Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ৫

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ৫

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। ডা. সায়ন পাল ।।

কনফারেন্স হলের বাইরে একজন অর্গানাইজার ব্যাচ গলায় ঝোলানো শ্বেতাঙ্গ মহিলাকে জিজ্ঞেস করলাম ইংরেজিতে `আমি কি ভেতরে যেতে পারি?’

`আপনি কি ডেলিগেট?’

বললাম `না,আমার বন্ধুর লেকচার আছে তাই শুনতে চাইছি।’

কী একটা ভেবে উনি হেসে বললেন ‘ওকে ঠিক আছে , এটাই কনফারেন্সের লাস্ট সেশন সেজন্য আপনাকে অনুমতি দিচ্ছি।’

বিরাট কনফারেন্স হল, দেশ-বিদেশের প্রায় হাজার খানেক ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ টিটুদার লেকচার শুনছে।  নীল রঙের সুট আর পার্পেল কালারের সিল্কের টাইতে টিটুদাকে দারুণ দেখাচ্ছে। বিশাল  দুটো জায়ান্ট স্ক্রিনে  হলে দুদিকে টিটুদার প্রেজেন্টেশন দেখানো হচ্ছে। লেকচার শেষে তুমুল হাততালি। এরপর প্রশ্ন উত্তর পর্ব প্রায় মিনিট দশেক। বিভিন্ন প্রশ্নের সপ্রতিভ জবাব দিলো টিটুদা। অনেকেই টিটুদার ক্লিনিক্যাল রিসার্চ এর প্রশংসা করলেন। প্রশ্নোত্তর শেষে আবার তুমুল হাততালির মধ্যে নিচে নেমে সামনের সারিতে এসে বসলো টিটু দা। আমি একদম শেষ সারিতে বসে অপেক্ষা করছি কনফারেন্স শেষ হওয়ার। আরো কিছু লেকচার শেষে কনফারেন্স শেষ হলো। বাইরে বেরিয়ে এক্সিট গেটের সামনে দেখি টিটুদা বেশ কিছু বিশেষজ্ঞের সঙ্গে আলোচনায় মগ্ন। বিরক্ত করলাম না। আলোচনা শেষে যখন ভিড় পাতলা হয়ে এসেছে আলতো করে হাত রাখলাম টিটুদার  পিঠে।

প্রবল বিস্ময় টিটুদা চোখ খুশিতে ঝলমলিয়ে উঠলো।

‘তুই এখানে? আমাকে জানাস নি তো।’

‘আজি  এলাম, আমার ইউনিভার্সিটি সাথে ভিয়েনা ইউনিভার্সিটি (ইউনিভার্সিটি  ওয়েন) একটা কোলাবরেশন করেছে। তাই একটা টিচার্স  ডেলিগেশন ভিজিট করার কথা ছিল। আমি ইচ্ছে করেই জানায়নি তোমাকে সারপ্রাইজ দেয়ার জন্য।’

‘হোয়াট এ প্লিজেন্ট সারপ্রাইজ।’

টিটুদার পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন একজন ইউরোপীয় পুরুষ ও মহিলা।

টিটুদা আমাকে নিজের বান্ধবী বলে (ফিয়ান্সে) বলে ওনাদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিলো। পুরুষ মানুষটি বিখ্যাত হেড এন্ড নেক অনকোলজিস্ট ডক্টর এগসটোন পিটার, উনি হাঙ্গেরীয়ান। আর ভদ্র মহিলাটি ডক্টর এরিন উনি ক্যানাডা থেকে এসেছেন। ওনার বিষয় গাইনোকোলজি অনকোলজি, অর্থাৎ মহিলাদের জনন তন্ত্র সম্পর্কিত ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ।

টিটুদা আমার দিকে দেখিয়ে বলল ‘ওর ক্যান্সার সম্পর্কে জানার খুব আগ্রহ।’

শুনে ডক্টর এরিন বললেন ‘সন্ধ্যেবেলা কি করছেন আসুন না ক্যাফে হাভেলকাতে এক কাপ কফি খেয়ে গল্প করা যাবে।’

বহু পুরনো বিখ্যাত কফিশপ ক্যাফে হাভেলকা। বহু জ্ঞানী গুণী ব্যক্তি সাহিত্যিকদের আড্ডাস্থল । কফি কাপে চুমুক দিয়ে টিটুদা আমার দিকে ফিরে বললো ‘তোর কিছু জিজ্ঞেস করার থাকলে ডক্টর এরিন বা পিটারকে জিজ্ঞেস করতে পারিস।’ কথাবার্তা হলো ইংলিশ এ আমি বাংলা করে লিখছি।

দুজন বেশ হাসিখুশি মানুষ। মুখে সম্মতির হাসি ঝুলিয়ে ওরা বললেন ‘অবশ্যই।’

‘আমাদের দেশে মুখ ও গলার ক্যান্সার তো খুবই বেশি। তাই জানতে চাইছিলাম এই ক্যান্সার কি চিকিৎসায় সম্পূর্ণ সেরে যায়?’

পিটার বললেন ‘অবশ্যই। এই ক্যানসারে সেরে যাওয়ার হার খুবই ভালো। অবশ্য যদি না অসুখটা শরীরের অন্যান্য অঙ্গে ছড়িয়ে গিয়ে থাকে।’

‘মানে মেটাস্টাসিস বলছেন?’

‘ইয়েস মেটাস্টাসিস।’

‘এই-চিকিৎসা মূলত কিভাবে হয়?’

‘দেখো মুখ আর গলার ক্যান্সারকে আমরা প্রধানত পাঁচটি ভাগে ভাগ করতে পারি। একটা হলো ওরাল ক্যাভিটি মানে ঠো্‌ মাড়ি, জিহ্বার যে অংশটা নড়াচড়া করে, তালু্‌জিভের নিচের অংশ। দ্বিতীয়টা হলো জিহবার পেছনভাগ, টনসিল, জিহ্বা আর স্বরযন্ত্রের (লারিংস) মাঝামাঝি অংশ এগুলোকে বলে ওরফারিংস,  আর স্বরযন্ত্র ও তার ওপর নিচের অংশ নিয়ে হলো লারিংস, আর লারিংস এর পেছনে এবং নিচের অংশকে বলে হাইপফারিংস। এছাড়া নাকের পেছনদিকে বলে নাসোফারিংস। এছাড়াও নাকের ক্যান্সার, লালা গ্রন্থির ক্যান্সার্‌সাইনাসের ক্যান্সার, কানের ক্যান্সার ইত্যাদি ও হতে পারে। মূলত অরাল ক্যাভিটি ক্যান্সারের চিকিৎসা হলো অপারেশন সম্ভব হলে অপারেশন করে কেটে বাদ দেয়া এবং তারপর রেডিও থেরাপি দরকার হলে দাওয়া এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তার সঙ্গে কেমোথেরাপিও যুক্ত করা।

অন্যদিকে ওরোফারিংস, হাইপোফারিংস এদের ক্যান্সার এর মূল চিকিৎসা রেডিওথেরাপি এবং এডভান্স স্টেজে রেডিওথেরাপির সঙ্গে একসাথে কেমো থেরাপি দেয়া।

‘আর স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারে?’

‘হ্যাঁ স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারটা গুরুত্বপূর্ণ কেননা স্বরযন্ত্রের ক্যান্সারের চিকিৎসা ছিল স্বরযন্ত্র কেটে বাদ দেয়া এবং এর ফলে রোগীর কথা বলার ক্ষমতা একেবারে নষ্ট হয়ে যায়। সেজন্য যদি দেখা যায় যে রোগীর লারিংস বা স্বরযন্ত্র ক্যান্সার সত্বেও কার্যকারিতা হারায় নি, সে ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপি এবং কেমোথেরাপি একসাথে চিকিৎসার মাধ্যমে ক্যান্সার সারিয়ে তোলা সম্ভব রোগীর লারিংসকে কার্যক্ষম রেখে, অর্থাৎ কথা বলা এবং খাবার খাওয়া শ্বাস নেয়ার অসুবিধে না করে।’

‘বাহ ব্যাপারটা তো বেশ ইন্টারেস্টিং, কিন্তু শুনেছি রেডিও থেরাপির অনেক সাইড এফেক্ট?’

‘গুড কোশ্চেন। যেহেতু ক্যান্সারটা মুখের এবং গলার তাই এই অংশটা বাদ দিয়ে রেডিয়েশন দেয়া সম্ভব না । কাজেই কিছু কিছু সাইডএফেক্ট আমরা আভয়েড করতে পারি না। তবে গত দুই দশকে রেডিওথেরাপি টেকনিকের অভাবনীয় উন্নতির ফলে এবং আইএমআরটি  বা ইনটেনসিটিমডুলেটেড রেডিওথেরাপি এবং আরো অন্যান্য কনফর্মাল ট্রিটমেন্ট টেকনিক যেমন ভলিউমএট্রিক আর্কথেরাপি বা টোমোথেরাপি আবিষ্কার হবার ফলে এই সাইডএফেক্ট অনেকাংশেই খুব কমে গেছে। মূলত রেডিয়েশন এর ফলে আগে লালা গ্রন্থির কার্যকারিতা কমে যেত এবং রোগী ড্রাই মাউথ কমপ্লেন করতো। মানে মুখ শুকিয়ে যাওয়া, খাবার খেতে অসুবিধা হওয়া। এই সমস্যাগুলো খুবই কষ্টদায়ক ছিল । কিন্তু এই সব নতুন টেকনিকের মাধ্যমে লালা গ্রন্থির কার্যকারিতা সম্পূর্ণভাবে রক্ষা করা সম্ভব। এবং খাবার গেলার জন্য যে মাসেলগুলো দরকার সেই মাসেল বা মাংসপেশির কার্যকারিতা সম্পূর্ণরূপে রক্ষা করা সম্ভব। এমনকি কিছু কিছু ইমিডিয়েট সাইডইফেক্ট আছে যেগুলো রেডিয়েশন চলার সময় রোগী অনুভব করে সেগুলো কমিয়ে দেয়া সম্ভব হয়েছে?’

‘কিন্তু ধরুন এই যে অপারেশনগুলো হয়, এগুলো তো অনেক বড় অপারেশন এবং এতে মুখের বিকৃতি হয়। সেটা রোগীর সামাজিক জীবনে তো খুবই প্রভাব বিস্তার করবে।’

‘রেডিয়েশন থেরাপি যেমন উন্নতি হয়েছে তেমনি সার্জারির অনেক উন্নতি হয়েছে। বিভিন্ন ধরনের  ফ্ল্যাপ  বা  গ্রাফট টেকনিক এর সাহায্যে রিকনস্ট্রাকটিভ সার্জারি বা পুনর্নির্মাণ অপারেশনের মাধ্যমে এই ধরনের বিকৃতি অনেকাংশেই ঠিক করে দেয়া সম্ভব।’

‘আর কেমোথেরাপি তো শুনেছি খুবই কষ্টকর নেয়া।’

‘হেড নেক ক্যান্সার এর ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি ব্যবহার করা হয় মূলত রেডিওথেরাপির কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য। এর ডোজ তুলনামূলকভাবে অনেকটাই কম। তাই এর সাইডএফেক্টও অনেকটাই কম।’

‘তা এই মুখ আর গলার ক্যান্সারে টারগেটেড থেরাপি ধরনের কোনো নতুন চিকিৎসা আসেনি?’

‘বোঝা যাচ্ছে আপনি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞের বান্ধবী। ভেরি গুড কোশ্চেন। হেড নেক ক্যান্সার এর ক্ষেত্রেও টার্গেট থেরাপি এসেছে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে সফল হয়েছে। এই থেরাপিগুলো রেডিও থেরাপির কার্যকারিতা বাড়ানোর জন্য রেডিও থেরাপির সঙ্গে একসঙ্গে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এখনো পর্যন্ত হেড নেক ক্যান্সার এর ক্ষেত্রে। রেডিও থেরাপি, সার্জারি এবং রেডিওথেরাপি সঙ্গে কেমোথেরাপি এইটাই মূল চিকিৎসা।’

‘তার মানে এখানেও বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের সম্মিলিত চিকিৎসা প্রয়োজন?’

‘নিশ্চয়ই প্রায় সব ক্যানসারই মাল্টিডিসিপ্লিনারি অ্যাপ্রচ অর্থাৎ বিভিন্ন বিশেষজ্ঞের একসাথে অংশগ্রহণ এর মাধ্যমে চিকিৎসা এবং নিরাময় হয়ে থাকে।’

ডক্টর এরিন আর টিটুদা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গল্প করছিল, মোজারট, কাফকা এইসব । আমাদের কথা শেষ হতে  ডক্টর এরিন প্রস্তাব করলেন ‘চলুন না আমরা ভিয়েনা স্টেট অপেরাতে একটা কনসার্ট শুনে আসি।’

টিটুদা বললো ‘উত্তম প্রস্তাব ভিয়েনা এসে কনসার্ট না শুনলে যাত্রাটা অসম্পূর্ণ রয়ে যেত।’

আমি বললাম ‘দারুণ ব্যাপার। কিন্তু ডক্টর এরিন এর কাছ থেকে যে অনেক কিছু জানার ছিল মেয়েদের ক্যান্সার বিষয়ে।

ডক্টর এরিন বললেন ‘কন্সারট এর পরে এখানকার বিখ্যাত স্নিটজেল খেতে খেতে না হয় কথা বলা যাবে।’

নভেম্বর মাসের মিষ্টি শীতে আমরা চারজন রওনা হলাম স্টিফেনপ্লা্য এর দিকে। মাথাটা দপদপ করছে, মনে হয় ঠান্ডাতে। বেরনর আগে ওয়াশরুমে গিয়ে একটা পেইনকিলার খেয়ে নিয়েছি। এই সুন্দর বিকেলটা নষ্ট করার কোনো মানে হয় না। অস্বাভাবিক পরিচ্ছন্ন এই শহর। রাস্তায় বেরিয়ে আমার হাত নিজের হাতে পুরে নিলো টিটুদা।           

ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখছেন উত্তরকালে

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: