Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > মতামত > নিউইয়র্ক বইমেলা : স্বপ্নের চেয়েও বড় যে কাজ

নিউইয়র্ক বইমেলা : স্বপ্নের চেয়েও বড় যে কাজ

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। ফকির ইলিয়াস ।।


নিউইয়র্কে শেষ হলো চারদিন ব্যাপি বইমেলা। ১৪ থেকে ১৭ জুন ছিল এই মেলা। শেষের দিন এটি ছিল ক্ষুদ্র পরিসরে। জুইশ সেন্টারে। প্রথম তিনদিন ছিল পিএস৬৯ স্কুলে। লোক সমাগম ছিল ব্যাপক। বইয়ের ক্রেতা কম, এই অভিযোগ নতুন নয়। তারপরও মেলা হচ্ছে, এটাই বড় কথা।

১৪ জুন ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ স্লোগানে ডাইভার্সিটি প্লাজা থেকে বর্ণাঢ্য র‌্যালির মাধ্যমে শুরু হয় এ বইমেলা। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্থায়ী প্রতিনিধি ও রাষ্ট্রদূত মাসুদ বিন মোমেন, কন্সাল জেনারেল সাদিয়া ফয়জুননেসা, বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজী, কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, আনিসুল হক, নাট্যব্যক্তিত্ব জামালউদ্দিন হোসেন, মুক্তিযোদ্ধা-বিজ্ঞানী-লেখক ড. নূরন্নবী, ভয়েস অব আমেরিকার বাংলা বিভাগের প্রধান রোকেয়া হায়দার, জ্ঞান ও সৃজনশীল সমিতির নির্বাহী পরিচালক মনিরুল হক, প্রকাশক মেসবাহউদ্দিন আহমেদ প্রমুখ।
শিশুসাহিত্যিক এবং চ্যানেল আইয়ের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফরিদুর রেজা সাগরকে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত নিউইয়র্ক বইমেলা ও বাংলাদেশ উৎসব কমিটি আজীবন সম্মাননায় ভূষিত করেছে।

প্রবাসে বাঙালি সংস্কৃতি চর্চায় নিরলসভাবে সহায়তাকারী ওয়ালেদ চৌধুরীকেও আজীবন সম্মাননা দেয়া হয়েছে। বইমেলার তৃতীয় দিন ১৬ জুন সন্ধ্যায় এ সম্মাননা তুলে দেয়া হয় তাদের হাতে। শারীরিক অসুস্থতার জন্য ওয়ালেদ চৌধুরী মেলায় উপস্থিত হতে না পারায়  মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের সভাপতি ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ তাঁর পক্ষে সম্মাননা গ্রহণ করেন।

মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান ড. জিয়াউদ্দীন আহমেদ মেলা শুরুর আগেই বলেছিলেন, জীবনে বই মননে বই হলো আমাদের ২৮তম বই মেলায় স্লোগান। আমরা চাই বাংলা বইয়ের প্রসার হোক সারা বিশ্বব্যাপী। মানুষের জীবনে ও মননে ভালো বইয়ের প্রভাব পড়ুক। আমরা বছর ধরে সবাই মিলে চেষ্টা করি ভালো সব বইয়ের প্রকাশনী যেনো এই মেলায় উপস্থিত থাকে। মানুষ যে সকল লেখকদেরও ভালোবাসে আমরা চেষ্টা করি তাদের মেলায় উপস্থিত করতে। আমেরিকার বিভিন্ন স্টেটসহ অন্যান্য দেশে আমাদের অনুকরণে বই মেলার আয়োজন করছেন। আমাদের সহযোগিতা চেয়েছেন, আমরা বইয়ের প্রসারের জন্য তাদের সহযোগিতা করতে পারছি। আমি মনে করি এটা আমাদের একটি বড় অর্জন।

এবারের আয়োজনে ছিল ‘কবিতার নবীন’ কণ্ঠ নামে শিশু কিশোরদের কণ্ঠে অভিবাসী কবিদের কবিতা আবৃত্তি অনুষ্ঠান।সঞ্চালনায় ছিলেন ছড়াকার মনজুর কাদের। সাহিত্য ও স্যাটায়ার নিয়ে কথা বলেন আহসান হাবীব। রবীন্দ্রনাথের বৃক্ষ-ভাবনা নিয়ে কথা বলেন মোকারম হোসেন।

ডায়াসপোরা সাহিত্য নিয়ে উন্মুক্ত আলোচনা অনুষ্ঠান। এতে অংশ নেন হাবিবুল্লাহ সিরাজী, ফকির ইলিয়াস, নাজমুন নেসা পিয়ারী ও শাহাব আহমেদ। অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ‘ঘুংঘুর’ লিটলম্যাগাজিনের সম্পাদক হুমায়ুন কবীর।

এ বছরের মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার দেয়া হয়েছে কথাসাহিত্যিক দিলারা হাশেম কে। তাই বিস্ময়ের চেয়ে তাঁর আনন্দ ছিল বেশি। তাঁর গলায় উত্তরীয় পরিয়ে দেন আরেক কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন। ক্রেস্ট তুলে দেন বইমেলার আহ্বায়ক নজরুল ইসলাম। আর পুরস্কারের অর্থ ২ হাজার ৫০০ ডলারের চেক তুলে দেন গোলাম ফারুক ভূঁইয়া। তাঁর আর্থিক সহযোগিতাতেই এই পুরস্কারের প্রচলন হয়।
সংক্ষিপ্ত ভাষণে দিলারা হাশেম বলেন, অভিবাসী বন্ধু ও প্রবাসী লেখকদের কাছ থেকে পাওয়া এই স্বীকৃতির মূল্য তাঁর কাছে অনেক বেশি। ‘ঘর মন জানালা’ খ্যাত এই বরেণ্য সাহিত্যিক সেলিনা হোসেনের হাতে হাত রেখে বলেন, বাঙালি পাঠক এখনো তাঁর বই ভালোবাসে, এই সংবাদ তাঁকে কৃতজ্ঞ করেছে।

চতুর্থ লেখক হিসেবে মুক্তধারা-জিএফবি সাহিত্য পুরস্কার সাহিত্য পুরস্কার অর্জন করলেন দিলারা হাশেম। এর আগে এই পুরস্কার পেয়েছেন কবি নির্মলেন্দু গ‌ুণ, প্রাবন্ধিক শামসুজ্জামান খান ও বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ।

এই যে কাজগুলো হচ্ছে, তা অভিবাসীদের স্বপ্নের চেয়ে বড় কাজ।কিন্তু তা ম্লান করে দিতেও তো তৎপর রয়েছে একটি মহল। এই বইমেলা উপলক্ষেই হুমায়ন কবির সম্পাদিত ‘ঘুংঘুর’, হাবিব ফয়েজি সম্পাদিত ‘মেগালিথিক’ ও ‘পঞ্চায়েত’ নামে তিনটি লিটল ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছে। এতে দেশে বিদেশে ছড়িয়ে থাকা লেখকদের লেখা স্থান পেয়েছে।

মেলার শেষ দিন সোমবার বইয়ের বইয়ের বিশেষ মূল্যহ্রাস করা হয়েছিল। এই সুযোগটি লুফে নিয়েছিলেন অনেক পাঠক। তাই শেষ বেলায় বই কেনার ধুম দেখা গেছে। বাংলাদেশসহ পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা লেখক, প্রকাশকদের সঙ্গে উত্তর আমেরিকায় বসবাসরত লেখক, পাঠক, প্রকাশকদের এই কয়েক দিনে দেখা, পরস্পর কুশল বিনিময়, আলাপচারিতা, অটোগ্রাফসহ বই ক্রয়-বিক্রয়, নিজের লেখা বই উপহার হিসেবে বিনিময় করতে গিয়ে তৈরি হয়েছে এক অনাবিল বন্ধুত্ব। এ ছাড়া সাহিত্য সেমিনার, বিভিন্ন সাহিত্য অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান উপভোগ, প্রাতরাশ, দুপুরের খাবার ও চা-পর্বে আনন্দময় সময় অতিবাহিত করতে গিয়ে যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল তাও অনেককেই নস্টালজিক করে তুলেছিল শেষ দিনে। মেলার শেষে অনেককেই দেখা গেছে কার্ড ও ফোন নম্বর বিনিময় করতে। এভাবেই বইমেলা দূরকে কাছের, পরকে আপন করে তোলে প্রতি বছর। চার দিনের এই মিলনমেলা যেন এক টুকরো বাংলাদেশ হয়ে উঠেছিল নিউইয়র্কের বুকে।

ঢাকা থেকে আগত কালি ও কলমের সম্পাদক বেঙ্গল পাবলিকেশনসের কর্ণধার আবুল হাসনাত বলেছেন, এই যে নিউইয়র্কে এসে আমরা বাংলা ভাষায় কথা বলছি, বইমেলায় বাংলা ভাষায় রচিত বই বিক্রি হচ্ছে এটাই তো আমাদের জন্য বিশ্ব জয়ের শামিল। যেভাবে বইমেলাকে কেন্দ্র করে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে, মেলার প্রসার ঘটছে এটাকে একটা মাইলফলক হিসেবে চিহ্নিত করা যায়। মা-বাবার হাত ধরে যে নতুন প্রজন্ম আজ মেলায় আসছে, ভবিষ্যতে এরাই প্রবাসে বাংলা ভাষাকে বাঁচিয়ে রাখবে। আমাদের সংস্কৃতি চর্চায় এটা নতুন মাত্রা তৈরি করবে বলে আমার বিশ্বাস।

মেলা কেমন হলো এই প্রশ্নের জবাবে আবুল হাসনাত বলেন, মেলা খুব ভালো হয়েছে। প্রায় ২০ টির মতো প্রকাশনা সংস্থা মেলায় অংশ নিয়েছে। নানা ধরনের, বিভিন্ন লেখকের বই এসেছে। এটা একটা ইতিবাচক দিক। পাঠক নতুন নতুন বই ও বিখ্যাত লেখকদের পাশাপাশি নতুন লেখকদের সঙ্গেও পরিচিত হওয়ার সুযোগ পাচ্ছে। তবে গতবারের তুলনায় বই বিক্রি কিছু কম হলেও সার্বিকভাবে ভালো। আমি হতাশ নই,আনন্দিত।

এটা খুবই আনন্দের কথা, বিশ্বজিত সাহা ও মুক্তধারা আমাদের এই পঁচিশ বছরে এসব গুণীজনের সান্নিধ্য পাবার সুযোগ করে দিয়েছে। অভিবাসী প্রজন্মের হাতে লেগেছে এসব মহান মানুষের হাতের পরশ। সময় এসেছে অভিবাসী লেখকদের মূল্যায়ন করার। যেসব বাঙালি লেখক উত্তর আমেরিকায় বাংলা ভাষায় লেখালেখি করেন তাদের সম্মান জানাবার। অনুষ্ঠানিকভাবে সম্মান জানানো যেতে পারে আমেরিকায় জন্ম নেয়া প্রজন্মকে, যারা ইংরেজি ভাষায় লেখালেখি করছে।
বাংলা ভাষার চেতনা এবং বইমেলাকে উত্তর আমেরিকার বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে ছড়িয়ে দেয়ার জন্য আরো তৎপরতা বাড়াবার সময়টিও এসেছে এখন। আশার কথা ২৩,১৪ জুন ২০১৯ ওয়াশিংটন ডিসিতে দুইদিন ব্যাপি বইমেলা হচ্ছে।
বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের বড় বড় সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো এই বইমেলার স্পনসর হতে পারে। তারা নিজ নিজ স্টেটে সম্মিলিতভাবে গ্রীষ্মকালীন সময়ে মুক্তধারা ফাউন্ডেশনের ছত্রছায়ায়  বইমেলা করতে পারেন বিভিন্ন উইকএন্ডে। আমি প্রস্তাব করি, ২০১৯ থেকেই এই জকাজটি শুরু হোক। ২০২০ সালের জন্য বিষয়টি বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যের সংগঠনগুলোর কাছে প্রস্তাব আকারে পাঠানো হোক মুক্তধারার পক্ষ থেকে। একটি সমন্বয় কমিটি করে বিভিন্ন স্টেটে তৎপরতা শুরু করা হোক।

এবারের বইমেলায় অন্তরঙ্গ কথা বলেছি বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক কবি হাবীবুল্লাহ সিরাজীর সাথে। তিনি বলেছেন, অভিবাসী লেখকদের জন্য ‘সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সাহিত্য পুরস্কার’টির জন্য নতুন করে নীতি নির্ধারিত হচ্ছে। তা শেষ হলেই তা পুনরায় শুরু হবে। আমি মনে করি নিউইয়র্কের বইমেলাকে বাংলাদেশ সরকারেরও পৃষ্ঠপোষকতা করা দরকার।কারণ বিদেশে যে বাঙালী প্রজন্ম গড়ে উঠছে, তাদের শিকড় ধরে রাখতে সরকারেও একটি বড় দায়িত্ব আছে।


ফকির ইলিয়াস যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশি কবি


সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: