Loading...
উত্তরকাল > Content page > সব খবর > ধানচাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক, বিঘাপ্রতি লোকসান ৬ হাজার টাকা

ধানচাষে আগ্রহ হারাচ্ছেন কৃষক, বিঘাপ্রতি লোকসান ৬ হাজার টাকা

পড়তে পারবেন 3 মিনিটে

।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

প্রতি এক বিঘা (৫৬ শতাংশ) জমিতে ইরি-বোরো আবাদে প্রায় সাড়ে ছয় হাজার টাকা করে ঘাটতি হচ্ছে বলে দাবি করছেন টাঙ্গাইলের কৃষকরা। এতে করে তারা ধান চাষে আগ্রহ হারিয়ে ফেলছেন। শ্রমিক সংকট, শ্রমিকের দাম বেশি এবং ধানের দাম কম থাকায় টাঙ্গাইলের প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকের পাকা ইরি-বোরো ধান এখনও জমিতেই পড়ে রয়েছে। সব মিলিয়ে কৃষকরা এখন দিশেহারা হয়ে পড়েছেন।

ধানের কম দাম ও শ্রমিক সংকটের কারণে ধান কাটতে না পারার হতাশা থেকে জেলার কালিহাতী উপজেলার পাইকড়া ইউনিয়নের বানকিনা এলাকার আব্দুল মালেক ও বাসাইল উপজেলার কাশিল গ্রামের নজরুল ইসলাম খান সম্প্রতি তাদের নিজ পাকা ধান ক্ষেতে আগুন দিয়ে প্রতিবাদ জানান। জেলার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জেলায় কৃষকরা ধানের কম দাম নিয়ে প্রতিবাদ জানাতে মানববন্ধন, রাস্তায় ধান ছড়িয়ে প্রতিবাদসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছেন।

প্রত্যন্ত অঞ্চলের কৃষকদের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, ইরি-বোরো চাষে এক বিঘা (৫৬শতাংশ) জমি প্রস্তুত করতে অন্তত ছয় জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ওই সময় শ্রমিকের মজুরি থাকে ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা করে। ট্রাক্টর বাবদ খরচ হয় প্রায় ১৮শ’ থেকে দুই হাজার টাকা। বীজ ও বীজতলা প্রস্তুত করতে শ্রমিকের মূল্যসহ প্রায় ১৫শ’ টাকা খরচ হয়। ধানের চারা রোপণ করতে আট জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। এই আট জন শ্রমিকের খাবারসহ প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়। এরপর ধান ক্ষেত থেকে ঘাস পরিষ্কার (নিরানী) করতে অন্তত চার জন শ্রমিক লাগে। এই চার জন শ্রমিকের খাবারসহ ২৫শ’ টাকার মতো খরচ হয়ে থাকে। ধান কাটতে আবার অন্তত ১০জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি এই সময়ে প্রতিজন ৮শ’ থেকে ৯শ’ টাকা পর্যন্ত থাকে। এই ১০জন শ্রমিকের খাবারসহ প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয় দিনে।  অপরদিকে সার বাবদ প্রায় ৩ হাজার টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে বীজতলা প্রস্তুতসহ কৃষকের সোলানী ধান গোলায় তুলতে প্রায় ৩০জন শ্রমিকের প্রয়োজন হয়। আর এই ৩০জন শ্রমিকের খাবারসহ সব মিলিয়ে কৃষকের খরচ হচ্ছে ২৭ হাজার টাকার ওপরে।  এদিকে ওই এক বিঘা (৫৬ শতাংশ) জমিতে ধান হচ্ছে ২৬ থেকে ২৮মণ করে। আর ভালো ফলন হলে ৩০ মণও হয়। ধানের বর্তমান মূল্য ৫০০ থেকে ৫৫০ টাকা করে। ৫৫০ টাকা হিসেবে ২৮মণ ধানের মূল্য ১৫ হাজার ৪০০ টাকা। কৃষকের ২৭ হাজার টাকা খরচ হলে এক বিঘা (৫৬ শতাংশ) জমিতে কৃষকের প্রায় ১১ হাজার টাকা করে লোকসান হচ্ছে।

বাসাইল উপজেলার কলিয়া গ্রামের কৃষক আব্দুর রশিদ বলেন, আমি প্রায় ৫ বিঘা জমিতে বোরো ধান আবাদ করেছি। এক বিঘা জমিতে ট্রাক্টর, শ্রমিক ও সারের খরচ বাবদ প্রায় ২৭ হাজার টাকা খরচ হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে ২৬ থেকে ৩০ মণ পর্যন্ত ধান হয়। এবার ধানের দাম কম। তাই আমার প্রতি বিঘা জমিতে প্রায় ৬ হাজার টাকা করে লোকসান হবে।

ধানক্ষেতে আগুন দেয়া বাসাইলের কৃষক নজরুল ইসলাম খান বলেন, ধান কাটার শ্রমিকের মজুরি প্রায় এক হাজার টাকা। তারপরও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। অপরদিকে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে ৫শ’ টাকা করে। এছাড়াও ধান ক্ষেতে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে ধানের শীষ চিটা হয়ে শুকিয়ে গেছে। ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হওয়া প্রায় ৫৬ শতাংশের ধান কেটেছি। এই ৫৬ শতাংশ জমিতে মাত্র চার মণ ধান হয়েছে। এক বিঘা (৫৬ শতাংশ) জমিতে আমার প্রায় ২৫ হাজার টাকার লোকসান হয়েছে। তাই দিশেহারা হয়ে ২০ শতাংশ পাকা ধান ক্ষেতে আগুন ধরিয়ে দেই। পরে স্থানীয়রা এসে আগুন নিভিয়ে দেয়। আমি এবার ১২ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছি। এর আট বিঘা জমির ধানে ব্লাস্ট রোগে আক্রান্ত হয়ে চিটা হয়েছে। এবার আমার বোরো আবাদে অনেক টাকার লোকসান হবে।

কৃষক শ্রীবাস মন্ডল বলেন, গত বছর যমুনা সার ধান ক্ষেতে ব্যবহার করতাম। তখন ফলন ভালো হতো। এখন যমুনা সার বাজারে পাওয়া যায় না। এই সারের দাম বর্তমান সারের চেয়ে অনেক কম ছিল। এবার চায়না, সৌদি, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়ার সার বাজারে এসেছে। এসব সার ধান ক্ষেতে ব্যবহার করার কারণে ধানের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

ধানক্ষেতে আগুন দেয়া কালিহাতীর কৃষক আব্দুল মালেক বলেন, ধান কাটতে শ্রমিককে দিতে হচ্ছে প্রায় এক হাজার টাকা। তারপরও শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। ধান কেটে বাড়িতে আনতে এক মণ ধানের পেছনে প্রায় এক হাজার টাকা করে খরচ হচ্ছে। ধান বাজারে নিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে ৫শ’ টাকা করে। প্রতিমণে ঘাটতি পড়ছে ৫শ’ টাকা করে।

তিনি আরও বলেন, ক্ষেতে ধান পাকলেও তা ঘরে তুলতে পারছিলাম না। তাই দিশেহারা হয়ে এক দাগের ৫৬ শতাংশের ধানে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিলাম। পরে এলাকার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীর এসে ধান কেটে দিয়েছে।

একাধিক সার ব্যবসারীর সঙ্গে কথা বলবে তারা জানান, গত বছর যমুনা সার বাজারে ছিল। তখন কৃষকের ধানের ফলন ভালো হতো। কিন্তু এবার বাজারে কয়েকটি দেশের সার আসার কারণে জমিতে ফলন কম হচ্ছে। এই সারের দামও অনেক বেশি।

টাঙ্গাইল জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এখন শ্রমিকের মজুরি বেশি। আর বাজারে ধান মণপ্রতি ৫শ’ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। এই সময়ে ধানের বাজার কিছুটা কম থাকলেও কৃষক যদি ধান সংরক্ষণ করে রাখেন তবে ক’দিন পরেই অধিক মূল্য পাবেন।

এবার জেলার ১২টি উপজেলায় ১ লাখ ৭১ হাজার ৭০২ হেক্টর জমিতে ধান আবাদ হয়েছে বলেও তিনি জানান।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

Follow US

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: