।। ডা. সায়ন পাল ।।

মোটাসোটা বয়স্ক জার্মান ভদ্রলোকের হাত লেগে টিটু দার হাতটা একটু কেঁপে গেল। তার ফলে টিটুদার  হাতে ধরা গ্লাস থেকে একটু অ্যাপল জুস ছলকে ওর ট্রাউজারের উপর পরল। ভদ্রলোক ‘স্যরি’ বলে তড়িঘড়ি ওয়াশ রুমের দিকে ছুটলেন।

অস্ট্রিয়ান এয়ারলাইন্সের ভিয়েনা থেকে দিল্লিগামী ফ্লাইটে আমরা চলেছি ঘণ্টাখানেক হলো। এর মধ্যেই ভদ্রলোককে একাধিকবার ওয়াশরুমে ছুটতে  হয়েছে। মজা করে টিটুদাকে বললাম, “বেশি হটডগ খেয়ে নিশ্চয়ই পেট খারাপ হয়েছে।”

টিটুদা বলল, “না, আমার অন্যরকম মনে হচ্ছে।”

“কী মনে হচ্ছে?”

টিটুদা বলল, “বয়স্ক পুরুষ মানুষের সাধারণ যে সমস্যাটা হয়। প্রোস্টেটের সমস্যা।”

ইতিমধ্যে এয়ার হোস্টেসদের ফুড ট্রলি পাশ কাটিয়ে ভদ্রলোক টিটুদার পাশের আইল সিটে এসে বসলেন। মুখে চোখে অপ্রস্তুত ভাব। অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে ইংরেজিতে বললেন, “আমি অত্যন্ত দুঃখিত কিছু মনে করবেন না। আমার প্রোস্টেটের প্রবলেম আছে তাই বারবার ওয়াশরুম যেতে হয়। আপনার ট্রাউজারটা নষ্ট হয়ে গেল।”

ততোধিক বিনয়ের সাথে বলল, “না না কিছুই নষ্ট হয়নি। আপনি খামোখা লজ্জিত হচ্ছেন।”

দুজন আর কিছুক্ষণ কথাবার্তার পর ভদ্রলোক কানে হেডফোন গুঁজে সামনে ডিসপ্লেতে একটা সিনেমা দেখতে শুরু করলেন।

আমি টিটুদাকে বললাম, “এই প্রোস্টেট সমস্যাটা কী ব্যাপার? অনেকেরই হয় বলে শুনি।”

প্রোস্টেট হল একটা গ্ল্যান্ড যেটা ইউরিনারি ব্লাডার বা মূত্রথলি আর ইউরেথ্রা বা যে রাস্তা দিয়ে ইউরিন বেরোয় তার মাঝে থাকে। এই ইউরেথ্রার কিছু অংশ আবার প্রোস্টেটের মধ্যে দিয়ে যায়। এবার বয়স হলে শরীরে হরমোনের পরিমাণের তারতম্যের কারণে এই প্রোস্টেট গ্ল্যান্ড আকারে বৃদ্ধি পায়। যার ফলে এটা ইউরেথ্রা মূত্রনালীর উপর চাপ সৃষ্টি করে যার ফলে বিভিন্ন ধরনের অসুবিধা দেখা যায় যাকে আমরা বলি লোয়ার ইউরিনারি ট্রাক সিম্পটমস।”

“এটা থেকে ক্যান্সার হতে পারে?”

প্রোস্টেটের টিউমার অথবা প্রোস্টেট বড় হয়ে যাওয়া- এটা সাধারণত দুরকমের হয়। একটা হলো, বয়সজনিত কারণে হরমোন লেবেলের তারতম্যের জন্য প্রোস্টেট বড় হয়ে গেলে, যাকে আমরা বলি বিনাইন প্রোস্টেটিক হাইপারট্রফি। আবার প্রোস্টেটের ক্যান্সার হলেও অনেকটা একই ধরনের সিম্পটমস হয়। প্রোস্টেট ক্যান্সার ও মূলত বয়স্ক পুরুষদের হয় এবং এটাও মেল হরমোন বা অ্যান্ড্রোজেন এর ওপর ডিপেন্ডেন্ট। একটি খুবই কমন ক্যান্সার এবং বলা হয় একজন পুরুষ মানুষ যদি ৯০-১০০ বছর বাঁচে, তবে প্রায় সবারই প্রোস্টেট ক্যান্সার হতে পারে।“

“এর সিম্পটম কী কী?”

“সিম্পটমস মূলত ইরিটেশন অথবা অবস্ট্রাকশন এর জন্য হয়। বারবার মূত্র ত্যাগের প্রয়োজন, পরিষ্কারভাবে মূত্রত্যাগ না হওয়া এবং মনে হয় যে ইউরিন ক্লিয়ার হলো না, আবার মূত্রের বেগ এতটাই যে কন্ট্রোল করা মুশকিল এবং জামা কাপড় নষ্ট হয়ে যাওয়া, রাত্তিরে বারবার মূত্র ত্যাগ করার প্রয়োজন হওয়া। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ইউরিন বন্ধ হয়ে যাওয়া, বারবার ইউরিনারি ট্রাক্ট ইনফেকশন হওয়া। এগুলোই মূলত সিম্পটমস।”

“এই ক্যান্সারটা আরলি ডায়াগনোসিস করার উপায় কী?”

“সৌভাগ্যবশত একটা পদার্থ পাওয়া যায় রক্তে, যাকে বলে প্রোস্টেট স্পেসিফিক অ্যান্টিজেন বা পিএসএ। পরীক্ষা করলে যদি দেখা যায় তার পরিমাণ বেশি, সেক্ষেত্রে বাকি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে এই ক্যান্সারটা তাড়াতাড়ি ডায়াগনোসিস করা সম্ভব। এই পিএসএকে বলে টিউমার মার্কার।”

“এই ক্যান্সার কি খুব অ্যাগ্রেসিভ?”

“এই ক্যান্সারটার আর একটা ভালো দিক হলো, এটা খুব স্লো গ্রোইং ক্যান্সার। মানে ধীরে ধীরে বাড়ে। সেজন্য একে কিওর করা খানিকটা সহজ। এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে, যেমন ধর খুব আর্লি স্টেজে এই ক্যান্সার রোগীকে নিয়মিত পর্যবেক্ষণে রাখতে পারলে চিকিৎসা খানিকটা দেরিতে শুরু করা যেতে পারে, তবে তা অবশ্যই সঠিক ডায়াগনোসিস এবং স্টেজিং এর পরে। আর অবশ্যই নিয়ম করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা একজন ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের আন্ডারে থেকে করতে হবে।”

“একটু খুলে বলো না।”

“দেখ, এই ক্যান্সারের তিনটে রিস্ক ক্যাটাগরি হয়। লো রিস্ক, ইন্টারমিডিয়েট আর হাই রিস্ক। এই রিস্ক ক্যাটাগরি ডিপেন্ড করে ক্যান্সারটা স্টে্‌ রক্তের পিএসএ লেভেল এবং বায়োপসি রিপোর্টে একটা স্কোর থাকে, যাকে বলে গ্লিসন স্কোর, তার ওপর। এবার সাধারণত লো রিস্ক প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অপারেশন অথবা ব্রাকিথেরাপি মাধ্যমে চিকিৎসা করা যায়।”

“ব্রাকিথেরাপি? মানে টিউমারের ভেতরে গিয়ে রেডিয়েশন দেওয়া?”

“হ্যাঁ। তবে এক্ষেত্রে কিছু রেডিও অ্যাকটিভ আয়োডিন সিডস বা দানা প্রস্টেটের ভেতর পাকাপাকিভাবে ঢুকিয়ে দেওয়া হয় যার থেকে ক্রমাগত low-dose রেডিয়েশন বের হয় আর ক্যান্সার কোষগুলোকে মেরে ফেলে। আর ইন্টারমিডিয়েট রিস্ক, হাই রিস্ক প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে হরমোন ট্রিটমেন্ট দিতে হয় অথবা কেউ যদি হরমোন না নিতে চান তাহলে তার টেস্টিস বা অণ্ডকোষ কেটে বাদ দিলেও হরমোন লেভেল রক্তে কমে যায়, যা ক্যান্সার কোষগুলো বৃদ্ধি বন্ধ করে।”

“এক্ষেত্রে অপারেশন করা যায় না?”

“ইন্টারমিডিয়েট-এর ক্ষেত্রে করা যায়। তবে অপারেশন আর রেডিওথেরাপি চিকিৎসার ফলাফল সমান, তাই অনেকেই অপারেশন না করে অপেক্ষাকৃত ব্যথাহীন চিকিৎসা রেডিওথেরাপি করাতে পছন্দ করেন। আর হাই রিস্ক এর ক্ষেত্রে মূলত রেডিওথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা করা হয়।”

“আর যদি ক্যান্সারটা শরীরে অন্য জায়গায় ছড়িয়ে যায়?”

“মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার এর কথা বলছিস তো? প্রোস্টেট ক্যান্সারের মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সার এর ক্ষেত্রেও রেজাল্ট খুবই ভালো। ব্যথা কমানোর জন্য রেডিওথেরাপি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে যদি মেটাসটেসিস এর সংখ্যা কম থাকে তাহলে প্রোস্টেটে রেডিওথেরাপি এবং এর সঙ্গে অনেকগুলো নতুন নতুন ওষুধ আবিষ্কার হয়েছে যেগুলি খেলে রোগী অনেক বছর সুস্থ থাকেন। এবং এই স্টেজে একটা কেমোথেরাপিও দেওয়া হয়, যেটাও খুবই কার্যকরী। এই নতুন খাবার ওষুধগুলো কয়েক বছর হলো আবিষ্কার হয়েছে এবং যথারীতি প্রমাণিত হয়েছে যে স্টেজ ফোর বা মেটাস্ট্যাটিক ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এই ওষুধগুলো রোগীদের অনেকদিন সুস্থভাবে বাঁচিয়ে রাখতে সক্ষম হচ্ছে। তবে হ্যাঁ ছড়িয়ে যাওয়া ক্যান্সারের ক্ষেত্রে অনেক ধরনের নতুন নতুন সিম্পটমস বা অসুবিধা দেখা দেয় এবং সেগুলোর ক্রমাগত চিকিৎসা করিয়ে যেতে হয়। তবে বাকি সমস্ত ক্যান্সারের মধ্যে তুলনা করলে প্রোস্টেট ক্যান্সারের সেরে যাওয়ার হার অথবা সুস্থ থাকার হার অনেকটাই বেশি। প্রোস্টেট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি, কেমোথেরাপি বা টার্গেট থেরাপি মানে খাওয়ার ওষুধ দিয়ে য়েগুলো বললাম এবং অপারেশনের অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে। রেডিওথেরাপি এখন ইমেজ  গাইডেড রেডিওথেরাপি বা টোমোথেরাপি পদ্ধতিতে করা হয়। অপারেশন এখন রোবটিক সার্জারির মাধ্যমে করা হয্‌ আর খাওয়ার ওষুধগুলোর কথা তো বললামই। সব মিলিয়ে প্রোস্টেট ক্যান্সারের চিকিৎসা একটা সাকসেস স্টোরি।”

“তোমার সাথে থেকে কত নতুন নতুন কথা জানতে পারছি, এই কথাগুলো সাধারণ মানুষের জানা খুবই জরুরি।”

“হ্যাঁ। যেমন ধর বয়স্ক মানুষেরা যদি বছরে একবার পিএসএ পরীক্ষা করান এবং আলট্রাসনোগ্রাফি করান তাহলে অনেক ক্ষেত্রেই অসুখটা খুব তাড়াতাড়ি ডায়াগনোসিস করা সম্ভব। মানে যাকে বলে স্ক্রীনিং। সুস্থ মানুষদের নিয়মিত পরীক্ষা করার মাধ্যমে ক্যানসারকে তাড়াতাড়ি ডায়াগনোসিস করা।”

৭ ঘণ্টা লম্বা জার্নি, ড্রিংকস এবং খাবার শেষ করার পরে এয়ারহোস্টেসরা নিজের নিজের জায়গায় ফিরে গেছেন। ঘড়ির সময়টা ভারতীয় সময়ের সাথে মিলিয়ে নিলাম। টিটুদা বলল, “একটা সিনেমা দেখবি?”

বললাম, “আরতো কয়েকটা ঘণ্টা, তারপর তুমি তোমার কাজে আর আমি আমার ইউনিভার্সিটি তে ব্যস্ত হয়ে পড়ব। আজ রাতটা চলো গল্প করে কাটিয়ে দিই।”

টিটুদা ভারী উৎসাহিত হয়ে বলল, “অবশ্যই, সত্যিই এই সুযোগ কেউ ছাড়ে? তবে আর ক্যান্সার নিয়ে গল্প নয়। তোর যে জিজ্ঞাস্য আবার কালকে বাড়ি ফিরে আলোচনা করা যাবে।”

টিটুদার হাত জড়িয়ে কাঁধে মাথা রাখলাম। টিটুদা আমার গায়ে কম্বলটা ভালো করে জড়িয়ে দিল।  বুঝতে চেষ্টা করলাম ৩৫ হাজার ফুট উচ্চতায়, বিমানের নিয়ন্ত্রিত ঠাণ্ডায় কার উষ্ণতা বেশি? এই কম্বল না টিটুদার সান্নিধ্য?

ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখছেন উত্তরকালে