Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > মতামত > বাঙালির ঈদ-উৎসব: অতীত ও বর্তমান

বাঙালির ঈদ-উৎসব: অতীত ও বর্তমান

পড়তে পারবেন 8 মিনিটে

।। অনুপম হীরা মণ্ডল ।।

ঈদুল ফিতর এলেই প্রথমে মনে হয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের গানের কথা, ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশীর ঈদ। ঈদুল ফিতরের মাহাত্ম্যকে কেন্দ্র করে কবি এই গানটি রচনা করেছিলেন।

এক মাসের সিয়াম সাধনার পর খুশির দিনটি হাজির হয়। বিশেষ করে গানটির শেষ দুই চরণ মনকে নাড়া দেয়, যারা জীবন ভরে রাখছে রোজা নিত্-উপবাসী/সেই গরীব এতিম মিস্কিনে দে যা কিছু মফিদ। এ উৎসব হলো আত্মোৎসর্গের উৎসব। বন্ধু-শত্রু, ধনি-দরিদ্র সবাইকে কাছে টেনে নেওয়ার উৎসব। সকলের মাঝে এই খুশিকে বিলিয়ে দেওয়াই হলো ঈদের লক্ষ্য। কবি নজরুল ঈদুল ফিতরের যে মর্মবাণী ঘোষণা করেছেন তা কেবল কবির নিজের নয় সমগ্র মানবজাতির।

রমজান মাস মুসলমানদের কাছে খুব পবিত্র মাস। পবিত্র কোরানে এ মাসের কথা বর্ণিত হয়েছে। শুধু তাই নয় এই মাসে নাজেল হয়েছিল পবিত্র কোরান। এ মাসের মাহাত্ম্য লুকিয়ে আছে আরো অনেক ঘটনার সঙ্গে। মহানবী হযরত মুহম্মদ (সা.) প্রথম ওহীপ্রাপ্ত হন এ মাসে। তিনি গিয়েছিলেন মেরাজে।

রমজান শব্দের উৎস অনুসন্ধান করতে গেলে দেখা যায় যে শব্দটি আরবি রমজ ধাতু থেকে আগত। রমজ অর্থ দাহ, তাপ, পোড়ানো। পণ্ডিতদের ধারণা চান্দ্র মাস চালু হওয়ার পূর্বে প্রাচীন কালে গরমের মৌসুমে এই মাস পড়তো বলে এর নাম হয়েছে রমজান।

রমজান মাস বর্তমানে একটি পবিত্র মাস হিসেবে স্বীকৃত। তবে এর অর্থ উপবাস নয়। আরবিতে উপবাসের প্রতিশব্দ হলো সওম। যদিও এই অর্থটিও ঠিক উপবাসের হুবহু অর্থ প্রকাশ করে না। এক সময় সওম শব্দের অর্থ ছিল আরাম বা বিশ্রামে থাকা। তবে শব্দটি থেকে সিয়াম শব্দটি এসেছে। বর্তমানে যার বাংলা অর্থ করা উপবাস থাকা। তবে রোজা রাখা কেবল উপবাস থাকা নয়। কঠোর-কঠিন রীতি-নীতি পালন করার মধ্য দিয়ে রোজা পালন করা হয়। এ মাসে একই সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষার কঠিন রীতি পালনের, ত্যাগ স্বীকারের, শৃঙ্খলার এবং আনন্দের। একমাস রোজা রাখার পর যখন ঈদুল ফিতর হাজির হয় তখন খুশির অন্ত থাকে না।

ঈদের অর্থ খুশি, আনন্দ, উৎসব। আর ফিতর অর্থ রোজা ভঙ্গ করা। তাই ঈদুল ফিতর বলতে পবিত্র মাহে রমজানের সিয়াম সাধানার পর রোজভঙ্গ করার উৎসবকে বোঝানো হয়। দ্বিতীয় হিজরিতে মুসলমানদের জন্য রমজান পালনের আবশ্যিকতার জন্য নির্দেশ আসে।

ঈদের এক অর্থ উৎসব। যদিও এই অর্থের সঙ্গে আভিধানিক অর্থের কোনো মিল নেই। আভিধানিক অর্থ পুনরায় ফিরে আসা বা বারে বারে ফিরে আসা। উৎসব যেহেতু বার বার ফিরে আসে তাই ঈদ শব্দটি উৎসব এবং ফিরে আসা উভয় অর্থকেই নির্দেশ করে। ঈদুল ফিতর বর্তমানে একটি জাতীয় রূপ পরিগ্রহ করেছে।

বাঙালিদের কাছে উৎসবটি অত্যন্ত আনন্দের উৎসব হিসেবে পালিত হয়। রমজান মাসে হিংসা-বিদ্বেষ ভুলে সদাচারী হওয়ার শিক্ষা শেষে উৎসবটি পালন করা হয়। ঈদুর ফিতরের মধ্যে কিছু সামাজিক শিক্ষাও লক্ষ্য করা যায়। এই উৎসবে পরস্পরের মধ্যে শুভেচ্ছা বিনিময়, আন্তরিকতা ও সহমর্মিতা গড়ে তোলা হয়। দরিদ্রকেও খুশির উৎসবে সামিল হতে সহযোগিতা করা হয়। এই দিন বেশি বেশি দান খয়রাত করা হয়, জাকাত, সাদকা ও ফিতরা প্রদানের মধ্য দিয়ে ঈদের খুশিকে সবাই ভাগ করে নেওয়া হয়।

ঈদের দিনের হিসেব করা হয় চান্দ্রমাস অনুযায়ী। মুসলিম পর্বগুলোর সব চান্দ্রমাসের হিসেবে অনুযায়ী চলে। চাঁদ দেখে রোজা শুরু করা হয় আবার চাঁদ দেখেই রোজা ভাঙা হয়। চাঁদ দেখা না দেখার উপর ঈদ উদ্যাপন নির্ভর করে। চন্দ্রমাস যেহেতু সৌর মাস অপেক্ষা এগার দিন কম। তাই ঈদ প্রতিবছর এগারো দিন করে এগিয়ে আসে। তাই ঈদ সারাবছর একই সময় অনুষ্ঠিত হয় না। প্রতি চার পাঁচ বছর পর পর ঈদের সময়ের এই পরিবর্তিত অবস্থা সহজে চোখে পড়ে।

বাংলাদেশে বর্তমানে ঈদ একটি প্রধান ধর্মীয় উৎসব হিসেবে পালিত হচ্ছে। অতীত কাল থেকে এই অঞ্চলটি মুসলিম সম্প্রদায় সংখ্যায় বেশি ছিল। তাই ধর্মীয় উৎসব হিসেবে উৎসবটির একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল। সংখ্যাগত দিক দিয়ে মুসলিম সম্প্রদায় তাদের নিজস্ব ধর্মীয় উৎসব হিসেবে দুটো ঈদকে বেশি গুরুত্ববহ মনে করে। এছাড়া অনেক জাতীয় উৎসব রয়েছে কিন্তু ধর্মীয় কারণে ঈদ উৎসবের রয়েছে আলাদা গুরুত্ব। এদেশে সব চেয়ে জৌলুসপূর্ণ উৎসব পালিত হয় ঢাকায়। ঢাকার ঈদের সঙ্গে অন্যান্য অঞ্চলের ঈদের তুলনা চলে না। অতীতকাল থেকে ঢাকা ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থান। বাণিজ্য এবং আভিজাত্যে স্থানটি বরবারই মুসলিম সম্প্রদায়কে আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়।

ঢাকা শহরে বরাবরই ঈদ একটি জাকজমকপূর্ণ উৎসব ছিল। অতীতকাল থেকে ঢাকা ছিল মুসলিম সম্প্রদায়ের উৎসবের শহর। যদিও এই শহরে মুসলিম আমলেও ধর্মীয় সম্প্রীতি বাজায় ছিল। এখানকার নবাব, ব্রিটিশ সিভিলিয়ান কিংবা হিন্দু রাজা কেউই ধর্মীয় সম্প্রীতিকে নষ্ট হতে দেননি। ঢাকা যেমন ছিল নবাবদের শহর তেমনি ছিল বিভিন্ন রাজা জমিদারের প্রিয় শহর। তাই এখানে প্রতিটি ধর্মীয় উৎসবই মহাধুমধামের সঙ্গে পালিত হয়েছে। তবে ঢাকায় ঈদের চেয়ে মহররমের উৎসবের জৌলুস ছিল বেশি। মহররমের মিছিল এবং লাঠি খেলা বরাবরই আকর্ষণীয় ছিল। এর পরই মুসলিম সম্প্রদায়ের উৎসবের কথা বললে ঈদের কথা বলতে হয়। মুঘল আমল থেকেই ঢাকায় ঈদের উৎসব পালনের তথ্য পাওয়া যায়।

সারা বাংলাতেই ঢাকার ঈদের একটা সুনাম ছিল। সম্রাট জাহাঙ্গীরের প্রতিনিধি সুবাদার ইসলাম খাঁ ঢাকায় রাজধানী গড়ে তোলেন। সেটা ছিল ১৬১০ সালে। ইসলাম খাঁর একজন সেনাপতি ছিলেন নাথান। তিনি ঢাকার রোজা ও ঈদ উৎসব সম্পর্কে অনেক তথ্য লিপিবদ্ধ করে গেছেন। দেখা যায় মুঘল আমলে ঢাকায় যে ঈদ পালন হতো তাতে মুঘলদের অংশগ্রহণই ছিল বেশি। সাধারণ মানুষ তখনো পর্যন্ত ঈদের খুশি তেমনটা উপভোগ করার সুযোগ পেতো না। বিশেষত রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় যে উৎসব পালিত হতো তাতে বাঙালি মুসলিমদের অংশগ্রহণ ছিল না বললেই চলে।

ঐতিহাসিক মিনহাজ-উস-সিরাজের বর্ণনা থেকে জানা যায় সে সময় সরকারি উদ্যোগে ঈদের সময় ধর্মীয় আলোচনার ব্যবস্থা করা হতো। এমনকি অনেক সময় রমজান মাসের শুরু থেকেই এ সব আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। সে সময় মুঘলরা অনেক ঈদগাহ তৈরি করেন। যেখানে উচ্চপদস্থ সেনাপ্রধানসহ অন্যরা ঈদের নামাজ আদায় করতেন। ঢাকাতে এমন শাহী ঈদগাহের ধ্বংসাবশেষ দেখা যায়। ঢাকাসহ নারায়ণগঞ্জ, চট্টগ্রাম, রাজশাহী প্রভৃতি অঞ্চলে মুঘল আমলের ঈদগাহের ধ্বংসাবশেষ খুজে পাওয়া যায়। ধারণা করা হয় এ সব ঈদগাহে মুঘল অভিজাত শ্রেণির মানুষ ঈদের নামাজ আদায় করতেন।

ঢাকার নবাবদের মধ্যে ঈদের দিন আনন্দ উৎসব করতেন। এমনকি উচ্চরাজকর্মচারীদের এই আনন্দে সামিল হবার সরকারি নির্দেশনা থাকতো। ১৭২৯ সালে দ্বিতীয় মুর্শিদকুলি খাঁর সময় ত্রিপুরা জয় করা হয়। এই সংবাদ নবাবের কাছে পৌঁছায় ২৯ রমজান। তখন তিনি মীর সৈয়দ আলী ও মীল মোহাম্মদ জামানকে ঈদের দিন গরিবদের মধ্যে এক হাজার টাকা দান করার নির্দেশ দেন। জানা যায় সে সময় ঢাকা কিল্লা থেকে এক ক্রোশ দূরে ঈদগাহে যাবার পথে রাস্তায় মুদ্রা ছড়ানো হয়। ঈদের সময় ধনশালী ব্যক্তিরা দান করতেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই। মুঘল আমলে মুঘলরা যেমন জাকজমকপূর্ণ ঈদ পালন করতেন তেমনি সাধারণ মানুষ ঈদের মেলায় যোগ দিতেন। সে সময় ঈদে নানা সামাজিক-সাংস্কৃতিক উৎসব-অনুষ্ঠান পালিত হতো।

ঢাকায় রমজান মাস থেকেই ঈদের প্রস্তুতি শুরু হতো। মুঘল আমলে ঈদের আমেজ ছিল সব চেয়ে বেশি। ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপিত হওয়ার পর ঈদের আমেজ কিছুটা কমতে থাকে। এ সময় সরকারিভাবে বড় দিনের ছুটি ছিল সব চেয়ে বেশি। তার পর দুর্গাপুজোর। ঈদের ছুটি ছিল সব চেয়ে কম। এ সময় ঈদের অনুষ্ঠানের প্রতি সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও কমতে থাকে। বাংলাদেশের বড় বড় শহরগুলোতে খ্রিস্টমাসের উৎসব সব চেয়ে বড় উৎসব হিসেবে পালিত হতো। এই উৎসবে ব্রিটিশ সিভিলিয়নসহ সরকারি কর্মকর্তা, কর্মচারীরা যোগ দিতেন। বাঙালি কর্মচারীদেরও খ্রিস্টমাসের উৎসবে যোগ দিতে হতো

এরপর সরকারি চাকুরিতে যেহেতু হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ বেশি এগিয়ে ছিল এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতাও তাদের প্রতি বেশি ছিল তাই স্বাভাবিক কারণে দুর্গাপুজোর অনুষ্ঠানটিও বেশ জাকজমকপূর্ণ হতো। এছাড়া পূর্ববঙ্গের বেশিরভাগ জমিদার ছিলেন হিন্দু যাদের পৃষ্ঠপোষকতায় ঔপনিবেশিক আমলে দুর্গাপুজো হতো। তাই খ্রিস্টমাস এবং দুর্গাপুজোতেই বেশি জৌলুস ছিল। বাঙালি মুসলিম ছিল কৃষিজীবী সম্প্রদায়। যে সব অঞ্চলে মসলিম নবাব কিংবা জমিদার ছিলেন সে সব অঞ্চলে ঈদের উৎসবে কিছুটা জৌলুস দেখা যেতো। তবে সাধারণ কৃষিজীবী বাঙালি মুসলিমদের কাছে ঈদের উৎসবের তেমন জৌলুস দেখা যেতো না।

ঢাকার মধ্যবিত্তদের মধ্যে ঈদের আমেজ বারাবরই বহাল ছিল। আর চকবাজারের ইফতারির পশরা সাজানো শুরু হতো প্রথম রমজান থেকেই। পুরো ঢাকা শহরের মানুষ চকবাজারের ইফতারির জন্য অপেক্ষা করতেন। বিশেষ করে ধনশালী ব্যক্তিরা চকবাজারের ইফতারির জন্য মুখিয়ে থাকতেন। তখন পুরো রমজান মাস পথচারীদের বিনামূল্যে সরবত খাওয়ানো হতো। ইফতারির পশরা শেষ হতে না হতেই ঈদের মেলা হতো চকবাজার ও রমনা ময়দানে।

ঢাকার ঈদ উৎসবের বর্ণনা পাওয়া যায় সৈয়দ আলী আহসান লিখিত ষাট বছর আগের ঢাকা নামক গ্রন্থে। সৈয়দ আলী আহসানের বর্ণনা থেকে জানা যায় ঈদের দিন বিভিন্ন এলাকা থেকে লোক ঈদগাহে যোগ দিতো। পুরুষেরা নতুন কাপড় পরে নিশান হাতে মিছিল করে ঢোল বাজাতে বাজাতে ঈদগাহে হাজির হতেন। গুলিস্থান স্টেডিয়াম এলাকায় তখন অনেকগুলো খেলার মাঠ ছিল সেই মাঠে ঈদের জামাত হতো। চুড়িহাট্টা, বংশাল এবং নবাবপুর থেকে বড় মিছিল আসতো। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সলিমুল্লাহ মুসলিম হল থেকে মুসলমান ছাত্ররা মিছিল করে ঈদগাহে হাজির হতেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা ড্র্রাম বাজিয়ে মিছিল করে ঈদের জামাতে যোগ দিতেন। এ সময় ঈদের মিছিল দেখার জন্য হিন্দু-মুসলিম-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ সব ধর্মের লোকই দাঁড়িয়ে থাকতো। তখন ঈদের মিছিল ছিল মানুষের কাছে খুব দর্শনীয় বিষয়। এ সময় বিদেশীরাও ঈদের মিছিলের ছবি তোলার জন্য রাস্তায় নেমে আসতেন।

সে সময় তিনটি জায়গায় ঈদের জামাত হতো। সব চেয়ে বড় জামাত হতো পুরানা পল্টনে, তার পরে লালবাগ শাহী মসজিদে। তৃতীয় জামাত হতো চকবাজারের মসজিদে। তখনো ঈদের দিন এবং ঈদের পরের দিন ঢাকার অনেক স্থানে মেলা বসতো। ঢাকার ঈদের অনুষ্ঠানের একটি অন্যতম আকর্ষণ ছিল লাঠি খেলা। পুরানা পল্টনের মাঠে সব চেয়ে বড় লাঠি খেলার আয়োজন করা হতো। তবে অন্যান্য স্থানেও লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হতো। বর্তমানে ঈদের অনুষ্ঠানে লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হওয়ার সংবাদ পাওয়া যায় না।

ঐতিহাসিক মুনতাসির মামুন মনে করেন, ‘আজ আমরা যে ঈদের জন্য সাগ্রহে অপেক্ষা করি বা যে ঈদকে দেখি আমাদের একটি বড় উৎসব হিসেবে তা চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের ঐতিহ্য মাত্র।’ তিনি এর কারণ হিসেবে মুসলিম সম্প্রদায়ের বিত্ত এবং রজনৈতিক ক্ষমতাহীনতাকে কারণ হিসেবে নির্দেশ করেন। পাকিস্তান রাষ্ট্রটি সৃষ্টির পরই ঈদের উৎসবের জৌলুস বাড়তে থাকে। রাষ্ট্রীয়ভাবে মুসলিম সম্প্রদায় তখন ক্ষমতার কাছাকাছি আসার সুযোগ পায়। যদিও বাঙালি মুসলিমদের তখনো পর্যন্ত অর্থনৈতিক দিক দিয়ে খুব স্ববলম্বী হওয়ার সুযোগ ছিল না। কিন্তু উৎসব হিসেবে ঈদকে যেহেতু রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া হতো এবং ঈদের ছুটি বাড়িয়ে দেওয়া হয় তাই ঈদ পালনে বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায় এই প্রথম রাষ্ট্রীয় আনুকূল্য পাওয়ার সুযোগ পায়।

ঔপনিবেশিক আমলেও দেখা যায় মুসলিম চাকুরীজীবীদের অনেককেই ঈদের ছুটি বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য আবেদন করছেন। কিন্তু সে সময় ইংরেজ শাসক মসলমানদের ঈদের ছুটি বাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়টি কখনো আমলে নেয়নি। ফলে পাকিস্তান রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পূর্বে বাঙালি মুসলমানদের কাছে ঈদের উৎসব তেমনভাবে বড় কোনো উৎসবে পরিণত হওয়ার সুযোগ পায়নি। যদিও ধর্মীয় কারণে ঈদসবটি বাঙালি মুসলমানদের কাছে এর স্বতন্ত্র মর্যাদা ছিল।

বাঙালি মুসলিম সম্প্রদায় ঈদের সময় নতুন জামা-কাপড় পরতো। ঈদের আগ থেকে গ্রামের হাট-বাজারে জায়নামাজের মতো ছোট ছোট পাট পাওয়া যেতো। মালিয়ার তৈরি এই পাটি নিয়ে ঈদের দিন সকালে সবাই নামাজ পড়তে যেতেন। ঈদগাঁগুলোও তেমন ভালো ছিল না। কোনো স্কুল, কলেজের মাঠ কিংবা গ্রামের ফাঁক স্থানকে ঈদগাঁ হিসেবে ব্যবহার করা হতো। এ সব স্থানে আজকের মতো সুন্দর চাদোয়া কিংবা চট বিছানোর কোনো ব্যবস্থা ছিল না। গ্রামের মানুষ নিজ নিজ উদ্যোগে পাটি নিয়ে নামাজ আদায় করতে যেতেন। তবে সব চেয়ে মজার বিষয় ছিল ঈদগাঁটি তৈরি করার কাজ করাআজকের মতো কোনো ডেকোরেট এনে ঈদগাঁ সাজানো হতো না। আগের দিন থেকেই গ্রামের ছেলেরা সমবেতভাবে রঙিন কাগজ, সুতা, কালী, বাঁশ নিয়ে ঈদগাঁ সাজানোর কাজ করতো। সেই ছিল উৎসবের মজা।

ঈদগাঁর কাছেই বসতো মেলা। তবে ঈদের মেলা সে সময় আজকের মতো এতো দীর্ঘস্থায়ী হতো না। নামাজের পর দু’ তিন ঘন্টার মধ্যে ঈদের মেলা শেষ হতো। আগের দিন ঈদের মেলাতে গ্রামের মেয়েদের খুব একটা যাওয়ার সুযোগ ছিল না। মেয়েরা ঘরে বসেই বাড়িতে অতিথি এবং প্রতিবেশিদের জন্য মজার মজার খাবার তৈরি করতেন। তবে বর্তমানে ঈদের মেলা আরো বেশি জাকজমকপূর্ণ হয়েছে। কোথাও কোথাও মাসব্যাপিও মেলা হয়। এখন নারী-পুরুষ নির্বিশেষে ঈদের মেলায় যায়। কেনাকাটা করে, ঘুরে ফিরে বেড়ায়, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা দেয়। মেলায় যোগ দিতে এখন আর কোনো ধর্মীয় কিংবা সামাজিক নিষেধ লক্ষ্য করা যায় না।

বাংলাদেশে ঈদ এখন খুশির উৎসব। এর সঙ্গে আভিধানিক অর্থের মিল না থাকলেও বাঙালি ঈদের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে। কখন ঈদের ছুটি হবে, কবে ঈদের পরবী পাওয়া যাবে সেই অপেক্ষার পর কাঙ্ক্ষিত উৎসবটি এসে হাজির হয়। বাংলাদেশে ঈদ হলো আত্মীয় পরিজন, স্বজন, প্রতিবেশি, বান্ধব নিয়ে পালন করা উৎসব। এদেশে কেউ এককভাবে ঈদ পালন করে না। তাইতো ঈদের সময় সমস্ত নাগরের মানুষ গ্রামে দিকে ধাবিত হয়। গ্রামের স্বজনদের নিয়ে উৎসব পালন করে। কখনো কখনো ঈদের সময় গ্রামে, মফস্বলে পুনর্মিলনী হয়। সমস্ত চেনা পরিচিত মানুষ ঈদের সময় নিজ নিজ গ্রাম, মফস্বল শহরে এসে হাজির হয়। দীর্ঘ কালের না দেখার অবসান ঘটে। নতুন করে আবার সবার সঙ্গে যোগাযোগ গড়েওঠে।

বাঙালির মাঝে ঈদ হলো একটি সম্মিলন, মিলন মেলা। বাংলাদেশের অনেক স্থানে ঈদ এবং মর্হরমের সময় লাঠি খেলা অনুষ্ঠিত হয়। কোথাও কোথাও ষাঁড়ের লড়াই, নৌকা বাইচ, হাডুডু ইত্যাদি খেলার আয়োজন করা হয়। ঈদের আর একটি অন্যতম আকর্ষণ হলো খাবারের দোকান। বাঙালি চিরদিন রসনাপ্রিয়। বিশেষ করে মিষ্টান্ন ছাড়া ঈদের উৎসবের কথা কল্পনা করা যায় না। যদিও বাঙালির সকল উৎসবের সঙ্গেই মিষ্টান্নের সম্পর্ক আছে। নানা প্রকার মিষ্টি কেনা বাঙালির সহজাত প্রবৃত্তি। এছাড়া ধনী, দরিদ্র সকল বাড়িতেই একটু বাড়তি রান্না হয়। অতিথি ছাড়া এ সময় যেনো কোনো পরিবারই খাবার খাওয়ার কথা চিন্তা করে না। বাঙালি যে আতিথি পরায়ণ জাতি তা ঈদের সময় সহজে অনুভব করা যায়।

ঈদের সময় ট্রেন, বাস, লঞ্চ, স্টিমারে তীল ধারণের ঠাঁই থাকে না। সবাই ঈদ কাটাতে গ্রামের বাড়ির দিকে রওনা হয়। এর থেকে বোঝা যায় এখনো বাংলাদেশের মানুষ নগরে কেবল অর্থনৈতিক কারণে বসবাস করে। মনটা পড়ে থাকে গ্রামেই। ঈদের সময় হাতে কিছু টাকা এলেই ছুটে যায় গ্রামে। বাঙালি যে সহজাতভাবে যৌথজীবনের প্রতি আকৃষ্ট তা ঈদের সময় এলেই বোঝা যায়। কেউ ঈদ শহুরে চার দেওয়ালের মধ্যে পালন করতে চায় না। এমনকি হাসপাতাল, ফায়ার ব্রিগেড, পুলিশ প্রভৃতি সেবামূলক ক্ষেত্রেও ঈদের সময় লোকবল কমে যায়। প্রায় সবাই ছুটি নিয়ে ঈদ পালন করার উদ্দেশ্যে গ্রামের বাড়িতে যায়। প্রতিবছর সড়ক এবং নৌপথে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। যা ঈদের আনন্দকে অনেক ক্ষেত্রেই ম্লান করে দেয়। তার পরও মানুষ গ্রামে যেতে চায়। স্বজনের সাহচর্যে উৎসব পালন করতে চায়।

বর্তমানে ঈদের আনন্দ আরো বৃদ্ধি পেয়েছে। ঈদের উৎসব এখন আর কেবল ঈদের দিন আর ঈদের পরের দিনে আবদ্ধ নেই। সারা দেশে এখনো ঈদের মেলা হয়। কোথাও কোথাও মাসব্যাপী মেলা বসে। ঈদ পালিত হয় সপ্তাহ জুড়ে। সরকারিভাবে ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। সারা দেশেই ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশের প্রতিটি শহরে এখন ঈদের জামাত হয়। এমনকি অনেক জামাতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগম হয়। কিশোরগঞ্জের শোলাকিয়ায় সব চেয়ে বড় ঈদের জামাত অনুষ্ঠিত হয়।

ঈদ এখন আর কেবল ধর্মীয় রীতি নীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সামাজিকভাবেও এর গুরুত্ব অনেক। ঈদুল ফিতরের উৎসব আরম্ভ হয় খুব সকাল থেকেই। গোসলাদির পর শুরু হয় মিষ্টিমুখ। এর পরই মূলত মুসল্লিরা স্থানীয় ঈদগাহে নামায আদায় করতে যান। নামাজের পর শুরু হয় প্রীতি আর শুভেচ্ছা বিনিময়ের পালা। শুভেচ্ছা আর প্রীতি সম্ভাষণ চলে দিনব্যাপি। কখনো কখনো কয়েকদিন ধরে শুভেচ্ছা বিনিময় চলতে থাকে। চাকুরীজীবী ছুটির শেষে কর্মক্ষেত্রে ফেরার পরও ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময় ও কোলাকুলি করে। কখনো কখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কর্মক্ষেত্রে আবার ঈদপুনর্মিলনী করা হয়। কেউ কেউ নিজ নিজ অঞ্চলে ঈদ পালনের স্মৃতিচারণও করেন সে সব অনুষ্ঠানে।

ঈদকে কেন্দ্র করে প্রতিটি গণমাধ্যমে বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। টেলিভিশনগুলোতে এক সপ্তাহ থেকে দশ দিন ধরে বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। সংবাদপত্রগুলো প্রচার করে বিশেষ ক্রোড়পত্র। অধিকাংশ সংবাদপত্র ঈদের বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে এবং ঈদ সংখ্যা হিসেবে আলাদা ম্যাগাজিন প্রকাশ করা হয়। লিটলম্যাগুলোর অনেকেই ঈদ সংখ্যা প্রকাশ করে। শিল্প-সাহিত্য ক্ষেত্রে ঈদের প্রভাব পড়তে দেখা যায়। ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা বাদ দিয়ে এই উৎসব বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের কাছেই আনন্দের উৎসব, খুশির উৎসব, বিশেষ উৎসব। ধর্মীয় সম্প্রীতির এই দেশে ঈদ এখনো খুশি আর সম্প্রীতির বার্তা নিয়েই হাজির হয়।


অনুপম হীরা মণ্ডল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ফোকলোর বিভাগে শিক্ষকতা করছেন।


সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: