Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > নজরুলের জীবনে তিন নারীর প্রেম

নজরুলের জীবনে তিন নারীর প্রেম

পড়তে পারবেন 7 মিনিটে

।। চন্দন আনোয়ার ।।

প্রাক-সৈনিক জীবনে কাজী নজরুল ইসলাম কোনো একজন কিশোরীর প্রেম প্রত্যাশী ছিলেন। সম্ভবত, তিনি এই প্রত্যাশিত প্রেম পাননি। অথবা, সামান্য সময়ের জন্যে পেয়ে তা হারিয়ে ফেলেছিলন। এই দুটির কোনো একটি কারণে তাঁর প্রেমিকমন বিষিয়ে উঠেছিল।

লেখাপড়া ছেড়ে পল্টনে যোগ দেওয়ার পেছনে এটি একটি অন্যতম কারণ হতে পারে বলে ধারণা করা হয়। তবে সৈয়দা খাতুন ওরফে নার্গিস আসার খানম, আশালতা সেনগুপ্তা ওরফে প্রমীলা সেনগুপ্তা এবং ফজিলাতুন্নেসা- এই তিন নারী ছিলেন নজরুলের জীবনে প্রতিষ্ঠিত প্রেমিকা। এঁরা প্রত্যেকেই নজরুলের কবিসত্তায় গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব বিস্তার করেছিলেন।

নজরুল-নার্গিসের প্রেম

কাজী নজরুল ইসলামের জীবনে প্রথম প্রতিষ্ঠিত প্রেমিকা নার্গিস। নার্গিসের সাথে নজরুলের প্রেম ও বিয়ে ঘটনাটি ঘটেছিল একটি নাটকীয় ঘটনার মধ্যে দিয়ে। ১৯২০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে ৪৯নং পল্টন ভেঙে দেবার পরে নজরুল কলকাতায় ফিরে এসেছিলেন। ‘বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পরিষদে’ থাকাকালীন আলী আকবর খান নামে একজন পুস্তক ব্যবসায়ীর সাথে সখ্য গড়ে উঠেছিল। কিশোর নজরুলের প্রতিভাকে ব্যবহার করে ব্যবসায়িক স্বার্থ সিদ্ধির গোপন আকাঙ্ক্ষা নিয়ে আলী আকবর খান এই সখ্য গড়ে তুলেছিলেন।

এই গোপন আকাঙ্ক্ষাকে ফলপ্রসূ করার জন্যই নজরুলকে নিয়ে গিয়েছিলেন তার নিজের বাড়ি কুমিল্লার মুরাদনগর থানার দৌলতপুরে। সেখানে নজরুল অকল্পনীয় আদর-আপ্যায়ন পেয়েছিলেন। খান বাড়ির অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার ঘটেছিল। এছাড়া নজরুলকে উদ্দেশ্য করে কৃত্রিমভাবে আনন্দ-উল্লাসের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছিল। বস্তুত, নজরুলকে আটকানোর জন্যে নানা ধরনের ফন্দি-ফিকির ও পরিকল্পনা করেছিলেন আলী আকবর খান।

খান বাড়ির কোনো মেয়েই তেমন নিখুঁত সুন্দরী ছিল না, যাকে দেখে নজরুল আকৃষ্ট হতে পারেন। আলী আকবর খানের বিধবা বোন আসমাতুন নেসার কন্যা সৈয়দা খাতুন ছিল বেশ সুন্দরী। ফলে সৈয়দা খাতুনকেই পুঁজি করে নজরুলকে আটকানোর প্রধান জাল পেতেছিলেন আলী আকবর খান। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই আসমাতুন নেসা তাঁর সুন্দরী তরুণী কন্যাকে নিয়ে ঘনঘন যাতায়াত শুরু করেছিলেন ভাইয়ের বাড়ি।

এই সুন্দরী তরুণী নজরুলের মন জয় করতে সক্ষম হয়েছিলেন। নজরুল এতোটাই দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন যে, সৈয়দা খাতুনের নাম পাল্টে নার্গিস আসার খানম রেখেছিলেন। এক আচেনা পল্লি-বালিকার কাছে নজরুল নিজেকে এতোটাই সমর্পণ করেছিলেন যে, জীবনে আর কোনো নারীর কাছে করেননি। নজরুলের সম্মতিতেই বিয়ের প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন আলী আকবর খান।

একদিকে দাওয়াতপত্র বিতরণ চলছে, অন্যদিকে খান বাড়ির অন্দরমহলের একটি ঘটনা নজরুলের মনকে বিষিয়ে তুলেছিল। এই ঘটনায় বিয়েটাই নজরুলের কাছে বিতৃষ্ণার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল।

নার্গিস ছিল প্রায় অশিক্ষিত মেয়ে। নজরুল তা জানতেন। বিয়ের কথা পাকা হতেই আলী আকবর খান তাঁর ভাগ্নিকে শিক্ষিত করে নজরুলের যোগ্য করে তোলার জন্য আদাজল খেয়ে লাগেন। এতো বড় একজন কবির বউ হবে, তাই অপরিণত নার্গিসকে পরিণত করার জন্য এতোটাই বাড়াবাড়ি শুরু করেছিলেন যে, শরৎচন্দ্র ও অন্যান্য লেখকদের বই এর নারীদের মতো মহীয়সী করে গড়ে তুলতে চাইলেন।

কৃত্রিমভাবে নার্গিসকে গড়া-পিটা করার এ বিষয়টি ভাল চোখে দেখেননি নজরুল। তিনি আলী আকবর খানকে তাঁর বিরক্তির কথা জানিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে কোনো কাজ হয়নি। এমন কি তাঁর বাগদত্তা নার্গিসও মনের অবস্থা বুঝতে চাননি। এতে নজরুলের মন ভেঙে যায় এবং সম্পূর্ণ বিতৃষ্ণ হয়ে পড়েন এই বিয়ের উপরে। এই ব্যাপারটি ছিল আলী আকবর খান এবং তাঁর ভাগিনীয়ীর তরফ হতে নজরুলের ওপর চরম আঘাত ও অপমান।

এরমধ্যে অতিথিদের কাছে নিমন্ত্রণপত্র চলে গিয়েছ। অতিথি অভ্যাগতরা এসে পড়লেন বলে। আলী আকবর খান ও নার্গিসের আচরণে পরিস্থিতি এতোটাই বৈরী হয়ে উঠেছিল যে, বীতশ্রদ্ধ নজরুল একবার ভেবেছিলেন পালাতে পারলেই বাঁচেন। কিন্তু উপায় ছিল না।

শেষ পর্যন্ত নজরুল-নার্গিসের বিয়ে হয়েছিল কি হয়নি এই নিয়ে নানা বিতর্ক আছে। অধিকাংশই মনে করেন, বিয়ে হয়েছিল কিন্তু বাসর হয়নি। বিয়ের পরে নজরুলকে খান বাড়িতেই থাকতে হবে, কাবিন নামায় এমন একটি শর্ত জুড়ে দেওয়ায় নজরুল অপমানবোধ করেন এবং বিয়ের রাতেই পালিয়ে চলে আসেন। এরপরে নজরুল-নার্গিসের আর মিলন হয়নি। তবে, নজরুলের জীবনে প্রথম প্রেমের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন নার্গিস।

নার্গিসের প্রেম নজরুলের জীবনে একটি স্থায়ী ক্ষত। এই ক্ষত রয়ে গেছে আমৃত্যু। গোমতীর তীরের স্মৃতি কোনোদিনই ভুলতে পারেননি। কিশোর নজরুলের আবেগ-সরলতা-বিশ্বাস রক্তাক্ত হয়ে উঠেছিল নার্গিস ও তাঁর মামা নির্মম আঘাতে। ব্যক্তি নজরুল ছিলেন প্রবল অনুভূতিপ্রবণ এবং স্পর্শকাতর মানুষ। জীবনে যা করেছেন, যা চেয়েছেন এবং যাকে ভালবেসেছেন, তা করেছেন লাভ-লোভ-স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠে এবং মন-প্রাণ উজার করে।

একজন সৎ প্রেমিকের মতোই নজরুল আত্মসর্বস্ব বিলিয়ে, বন্ধু-স্বজনদের প্রবল বাধা-অনুরোধ উপেক্ষা করে প্রেমের মর্যাদা দিতে প্রস্তুত হয়েছিলেন। নজরুলের এত বড় আত্মত্যাগের মর্যাদা দেননি নার্গিস, বরং মামা আলী আকবর খানের শিখানো মতো প্রেমের অভিনয় করে গেলেন। নার্গিসের প্রেমের স্বরূপ বুঝতে পেরেছিলেন নজরুল। দু-জনের মিলন না হওয়ার জন্য নার্গিসই দায়ী, একথা নজরুল তার বিভিন্ন কবিতা-গানে প্রকাশ করেছেন।

হয়ত তোমারে করেছে আঘাত, তবু শুধাই আজি,
আঘাতের পিছে আরো-কিছু গো ও-বুকে ওঠেনি বাজি’?
মনে তুমি আজ করিতে পার কি-তব অবহেলা দিয়া
কত সে কঠিন করিয়া তুলেছ তাহার কুসুম-হিয়া?
মানুষ তাহারে করেছ পাষাণÑসেই পাষাণের ঘায়
মুরছায়ে তুমি পড়িতেছ ব’লে সেই অপরাধী, হায়?
(হিংসাতুর, চক্রবাক)

নজরুলের জীবনে প্রথম প্রেমের মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিলেন নার্গিস। কবি নিজেই নার্গিসকে নিবেদন করেছেন ‘জীবনের প্রথম পবিত্র ভালবাসার অঞ্জলি’। নজরুলের জীবন ও সৃষ্টিতে নারীর কল্যাণমূর্তি যেমন আছে, তেমনি আবার আছে নারীর নিষ্ঠুর ও ছলনার মূর্তিও। সচেতনভাবে নজরুল নারীর প্রেমের মহৎ দিকটাই দেখেছেন। কিন্তু অবচেতন মনে দেখেছেন ভেতরের কুৎসিত রূপ। কারণ নার্গিসের দেওয়া আঘাতের ক্ষত কোনোদিনই শুকায়নি অন্তরে।

নজরুল-প্রমীলার প্রেম

নজরুলকে নিয়ে দৌলতপুর যাওয়ার সময় আলী আকবর খান উঠেছিলেন কান্দিরপাড় তাঁর বাল্যসহপাঠী বীরেন্দ্রকুমার সেনগুপ্তের বাড়িতে। এ বাড়িতে তাঁর নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। বীরেন্দ্রকুমারের মাতা বিরজাসুন্দরীকে তিনি মা বলে ডাকতেন। তাঁর দেখাদেখি নজরুলও এই নারীকে ‘মা’ ডাকতে শুরু করেন।

খুব দ্রুত পরকে আপন করে নেবার দুর্লভ চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্য ছিল নজরুলের। অল্প সময়েই বিরজাসুন্দরীর ছেলে হয়ে উঠেছিলেন। নজরুলকে মাতৃস্নেহের আঁচলে বেঁধে ফেলেছিলেন বিরজাসুন্দরী। বীরেন্দ্রকুমারের মা বিরজাসুন্দরী দেবী এবং বিধবা জেঠী-মা গিরিবালা দেবীর যত্নাদরে নজরুল এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, পরবর্তীতে দুঃসময়ে তাদের এখানেই আশ্রয় নিলেন।

বিয়ে ভঙ্গের মানসিক যন্ত্রণাবিদ্ধ নজরুলকে সত্যিকারের কাছের মানুষের মতোই তারা গ্রহণ করেছিলেন। নজরুল এই বাড়িতে ছিলেন প্রায় তিন সপ্তাহ। এরই মধ্যে নতুন করে প্রেমে পড়েন গিরিবালা দেবীর একমাত্র মেয়ে আশালতা সেনের।

তখন নজরুলের বয়স বাইশ বছর, আর আশালতা সেনের বয়স মাত্র তের বছর। তাঁর ডাক নাম ছিল ‘দোলন’, কেউ ‘দুলি’ও ডাকত। এই প্রেমের সূত্রে নজরুল নিয়মিত কুমিল্লায় যেতেন। নজরুল-প্রমীলার প্রেম ধীরে ধীরে এমন গভীর হয়েছিল যে, মিলনের জন্য ধর্ম আর কোন বাধাই ছিল না।

বিয়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়। এ বিয়েতে পূর্ণ সমর্থন ও সহযোগিতা ছিল কন্যাপক্ষের একমাত্র অভিভাবক মা গিরিবালা দেবীর। তারপরেও এ বিয়ে নিষ্কণ্টক ছিল না। সমাজ এ ক্ষেত্রে ছিল বড় বাধা। বিশেষত, রক্ষণশীল সনাতন হিন্দু সমাজ কোনমতেই এ বিয়ে মানতে রাজী ছিল না। এমন কি নজরুলের ধর্মমাতা বিরজাসুন্দরী দেবীও অমত ছিল এ বিয়েতে। তাঁর স্বামী ইন্দ্রকুমার সেনগুপ্ত ছিলেন এ বিয়ের ঘোর বিরোধী। নজরুলের ঘনিষ্ঠজন বীরেন্দ্রকুমারও চাননি এ বিয়েটা হোক। তিনি বিয়ের বিরুদ্ধে বিবৃতিও দিয়েছিলেন। এই বিয়ের কারণে নজরুলের প্রতি বিরজাসুন্দরীর প্রসন্ন চিত্তে চিড় ধরেছিল।

এছাড়া এ বিয়েতে ধর্মীয় বাধাও কম ছিল না। সমাজের কোন একটা কাঠামোর সঙ্গে বাঁধতে হবে, অন্যথা বিয়ে আইনসম্মত হয় না। কিন্তু প্রমীলাকে ধর্মান্তর করিয়ে অর্থাৎ ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করে বিয়ে করার কথা নজরুল চিন্তাও করতে পারতেন না। গিরিবালা দেবী আর প্রমীলাও তাতে রাজী হবেন কেন? অনেক ভাবার পর একটি উপায় বের হয়। যারা ‘আহলুল কিতাব’ অর্থাৎ কিতাবওয়ালা, তাদের মেয়েদের স্বধর্মে রেখেই মুসলমানরা বিয়ে করতে পারে। কিন্তু মুসলমানরা শুধু ইহুদি, খ্রিস্টান ও মুসলমানদের কিতাবওয়ালা ধরে। হিন্দুদের ধরে না। ফলে হিন্দু-মুসলমানের বিয়েতেও নিষেধাজ্ঞা বিদ্যমান।

ভারবতবর্ষ এত প্রাচীন সভ্যতার দেশ, এত জনবসতির দেশ, এখানে অবশ্যই কোন না কোন নবীর আগমন ঘটেছে। আর এ যুক্তিতেই মোঘল সম্রাটরা সম্ভবত, হিন্দু নারী বিয়ে করেছিলেন। সুতরাং হিন্দুরাও ‘আহলে কিতাব’-এই যুক্তিতে কাজী নজরুল ইসলাম ও আশালতা সেনগুপ্তার বিয়ে হয়েছিল ১৯২৪ সালের ২৪ এপ্রিল তারিখে। ঘরোয়া পরিবেশে, অনাড়ম্বর এবং অত্যন্ত সংক্ষিপ্তভাবে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়। আর তা হয় মুসলমান রীতি মেনেই।

নার্গিসের মতো প্রমীলা নজরুলের সাথে প্রতারণা করেননি। পাহাড়সম ধর্মীয়, সামাজিক ও পারিবারিক বাধা ডিঙিয়ে নজরুলের মতো ভবঘুরে বাউণ্ডুলেকে জীবনসঙ্গী করে অসীম সাহসিকতার এবং একনিষ্ঠ প্রেমের দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন। নিজে একা নন, মাকে পর্যন্ত এই অনিশ্চয়তার জীবনের সাথে জড়িয়ে সমাজ-সংসার ছেড়েছিলে। এ যে কত বড় প্রেমের পরীক্ষা তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কবির চরম দারিদ্র্যপীড়িত লাঞ্ছিত জীবনের সবটুকু দায়ভার প্রমীলা একাই বহন করে গেছেন পুরোটা জীবন ধরে। বিনিময়ে শুধু চাইতেন নজরুল যেন বড় কবি হয়।

সন্তান-সংসারের অসহনীয় পরিস্থিতি এবং দারিদ্র্যের অভিশাপে জর্জরিত প্রমীলার বুকভরা আর্তনাদ কেউ দেখে নি। দেখেছে শুধু নজরুলের অমর কীর্তি। মনে রেখেছে নজরুলকেই আজ। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য নীরবে কত বড় দান করে গেলেন প্রমীলা! আরও একটি বিষয়, নার্গিসের প্রতারণা আর ফজিলাতুন্নেসার প্রেম প্রত্যাখ্যান কালবৈশাখি ঝড়ের মতোই তছ্নছ্ করে দিয়েছিল নজরুলের দেহ-মন-বিশ্বাস। আর তখন কল্যাণকামী দেবীর মতোই প্রমীলা আঁকড়ে ধরেছিলেন নজরুলকে। নইলে নজরুল বখে যেতে পারতেন। আর তখন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের জন্য ঘটে যেত বড় রকমের দুর্ঘটনা।

নজরুল-ফজিলাতুন্নেসার প্রেম

নজরুলের প্রেমের ইতিহাসে দুই নারী, নার্গিস ও প্রমীলার নাম সকলের জানা ছিল। জীবনের কোন এক পর্যায়ে কোন এক বিদূষী উচ্চশিক্ষিত নারীর প্রতি প্রচ- রকমের দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন নজরুল, এ কথা প্রায় অজানা ছিল। সৈয়দ আলী আশরাফ সম্পাদিত ‘নজরুলের প্রেমের এক অধ্যায় (করাচি বিশ্ববিদ্যালয়, আগস্ট, ১৯৬৭)’ গ্রন্থটি প্রকাশের পরই এ সত্য জানা গেল। ১৯২৮ খিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে ‘মুসলিম সাহিত্য সমাজ’ নামক সংস্থার দ্বিতীয় বার্ষিক অধিবেশনে যোগ দিতে এসে তিন সপ্তাহ ঢাকায় ছিলেন নজরুল। এই সময় কাজী মোতাহার হোসেন ফজিলাতুন্নেসার সাথে নজরুলের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন।

ফজিলাতুন্নেসা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম মুসলিম ছাত্রী ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ও বিদূষী ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় হতে গণিতশাস্ত্রে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়ে এম এ ডিগ্রি অর্জন করেছিলেন। আরও উচ্চতর শিক্ষার জন্য স্টেট স্কলারশিপ নিয়ে বিলেতও গিয়েছিলেন। এত বড় উচ্চশিক্ষিত একজন নারীর নজরুলের মত স্বল্প শিক্ষিত একজন পুরুষের প্রেমের প্রস্তাবে সাড়া দেবার মতো যৌক্তিক কারণ ছিল না। ফজিলাতুন্নেসা নজরুলের প্রেম প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তারপরও নজরুল ছিলেন নাছোড়বান্দা, আশা ছাড়েননি। কাঙালের মত প্রেম চেয়ে গেছেন ক্রমাগত।

কাজী মোতাহার হোসেনের কাছে লেখা সাতটি এবং ফজিলাতুন্নেসার কাছে লেখা একটি মোট আটটি প্রেমাকুতিপূর্ণ পত্র তার প্রমাণ। নজরুল মূলত পত্র-কবিতা-গান দিয়ে ফজিলাতুন্নেসার মন জয়ের চেষ্টা চালিয়েছেন। ‘না জানি কী শাস্তি ভোগ করতে হবে আবার।’- বুকে এই ভয় নিয়ে বই-কবিতাও পাঠিয়েছিলেন। বাস্তবে দু’জন মুখোমুখি হলে নজরুল চুপচাপ থাকতেন। প্রেম যেখানে গভীর, ভাষা সেখানে নীরব। তুখোড় আড্ডাবাজ, চঞ্চল নজরুল ফজিলাতুন্নেসার মুখের দিকে তাকিয়ে একটি কথাও বলতে পারতেন না। ফজিলাতুন্নেসার প্রতি অপ্রতিরোধ্য আকর্ষণ নজরুলের জীবনের এক করুণ অধ্যায়। একথা নজরুল নিজেই বলেছেন। এ ঘটনায় সংসার উদাসীন হয়ে পড়েছিলেন কিছুদিনের জন্য। নজরুল সপরিবারে তখন কৃষ্ণনগরে থাকতেন। দীর্ঘ দিন ঢাকায় থাকার জন্য প্রমীলার সংসারে নিদারুণ অভাব দেখা দিয়েছিল। একাধিক চিঠি লেখে ও টেলিগ্রাম করেও নজরুলের কোন উত্তর পায় নি প্রমীলা।

নজরুলের জীবনে নার্গিস, প্রমীলার মতো ফজিলাতুন্নেসাও প্রভাব বিস্তারকারী এক রহস্যময়ী নারী। ফলে তাঁর কবিতা-গানে ঐ দু’জনের মতো ফজিলাতুন্নেসার উপস্থিতিও দৃশ্যমান। ফজিলাতুন্নেসার প্রেমকে নজরুল ঋণ হিসেবেই মনে করতেন। আর সে ঋণ শোধ করে গেছেন চোখের জলে ও কলমের কালিতে।

এই সময় নজরুল প্রচুর ব্যর্থ প্রেমের গান লিখেছেন। তার মধ্যে প্রায় সবই বহুল জনপ্রিয় গান। যেমন- ‘কেমনে রাখিব আঁখি-বারি চাপিয়া’, ‘গহীন রাতে কে ঘুম এলে ভাঙাতে’, ‘কেন আন ফুল ডোর’, ‘সাধ না মিটিতে নিশি পোহায়’, ‘জনম জনম গেল আশা পথ চাহি’, ‘দিতে এলে ফুল হে প্রিয়কে আজি’ ইত্যাদি।

বিরহ কাতর সময়ে লেখা নজরুলের প্রায় গানেই ফজিলাতুন্নেসার সজীব উপস্থিতি লক্ষ করি। কবির এই প্রেমিকা আনন্দ, বেদনা, তৃপ্তি এবং আঘাত সবই দিয়েছে। উচ্চশিক্ষিত এই প্রেমিকার কাছ হতে কবি যেন প্রেমের নতুন পাঠ নিলেন। আর এই নব চেতনাই পরিলক্ষিত হয় এ সময়ে লেখা গান-কবিতাতে।

প্রেমিকার প্রেম প্রত্যাখ্যান-প্রতারণা-বঞ্চনা সৃজনশীল প্রতিভার জন্যে অনেক সময় আশীর্বাদের হয়ে ওঠে। নজরুলের ক্ষেত্রে তাই ঘটেছিল। প্রেমোত্তর বিরহপর্বে তির্নি আরো বেশি সৃষ্টিশীল হয়ে উঠেন। বিশ্বসাহিত্যে এ ধরনের ঘটনার সাক্ষাৎ পাওয়া যায়। দান্তে তাঁর প্রেমিকা বিয়াত্রিচকে, শেলী তাঁর প্রেমিকা এমিলিয়াকে, কীটস্ তাঁর প্রেমিকা ফ্যানি বাউনকে পাননি বলেই মহৎ কবিতা লিখতে পেরেছেন। নজরুলও নিজেকে শেলী-কীট্সের মতোই ভাবতেন।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: