Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ১১

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ১১

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। ডা. সায়ন পাল ।।

আয়নায় নিজেকে দেখতে বড় অদ্ভুত লাগছিল। মাথার কিছুটা অংশে চুলগুলো কামিয়ে দিয়েছে। আমি নাপিতকে বললাম, পুরো মাথাটা কামিয়ে দিন। তারপর ন্যাড়া মাথায় একটা সেলফি তুললাম। সেলফিটা টিটুদাকে ফরোয়ার্ড করলাম। লিখলাম, “তুমি কি এখনো আমাকে ভালোবাসো?”

আধা ঘন্টা হয়ে গেল, টিটুদার কোনো রিপ্লাই নেই। মনটা বেশ খারাপ খারাপ লাগছে। কাল অপারেশন। এমন সময় ফোনে পিং শব্দ শুনে দেখি টিটুদা একটা ছবি পাঠিয়েছে। একী? টিটুদারও ন্যাড়া মাথা কেন? ন্যাড়া মাথা ছবিতে লেখা, “এ কথার মানে কী? আমার টাক পড়ে গেলে  তাহলে তুই আমাকে আর ভালোবাসবি না?”

টিটুদার কাণ্ড দেখে খুক খুক করে হাসছি, পাশের বেডের মাসিমা জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার? হাসছো যে বড়?”

টিটুদার কাণ্ড মাসিমাকে দেখালাম। মাসিমার কাল অপারেশন। ওনার খাদ্যনালী বা ইসোফেগাস ক্যান্সার। মাসিমা বললেন, “অনেক কপাল করে এমন একটি ছেলে পেয়েছো মা। ডাক্তারবাবুর তুলনা হয় না। যেভাবে আমায় চিকিৎসা করলেন যত্ন করে এতদিন, তা আমি কোনদিন ভুলবো না। এবার অপারেশনটা হলে বাঁচা যায়।”

“আপনার ঠিক কী হয়েছিল মাসিমা?”

“কী আর বলব মা? সারা জীবন সংসার নিয়ে থেকেছি, স্বামীর দেখাশোনা, ছেলে মেয়ে মানুষ করা। বলতে নেই তেমন বড় অসুখ বিসুখ আমার কোনদিনই কিছু হয়নি। এমনকি জ্বর সর্দি কাশিও কবে হয়েছে মনে করতে পারি না। অসুবিধে বলতে যা ছিল তা ওই এসিডিটি  আর বুক জ্বালা। তা সেটা কার না থাকে বল? সবাইকে খাইয়ে-পরিয়ে অফিসে স্কুলে পাঠিয়ে খেতে খেতে সেই বিকেল। মাঝে বার বার চা আর বিস্কুট। হঠাৎ মাস ছয়েক হলো দেখি খেতে অসুবিধা হচ্ছে। প্রথমটায় কাউকে কিছু বলি নি। পাউরুটি, এমনি রুটি এগুলো খেতে অসুবিধা হতো, গলায় আটকে যেত।  তারপর দেখি ভাত খেতে অসুবিধা হচ্ছে। ভাত আটকে বমি আসছে। একদিন পুরো ভাত বমি হয়ে গেল। না খেয়ে খেয়ে ওজন কমতে থাকল ।  ব্লাউজ সব ঢিলে। ছেলে এখানে নিয়ে এলো।  তারপর তো ধরা পরল খাদ্যনালী ক্যান্সার। এমন অবস্থা হয়েছিল জল খেতেও কষ্ট হচ্ছিল। এখন তো অনেকটাই ভালো।  রেডিয়েশন আর কেমোথেরাপি দিয়ে এখন সবই খেতে পারি। সিটি স্ক্যান করে বলেছে অসুখটা নাকি আর দেখাই যাচ্ছে না।”

“এ তো খুব ভালো কথা মাসিমা।  তাহলেও অপারেশন করতে হবে?”

“তাই তো বললে ডাক্তারবাবু, তোমার ঐ উনি, ওই দেখো বলতে বলতে হাজির।”  বলে মিটিমিটি হাসছেন মাসিমা ।  

ন্যাড়া মাথা টিটুদা এই টুইন শেয়ারিং রুমটাতে ঢুকলো। গলায় স্টেথোস্কোপ। অনেকটা বুদ্ধিস্ট মঙ্কদের মত লাগছে । বড় শান্ত সমাহিত ।

আমার দিকে একটু হেসে টিটুদা মাসিমাকে জিজ্ঞেস করল “কী, মাসিমা ভয় করছে না তো?”

“তুমি থাকতে আমার ভয় কী? ভয়টয় আমি পাইনে বাবা। যেতে তো একদিন হবেই। তা, তোমরা জোর করে ধরে রেখেছো, কী আর করা?”

“নাতিনাতনির মুখ না দেখে কোথায় যাবেন মাসিমা ?”

মাসিমার মুখে হাসি । “হ্যাঁ বাবা, ঐ একটাই বড় সাধ। আর তো দুটো মাস, তারপরই বউমার ডেট। তোমরা গল্প করো। আমি একটু বাগান থেকে ঘুরে আসি।” মাসিমা টুকটুক করে বাগানের দিকে হাঁটা দিলেন ।

টিটুদাকে বললাম “এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে গেল না? সবাই হাসাহাসি করবে হঠাৎ মাথা ন্যাড়া করে ফেললে!“

টিটুদা বলল, “দাঁড়া দুজনে ন্যাড়া মাথার একটা ছবি তুলি। পরে দেখলে মজা লাগবে।”

সেলফি তোলা হয়ে গেলে  টিটুদাকে বললাম, “এই মাসিমা কী সাংঘাতিক পজিটিভ মনের মানুষ! ওনার সঙ্গে থেকে আমার ভয়-ডরগুলো সব কেটে গেল। উনি ঠিক হয়ে যাবেন?”

“খাদ্যনালীর ক্যান্সার একটু খারাপ ধরনের ক্যান্সার। তবে ওনার ক্যান্সারটা বেশি ছড়ায় নি। তাছাড়া কেমো আর রেডিওথেরাপিতে খুব ভালো রেসপন্স হয়েছে। এবার অপারেশনটা ভালয় ভালয় হয়ে গেলে আশা করছি উনি অনেক দিন সুস্থ থাকবেন।”

“উনি তো বললেন একমাত্র এসিডিটি ছাড়া ওনার কোন সমস্যাই ছিল না, কোন নেশা ও নেই।  ওনার কী করে এই ক্যান্সারটা হল ?”

“এসিডিটি বা বুক জ্বালা  যাকে আমরা বলি গ্যাস্ট্রো ইসোফেজিয়াল রিফ্লাক্স ডিজিজ সেটা খাদ্যনালীর ক্যান্সারের অন্যতম কারণ। বিশেষ করে খাদ্যনালী আর পাকস্থলীর সংযোগস্থল, যাকে আমরা গ্যাস্ট্রো ইসোফেজিয়াল জংশন বলি সেই অংশের ক্যান্সারের কারণ। অনেকদিন ধরে পাকস্থলীর এসিড খাদ্যনালীতে উঠে এলে, যাকে আমরা রিফ্লাক্স বলি, খাদ্যনালীর ওই অংশটাতে ক্যান্সার সৃষ্টি হতে পারে। এছাড়াও সিগারেট খাওয়া, মদ খাওয়া্‌ অতিরিক্ত মসলাদার খাবার খাওয়া, শুকনো লঙ্কা- এগুলিও খাদ্যনালীর ক্যান্সারের কারণ।”

“এ তো ভারি সাংঘাতিক ব্যাপার। বহু মানুষেরই তো এই সমস্যাটা থাকে।”

“হ্যাঁ তা তো থাকেই। সে ক্ষেত্রে সাবধান হতে হবে। ওষুধ খেতে হবে এবং পরীক্ষা করে দেখতে হবে যে কোন ধরনের পরিবর্তন খাদ্যনালীতে হয়েছে কিনা। এন্ডোসকপি করে এই জিনিসটা বোঝা যায়।”

“একে প্রতিরোধ করা যায় না?”

“যে খাদ্যনালীর ক্যান্সারটা রিফ্লাক্স বা এসিডিটির জন্য হয় তাকে তো প্রিভেন্ট করা যায়। মানে ঝাল মসলা না খাওয়া, মদ সিগারেট এগুলো না খাওয়া, নিয়মিত এক্সারসাইজ করা শরীরের ওজন কম রাখা- এগুলো করলে অনেক ক্ষেত্রেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।”

“এর চিকিৎসা কী টিটুদা?”

“মূলত নির্ভর করে ক্যান্সারটা খাদ্যনালী কোন জায়গায় হয়েছে , মানে যদি ওপরের এক-তৃতীয়াংশে হয় মানে গলার আর বুকের সংযোগস্থলের জায়গায়  তাহলে কেমোথেরাপি রেডিও থেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করা হয় ।  যদি মাঝখানে হয় তাহলে কেমোথেরাপি রেডিওথেরাপি ও অপারেশন এই তিনটে  পদ্ধতি ব্যবহার করা হয় । আর একদম নিচের এক-তৃতীয়াংশে আর পাকস্থলীর সংযোগস্থলে  ক্যান্সার হলে প্রথমে রেডিওথেরাপি কেমোথেরাপি তারপর অপারেশন করা হয় । এখন কিছু নতুন রিসারচ ডেটা বলছে  কোন কোন ক্ষেত্রে অপারেশনের আগে ও পরে শুধু কেমোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করা সম্ভব । সমস্ত ক্যান্সারের  যা নিয়ম অসুখটা তাড়াতাড়ি ডায়াগনোসিস করতে হবে ।খেতে অসুবিধে হলেই একবার ডাক্তার বাবুর পরামর্শ নেওয়া উচিত অবহেলা না করে। “

“টিটুদা কাল তুমি আমার অপারেশনের সময় থাকবে তো?”

“আমি তো সব সময় তোর সঙ্গেই আছি। তাছাড়া ডাক্তার মজুমদার খুবই ভাল সার্জন। আমার মনে হয় আমি অপারেশন থিয়েটারের বাইরে অপেক্ষা করব। আমি চাই না আমার উপস্থিতি কোনোভাবে ডাক্তার মজুমদারকে বেশি সতর্ক করে দেয়। উনি ওনার কাজটা নরমালি বেশি ভালো করতে পারবেন।”

“তুমি যেটা ভালো বুঝবে। একটু একটু টেনশন হচ্ছে।”

“ধুস টেনশনের কী আছে? এসব অপারেশন এখন জলভাত। ডাক্তার মজুমদার রোজ তিনটে চারটে করে করছেন।”

“আমাকেও কি রেডিয়েশন দিতে হবে?”

“সেটা নির্ভর করছে অপারেশনের পর প্যাথলজি রিপোর্টের উপর।”

“টিটুদা একটা কথা তোমাকে আজ বলতে চাই। আমার জীবনে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি তোমার ভালোবাসা।”

“হঠাৎ এসব বলছিস কেন?”

“যদি কাল আর বলার সুযোগ না পাই?”

টিটুদা আমার মাথাটা ওর বুকে চেপে ধরে বলল, “ধুর পাগলী আমি থাকতে যমের বাবারও সাধ্য নেই আমাদের আলাদা করে। ইউ উইল বি ফাইন। আমি আছি তো তোর সঙ্গে সব সময়।”

ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখছেন উত্তরকালে

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: