Loading...
উত্তরকাল > Blog > শিল্প ও সাহিত্য > কবিতার পরিব্রাজক শিবলী মোকতাদির

কবিতার পরিব্রাজক শিবলী মোকতাদির

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। কামরুল বাহার আরিফ ।।

এলোমেলো চুল। বাতাসের সঙ্গে উড়ন্তপনা। রসিকতাও। কখনো হ্যাট বা ক্যাপে মোড়ানো। এই ভাবের ভাবসম্প্রসারণ করাও বেশ কঠিন কাজ। তবে দুই ভাবেই তিনি সমাসবদ্ধ এক কবি। শিবলী মোকতাদির। দুর্ভিক্ষের রাত হাতড়ে কবি আলোর বিস্ময়ে জাগিয়ে ফুটিয়ে তোলেন কবিতার নাইটকুইন! রাত হাতড়ে হাতড়ে কবিতার হাসনাহেনা, রজনীগন্ধার সৌরভ ছড়িয়ে কবিতার চাষাবাদে লিপ্ত হন কবিতার এই সফল চাষি। এই চাষিই রাত-বিরেতের অন্ধকারের পূর্ণতায় অপূর্ণতায় দান সামগ্রীতে পরিবেষ্টিত এক ক্যামেলিয়ার বররূপে বাতেলা গড়লে কামনার তির ছুটে আসে তাঁর মন আর মগজে। আমরা পাই কবিতা।

চাণক্যের বিষ থেকে সুধা, ময়লা থেকে সোনা, আর সর্বব্যাপী জ্ঞানভাণ্ডার থেকে জ্ঞান আহরণ করে কবি নিজেকে সঞ্চিত করেন সুলক্ষণা কবিতা সব। ভ্রমণ থেকে জেনে নেন বিনয়ের সূত্রসমূহ। জেনে নেন এই বৃহৎ সংসারে কত ক্ষুদ্রজন তিনি। কত জ্ঞান পড়ে আছে এই জগৎ সংসারে। এই ভ্রমণ তাঁকে তাঁর অহংবোধকে ভুলিয়ে দেয় নির্মোহভাবে। চোখের পরিধি বাড়াতে নিমগ্ন এই কবি বই আর ভ্রমণকে বেছে নেন। ভ্রমণও এক পাঠশালা। সেই পাঠশালার নিত্য নতুন পাঠে কবির চোখ ও মননশীলতা প্রসারিত হয়। যার প্রতিফলন দেখি তাঁর কবিতার নিত্য যাত্রার নিত্য অভিনবত্বে।

দুঃখ, নৈরাশ্য, ক্ষোভ কবি তার কবিতাতেই প্রকাশ করতে চান। কবিতার সেই ভ্রমণে তিনি কখনোই দরজার খিল এঁটে দিতে চান না। শিল্পিতরূপে তাকে আত্মস্থ করতে চান নিরন্তর। তিনি তাঁর কবিতা জগতকে নিজের একটা আবহ তৈরি করতে সক্ষম হয়েছেন নিজস্বতায়। নিজ চিন্তা ও দর্শনের প্রয়োগে তাঁর ছোট ছোট কবিতাগুলো যেন নতুন এক চাণক্যের চিন্তাধরন বা খনার বচনকে মনে করিয়ে দেয়।

‘খেজুর বেচে ক্ষণে ক্ষণে সামান্য যা হয়

আয়ই বলো, লাভই বলে

দিনান্তে তা ভয়!’

‘মানুষ হলেই মতের প্রশ্ন আসে

ধর্মে-মোড়াকুৎসা এবং কিচ্ছা নদীর ঘাটে

মদের পরে মাতাল যেমন তর্ক বাধায় তাসে!’

‘অঙ্ক করো ধ্বংস করো

যোগের সাথে বিয়োগ সেঁটে দিয়ে

ভাগের ভাগি গুণের মাথায় চড়ো!’

কিংবা,

‘গণিত হলো গণনাবিজ্ঞান

টাকার হিসাব সাধুর কাছে সই

চোরের হাতে টান!’

এ কবিতার ভ্রমণকারীকে কখনো কখনো দক্ষ মাঝিও মনে হয়। যার মনে বৈঠা বারো মাস। ছপাৎ ছপাৎ জলের শব্দ, স্রোতের চলমান কথায় নদীর কাহিনি যেন নদেরে শুনায়ে হয়ে যায় ভাটিয়ালি গান। আপাদমস্তক ধ্যানে ও জ্ঞানে কবিতা নিয়ে শিবলী মোকতাদির কবিতার যাত্রাপথে ভ্রমণ করছেন প্রায় তিন দশকের অধিক। অসংখ্য কবিতার জন্ম দিয়ে বাংলা কবিতার ঘর সংসারের এক গুরুত্বপূর্ণ সদস্য পদে মর্যাদায় আসীন হয়েছেন। আমি তাঁকে যতবার পড়ি, যতবার তাঁর কবিতার ঘরে প্রবেশ করি ততবার তাঁর কবিতার গৃহকে নতুনভাবে, নতুন সাজে, নতুন স্বাদে পেয়ে থাকি। এই যে বারবার নিজেকে গড়া, নিজেকে ভাঙার চেষ্টা সেটা হয়তো কখনো কখনো তাঁকে এলোমেলা মনে হতে পারে, হতে পারে আবহমান কবিতার স্বাদ থেকে কিছুটা ভিন্ন কিংবা হতে পারে তার কবিতার দরজাটা কিছুটা সংকুচিত হয়ে আসছে, প্রবেশ করা দুরূহ হয়ে যাচ্ছে। হতে পারে, কবি পথ থেকে পথের বাঁকে চিহ্ন রেখে নতুন পথে নতুন সঙ্গ নিয়ে, নতুন ভ্রমণের স্বাদ নিয়ে আরো কিছু নতুন চিহ্ন যুক্ত করে চলেছেন। কেউ কেউ ভাবতে পারেন পরিবর্তন বা নতুন নতুন নিরীক্ষার অস্থিরতাও। সেটা সময় বিচার করবে। তবে আমি যেভাবে কবি শিবলী মোকতাদিরকে পাচ্ছি সেটা হলো তাঁর দর্শনগত বাঁক পরিবর্তন, পরিবর্তন বললে পুরোপুরি সঠিক বলা হবে না। বলা যায় দর্শনের গভীরতা, চিন্তার উন্মেষ। নতুন নতুন পাঠের ক্রিয়ায় যে রসায়ন তাঁর মস্তিষ্কে অবারিত খেলে যাচ্ছে সেটার বহিঃপ্রকাশ তিনি কবিতায় ঢেলে দিচ্ছেন। স্বাদে, গন্ধে, সুষমায়, সৌষ্ঠবে, ব্যবহারে, আচরণে তা ভিন্ন ভিন্নভাবে চিন্তার খোরাক যোগাচ্ছে।

কবি জানেন ভ্রমণেও ক্লান্তি থাকে। বনে, পাহাড়ে, সাগরে, মরুভূমিতেও হিসাবের অঙ্ক আছে। সেই অঙ্ক মিলিয়ে নিতে হয়। এই মিলানোর কাজও প্রসারিত চিন্তায় কষতে হয়। সুরাপানে মাতাল হয়ে মরুভূমিতে পড়ে থেকে সারা দিনমানকে শোষণ করে অঙ্ক মেলানো যায় না। সেই ভ্রমণে কবিকেও বিশ্রামে যেতে হয়, ঘটে যাওয়া ভ্রমণের ভাবনাকে মিলিয়ে নিতে। তারপর অঙ্ক মিলিয়ে ফের ভ্রমণ। মানুষ তো জন্ম থেকে মৃত্যু অবধি এক ভ্রমণকারী মাঝি। সব মাঝি ভাটিয়ালি না। সব মাঝি চিত্রকর না, সব ভ্রমণকারী আকাশ দেখে না, জ্যোতির্বিদ নয়, সব মাঝি সমুদ্র গভীরে বৈঠা বাইতে পারে না। সব মাঝির মধ্যে ইন্দ্রিয়ভূত ঢেউ অনুভূত হয় না। আমাদের এই কবির কবির সেই অনুভব, অনুভূতি প্রখর।

কবিতা সম্পর্কে কবির নিজস্ব ভাবনা আছে। সেটাও তার লব্ধ উপলব্ধি থেকেই। ‘কবিতাকে হওয়া উচিত—যেমন, সুঠাম নারীর নগ্ন কোমরের মতো তীক্ষ্ম—তেমনি, প্রশস্ত নিতম্বের মতো দায়িত্বশীল। লোভনীয় টকের রসায়নে রসসিক্ত প্রকৃত কবিতা, যেন—জল আসা জিভের জৈব হন্তারক। প্রকৃত কবিতার সমস্ত ভূগোলজুড়েই ছড়িয়ে থাকে অনাকাক্সিক্ষত সঙ্গমে সাড়া দেওয়ার ন্যায় চরম এক উত্তেজনা। গৃহযুদ্ধের দেশে যেমন অতর্কিত ঘুমের মাঝেও জেগে থাকে অতি বিপ্লবীরা…’

আবার তিনি বলছেন, ‘প্রকৃত অর্থে কবি হবেন বহুদিশাময়। ঝরনার মতো অনর্গল ঝরবে তার কলম থেকে শব্দের ফুলঝুরি। তিনি হবেন বিস্তৃত। দেখায়, ভাবনায়, স্পর্শেবর্ণে হবেন বহুমাত্রিক লীলাময়। কবিতা কখনোই হুট করে লেখার বিষয় নয়। টাটকা বীজসত্তা নিয়ে প্রথমে তাকে কবির গর্ভেই পুষ্ট হতে হয়। সময় হলে সে জানান দেবে। ঠিক তখনই কবি তার আপন ভাষায়, নিজস্ব ডিক্সন দিয়ে পৃথিবীর আলো বাতাসে ছাড়ার অনুমতি দিয়ে করবে তার আত্মপ্রকাশ।’

পঞ্চাশ পূর্ণ কবি আজ পরিপূর্ণ। কবিতার প্রতি তাঁর কমিটমেন্টটা ঈর্ষণীয়। এই কমিটমেন্ট, সততা, একাগ্রতা আর নিরবচ্ছিন্নতা শিবলী মোকতাদিরকে দশকের উর্ধ্বে উঠে সর্বজনীন করেছে। তাই সবশেষে বলতে হয়, কবির ভাষায় ‘কবিতা পাগলামী বা প্রলাপ’ এ কথায় একমত হওয়া যায় না। কবিতা সিরিয়াসনেস অবশ্যই। সেই সিরিয়াসনেস নিয়েই কবি আরো আরো ফুল ফুটিয়ে সেই ফুলের সৌরভ ছড়িয়ে দিন বাংলা কবিতার পরতে পরতে। আমরা পাঠক হয়ে তাঁর সেই সব কবিতার সুরা পান করে নিরন্তর মাতাল হবো। শুভ পঞ্চাশ। শুভম। কবি ও কবিতার জয় হোক।

আলোকচিত্র : রাজা সহিদুল আসলাম

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: