Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ৬

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ৬

পড়তে পারবেন 5 মিনিটে

।। ডা. সায়ন পাল ।।

আর্টিস্টরা হলে ঢুকতে সবাই উঠে দাঁড়িয়ে হাততালি দিয়ে তাদের স্বাগত জানালো। তারাও ঝুঁকে অভিবাদন গ্রহণ করলেন। এরকম বার কয়েক হওয়ার পর সবাই নিজের নিজের আসন গ্রহণ করলেন।

সুবিশাল ভিয়েনা স্টেট অপেরা প্রেক্ষাগৃহ। গ্রাউন্ড ফ্লোরে চেয়ার পাতা আছে। তাছাড়াও বৃত্তাকারে অনেকগুলো তলায় বসে গান-বাজনা শোনার বা দেখার সুবন্দোবস্ত। একদম উপর তলায় সস্তায় দাঁড়িয়ে দেখবার ব্যবস্থা আছে।

এই মিউজিসিয়ানদের গ্রুপটা যে ভালই জনপ্রিয়, হাততালি বহর দেখেই বোঝা গেলো। অথবা হতে পারে এটা  এদের ইউরোপীয় সৌজন্য। বেশ কয়েকজন নামি কম্পোজারের বিভিন্ন সৃষ্টি এরা বাজালেন। তারমধ্যে  মোতসারট- এর টার্কিশ মার্চ, এ লিটল নাইটস মিউজিক; জোহান্ স্ট্রস-এর ব্লু  দানিয়ুব; বেটোফেনের মুনলাইট সোনাটা অসাধারণ মুহূর্ত সৃষ্টি করলো। আর অত্যন্ত শিক্ষিত দর্শকরা প্রতিটা প্রস্তুতি নিখুঁত নীরবতার সঙ্গে আস্বাদন করলেন এবং ঠিক ঠিক সময়ে হাততালি দিয়ে সম্মান জানালেন। টিটুদা আর আমি হাত ধরাধরি করে এই অপার্থিব  ঐশ্বরিক অনুভবের সমুদ্রে গা ভাসালাম।

অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার পর আমরা ভিয়েনা স্টেট অপেরার অসাধারণ স্থাপত্য শৈলী আরো একবার উপভোগ করতে করতে বাইরে বেরিয়ে এলাম। কাছাকাছি এক রেস্টুরেন্টে এসে স্নিটজেল আর কফি অর্ডার করে ধীরে ধীরে অনুষ্ঠানের ঘোর কাটিয়ে কথাবার্তা শুরু করলাম।

ডাক্তার পিটার আর এরিন-এর ওয়েস্টার্ন ক্লাসিক্যাল মিউজিক সম্পর্কে অগাধ জ্ঞান। টিটুদাও ওয়েস্টার্ন এবং ইন্ডিয়ান ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক নিয়ে খানিকটা পড়াশোনা করেছে এবং নিজেও পিয়ানো বাজাতে পারে। আমিও ভায়োলিন শিখেছি। তাই গল্প জমে উঠতে বেশি সময় লাগলো না।

ডাক্তারদের এক সমস্যা, যে কোনো আলোচনাই শেষমেষ অসুখ-বিসুখে গিয়ে পরে। তাই মোতসারট বেটোফেন, জোহান্ স্ট্রস থেকে শেষমেষ ইউটেরা, ওভারি, লাং, প্রোস্টেট ক্যান্সারে উত্তীর্ণ হতে বেশি সময় লাগলো না।

এই সুযোগে আমিও ডাক্তার এরিনকে জিজ্ঞেস করলাম, “ইন্ডিয়াতে তো সার্ভিক্স বা জরায়ুর মুখের ক্যান্সার খুব বেশি। কানাডাতেও কি এই ক্যান্সারটা হয়?”

ডক্টর এরিন বললেন, ”হয়, তবে ডেভলপ কান্ট্রিতে সার্ভিক্স এর চাইতে জরায়ুর ক্যান্সার মানে ইউটেরাইন ক্যান্সার বেশি হয়।”

“এটা কি জরায়ু মুখের ক্যানসার থেকে আলাদা?”

“হ্যাঁ খানিকটা আলাদা তো বটেই, যেমন এর রিস্ক ফ্যাক্টরগুলো অনেকটাই আলাদা।”

“কী রকম?”

“এক্ষেত্রে এই জরায়ুর বা ইউটেরাস ক্যান্সার সাধারণত মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্ত মহিলাদের বেশি হয়। আবার  সন্তান না হওয়া, স্থূলত্ব বা ওবেসিটি এবং তার সাথে যুক্ত হওয়া ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার এইগুলি শরীরে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয় যার ফলে জরায়ুর ক্যান্সার হতে পারে। আবার মাসিক তাড়াতাড়ি শুরু হওয়া এবং দেরি করে বন্ধ হওয়া মানে আর্লি মেনারকি আর লেট মেনোপজ, পলিসিসটিক ওভারি ডিজিজ এর ফলে ইস্ট্রোজেনের মাত্রা শরীরে বেড়ে যাওয়া এইগুলো কিন্তু  ইউটেরাস ক্যান্সার এর ক্ষেত্রে রিস্ক ফ্যাক্টর।”

“আপনি বলছেন শরীরে ইস্ট্রোজেন বেশি হওয়ার জন্য এই ক্যান্সার হতে পারে, তাহলে যদি কেউ ইস্ট্রোজেনের ট্যাবলেট খান, যেমন গর্ভ নিরোধক  জাতীয় তাহলেও কি জরায়ুর ক্যান্সার হতে পারে?”

“গুড কোশ্চেন। শুধুমাত্র ইস্ট্রোজেন ট্যাবলেট যেগুলি অনেক সময় মেনোপজ-এর পরে হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি হিসেবে ব্যবহার করা হয় অথবা অনেক সময় ব্রেস্ট কান্সারের ট্রিটমেন্ট-এ অনেকদিন ধরে হরমোন ট্রিটমেন্ট করা হয়, সেগুলি রিস্ক ফ্যাক্টর। কিন্তু গর্ভনিরোধক ট্যাবলেট রিস্ক ফ্যাক্টর নয়।”

“এটি কি বংশগত হতে পারে?”

“তা পারে কিছু কিছু ক্ষেত্রে। যেমন যেসব ফ্যামিলিতে ফাস্ট ডিগ্রী রিলেটিভ  মানে মা অথবা বোন এদের ইউটেরাসের ক্যান্সার বা এন্ডোমেট্রিয়াল ক্যান্সার, ব্রেস্ট ক্যান্সার, কোলন ক্যান্সারের হিস্ট্রি আছে তাদের রিস্ক আছে। একটা বংশগত অসুখ আছে যাকে বলে হেরিডিটি ননপলিপসিস কোলোরেক্টাল ক্যানসার লিঞ্চ টাইপ 2। এই অসুখেও জরায়ুর ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।”

“আর এই ক্যান্সারকে প্রতিরোধ করার উপায়?”

ফিজিক্যাল এক্সারসাইজ, আর কিছু কিছু খাবার আছে যাতে প্লান্ট সোর্স থেকে পাওয়া ইস্ট্রোজেন থাকে। তাকে বলে ফাইটো ইস্ট্রোজেন সেগুলি নাকি এই ক্যান্সার রিস্ক কমায়। তবে এই ফাইটোস্ট্রোজেনের ব্যাপারটা নিয়ে একটু কন্ট্রোভার্সি আছে।”

“এই ইস্ট্রোজেন কি খাবার থেকে পাওয়া যায়?”

“এই যেমন সয়াবিন ওটস বার্লি মসুর ডাল ভাত আপেল গাজর বেদানা এইসব আরকি।”

“এই ক্যান্সার স্ক্রিনিং করে আর্লি ডিটেকশন করা যায়?” টিটুদার সাথে থেকে থেকে এখন আমি অনেকটাই জেনে গেছি।

“হুমম… দেখো সুস্থ মানুষদের মানে জেনারেল পপুলেশন এ স্ক্রিনিং টেস্ট করে কোন বেনিফিট প্রমাণিত হয়নি। তবে যারা হাই রিস্ক গ্রুপ যেমন ধরো যারা ব্রেস্ট ক্যানসারের জন্য হরমোন ট্রিটমেন্ট নিচ্ছে অথবা বংশগত ক্যান্সার সম্বন্ধীয় অসুখগুলো আছে, ফ্যামিলি হিস্ট্রি আছে তাদের স্ক্রিনিং করা যেতে পারে।’

“কীভাবে করা হয়?”

“সাধারণতঃ আল্ট্রাসাউন্ড, এন্ডোমেট্রিয়াল বায়োপসি আর রক্তে ca125 নামক একটা পদার্থ যাকে টিউমার মার্কার বলা হয় তার পরীক্ষা করে। তবে এর কতটা ক্লিনিক্যাল বেনিফিট বা উপকারিতা তার উপযুক্ত প্রমাণ নেই।”

“তবে কী সমস্যা হলে ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নেওয়া উচিত?”

“সবচেয়ে বেশি যে সমস্যাটা নিয়ে মহিলারা আসেন, তা হল পোস্ট মেনোপজাল ব্লিডিং মানে মাসিক পাকাপাকিভাবে বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরেও রক্তপাত হওয়া। এছাড়া ভ্যাজাইনা দিয়ে তরল স্রাব, অথবা মাসিকের অনিয়মিত ধরণ যেমন দুটো ঋতুস্রাবের মাঝখানে রক্তপাত হওয়া, অতিরিক্ত রক্তপাত হওয়া অথবা যৌন মিলনের পর রক্তপাত হওয়া-এগুলিও আর্লি সিম্পটম হতে পারে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তলপেটে মাংসপিণ্ড অনুভব করা, ,তলপেটে ব্যথা, খুব কম ক্ষেত্রে রেনাল ফেলিওর অথবা প্রস্রাবের সাথে রক্ত আসা বা মল  দিয়ে রক্তপাত ,কোমরে ব্যথা এগুলো হতে পারে। তবে এগুলি খুবই রেয়ার সিম্পটম।”

“কী কী পরীক্ষা করলে এই ক্যান্সারটা ডায়াগনোসিস করা সম্ভব?”

“মূলত আল্ট্রাসাউন্ড এক্সামিনেশন, ট্রান্স ভ্যাজাইনাল অর্থাৎ ভ্যাজাইনা-এর মধ্যে দিয়ে আলট্রাসনোগ্রাফি করা, এক ধরনের এন্ডোসকপি করা, এম আর আই করা এই সব পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হয়।”

‘আর এর  চিকিৎসা কী?”

“যদি অসুখটা শরীরের অন্য অঙ্গতে ছড়িয়ে গিয়ে না থাকে তাহলে প্রথমে যেটা করতে হয় সেটা হল অপারেশন করে ইউটেরাস, এবং এর সঙ্গে ওভারি কেটে বাদ দেওয়া। তারপর অপারেশনের পরে যে স্পেসিমেনটা কেটে বাদ দেওয়া হল তার প্যাথলজি পরীক্ষার রিপোর্টের ভিত্তিতে হয় রেডিওথেরাপি অথবা খুব এডভান্স অসুখের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপিও দেওয়া হয়।”

“এই কান্সার সেরে যায় সম্পূর্ণ?”

“অবশ্যই সেরে যায়। আর্লি স্টেজ-এ সেরে যাওয়ার হার শতকরা ৭০ থেকে ৯০ শতাংশ। এমনকি স্টেজ থ্রি  অসুখেও প্রায় ৫০ শতাংশ মানুষ ৫ বছরের বেশি বাঁচেন। এবং এই সেরে যাওয়ার হার অন্যান্য অসুখের তুলনায় যথেষ্ট ভালো।”

টিটুদা এতক্ষন ডাক্তার পিটার-এর সাথে কী সব আলোচনা করছিল, এবার আমাদের আলোচনায় যোগ দিলো। এরিন কে বলল, “আমাদের দেশেও কিন্তু ইউটেরাস ক্যান্সারের হার খুব বেড়ে যাচ্ছে। মূলত শহরাঞ্চলে ।কেননা শহরের মহিলাদের জীবনযাপন অনেকটাই উন্নত দেশের মতো। মানে শারীরিক পরিশ্রম কম, ওবেসিটি বা স্থূলত্ব, ইনফার্টিলিটি, স্ট্রেস, ডায়াবেটিস, পলিসিস্টিক ওভারি ডিজিজ যার ফলে স্থূলত্ব আবার স্থূলত্বর ফলেও পলিসিস্টিক ওভারি ডিজিজ, সন্তান ধারণা না করা, খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন, এসবের কারণে আমাদের দেশেও কিন্তু জরায়ুর ক্যান্সার বেড়েই চলেছে।“

এরিন সায় দিলেন, “শুধু জীবনযাত্রার পরিবর্তন করেই যে কত ভালো থাকা যায় এটা মানুষ যে কবে বুঝতে পারবে!”

“তার সাথে যুক্ত হয়েছে নানা ধরনের নেশা, পুরুষ মহিলা উভয়ই নেশার কবলে।”

“একদম সত্যি কথা বলেছো, চলো এবার ওঠা যাক। রাত হয়েছে। কাল খুব ভোরে আমাকে ফেরার ফ্লাইট ধরতে হবে, পিটার তুমি গতকালই ফিরবে?”

“হ্যাঁ আমি কাল সকালে বুদাপেস্টের ট্রেন ধরবো।”

ওদের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে আমরা ফিরে চলেছি নিজের নিজের আস্তানায়। রাতের ভিয়েনা বড় মনোরম লাগছে। কনকনে হাওয়া বইছে। মাঝে মাঝে মাঝে আধুনিক গাড়ির পাশাপাশি টক টক শব্দ তুলে পেরিয়ে যাচ্ছে ঘোড়ার গাড়ি। দুপাশে চোখ ধাঁধানো স্থাপত্যশৈলী আর সবুজ পার্কের মধ্যে দিয়ে আমরা হেঁটে চলেছি। আমার গেস্ট হাউসের সামনে এসে টিটু দা বলল, “কাল আমরা ডনসেল যাব, ওকে? আচ্ছা, আমাকে কি তোর গেস্ট হাউসে অ্যালাও করবে থাকতে?”

আমি হেসে বললাম, “তা করতেই পারে। কিন্তু  আমার যে রুমমেট রয়েছেন। উনি ইউনিভার্সিটির একজন সিনিয়র প্রফেসর। কান মলে দিতে পারেন।”

টিটুদা হাসতে হাসতে বলল, “বুঝলাম কিছু করার নেই। কাল তাহলে মিটিং শেষে আসছি চারটে নাগাদ। তৈরি থাকিস।” হেসে বললাম, “নিশ্চয়ই, আমার মিটিং ও শেষ হয়ে যাবে দুটো নাগাদ। আমি অপেক্ষা করব।”

ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখছেন উত্তরকালে

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: