা করেননি। বর্তমানে বেঁচে থাকতে চেয়েছেন। তারপর, ভিক্ষা করেছেন। রাস্তায় রাস্তায় হেঁটে হেঁটে বেড়িয়েছেন। রাস্তাতেই একরাতে মেয়ে সন্তানের জন্ম দিয়েছেন। একাই।

তারপর থেকে কমলাপুর স্টেশনে রাত কাটতো রেবার। অন্ধকারে কোলের উপর শোয়ানো বড় শান্ত নবজাতকের মুখের দিকে চেয়ে রাত পার করতেন। নবজাতককে বুকে জড়িয়ে ভিক্ষা করতেন। ভিক্ষার জমানো টাকায় খবরের কাগজ ফেরি করতে শুরু করেন চুয়াত্তরের দুর্ভিক্ষের সময়। তখনই আফসার চাচার সাথে দেখা।

কমলাপুরের আফসার আর্টের আফসার চাচা একদিন রেবাকে রেললাইনের ধারে আবিষ্কার করেন। ছোটবেলায় ছবি আঁকতে পারতেন বলে রেবাদের বাড়িতে গিয়ে আফসার চাচা একদিন প্রশংসা করেছিলেন, বলেছিলেন, আমাদের মায়ের আঁকার হাত আছে। আফসার চাচার কাছে শিখেও ছিলেন কয়েকদিন, কীভাবে তুলি ধরতে হয়, কোন রঙের সাথে কোন রঙ মেশালে কোন রঙ হয় ইত্যাদি। আফসার চাচার সাথে দেখা হবার পর ক্লাস এইট পর্যন্ত লেখাপড়া জানা রেবা খবরের কাগজ বেচা বাদ দিয়ে আফসার আর্টে সাইনবোর্ড লেখার কাজ শুরু করলেন। কমলাপুর স্টেশন থেকে পাটি-বালিশ গুটিয়ে নিয়ে আফসার চাচার সাথে মগবাজারের নয়া বস্তিতে থাকতে লাগলেন। মেয়েটিকে পরম যত্ন করেন আর স্বপ্ন দেখেন। মেয়েটি হামাগুড়ি দেয়, তারপর এটা ওঠা ধরে উঠে দাঁড়ায়। তারপর একদিন গিরগির করে হাঁটতে শুরু করে। তারপর, পঁচাত্তরে, বঙ্গবন্ধু সপরিবারে খুন হওয়ার পরের দিন আফসার চাচা আফসার আর্টের পেছনে ডোবার মধ্যে মরে পড়ে থাকেন। স্বাধীন বাংলাদেশে এই প্রথম রেবা খুব কাঁদেন। বিলাপ করেন না, নিঃশব্দে চিৎকার করেন। পরিচিত দুই-একজন রেবার মাথায় হাত দিয়ে বলেছিলেন— জোরে কান্দিও না, রক্ষিবাহিনীর লোকেরা শুনলে বিপদ হবে! বেশকিছুদিন পর, বুকে আটকে থাকা বিলাপের চাপ কমে এলে বুকটা হালকা হয়ে আসে। এলাকার মানুষকে সাক্ষী রেখে আফসার আর্টের ঝাপ খোলেন রেবা।

দিন যায়। ঢাকায়, চট্টগ্রামে একটার পর একটা খুন হবার খবর সারা দুনিয়ায় ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

সূর্য অস্ত যায়। আবার সূর্য ওঠে।

ক্রমেই ঢাকা শহরের একমাত্র নারী সাইনবোর্ড ব্যবসায়ী হয়ে ওঠেন রেবা। সময় বয়ে যায়। রেবার ব্যবসা বাড়ে। সাত্তার, জিয়া, এরশাদ ইত্যাদি গল্পের ভেতর দিয়ে রেবার মেয়েটি বড় হতে হতে দশ বছর বয়সে আটকে যায়। ততদিনে রেবার অভাব দূর হয়। বস্তির মেয়েদের আর্ট শিখিয়ে তাদেরকে আফসার আর্টের সাথে সাথে নিযুক্ত করেন রেবা। তারা রিকশার পেছনে, ট্রাকের ডালায় ফুল আঁকতে আঁকতে নতুন জীবন খুঁজে পায়। মেয়েটিকে নিয়ে রেবা নানান দেশে যান। চিকিৎসা করান। মেয়েটির তবু বড় হবার সম্ভাবনা তৈরি হয় না। ডাক্তাররা বলেন— দেখা যাক। লেটস্ সি। রেবা প্রতিদিন মেয়েটির দিকে তাকিয়ে থাকেন। অপেক্ষা করেন।

খুব দ্রুত বদলে যায় ঢাকা। বদলে যায় বাংলাদেশ। স্বৈরাচারের যুগ শেষ হয়ে গণতন্ত্রের বাতাস বইতে শুরু করে। মেয়েটি দশ বছরেই আটকে থাকে। রেবার পরিচিতি মগবাজার, কমলাপুর ছাড়িয়ে ঢাকার উত্তর-দক্ষিণে ছাড়িয়ে পড়ে। 

এদিকে, ঢাকা শহরে বড় বড় বিলবোর্ড ঝুলতে শুরু করে যত্রতত্র। রেবাই বলা চলে বিলবোর্ড ব্যবসার প্রথম উদ্যোক্তা। বড় বড় নেতাদের সাথে রেবার সম্পর্ক তৈরি হয়। বড় বড় কোম্পানি রেবাকে ডেকে কাজ দেয়। কমলাপুরের নেতারা পার্সেন্টেজ দাবি করলেও রেবার ব্যবসার বাধা হয়ে ওঠে না। রেবা পার্সেন্টেজ দেন, সাথে নেতাদের কিছু দায়িত্বও দেন; কাউকে বলেন পাহারা দিতে, কাউকে বলেন, সরকারি বিলবোর্ড তাকে দিয়ে করানোর সুপারিশ করতে। রেবার ব্যবসা দ্রুত বাড়ে। কারো কারো জন্য রেবাও শক্তিশালী সুপারিশকারী হয়ে ওঠেন।

ওদিকে, মিসেস দিরহাম রেবার বন্ধু হয়ে ওঠেন। তিনি তার স্বামীর দিরহাম অ্যাসোসিয়েটস এর প্রধান লবিস্ট। দিরহাম অ্যাসোসিয়েটস প্রখ্যাত চলচ্চিত্রকার পল্লব আনসারির ডকু ফিকশন সিরিজ আমাদের নারী যোদ্ধারা ফাইন্যান্স করার সিদ্ধান্ত নেবার পর রেবা নিজে থেকে সেই ডকু ফিকশনের অংশ হয়ে ওঠার আগ্রহ প্রকাশ করেন। দশ বছর বয়সে আটকে থাকা মেয়েটিকেও ক্যামেরাবন্দি করাতে চান। দিরহাম অ্যাসেসিয়েটসের অংশীদার মিসেস দিরহাম ব্যবস্থা করতে রাজি হন। যদিও পল্লব আনসারিকে আগে থেকে কিছু বলে রাখা সম্ভব হয়নি। 

সন্ধ্যা হয় হয়। মিসেস দিরহাম ক্লাবের সামনে গাড়ি থেকে নেমে দেখলেন একটা অটোওয়ালা ক্লাবের সামনে অটো পার্ক করে রেখে কাঁদছে। আহ বা! কিন্তু, ওকে অটোটা সরাতে হবে। ঠিক ওখানেই মিসেস দিরহাম গাড়ি পার্ক করবেন। তিনি পাটের হাতব্যাগ থেকে একটা সুগন্ধি চকোলেট মুখে পুরে অটোওয়ালার সামনে দাঁড়ালেন। মোলায়েম স্বরে অটোওয়ালাকে বললেন, কি হইছে? কান্দো ক্যান?

নৈ-নাঙ্কার হয়া গেল!

মানে?

আমার অটো থাকিয়া নামিয়া ভালো লোকটা বাসে উঠলো, তারপর বাসটাতে আগুন জ্বলিয়া উঠলো। আমি ভয়ে জোরে টান দিয়া এইখানে আসলাম! জলজ্যান্ত একটা মানুষ, আপা।

আহা! এইরকম সময়ে কেউ অটো নিয়া বাইর হয়। যাও, এই তোমারে পাঁচশ টাকা দিলাম। বাজার কইরা নিয়া বাড়ি যাও।

কি যে কন আপা, পাঁচশ টেকা তো অটোর মালিকের হাতেই দেয়া লাগবে। দিনের জমা। গরিবের আবার বাজার।

তো কি, অটো সরানোর জন্য আরও চাও, তাই না? এই হলো তোমাদের মতো গরিব লোকের সমস্যা, যতো পাবা, ততোই চাইতে থাকবা।

চাই নাই তো, আপা। আপনেই দিলেন। আমি তো এইখানে বসিয়াই থাকব। আমি তো আরেক আপাকে নিয়া আসছি। তিনি ভাড়া না দিয়া আমাকে বসায়া রাখি গেইছেন। তিনি আসলেই আমি চলি যাব।

কতো হইছে তোমার ভাড়া?

উনি তো রিজাব নিছেন। ঘণ্টা চারশ। দুই ঘণ্টা তো হইলোই।

এই নাও, আটশ দিলাম। এখন বাড়ি গিয়া কান্দো। আমার জায়গা ছাড়।

অটোওয়ালা জায়গা ছাড়ার জন্য অটোর দরোজা খোলার সময় পুলিশের সার্জন এসে তার অটোর চাবি হাতে তুলে নিলেন। পকেট থেকে ফস করে জরিমানার কাগজ বের করলেন। রাস্তা বন্ধ করে অটো পার্ক করার জন্য ছয়শ টাকা জরিমানা— বললেন সার্জন। অটোওয়ালা সার্জনের পায়ে পড়ে গেলো। হাউমাউ করে কাঁদতে লাগলো। ‘কি কর! কি কর!’ বলতে বলতে সার্জন দুই পা পিছিয়ে গেলেন। অটোওয়ালা একবার মিসেস দিরহামের দিকে চেয়ে মিনতি করলো— আপা, কিছু কন, আপা। মিসেস দিরহাম তখন ক্লাবের পরিচয়পত্র বের করে গলায় ঝোলাতে ব্যস্ত। হ্যান্ডসেটের মিররে নিজের মুখটাও দেখে নিচ্ছিলেন। তখন চতুর্দিক থেকে এষার আজান একযোগে ভেসে আসছিল। জ্যামে আটকে থাকা গাড়িগুলো হর্ণ দিচ্ছিল অস্থিরভাবে। মিসেস দিরহাম অটোওয়ালার কথা শুনতে পেলেন না। অটোওয়ালা সার্জনের পা থেকে উঠে পকেটের টাকা গুনে পনেরশ টাকা সার্জনের হাতে দিয়ে কাঁদতে কাঁদতে চাবি ফেরত দেওয়ার মিনতি করলো। সার্জনের কলম থেমে গেলো। সার্জন জরিমানা লেখা বন্ধ করে ওয়াকিটকিতে ইয়াংকি টুয়েন্টি ওয়ান, ঠিকাছে, ওভার— বলতে বলতে টাকাটা নিয়ে দুমরে পকেটে রেখে চাবিটা ফেরত দিয়ে দিলেন। অটোওয়ালা অটো সরিয়ে নিয়ে রাস্তার আরেক পাশে গিয়ে আবার অটো থামিয়ে রাখলো।

জায়গা ফাঁকা পেয়ে মিসেস দিরহাম তার গাড়ি পার্ক করলেন সেখানে। তাকে বেশ নিশ্চিন্ত দেখাচ্ছে। তার মনটা ভালোই ছিল। পল্লব আনসারি নতুন মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক ডকু ফিকশনে মিসেস দিরহামকে কাস্ট করেছেন— এটা ভালো। দিরহাম অ্যাসোসিয়েটসের এমডি এগ্রিমেন্ট করার আগেই পল্লবকে এ ব্যাপারে বলে দিয়েছেন। ডিরেক্টর হিসেবে পল্লব আনসারির খুব প্রভাব। অনেক নাম-ডাক স্বদেশে বিদেশে। এবারকার ডকুটা প্রডিউস করছে তথ্য মন্ত্রণালয়। কো-প্রডিউসার দিরহাম অ্যাসেসিয়েটস। আসলে লো বাজেটের কাজ খুব একটা করেন না পল্লব। দিরহাম অ্যাসোসিয়েটস রাজি হবার কারণেই তথ্য মন্ত্রণালয়ে প্রজেক্টটা সাবমিট করেছিলেন।

পল্লব ও তার সহকারী একঘণ্টা আগে ক্লাবে পৌঁছেছেন। সহকারীর একহাতে স্টোরি, আরেক হাতে একমগ কফি। পল্লব ক্লাবের দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন। মিসেস দিরহাম দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই পল্লব উঠে এগিয়ে গেলেন, ‘হাল্লো, মিসেস দিরহাম। মাত্র একঘণ্টা লেট, কোনো ব্যাপার না। আল্টিমেটলি এইটা তো আপনারই প্রোডাকশন। দিরহাম অ্যাসোসিয়েটস আগায়া না আইলে তথ্য মন্ত্রণালয়ের ফান্ডে এই ছবি করার সাহস আমি পাইতামই না।’ মিসেস দিরহাম, ‘সরি, ভাইটি’ বলে পল্লবের লম্বা চুলে বিলি কেটে দিলেন; বললেন, ‘আমরা আলাপ শুরু করি। আমার বান্ধবী রেবার কথা বলছিলাম না, অই যে বীরাঙ্গনা রেবা বেগম, বাট তালিকায় নাম নাই— ও অবশ্য চায় না তালিকা-ফালিকায় ঢুকতে— ব্যবসা-ট্যাবসা করতেছে, ওর জন্য একটা ক্যারেক্টার ইনসার্ট কইরো, ভাই। সরি, তোমারে না বলেই ওকে ডেকেছি।’ পল্লব গম্ভীরভাবে বললেন, ‘লেটস সি। আগে স্টোরি লাইন শুইনা লন।’  

.

ডানহাতের আঙুলগুলো গোল করে, লম্বা করে, তর্জনি দিয়ে বাতাসে হিজিবিজি রেখা আঁকতে আঁকতে স্টোরি লাইন প্রেজেন্ট করছেন পল্লব আনসারি।

‘২৫ মার্চের ঘটনার পর আর কোনো উপায় রইল না। বঙ্গবন্ধু ঘোষণা দিয়াই দিলেন— এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। ঢাকার পরিস্থিতি বুঝতেই পারছেন। আর আপনি তো নিজেই তখন দ্যাকছেন সবকিছু।…’ মিসেস দিরহাম থামিয়ে দেন, ‘আরে না, শোনেন ডিরেক্টর, আমার বয়স তখন ১৪। ঘর থাইকা বাড়াইতাম না এক্কেরে। নিষেধ ছিল। আমার বাবা ডা. এনামুল হক তো মুসলিম লিগার ছিলেন। আমরা কিন্তু মনে মনে স্বাধীন বাংলাদেশ চাইতেছিলাম। আমরা দুই বোনের কেউ ঘর থাইকা বাড়াইতে পারতাম না। বাইরের কোনো খবরই জানতাম না আমি। একদিন এক পাকি ছেলে আইলো, আমাদের বাড়িতে থাকলো কয়দিন…’ পল্লব আনসারি থামিয়ে দেন, ‘আগে স্টোরি লাইনটা বুইঝা লন মিস, আপনের হিস্ট্রি পরে শুনুম। আপনেরে নিয়া ধরেন আরেকটা বায়োপিক করুমনে। দিরহাম অ্যাসোসিয়েটস অবশ্যই আপনের স্টোরি ডকুমেন্ট করতে ফাইন্যান্স করব। যাউক, এখন আপনে এইখানে কনসেনট্রেট করেন। এই স্টোরিটা সেলিম সাবরে নিয়া। আপনে সেলিম সাহেবের স্ত্রী। তো, যা বলছিলাম, ২৭ মার্চ আব্দুস সেলিম মুক্তিযুদ্ধে যাবার জন্যে আপনার কাছে বিদায় নিয়া বাড়ি ছাড়লেন। এপ্রিল মাসের শ্যাষের দিকে সেলিম কোচবিহার পৌঁছাইলেন। তারপর ট্রেনিং, যুদ্ধ, আর সব ডকুতে যা হয়, সেইসব। কিছু টিপিক্যাল ফুটেজ তো ইয়ুজ করতেই হইব। এদিকে, সেলিম তার নয়া বউরে, মানে, আপনেরে, কোন পত্র লেখে নাই যুদ্ধে যাবার পর থাইকা। ফলে সেলিম সম্পর্কে এভিডেন্স তেমন নাই। আপনের বাবা বঙ্গবন্ধুর কাছের মানুষ ছিলেন। যুদ্ধ-টুদ্ধ নিয়া তার টেনশন নাই। তার যত টেনশন চা রপ্তানির ব্যবসাটা বন্ধ হওয়া নিয়া। তো, একদিন সুযোগ কইরা তিনি বঙ্গবন্ধুর কাছে গিয়া কইলেন যে, মাইয়ারে ঢাকায় রাখা ঠিক হবে না। জার্মানিতে পাঠাইতে হবে। বঙ্গবন্ধু ব্যবস্থা কইরা দিলেন। আপনে জার্মানি চইলা গেলেন। আপনের বাবা আপনারে এইখানেও একা ছাড়েন নাই। সাথে গেছেন। এই বিষয়টা বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন নাই। যুদ্ধের টাইমে মাইনষের অতো ব্যক্তিগত খবরাখবর জানাটা সম্ভবও না। কিন্তু জার্মান গিয়া আপনে এক ব্লাক পোলার খপ্পরে পড়লেন। ঘরের হিটার ঠিক করতে আইসা সে আপনারে একলা পাইয়া রেপ করলো…’, পল্লবকে থামিয়ে দিয়ে মিসেস দিরহাম বললেন, ‘আরে আমি তো মানে অই যে পাকি ছেলেটা আইল, তো, সে তো আসলে পাক আর্মির এজেন্ট ছিল না, রাজাকার-ফাজাকার, মুসলিম লিগ-টিগ না…।’ পল্লব মিসেস দিরহামকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনে ভুল করতেছেন তো। স্টোরি তো আপনের না। আরেকজনের। মানে মুক্তিযোদ্ধা সেলিমের। আপনে সেলিমের বউয়ের ক্যারেক্টার। বোঝেন নাই? সেলিমের বউয়ের চাইর-পাঁচটা ফটো আমরা নানানভাবে ডেভেলপ কইরা দেখছি। আপনের চেহারার সাথে খুব যে যায়, তা না। এখন সবদিক বিবেচনা কইরা আপনে ক্যারেক্টার হইবেন ঠিক হইছে। আপনের ডায়ালগ তো ডাব হইব। রিয়েল ফিল আনতে হইব একশনে, বুচ্ছেন? আমি তো ধরেন স্টার অ্যাকট্রেস নিতে পারতাম; নেই নাই। আপনেরে নিছি ডকু ডকু ভাব ফুটায়া তুলতে। কিন্তু, মিসেস দিরহাম তো আর থাকতে পারতেছেন না আপনে; আপনে মিসেস সেলিম হয়া যাইতেছেন…।’ মিসেস দিরহাম শান্ত হলেন, বললেন, ‘আমি সরি। একটু আসতেছি। একটা ব্রেক নাও’। তিনি বাথরুমের দিকে যেতেই পল্লব সহকারীর দিকে তাকিয়ে ভ্রু কোঁচকালেন, ‘হালায় আউলা-ঝাউলা! শুট করাই ঝামেলা হইব দেখতেছি।’ সহকারী বললেন, ‘বস, অইদিকে দেখেন, অই মহিলাই রেবা নন তো, মিসেস দিরহামের বান্ধবী?’ পল্লব দরজার দিকে তাকালেন। আশ্চর্য হয়ে গেলেন। বয়স হলেও ছাপ পড়েনি। ফটোজেনিক। এইটারেই তো কাজে লাগানো যাইতো!’ সহকারী হাসলেন, ‘বস, আস্তে কন, প্রডিউসার শুনলে মাইন্ড করবো।’ পল্লব বললেন, ‘হুম’।

ওদিক থেকে মিসেস দিরহাম ফিরে এসে বসলেন। পল্লবের চোখ অনুসরণ করে দরজার দিকে তাকিয়ে হৈ হৈ করে উঠলেন—এ্যাই রেবা, এই, এদিকে, এদিকে। পল্লব রেবাকে সালাম দিলেন। তারপর আবার স্টোরি শুরু করলেন, ‘জার্মানিতে আপনার বাবা সেদিন ঘরে ফিরা আইসা আপনারে দেইখা কনফিউজড হইলেন। কিন্তু আপনে তারে রেপ হওয়ার ব্যাপারটা চাইপা গেলেন। আপনে দ্যাশে ফিরা আসতে চাইলেন। আপনে কইলেন— মেয়ে হইয়া জন্মাইছি, যা হবার দেশেই হোক। আমারে নিয়া চল। এইখানে দম বন্ধ হইয়া মইরা যাব। ফেরার পথে আপনেরা দিল্লি হইয়া কোচবিহার গেলেন। সেলিম সাবরে পাইলেন না। অনেকগুলা ক্যাম্প খুঁজলেন। তারপর, ঢাকায় আইলেন। বঙ্গবন্ধু তখন জেলে, পশ্চিম পাকিস্তানে। আপনের বাবা ব্যবসার টেনশানে ঘর থাইকা বাড়ান না। তো, একদিন আপনের বাবার এক বন্ধু আইল। রাইত তখন একটু বেশি। কারেন্ট নাই। আপনের বাবা ঘুমায়া পড়ছে। আপনাদের কাজের লোকটাও ঘুমায়া পড়ছে। আপনের বাবার বন্ধুরে আপনে দরজা খুইলা দিলেন। বাইরের ঘরে বসাইলেন। তারে কইলেন— আব্বা ঘুমাইতেছে। আপনের বাবার বন্ধু কইল— থাউক, তোমার সাথে কথা কইতেই আমার আসা। আমি খুব বিপদে আছি। আমারে তুমিই বাঁচাইতে পার। আপনে, মানে মিসেস সেলিম, কি কইবেন বুঝতেছিলেন না, এইরকম এক্সপ্রেশন দিলেন। আপনের বাবার বন্ধু কইলো— জামাই বাবার খোঁজ না-দিতে পারলে, মেজর সুলতান আমারে মাইরা ফেলবে। আমি কই গিয়া লুকায়া থাকি, খালি সেই বুদ্ধিটা আমারে দেও, আম্মাজান…।’ মিসেস দিরহাম আবারও পল্লবকে থামিয়ে দিলেন, বললেন, ‘আপনে এই স্টোরিটা বাদ দেন। আমি কই— পাকি ছেলেটার নাম ছিল সাফায়াত। সে তার এক বন্ধুরে কইছিল— সরকার ঠিক করতেছে না। শেখ মুজিব তো ভোটে জিতছে! সেই বন্ধু ছিল ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের ভক্ত। এই কথার জন্য সাফায়াতরে মাইরা ফালানোর হুমকি দিল বন্ধুটা। সাফায়াত ভয় পাইয়া পালায়া ইন্ডিয়া হইয়া পূর্ব পাকিস্তানে আসছিল। আমাদের বাড়িতে আইসা উঠলো। তার সাথে আমার অনেক গল্প হইতো। কিন্তু পাকি পোলাপাইন আসলেই বজ্জাত। একদিন রাইতে আমারে এমনভাবে বোলাইলো…।’ পল্লব আবারও মিসেস দিরহামকে থামিয়ে দিলেন, বললেন, ‘ম্যাডাম, আপনের স্টোরি দিয়া আমারে কনফিউজ কইরেন না। আপনে মিসেস সেলিমের ফিলটা নিয়া আসেন। আপনে ক্যারেক্টার হইয়া ওঠেন। না হইলে পাবলিক তো খাইব না! আপনেরে কাস্ট করছি অনেক বুইঝা-শুইনা। আমারে মাইরা ফেইলেন না।’

পল্লবের সহকারী কফির অর্ডার দিয়েছে। রেবা একটাও কথা না বলে চুপ করে বসে আছেন। পল্লব বললেন, ‘সরি, আপনার সাথে কথা বলা হচ্ছে না।’ রেবা বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি বোঝার চেষ্টা করতেছি স্টোরিটা।’ পল্লব হাসলেন। ততক্ষণে কফি চলে এসেছে। রেবা বললেন, ‘আমি যেইটুক বুঝলাম, এইটার সাথে আমি যাইতেছি না। এইটা তো মিসেস সেলিমের গল্প, তাই না? আমার ব্যাপারটা একেবারেই আলাদা। মানে, আই ওয়াজ রেপড ইন আর্মি ক্যাম্প। কাউরে তো বলি নাই আইজ পর্যন্ত। দিরহাম জানেন। দিরহাম অ্যাসোসিয়েট আমার পার্মানেন্ট ক্লায়েন্ট। তারে কইছি ঘটনা প্রসঙ্গে। আমি ভুইলাই যাইতে চাইছিলাম একাত্তুর-বাহাত্তুর-তিয়াত্তুর-চুয়াত্তুর-পঁচাত্তুর সব। মনে হইলেই আমার হাত-পা ঠাণ্ডা হইয়া আসে। সেইগুলার ছবি তো মাইনষের মন থাইকা হারাইয়া গেছে গা। আপনে দেখাইবেন কেমন কইরা? দেখাইতে পারবেন? শুট করবেন কীভাবে?’ পল্লব হাত তুলে রেবাকে থামিয়ে দিলেন। দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন। রেবা নিজেও বিব্রত হলেন হঠাৎ এভাবে কথা বলে ওঠার জন্য। সহকারী কফির কাপ হাতে পল্লবের দিকে ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকলেন। রেবা বললেন, ‘এক কাজ করতে পারেন, আপনার স্টোরিতে আমারে লিংক করার উপায় একটা আছে। অই যে মিসেস সেলিমের বাবার বন্ধু, তারে রাজাকার আকবর বানান…।’ পল্লব কফির কাপের দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আকবরটা কে?’। রেবা বললেন, ‘একটা রাজাকার, আমার মায়েরে খুন করছে দিনের বেলা।’ পল্লব বললেন, ‘আইজ থাউক, আরেক দিন শুনবোনে। মানে স্টোরিটা তো আমি লেখছি। এখন আপনাদের কেইস ঢুকায়া দেওয়ার রাস্তা নাই। জিনিশটা গুলায়া যাইতেছে। আইজ আসলে সবই থাউক। আমাগো উঠতে হইবো। রেবা বললেন, ‘ঠিকাছে, তাড়াহুরা নাই, শুধু বইলা রাখি, কতজন আমারে ধর্ষণ করছে, সেইটার কোনো হিসাব নাই। যারা বাধা দিতে গেছে, তাদের কারো গলা কাটছে, কারো যৌনাঙ্গ দিয়া বেয়োনেট ঢুকায়া দিছে, কারো স্তন কাইটা দূরে ফালায়া দিছে, কেউ কেউ নিজেই বেয়োনেটের উপর ঝাপায়া পইড়া আত্মহত্যা করছে… এইগুলা দেখাইতে হইবো আমারে নিতে গেলে। এই ছবিগুলা ক্যামনে তুলবেন?’ পল্লব বললেন, ‘শুট করা ব্যাপার না, কিন্তু এত ভায়োলেন্স তো সেন্সরে আটকায়া দিব! আমার তো স্টাডি আছে, পুরা একাত্তুর তো ফুল অব ভায়োলেন্স এক্সট্রিমিজম। এইগুলা দেখানো যায়! ভিউয়াররা সাইকলজিক্যালি অ্যাফেক্টেড হইব। সব দেখাইতেই হবে এমন কোনো কথাও নাই। হিস্ট্রি তো নানাভাবে ন্যারেট করা যায়।’ খালি কফির কাপ দুই হাতের মথে নিয়ে রেবা বললেন, ‘তার মানে বন্দুক-বোমার যুদ্ধ দেখানো গেলেও যুদ্ধের সবটা তো দেখানো যায় না, তাই না? এক্সট্রিমিজম হইয়া যায়!’ পল্লব বললেন, ‘শিগগিরই আবার বসতে হইব। স্টোরি লাইন নিয়া মন্ত্রণালয়ের লগেও বসা দরকার। দেখি কি করা যায়। আইজ টায়ার্ড লাগতেছে আসলে।’ রেবা বললেন— আপনার স্টোরি লাইন বদলায়া ফেলেন। না হইলে, আমারে নিয়া আরেকটা ফিল্ম বানান। আমি ফাইন্যান্স করুমনে। মইরা যাওনের আগে এইটা হইলে শান্তি পাইতাম। আমার মেয়েটারেও ক্যারেক্টার কইরেন। তিরিশ বছর ধইরা ওর বয়স দশ! ভাবতে পারতেছেন? একদিন বাসায় আইসেন। স্টোরি লাইন আমি কইরা দিব।’

পল্লব হাসেন, বলেন, ‘আসব।’

রেবা একটা খালি অটো নিয়ে তড়িঘরি করে চলে গেলেন। রাত হয়েছে। মেয়েটি একা আছে। রেবাদের পাড়ায় প্রতিদিন বোমা ফাটে। বোমার শব্দ শোনার জন্য মেয়েটি না আবার জানালা খুলে দাঁড়িয়ে থাকে! রেবা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।

ক্লাবের বাইরে মিসেস দিরহামের গাড়ির পাশ ঘেষে সেই অটো তখনও দাঁড়িয়ে আছে। অটোওয়ালাকে দেখে মিসেস দিরহাম বললেন, ‘তুমি যাও নাই!’ অটোওয়ালা বললো, ‘না, আপা, টাকাটাই তো বড়কথা না, যিনি আমাকে রিজাব করছেন, তিনি আমাকে না পাইলে তো বিপদে পড়ি যাইবেন। এইখানে অটো পাইবেন কই? তাই খাড়া হয়া আছি।’ মিসেস দিরহাম বললেন, ‘তাহলে আমার কাছ থাইকা টাকা নিলা ক্যান?’ অটোওয়ালা বললো, ‘নিয়া আমার কি লাভ হইছে, আপনে তো জানেন, সেইটা তো পুলিশ নিয়া নিছে।’ মিসেস দিরহাম মেজাজ সামাল দিতে পারলেন না সম্ভবত। অটোওয়ালার গালে চড় কষে দিলেন। আর সঙ্গে সঙ্গে হৈ হৈ পড়ে গেল। আচমকাই তখন লোডশেডিং হলো। অন্ধকারে বেশ কয়েকজন উন্মাদের মতো খিস্তি করতে করতে মিসেস দিরহামের গাড়ির উপর ঝাপিয়ে পড়লো। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই গাড়িটাতে আগুন জ্বলে উঠলো! কোথা থেকে একটা বুম মিসেস দিরহামের মুখের সামনে এসে ঝুলে রইলো। একজন চিৎকার করে প্রশ্ন করলো— ‘এই যে এইসব জ্বালাও-পোড়াও চলতেছে, ম্যাডাম, আপনার কি মনে হয়, বিরোধী দল আসলে কি চায়?’ মিসেস দিরহাম বললেন, ‘আমি কি জানি নাকি এইসব, স্টুপিড।’

প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক পল্লব আনসারি গভীর রাতে দিরহাম অ্যাসেসিয়েটসের এমডিকে ফোন করলেন।

শুনেন ভাই, এই প্রজেক্ট আমি ক্যানসেল কইরা দিতেছি। গল্পটা এলোমেলো হইয়া গেছেগা। গল্পটা আগে দাঁড়াক। পরে কখনও সম্ভব হইলে আপনাদের সাথে কাজ করবো। মিনিস্ট্রির ব্যাপারটা আমি দেখব। সরি, ভাই।

এমডি কোনো প্রতিউত্তর করার আগেই পল্লব ফোন রাখলেন। সহকারীকে বললেন, ‘কাইল সব অ্যাপয়েন্টমেন্ট ক্যানসেল। বোতলটা আন। গেলাস দে। বরফ দিস ইট্টু। একটা ভালো ঘুম লাগবো আইজ।’

গভীর রাতে মিসেস দিরহাম ফোন করতেই মেয়েটি কেঁদে উঠলো।

আম্মু এখনও ফেরেনি। আমার ভয় করছে তো।

আজকেও বোমা ফাটছে?

না, আজকে বৃষ্টিও হচ্ছে না।

আচ্ছা, কাঁদিস না, আমি আসতেছি, তোরে আমার বাসায় নিয়া আসব, আফটার অল, তুই খালি রেবার মেয়ে না, আমারও স্পেশাল চাইল্ড!

মিসেস দিরহাম ফোন রাখার পর মেয়েটি বিছানার উপর ফোন ছুড়ে দিয়ে জানালার পাশে দাঁড়ায়। লোডশেডিং। নিচের দিকে, রাস্তায়, অটোরিকশা, বাস ও গাড়ির তীব্র আলোর অনন্ত জট। অন্ধকার।

অলঙ্করণ : রাজিব রায়

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: