Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ১০

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ১০

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। ডা. সায়ন পাল ।।

মুখের ওপর একটা ফ্রেম লাগানো। আমাকে নিয়ে এমআরআই-এর টেবিলটা ধীরে ধীরে বিরাট গোল রিং-এর মতো এমআরআই মেশিনের মধ্যে ঢুকে গেল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা টিটুদার মুখটা দূরে সরে যেতে যেতে ধীরে ধীরে ঢাকা পড়ে গেল মেশিনের পেছনে।

এই বিরাট গোল গহ্বরে এখন আমি সম্পূর্ণ একা। মেশিন চালু হলে বিচিত্র সব আওয়াজ কানে আসতে লাগলো। মনটাকে শান্ত করার জন্য আকাশ-পাতাল নানান কথা ভাবতে লাগলাম। ছেলেবেলার নানান ঘটনা ঘুরে ফিরে আসছে।

একদিন স্কুল থেকে ফিরেছি। বাস থেকে নেমে বাড়ির গলি দিয়ে হেঁটে চলেছি। এমন সময় আমাদের পাড়ার নেড়ি লালু হঠাৎ চিৎকার শুরু করলো। প্রচণ্ড ভয় পেয়ে দৌড়াচ্ছি বাড়ির দিকে। এমন সময় দেখি টিটুদা একটা  ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে মাঠের দিকে যাচ্ছে। দৌড়ে পেছনে গিয়ে ওর টি শার্ট খামচে ধরেছি। টিটুদা হো হো করে হাসছে, বলছে, “ছাড়, ছাড়। কাতুকুতু লাগছে। লালুকে ভয় পাওয়ার কী আছে?”

ভয়ে আরো জাপ্টে ধরেছি টিটুদাকে। লালু এমন পাজী! এতক্ষণ ঘেউ ঘেউ করতে করতে আমার পিছু পিছু দৌড়ে আসছিল। টিটুদাকে দেখে কুঁইকুঁই করে ওর পায়ে মুখ ঘষতে লাগলো।

টিটুদা বলল, “আরে, এ তো আমার পোষা কুকুর। রোজ রাতে ওকে খেতে দিই তো। লালুকে কেউ ভয় পায়?”

আমি বললাম, “প্লিজ ওকে সরাও।“

টিটুদা একদিকে লালু আর একদিকে আমাকে নিয়ে আমার বাড়ি অবধি ছেড়ে দিয়ে এলো। গোটা রাস্তা আমি খামচে ধরে রাখলাম টিটুদার হাত। অনুভব করলাম টিটুদার হাতের মাংসপেশী শৈশবের  কোমল অবয়ব ছেড়ে বলিষ্ঠ পুরুষালি হয়ে উঠছে।

হঠাৎ আলো জ্বলে উঠলো। মেশিন থেকে বিদঘুটে আওয়াজ বন্ধ। আমাকে শুদ্ধ টেবিলটা এমআরআই মেশিন থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো। মুখের   ফ্রেমটা সরাতে টিটুদাকে দেখতে পেলাম ।

জিজ্ঞেস করলাম, “কিছু বুঝতে পারলে এমআরআইতে ?”

টিটুদা বলল, “ব্রেনটা তো আছে দেখলাম! আমি তো ভেবেছিলাম খালি  দেখব!“

টিটুদাকে একটা রাম চিমটি দিয়ে বললাম, “ইয়ার্কি হচ্ছে? সত্যি করে বলো না ব্রেইন এ কিছু আছে?”

টিটুদা এবার সিরিয়াস হয়ে বলল, “তুই ড্রেস চেঞ্জ করে আমার রুমে গিয়ে একটু বস। আমি রেডিওলজিস্ট-এর সাথে কথা বলে আসছি।”

টিটু দার রুমে  গিয়ে বসলাম। হাসপাতালে কাজকর্ম সবে শুরু হচ্ছে। রোগীর ভিড় ধীরে ধীরে বাড়ছে। টিটুদা সকাল বেলার জগিং ট্রাকসুট পরেই চলে এসেছে। বাড়ি গিয়ে ওকে আবার তৈরি হয়ে আসতে হবে। খানিক পর টিটুদা সঙ্গে আরেকজনকে নিয়ে রুমে এলো। আমার সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বলল, “ইনি ডক্টর গুপ্তা, আমাদের সিনিয়র রেডিওলজিস্ট। উনি তোর এমআরআইটা ভালো করে দেখেছেন। এমআরআইতে একটা ফাইন্ডিং আছে।“

আমি বললাম, “আমাকে সব খুলে বল। কিছু গোপন করো না।“

টিটু দা বলল, “অবশ্যই বলব। তোর ব্রেনে একটা টিউমার আছে। সেই টিউমারটা এমআরআইতে দেখে মনে হচ্ছে গ্লায়োমা।”

“এইটা আবার কী ধরণের ব্রেইন টিউমার? এটা কি ক্যান্সার?”

“গ্লায়োমা একটা খুবই কমন ব্রেইন টিউমার। এটা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যাকে আমরা বলি টিউমার গ্রেড। লো অথবা হাই গ্রেড। গ্রেড ওয়ান থেকে গ্রেট ফোর।  গ্রেড ওয়ান ও টু-এর ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ কিওর হওয়ার সম্ভাবনা খুবই বেশি। গ্রেড থ্রি-এর ক্ষেত্রে অতটা ভালো না হলেও খুব একটা খারাপ নয়। কিন্তু গ্রেড ফোর, যাকে আমরা গ্লায়ব্লাস্টমা মাল্টিফরমি বলি, তার সেরে যাওয়ার হার ততটা ভাল নয়। যদিও উন্নত নিউরো সার্জারি, উন্নত রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপির উন্নতিতে গ্রেড ফোর  টিউমার রোগীকেও অনেকদিন সুস্থ রাখা সম্ভব হচ্ছে ।“

“আমার কি গ্রেড ফোর?”

এবার ডক্টর গুপ্তা বললেন, “আপনার টিউমারটা এমআরআইতে দেখে লো গ্রেড মনে হচ্ছে। আর সেটা ব্রেইনের এমন জায়গায় আছে, যাতে অপারেশন করা খুব সহজ। যদিও অপারেশনের পর প্যাথলজি রিপোর্ট দেখে সঠিকভাবে বলা সম্ভব টিউমারটা কী ধরনের।“

“আমাকে কি তাহলে অপারেশন করতে হবে?”

টিটুদা বলল “হ্যাঁ একটা অপারেশন করতে হবে। আমার বন্ধু নিউরো সার্জন ডক্টর মজুমদারকে অনুরোধ করবো তোর অপারেশনটা করতে। উনি দেশের অন্যতম সেরা নিউরোসার্জন। তার আগে কাকু কাকিমা কে একবার ইনফর্ম করা উচিত।“

বাবার মুখটা মনে পড়ল। আমি বাবার প্রচণ্ড আদরে মানুষ। একবার সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে একটু পা কেটে গিয়েছিল। তাতে বাবা এমন অস্থির হয়ে পড়ে যে শেষ পর্যন্ত মার বকুনি খেয়ে শান্ত হয়। আমার ব্রেইন টিউমারের খবর পেলে কী করবে ভাবতেই পারছি না।

টিটুদাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কিন্তু টিটুদা আমার তো অল্প অল্প মাথাব্যথা আর এই আজকের খিঁচুনিটা ছাড়া আর কোনো সিম্পটমই ছিল না।“

“ব্রেইন টিউমারের সাধারণত খুব বেশি দিনের সিম্পটম থাকে না। মাথাব্যথা,  শরীরে খিঁচুনি, সারা শরীরে অথবা শরীরের কোনো একটা অংশে, হাঁটতে গিয়ে হঠাৎ পড়ে যাওয়া, মানে ব্যাল্যান্স এর অভাব, হঠাৎ একটা জিনিস দুটো দেখতে শুরু করা, মুখের কোনো অংশ ঝুলে পড়া, চোখের পাতা বন্ধ হয়ে আসা, হঠাৎ অজ্ঞান হয়ে যাওয়া বা শরীরের কোনো অংশে প্যারালাইসিস হওয়া-এগুলো সাধারণত ব্রেইন টিউমারের সিম্পটম।“

“আমার টিউমারটার চিকিৎসা কী?”

“প্রথমেই গ্লায়োমার ক্ষেত্রে টিউমারটাকে কেটে বাদ দিতে হয়।  তারপর তার প্যাথলজিক্যাল রিপোর্টের উপর ভিত্তি করে পরবর্তী পদক্ষেপ ঠিক করতে হয়। গ্রেড ওয়ান-এর ক্ষেত্রে অনেক সময় অপারেশন ভালো হলে কিছু না করলেও চলে।  গ্রেড টু-এর ক্ষেত্রে অধিকাংশ সময়ে অপারেশনের পরে রেডিওথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করতে হয়। গ্রেড থ্রি আর ফোর-এর ক্ষেত্রে অপারেশনের পরে রেডিওথেরাপি, তার সাথে কেমোথেরাপি খাওয়ার ট্যাবলেট এবং রেডিওথেরাপির পর ৬ থেকে ১২ মাস কেমোথেরাপি ট্যাবলেট খেতে হয়। গ্লায়োমা ছাড়াও আরো অন্যান্য অনেক ধরনের ব্রেন টিউমার হয়। সবার চিকিৎসা আলাদা আলাদা। তবে চিকিৎসা মূলত অপারেশন এবং রেডিওথেরাপির মাধ্যমে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছোট টিউমারের বেলায় অথবা অপারেশন সম্ভব না হলে স্টিরিওট্যাকটিক রেডিও সার্জারির মাধ্যমে চিকিৎসা করা হয়। ব্রেন টিউমার সম্পর্কে এখন আমরা অনেকটাই জানি। এখন আমরা টিউমার কোষগুলোর ডিএনএ অ্যানালাইসিস করে বলতে পারি, কোন টিউমারটা কী ধরনের অথবা কতটা মারাত্মক আর সেই অনুযায়ী চিকিৎসা নির্ধারণ করতে পারি। এগুলিকে বলে মলিকুলার মার্কার। ব্রেন টিউমারের চিকিৎসার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। কাজেই নো টেনশন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তোর ট্রিটমেন্ট শুরু করতে হবে।  আমি আজই তোকে ডক্টর মজুমদারের সাথে দেখা করিয়ে নিচ্ছি আর কিছু ব্লাড টেস্ট, যেগুলো অপারেশনের আগে করা জরুরি সেগুলি করিয়ে নিচ্ছি। তারপর সোজা তোদের বাড়ি গিয়ে কাকু কাকিমার সাথে কথা বলতে হবে।“

“আচ্ছা টিটুদা, এই যে আমরা এত মোবাইল ফোন ব্যবহার করছি, সবাই বলছে মোবাইল ফোন থেকে নাকি ব্রেইন টিউমার হয়। আমার কি মোবাইল ফোন থেকে হল ?”

“দেখ, মোবাইল ফোন ব্রেন টিউমারের কারণ হিসেবে কিছু কিছু  রিসার্চ পেপার পাবলিশ হয়েছে। এইসব গবেষণাপত্রে মোবাইল ফোন ব্যবহারকে  ব্রেন টিউমার বা ব্রেইনের ক্যান্সার হওয়ার কারণ বলা হচ্ছে। তবে এর বিরুদ্ধ মতও আছে। অনেক রিসার্চ পেপার বলছে, সেটা নাও হতে পারে।  তবে বুঝতেই তো, পারছিস বিরাট বড় টেলিকম ইন্ডাস্ট্রি কখনোই চাইবে না এইরকম একটা ব্যাপার মানুষের গোচরে আসুক। তাহলে মোবাইল ফোনের ব্যবহার ভীষণভাবে কমে যাবে।  তাই যতদিন না নির্দিষ্ট করে কিছু জানা যাচ্ছে, ততদিন আমার মনে হয় মোবাইল ফোনের ব্যবহার সীমিত করা উচিত। এবং সম্ভব হলে তাকে শরীর থেকে দূরে রাখা উচিত। বিশেষ করে বাচ্চাদের ক্ষেত্রে।“ হাতে এমআরআই-এর ফিল্মগুলো, টিটুদা আমাকে নিয়ে চলল ডাক্তার মজুমদারের কেবিনে। বড় অদ্ভুত লাগছে। কখনোই ভাবিনি আমাকেও একদিন পেশেন্ট হয়ে টিটুদার হসপিটালে আসতে হবে। বারবার বাবার কথা মনে হচ্ছে, মার কথা মনে হচ্ছে। সন্তানের এই অসুখের কথা শুনলে জানি না তাদের কী অবস্থা হবে।

ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখছেন উত্তরকালে

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: