Loading...
উত্তরকাল > Blog > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ৭

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ৭

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। ডা. সায়ন পাল ।।

একদিকে দানিউব নদী, অন্যদিকে নিউ দানিউব বা ডনিউ ক্যানাল। মাঝখানে একটুকরো সবুজ মায়াময় দ্বীপ ডনিউসেল। একদম কচিকাঁচারা দোলনা, স্লাইডে খেলছে। তাদের কলরবে মুখর একদিক তো অন্যদিকে শান্ত নদীর পারে প্রৌঢ় মানুষটি রোদ্দুরে পিঠ দিয়ে প্রিয় বইতে মগ্ন। আবার খানিক দূরে ভালবাসাবাসিতে চলছে যৌবন উদযাপন।

রকমারি ফুল আর বাহারি গাছের সারি। চারিদিকে রঙের উৎসব। তবে সবুজের ছোঁয়াই বেশি। একটা ঘোরের মধ্যে বসেছিলাম কতক্ষণ জানি না। মনে পরে যাচ্ছিল ছেলেবেলার উত্তরবাংলা। এমনই শীতের দুপুর, রোদে পিঠ ঠেকিয়ে গল্প করতে বসা পাড়ার কাকিমা-জ্যেঠিমারা; বারান্দায় ইজিচেয়ারে ঘুমিয়ে ঠাকুরদা, বুকের ওপর রাখা খবরের কাগজ, চোখে চশমা। পাশের বাড়ির দিদা ডালের বড়ি দিচ্ছেন উঠোনে। দোতলার ঘরে বিছানায় শুয়ে জানালা দিয়ে ঘুম চোখে চেয়ে দেখছি রাশি রাশি শুধু গাছের সারি, আশেপাশে কোনো দোতলা বাড়ি নেই। তাই মনে হচ্ছে কোনো ফরেস্টে  আছ। শুধুগাছ আর গাছ।

এ গাছ সে গাছের ফাঁক দিয়ে মাঝে মাঝেই বেরিয়ে আসে পাখির দল, কলকল করে উড়ে উড়ে হারিয়ে যায় গাছের ফাঁকে। আবার বেরিয়েআসে অন্য কোনো গাছের আড়াল থেকে। টিয়া, দোয়েল, বুলবুলি, শালিক, হলুদপাখি, চড়াই- দেখতে দেখতে চোখে ঘোর লাগে। ঘুম নেমে আসে আর ঘুমের মধ্যে আসে ফেলুদা, টিনটিন, প্রফেসর শংকু, কাকাবাবু আর গোগোল। তেমনই স্বপ্নের মতো লাগছিলো আজ। আমি টিটুদা হাত ধরাধরি করে বসে আছি কতকাল যে, কে জানে!

বললাম, “দেখো টিটুদা, কত পাখি, কত ফুল, প্রকৃতি কত সুন্দর আর আমরা একে ধংস করে চলেছি দিনরাত। কী লাভ বল এই টেকনোলজির উন্নতিতে? আমরা তো শেষের দিকে এগিয়ে চলেছি, তাই না?”

টিটুদা বলল, “কথাটা খানিক সত্যি, তবে পুরোটা নয়। ভেবে দেখ, টেকনোলজির অভাবনীয় উন্নতি না হলে আমরা কি ক্যান্সার চিকিৎসায় এতটা এগোতে পারতাম? যেমন, ধর লাং ক্যান্সার বা ফুসফুসের ক্যান্সার। এই লাং ক্যান্সার হল খুবই খারাপ টাইপের ক্যান্সার। একটা সময় ছিল যখন লাং ক্যান্সার ডিটেক্ট হলে ভাবা হতো বড়জোর কয়েক মাস। কিন্তু এখন উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এবং চিকিৎসার মাধ্যমে স্টেজ ফোর লাং ক্যান্সার নিয়েও তিন থেকে চার বছর এমনকি তার বেশিও মানুষ ভালোভাবে বেঁচে আছেন।”

আমি বললাম, “কী রকম?”

“যেমন ধর, আর্লি স্টেজ লাং ক্যানসার। যেটা আগে ডায়াগনোসিস করাই অসম্ভব ছিল। কিন্তু এখন সিটি স্ক্যান এর সাহায্যে খুব সহজেই ডায়াগনোসিস করা যাচ্ছে। এবং হয় সার্জারি অথবা স্টিরিও ট্যাকটিক বডি রেডিও থেরাপির মাধ্যমে সম্পূর্ণ সুস্থ করা যাচ্ছে।”

“একটু বুঝিয়ে বল প্লিজ।”

“ধর কারো লাং ক্যান্সার হয়েছে। এবার সেটা খুব একটা বড় হয়নি অথবা শরীরের অন্য কোথায় ছড়ায়নি। তাহলে সেই অংশটাকে কেটে বাদ দিলে এবং যদি দরকার হয় কেমোথেরাপি দিলে সেই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে।”

“বেশ ভালো ব্যাপার তো। তাহলে যদি আরলি ডিটেকশন হয়, তাহলে অপারেশন করে দিলেই তো সব পেশেন্ট ভালো হয়ে যাবে।”

“এইখানেই তো একটা সমস্যা। মেডিকেল সাইন্স  কিন্তু সোজা পাটি গণিতের নিয়মে চলে না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এইসব রোগীদের যে অংশটা কেটে বাদ দেওয়া হয় এবং তারপর বাকি যে অংশটা পড়ে থাকে সেই অংশটার ফুসফুসের বা লাং-এর কাজটা মানে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কাজটা এবং শরীরে অক্সিজেন নেওয়া এবং কার্বন ডাই অক্সাইড বের করে দেওয়ার কাজটা সম্পূর্ণভাবে করতে পারা উচিত। যদি তা না করতে পারে তাহলে এইসব রোগীদের  অপারেশন করলে বিপদ। এবং দুর্ভাগ্যবশত বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এনারা স্মোকার অথবা এদের ফুসফুসের ক্ষমতা বারবার ইনফেকশন অথবা অন্যান্য কারণে যেমন বয়স জনিত কারণে অনেকটাই কম থাকে, সে ক্ষেত্রে অপারেশন করা মুশকিল।”

“তাহলে উপায়?”

“এইখানেই টেকনোলজির অভাবনীয় উন্নতি। আমরা যে চিকিৎসাটা এদের দিই সেটা হল স্টিরিও ট্যাকটিক বডি রেডিওথেরাপি। এতে করা হয় কী, উন্নত রেডিয়েশন থেরাপির মাধ্যমে শুধু ফুসফুসের ক্যান্সার বা টিউমারটা টার্গেট করে খুব হাইডোজ রেডিও থেরাপি দেওয়া হয় যে ডোজে টিউমারটা সোজা বাংলায় বলতে গেলে সম্পূর্ণ পুড়ে যায়।” 

“এতে পেশেন্টের ব্যথা লাগে না অথবা সাইডএফেক্ট হয় না?”

“এটা সম্পূর্ণ পেইনলেস অর্থাৎ ব্যথাহীন চিকিৎসাপদ্ধতি। এবং যেহেতু রেডিওথেরাপির অভাবনীয় উন্নতি হয়েছে তাই সাইডএফেক্ট তুলনায় নগণ্য।”

“কিন্তু যদি ধরো টিউমার অনেকটা বড় হয় তখনো কি এই চিকিৎসা করা যায়?”

“না। সেক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি একসাথে দিয়ে চিকিৎসা করা হয়। আর যদি ক্যান্সারটা শরীরের অন্য জায়গায় ছড়িয়ে যায় সে ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি, টার্গেটেড থেরাপি অথবা কিছু কিছু ক্ষেত্রে ব্যথা কমানোর জন্য রেডিওথেরাপি দেওয়া হয়। এবার ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো এই স্টেজ ফোর বা লাস্ট স্টেজ ক্যান্সারের ক্ষেত্রেও যেটা তোকে আগে বলেছিলাম টার্গেটএড থেরাপি বলে এক ধরনের চিকিৎসা হয়, যাতে ক্যান্সার সেলের মধ্যে, সেই সেল বা কোষটার বৃদ্ধির জন্য যে পদার্থগুলো দরকার হয় এই থেরাপি সেই পদার্থগুলোকে টার্গেট করে ব্লক করে দেয়। এবং এই ট্রিটমেন্ট এর সাহায্যে এই লাস্ট স্টেজ ফুসফুসের ক্যান্সার পেশেন্টরা তিন থেকে চার বছর এমনকি তার চেয়ে বেশিও ভালোভাবে বেঁচে আছেন।”

“বুঝলাম। কিন্তু এই লাং বা ফুসফুসের ক্যান্সারের আরলি ডায়াগনোসিস কীভাবে হবে? বা কী কী সমস্যা হলে তাড়াতাড়ি চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত?”

“কিছু কিছু সমস্যা যেমন অনেকদিন ধরে কাশি, বুকে ব্যথা, বারবার চেস্ট ইনফেকশন হওয়া, কাশির সাথে রক্ত আসা, মাঝে মাঝে জ্বর অথবা ওজন কমে যাওয়া- এইসব সমস্যা হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত। বিশেষত যারা ধূমপান করেন তাদের ক্ষেত্রে লাং ক্যান্সার হওয়ার হার অত্যন্ত বেশি। তাই তাদের ক্ষেত্রে অবশ্যই যত তাড়াতাড়ি সম্ভব একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া উচিত।”

“কিন্তু টিটুদা, তুমি যেগুলো বললে, এগুলো তো অন্য কোনো ইনফেকশন নিউমোনিয়া অথবা আমাদের দেশে যে অসুখটা খুবই বেশি পরিমাণে হয় টিউবারকুলোসিস সেগুলো হলেও তো হতে পারে?”

“ভেরি গুড কোশ্চেন। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এই সিম্পটমগুলোকে টিবি বলে ধরে টিবির জন্য যেসব পরীক্ষা নিরীক্ষা দরকার সেগুলো করা হয় এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের সাথে টিবিও সত্যিই হতে পারে অথবা টিবি ডায়াগনোসিস না করতে পারলেও সিম্পটম বিচার করে টিবির ট্রিটমেন্ট শুরু করা হয়। এবং অনেক ক্ষেত্রেই এতে খানিকটা সময় নষ্ট হয়ে যায়। আমাদের কাছে এমন অনেক পেশেন্ট আছেন যারা দুমাস তিন মাস চার মাস টিবির ওষুধ খেয়ে ভালো না হয়ে তবে পরীক্ষা করতে এসেছেন।”

“তাহলে এইসব সমস্যা হলে কী কী পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা উচিত?”

“ক্যান্সার ডায়াগনোসিস করার মূল সূত্র হল সবচেয়ে খারাপটা সন্দেহ করো এবং সবচেয়ে ভালোটা আশা করো। তাই সহজ কিছু পরীক্ষা-নিরীক্ষা যেমন চেস্ট এক্সরে অথবা একটা সিটি স্ক্যান এবং সেই সিটি স্ক্যানে কোন টিউমার অথবা গ্রোথ দেখতে পেলে তার একটা বায়োপসি করা হতে পারে। সেই টিউমার অথবা লিম্ফ নোড যদি কোনো ইনফেকশন থেকে হয়ে থাকে, যেমন ধর টিবি সে ক্ষেত্রে টিবির ওষুধ শুরু করতে হবে, আর যদি ক্যান্সার ধরা পড়ে তাহলে ক্যান্সারের ট্রিটমেন্ট।”

“কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে তো সিগারেট না খেলেও শুনি ফুসফুসের ক্যান্সার হয়?”

“সিগারেট বা তামাক জাতীয় পদার্থ বিড়ি ইত্যাদি অবশ্যই লাং ক্যান্সার এর একটা অন্যতম কারণ। তবে কিছু ধরনের ফুসফুস কান্সার আছে যেগুলো যারা ধূমপান করেন না তাদেরও হতে পারে। এর জন্য বিভিন্ন ধরনের দূষণ, রাসায়নিক, কীটনাশক আরো বিভিন্ন কারণ দায়ী। এমন সুন্দর একটা জায়গায় আর অসুখ নিয়ে আলোচনা ভালো লাগছে না। চল একটু হেঁটে আসি। হাতে তো মাত্র আর একটা দিন। তারপর আবার রোজকার রুটিন এ ফিরতে হবে।” দানিয়ুবের পাড় ধরে হাটতে লাগলাম দুজনে রংবেরঙের ফুল প্রজাপতি আর সবুজের সমারোহ আমাদের দুজনকে আবার ভাসিয়ে নিয়ে চলল সেই স্বপ্নের দেশে।

ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখছেন উত্তরকালে

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: