Zee5 Contract Coming Soon

মার্কিন নিষেধাজ্ঞায় আইটি ব্যবসায় নতুন সমীকরণের ইঙ্গিত

।। টেকশহর, ঢাকা ।।

বেশ কিছুদিন ধরে গুঞ্জন চলার পর অবশেষে মার্কিন সরকার চীনা প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।

নতুন নিষেধাজ্ঞার ফলে মার্কিন জায়ান্ট গুগল হুয়াওয়ের সঙ্গে তাদের বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করেছে। ফলে এখন থেকে আর হুয়াওয়ে তাদের ফোনে গুগলের প্লে স্টোর, ইউটিউব, জিমেইল, ক্রোম বাউজারসহ অন্যান্য সার্ভিস ব্যবহার করতে পারবে না।

এতে বিপদের মুখে পড়বে হুয়াওয়ের স্মার্টফোন ব্যবসা। কারণ তারা মার্কিন প্রতিষ্ঠান গুগলের অ্যান্ড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেমের নির্ভরশীল।

এছাড়াও গুগলের সিকিউরিটি আপডেট থেকেও বঞ্চিত হবে পুরনো সব হুয়াওয়ের ফোন ব্যবহারকারীরা। 

যদিও ওপেন সোর্স হওয়ার কারণে অ্যান্ড্রয়েডের পাব্লিক রিলিজগুলো (এওএসপি) ব্যবহার করতে পারবে হুয়াওয়ে। কিন্তু সেটির সেবাও যথেষ্ট নয়। ফলে অনেকেই গুগল প্লের সেই প্রয়োজনীয় সেবাগুলো ছাড়া স্মার্টফোন কিনতেও চাইবে না।  

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জারি করা এক নির্বাহী আদেশের ভিত্তিতে মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ হুয়াওয়েকে একটি তালিকাভুক্ত করেছে।  এর আওতায় মার্কিন কোন প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের কাছে কোন হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার পণ্য বিক্রয় করতে পারবে না। যদি এই অবস্থায় হুয়াওয়ের সঙ্গে কেউ ব্যবসা করতে চায় তবে তাকে আলাদাভাবে মার্কিন সরকারের কাছ থেকে লাইসেন্স নিতে হবে। 

তবে সফটওয়্যারের পাশাপাশি হার্ডওয়্যারের জন্যেও চীনা প্রতিষ্ঠানটি মার্কিন আরও কিছু প্রতিষ্ঠান যেমন- কোয়ালকম, ইন্টেলের উপর নির্ভরশীল। এসব প্রতিষ্ঠান থেকে যন্ত্রাংশ কেনার ক্ষেত্রেও নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়বে হুয়াওয়ে।

পশ্চিমা দেশগুলোতে অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে হুয়াওয়ের স্মার্টফোন। পরপর কিছু ফ্ল্যাগশিপ ফোন এনে অ্যাপলের সঙ্গে টক্কর দিতে শুরু করে চীনা প্রতিষ্ঠানটি। গুগলের এমন সরে আসার খরব নিশ্চয় ভালোভাবে নেবে না পশ্চিমারা। ফলে ব্যবসায় বড় ধরনের সমস্যার সম্মুখীণ হতে পারে বলে ধারণা করছেন বিশ্লেষকরা।

তিনমাসের জন্য প্রস্তুত হুয়াওয়ে

যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার খগড় শুধু হুয়াওয়ের উপরে পড়েনি। চিপ সরবরাহকারী প্রধান তিন কোম্পানিও এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। নিষেধাজ্ঞার ফলে প্রসেসর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ইন্টেল, ব্রডকম ও কোয়ালকমকে চুক্তি বাতিল করতে হবে হুয়াওয়ার সঙ্গে।

সংবাদ মাধ্যম ব্লুমবার্গ জানিয়েছে, হুয়াওয়ার সঙ্গে সব লেনদেন স্থগিত রাখার ব্যাপারটি প্রসেসর সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর কর্মীদেরকে নোটিশ দিয়ে জানানো হয়েছে। পরবর্তী নির্দেশনা না আসা পর্যন্ত এই নিয়মের পরিবর্তন হবে না।

ল্যাপটপ তৈরির জন্য হুয়াওয়েকে সার্ভার চিপ ও প্রসেসর সরবরাহ করে ইন্টেল। ব্রডকমের কাছ থেকে বিভিন্ন উপাদান নিয়ে তারা নেটওয়ার্কিংয়ের যন্ত্রাংশ তৈরি করে। কোয়ালকমের কাছ থেকে তারা মডেম ও অন্যান্য প্রসেসর নিয়ে থাকে। যদিও নিজেস্ব মোবাইল প্রসেসর ও মডেম তৈরির কারণে কোয়ালকমের উপর খুব বেশি নির্ভরশীল নয় হুয়াওয়ে।

হঠাৎ করেই যে এরকম নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে সে সম্পর্কে আগেই আভাস পেয়েছিলো হুয়াওয়ে। তাই বছর খানেক আগে থেকেই নিজেস্ব চিপ ডিজাইন করার পাশাপাশি তারা যুক্তরাষ্ট্র থেকে প্রচুর পরিমাণে চিপ ও প্রয়োজনীয় উপাদান মজুদ করা শুরু করে। যে পরিমাণ চিপ ও অন্যান্য উপাদান তারা মজুদ করেছে তা দিয়ে আগামী তিন মাস তাদের কাজ চলে যাবে। এই সময়ের মধ্যেই স্পষ্ট হয়ে যাবে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাটি স্থায়ী নাকি অস্থায়ী।

এদিকে, হুয়াওয়ের ল্যাপটপের জন্য উইন্ডোজ অপারেটিং সিস্টেম সরবরাহ করা অব্যাহত রাখবে কিনা তা জানায়নি মাইক্রোসফট। তবে ধারণা করা হচ্ছে, মাইক্রোসফটও যুক্তরাষ্ট্র সরকারের নির্দেশনা এড়িয়ে চলতে পারবে না।

নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেমের পথে হুয়াওয়ে

মার্কিন বাণিজ্য বিভাগ নিষেধাজ্ঞা জারি করায় মার্কিন কোনো প্রতিষ্ঠান হুয়াওয়ের কাছে হার্ডওয়্যার বা সফটওয়্যার পণ্য বিক্রি করতে পারবে না।

তবে হুয়াওয়ের ফোনে অ্যান্ড্রয়েডের অপারেটিং সিস্টেম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হলেও এতে ফোনটির ব্যবহারকারীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন না। অ্যান্ড্রয়েডের অফিশিয়াল টুইটার পেইজে এ তথ্য জানানো হয়েছে। গুগল প্লে ব্যবহার করতে পারার পাশাপাশি তারা নিয়মিতভাবে সিকিউরিটি আপডেটও পাবেন।

ব্যবহারকারীদের জন্য এটা স্বস্তিদায়ক খবর হলেও ট্রাম্প প্রশাসনের সিদ্ধান্তের ফলে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশ্ব প্রযুক্তি বাজারেও এর প্রভাব পড়বে বলে জানিয়েছেন খাত সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

গবেষণা ফার্ম ক্যানালিসের বাজার বিশ্লেষক মোজিয়া বলেছেন, ট্রাম্প এই নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের চিপ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ও চীনের ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তাই এটাকে তলোয়ারের সঙ্গে তুলনা করা যায়। যা দিয়ে দুই দিকেই আঘাত করা সম্ভব।

তিনি আরও জানান, হুয়াওয়ের তৈরি করা ফাইভজির যন্ত্রাংশগুলোর দাম কম। কিন্তু এখন তাদেরটা বাদ দিয়ে মার্কিন টেলিকমিউনিকেশন প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত দাম দিয়ে অন্যদের কাছ থেকে তা কিনতে হবে। এই খাতে এরিকসন ও নকিয়াই রাজত্ব করছে। তবে এগুলো যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান নয়।

বর্তমানে হুয়াওয়ের সঙ্গে ইউরোপিয়ান দেশগুলোর সম্পর্ক ভালো। তবে যুক্তরাষ্ট্রের এই নিষেধাজ্ঞা অন্য দেশগুলোকেও প্রভাবিত করতে পারে। এর আগে অস্ট্রেলিয়ায় ফাইভজি যন্ত্রাংশ বিক্রির অনুমতি হারিয়েছে হুয়াওয়ে। তবে ফাইভজি যন্ত্রাংশের দাম কম রাখায় এবং সেগুলো অত্যাধুনিক হওয়ায় আর কোনো দেশ হয়তো হুয়াওয়ের সঙ্গে ব্যবসায়িক সম্পর্ক নষ্ট করবে না।

মার্কেট রিসার্চ প্রতিষ্ঠান কান্টার এএমআরবির ভাইস প্রেসিডেন্ট শুখদেব সিং জানিয়েছেন, যুক্তরাষ্ট্র যদি হুয়াওয়েকে নিষিদ্ধ করতে অন্যান্য দেশকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে তবে বিপদে পরবে হুয়াওয়ে। ব্যবসা থেকে ছিঁটকে পড়লে প্রতিযোগিতা কমে যাবে। এতে নতুন কিছু উদ্ভাবনের চেষ্টাও বাধাগ্রস্ত হবে।

পুরো বিষয়টি নিয়ে হুয়াওয়ের বক্তব্য হলো, তারা এখন প্ল্যান ‘বি’ অনুসরণ করবে। এই প্ল্যান বি বলতে তারা নিজস্ব অপারেটিং সিস্টেম তৈরির কথা বুঝিয়েছে।