নতুন না পুরনো চাল, প্রভেদের উপায় থাকছে না

।। রাজু আহমেদ, রাজশাহী ।।

সরকারি গুদামে নতুন কেনা চাল ঢোকানোর কিছু নিয়ম রয়েছে। রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) নাজমুল হক ভুঁইয়া জানান, নিয়মগুলোর অন্যতম হলো, প্রতিটি বস্তা গুদামে প্রবেশের আগেই স্টেনসিল করিয়ে প্রবেশ করাতে হবে। এটি বাধ্যতামূলক।

এই স্টেনসিল বা সিলে থাকে সুনির্দিষ্ট নম্বর, যেগুলো থেকে চালগুলো কবে সরবরাহ করা হয়েছে, তা বস্তা দেখেই বোঝা যায়। এজন্য গুদামে শ্রমিকদের টিন কেটে একটি ফর্মা তৈরি করে দেয়া হয়।

কিন্তু রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামে নতুন কেনা চাল প্রবেশ করানোর ক্ষেত্রে উপেক্ষিত হচ্ছে সেই নিয়ম। সোমবার সরেজমিন নগরীর শিরইল এলাকার সেই গুদামে গিয়ে দেখা গেছে, স্টেনসিল ছাড়াই বস্তায় বস্তায় চাল ট্রাক থেকে নামিয়ে গুদামে প্রবেশ করানো হচ্ছে।

খাদ্য বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামের নতুন চাল সরবরাহের জন্য শাহমখদুম রাইস মিলের কর্তৃপক্ষের সাথে ক্রয় চুক্তি করা হয়। এ লক্ষ্যে চালকল কর্তৃপক্ষ এই মধ্যে ১০০ টন চাল সরবরাহ করেছে বলে জানিয়েছেন মিলের ম্যানেজার তানভির সুলতান। তিনি জানান, সোমবার অবধি তারা ১৫৮ টন চাল সরবরাহ করেছেন। তবে এসব চাল গুদামে প্রবেশ করানোর আগে নিয়মানুযায়ী স্টেনসিল হয়নি।

খাদ্য গুদামে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, ৪নং গুদামটিতে রাখা রয়েছে নতুন সরবরাহ করা চাল। সেখানে পুরাতন চাল রয়েছে প্রায় ৪৪৯ টন। এবার নতুন চাল ক্রয়ের বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৫৪৯ টন। তারই অংশ হিসেবে গুদামে নতুন করে আরো চাল ভর্তি বস্তা ঢোকানো হচ্ছে। প্রতিটি বস্তায় রয়েছে ৩০ কেজি চাল। পাটের তৈরি বস্তাগুলো সরকারের সরবরাহকৃত। মিল থেকে সেই বস্তায় চাল ভরে নিয়ে এসে সারিবদ্ধ করে রাখা হচ্ছে গুদামে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে খাদ্য বিভাগের একাধিক সংশ্লিষ্টজন জানান, স্টেনসিল ছাড়া এভাবে গুদামে চাল প্রবেশ করানো হলে নতুন ও পুরাতন চালের বস্তা চেনার উপায় থাকে না। ফলে এই দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে নতুন চাল দেয়ার নামে পুরনো চালই গুদামে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করতে পারে অসাধু চক্র।

সংবাদকর্মীদের প্রশ্নের মুখে ওসি-এলএসডির নির্দেশে গুদামে ঢোকানো বস্তায় অবশেষে স্টেনসিল মারা শুরু করেন শ্রমিকরা। কিন্তু প্রশ্ন হলো, গুদামে স্তূপ হয়ে থাকা সবগুলো বস্তায় কি স্টেনসিল মারা সম্ভব হবে?

নিয়ম না মেনে স্টেনসিল ছাড়া চাল গুদামে ঢোকানোর বিপদ ব্যাখ্যা করে তারা আরও জানান, খাদ্য গুদাম থেকে প্রয়োজনীয় ডিও’র মাধ্যমে চাল বা গম সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা অনুদান সংশ্লিষ্টদের দেয়া হয়। তবে সেই চাল বা গম সংশ্লিষ্টরা অনেক সময় না নিয়ে গোপনে কতিপয় মিল মালিক বা গুদাম সংশ্লিষ্টদের কাছে বিক্রি করে দেয়ার ঘটনা ঘটে থাকে। যেখানে এমন অনিয়ম হয়, সেখানে খাদ্য শ্যস্যগুলো গুদামেই পড়ে থাকে, আর হাত বদল হয় শুধু বিপুল অংকের অর্থ। পরবর্তীতে সেই খাদ্যশস্যগুলো চুক্তিবদ্ধ মিলারদের মাধ্যমে গুদামে সাপ্লাই করা হয়েছে বলে দেখানোর সুযোগ রয়েছে এই অসাধু চক্রের। ফলে স্টেনসিল দিয়ে সুনির্দিষ্ট না করা হলে সেই অসাধু চক্রের সক্রিয়তার সুযোগ থেকে যায়।

সোমবার রাজশাহী সদর খাদ্য গুদামে স্টেনসিল ছাড়াই কেনো শ্রমিকরা চালের বস্তা প্রবেশ করাচ্ছেন, জানতে চাইলে তারা কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি।

এই অনিয়মের বিষয়ে গুদামটির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি-এলএসডি) মাজেদুল ইসলামের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি তাৎক্ষণিকভাবে শ্রমিকদের স্টেনসিল নিয়ম মেনে ব্যবহার করতে বলেন। এরপর শ্রমিকদের তৎপর হতে দেখা যায়। কিন্তু ততোক্ষণে গুদামে ঢুকে গেছে ১৫৮ টন চালের বেশিরভাগ।

রাজশাহী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক (ভারপ্রাপ্ত) নাজমুল হক ভুঁইয়াকে তার কাছ থেকেই জানা নিয়ম লঙ্ঘন করার বিষয়টি স্মরণ করিয়ে দিলে তিনি বলেন, “শ্রমিকদের অসচেতনতায় দুই একটি বস্তায় স্টেনসিল মিস হতে পরে। তবে হাজার হাজার বস্তা স্টেনসিল না করিয়ে গুদামে প্রবেশ করানো অন্যায়।” এসময় তিনি বিষয়টি নিয়ে পদক্ষেপ গ্রহণের আশ্বাস প্রদান করেন।