Loading...
উত্তরকাল > Content page > শিল্প ও সাহিত্য > জেন গল্পের সন্ধানে ।। হাসিনুল ইসলাম

জেন গল্পের সন্ধানে ।। হাসিনুল ইসলাম

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

জেন কি? এই প্রশ্ন করা কিংবা এর উত্তর দেয়া যেন গল্পে শোনা দুই মাছের কথোপকথনের মত হবে: একবার এক মাছ তার সঙ্গের অন্য এক মাছকে জিজ্ঞেস করল, ‘আমি সমুদ্রের কথা বহু শুনেছি। কিন্তু এটা কী? এটা কোথায়?’ অন্য মাছটি বলল, ‘সমুদ্রের মাঝেই তুমি বেঁচে আছো, ঘোরাফেরা করছো আর তোমার সত্তার গঠন হয়েছে। সমুদ্র তোমার ভেতরে, আবার বাইরেও। সমুদ্র থেকেই তোমার উৎপত্তি আর সমুদ্রেই তোমার সমাপ্তি। তোমার নিজ সত্তার মতই সমুদ্রও তোমাকে ঘিরে আছে।’ আর তাই ‘জেন কি’ এই প্রশ্নের সঠিক উত্তর হয়ত এটি যে আপনি নিজ অভিজ্ঞতায় তা জানুন। এছাড়া লাও ৎজু এর একটি কথা এ সময়ে মনে আসছে। তিনি বলেছেন: যারা বলেন তাঁরা জানেন না, যারা জানেন তাঁরা বলেন না। সবদিক বিচার করে জেন কি একথার উত্তর দেয়ার চেষ্টা না করে আমরা বরং দেখার চেষ্টা করি এই চিন্তাধারা বা দর্শন বা এটি যাই হয়ে থাকুক না কেন কিভাবে তা সমৃদ্ধি পেল। জেন শিক্ষার্থীরাই বা কিভাবে একে বোধে আনার চর্চা করে থাকে। এসব বলতে গিয়ে যদি আমাদের চেতনা জেন কি তা ব্যাখ্যার জন্য সচেষ্ট হয় তবে সে সুযোগ আমরা গ্রহণ করব।

তাহলে জেন কিভাবে এলো? অতীশ দীপংকরের দেশ এই বাংলাদেশ। আবার ‘জেন’ শব্দটি মূল যে শব্দ থেকে এসেছে সেটিও এ উপমহাদেশের। এরপরও এদেশে জেন ঠিক সুপরিচিত বলে বোধ হয় না। ‘জেন’ শব্দটি জাপানি। এই শব্দটি মূলত সংস্কৃত ‘ধ্যান’ শব্দের চীনা রূপ হতে জাপানে গিয়ে ‘জেন’ হয়ে যায়।

বলা হয়ে থাকে যে বুদ্ধ তাঁর বৃদ্ধবয়সে একবার এক গুরুত্বপূর্ণ ধর্মোপদেশের জন্য শিষ্যদের ডাকলেন। শিষ্যেরা সবাই একত্র হয়ে নীরবে অধীর আগ্রহে বসে আছেন। বুদ্ধ ফুল বিছানো মন্ডপে উঠে আসলেন। তাঁর শিষ্য ও ভিক্ষুদের দিকে তাকালেন। এরপর নুইয়ে পড়ে একটি ফুল তুলে নিয়ে তাঁর চোখ বরাবর ফুলটি ধরলেন। এরপর কোনো কথা না বলে নিজ আসনে ফিরে গেলেন। শিষ্যেরা এক অন্যের দিকে মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে থাকলেন। একমাত্র মহাকাশ্যপ বুদ্ধের দিকে চেয়ে প্রশান-ভাবে হাসলেন। বুদ্ধও তাঁর দিকে চেয়ে হাসলেন এবং নীরবে সেই অব্যক্ত উপদেশ দান করলেন। সে মুহূর্তেই নাকি জেন-এর জন্ম।

মহাকাশ্যপ ও বুদ্ধের এই সাক্ষাতের পর প্রায় হাজার বছর পার হলো। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে জেন হস্তান্তরিত হয়ে একসময় বোধিধর্মের কাছে পৌঁছল। বোধিধর্ম ছিলেন দক্ষিণ ভারতের এক ভিক্ষু। তিনি দক্ষিণ চীনে প্রবেশ করে পরে একসময় উত্তর চীনে অবস্থান নেন। ৩১৮ থেকে ৫৩৪ সালের মধ্যের কিছু সময়ে তিনি চীনে ছিলেন। বোধিধর্ম এই জেন-এর ধারা চীনে প্রশস্ত করলেন। বোধিধর্মর প্রথম উত্তরাধিকারী হুইকে। হুইকে এবং তাঁর পরবর্তী দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম উত্তরাধিকারী সম্বন্ধে তেমন কিছু জানা যায় না। এভাবে বোধিধর্মের পর প্রায় এক শতাব্দী পার হয়ে গেল। এরপর ষষ্ঠ উত্তরাধিকারী হলেন এক চীনা দার্শনিক ও ধর্মতত্ববিদ হুই-নেং (৬৩৮-৭১৩)। তিনি জেনকে বৌদ্ধধর্মের একটি শাখা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করলেন।

হুই-নেং হতে জেন প্রসারিত হলো। এরপর চীনে একসময় পাঁচটি পরিপূর্ণ ধারা প্রতিষ্ঠা পেল: ক্যাওডং, লিনজি, গুইয়াং, ফেয়্যান ও য়্যুনমেন। এর বাইরেও কিছু গৌণ ধারা ছিল। এরিমধ্যে জেন ভিয়েতনাম ও কোরিয়ায় প্রবেশ করে বিস্তার লাভ করে। আলোকপ্রাপ্ত হওয়ার এই মরমী অভিজ্ঞতার জ্ঞান চীনে গিয়ে লাও ৎজু-এর শিক্ষা দ্বারা প্রভাবিত হলো। জেন-এর বীজ ভারত থেকে চীনে গেলেও সেখানে সেটি তাওবাদ দ্বারা প্রভাবিত হলো। তবে জাপানে না পৌঁছানো পর্যন্ত জেন যেন পূর্ণতা পেল না। জাপানে জেন এক ধারায় স্ফটিক রূপ পেল। জাপানে জেন যেমন সাদরে গৃহীত হলো তেমনি সেটি অভিযোজিতও হলো। জাপানের বুদ্ধিজীবী শ্রেণীর কাছে জেন ব্যাপক প্রিয়তা পেল এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে জাপানে জেনবাদীর সংখ্যা হয়ে দাঁড়ালো পঞ্চাশ লাখ। তবে অনেক জেনবাদী আবার মনে করেন যে জাপানে জেন আনুষ্ঠানিকতাসর্বস্ব, এক বংশপরস্পরাগত মরমী ব্যবসায়-এ পরিণত হয়েছে। আবার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে কিছু জেনবাদীর যুদ্ধবাদিতা ও উগ্র জাতীয়তাবোধের সঙ্গে সম্পৃক্ততার জন্য জাপানি জেন ধারা সমালোচিত হয়।

জেন হচ্ছে বর্তমান মুহূর্তে জেগে ওঠা। বর্তমান মুহূর্তকে পরিপূর্ণভাবে বোধ করা, তা অবশ্যই আমাদের নিজস্ব চিন্তা-চেতনা বা মতাদর্শের ছাঁকনিতে পরিস্রুত করে নয়। এটি চর্চার একটি উপায় হলো নিজেকে একটি বিশাল প্রশ্ন করা। যেমন, আমি কী? এমন প্রশ্ন যদি প্রবলভাবে এবং আন্তরিকতার সঙ্গে করা হয় তবে যা ভেসে আসে তা হলো ‘জানি না তো’। এই ‘জানি না তো’ হলো চিন্তার শুরু। এটি যদি মুহূর্তের পর মুহূর্ত লালন করা যায় তবে বোধ স্ফটিক রূপ পায়। এর ফল হয়- প্রতি মুহূর্তে আপনি যাই করেন কেবল সেটিই করেন। আপনি যখন বসে আছেন, কেবল বসে আছেন। যখন খাচ্ছেন, কেবল খাচ্ছেন। এভাবেই প্রতি মুহূর্ত এগিয়ে চলে। জেন-এর মতে অস্তিত্ব কেবল মনের নীরবতায়, আমাদের ভেতরের অন্তর্কথোপকথনের বাইরে অনুভূত হতে পারে। জেন দৃষ্টিভঙ্গিতে অস্তিত্ব এমন কিছু যা প্রতি মুহূর্তে স্বতঃস্ফূর্তভাবে হয়ে চলেছে। এবং এটি অবশ্যই আমাদের চিন্তাপ্রবাহের অংশ নয়। মহাবিশ্বের প্রতিটি অনু-পরমানু প্রতি সেকেন্ডের কোটি ভাগ সময়ে পরিবর্তিত অবস্থায় বহমান এবং প্রতি মুহূর্তেই তা কোনো না কোনোভাবে আলাদা। তাহলে অস্তিত্ব কী? জেন বলছে এটি স্বতঃর্স্ফূর্ত। যেহেতু মহাবিশ্বের সবকিছুই সদাপরিবর্তনশীল সেহেতু আমরা প্রকৃত অর্থে কী তা কেবল প্রতি মুহূর্তে অভিজ্ঞতা লাভের ব্যাপার।

আপনি এখনই যদি সুন্দর একটি দৃশ্য দেখে থাকেন তবে দৃশ্যটি কি আপনার চেতনার অতীত একটি মুহূর্তের ব্যাপার নাকি বর্তমানের? যা কিছুই আমরা ব্যাখ্যা করতে পারি তাই কি অতীত সংবেদনের অংশ নয়? এটি আমাদের সর্বশেষ মুহূর্তের অনুভূতি বা চিন্তার অংশ হলেও তো কথাটি সত্য। তাহলে আমাদের প্রকৃত বাস্তবতা কী? এভাবে দেখলে বলা যায় যে প্রতি মুহূর্তে অনন্ত অবস্থান থাকতে পারে। সেহেতু প্রতি মুহূর্তে অনন্ত সংখ্যক অস্তিত্বের সম্ভাবনা দেখা দেয়। একারণেই জেন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায় যে আমরা অস্তিত্বকে অভিজ্ঞতায় লাভ করি না কেন?

এখন জেন বলছে যে আমরা যদি অস্তিত্বকে ব্যক্তিমাত্রিকতা না দেয়ার চেষ্টা করি অর্থাৎ মুহূর্তের চেতনায় যদি ব্যক্তিমাত্রিক ব্যাখ্যা যোগ না করি তবে অস্তিত্ব আমাদের কাছে স্বতঃর্স্ফূর্তভাবে ধরা দেবে। জেন মতে আমরা আসলে অস্তিত্বকে অভিজ্ঞতায় লাভ করি না কারণ আমরা প্রতি মুহূর্তে আমাদের ব্যক্তিমাত্রিক অস্তিত্বকে বোধ করতে ব্যস্ত থাকি।

তাহলে এই অস্তিত্বকে কিভাবে অভিজ্ঞতায় লাভ করব? আমরা যদি অস্তিত্বকে গড়ে না নেই তবে অস্তিত্ব কেবলই ধরা দেবে। সমস্যা হচ্ছে আমরা সাধারণত আমাদের মত করে বিশ্বটাকে গড়ে নিয়ে দেখতে থাকি। আমাদের প্রয়োজন প্রতিটি বর্তমান মুহূর্তে বেঁচে থাকার চেষ্টা করা। জেন শিক্ষার্থীরা ব্যক্তিমাত্রিক সচেতনতা থেকে দূরে সরে আসার জন্য নীরব ধ্যান এবং বিশেষ কোনো সমস্যাপূর্ণ বাক্যের প্রতি মনোনিবেশ করে থাকে। বিশেষ সমস্যাপূর্ণ বাক্যগুলো জেন পরিভাষায় ‘কোয়ান’ হিসেবে পরিচিত। কোয়ানকে এভাবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে: কোয়ান হলো হতবুদ্ধিকর ভাষ্যে গড়া কথা, কথোপকথন বা গল্প। কোয়ানকে যুক্তিবিদ্যক চিন্তাধারায় সমাধান করা যায় না। বিষয় থেকে বিষয়ান্তরে ছুটে চলা বুদ্ধিবৃত্তির জগতের বাইরের মনের গভীর স্তরের চেতনায় কেবল এর সমাধান ঘটে থাকে। কোয়ানের একটি ধ্রুপদী উদাহরণ হলো: এক হাতের তালি।

কোয়ানের ভাবনা জেন শিক্ষার্থীকে চেতনার এমন জগতে যেতে সাহায্য করে যেখানে যুক্তিবিদ্যক চিন্তন থেমে যায়। এর ফলে শিক্ষার্থীর চেতনা স্থির হয় ও অস্তিত্বকে প্রকৃতরূপে অভিজ্ঞতা লাভের পথ প্রশস্ত হয়। হঠাৎ কোনো একসময় শিক্ষার্থীর অজান্তেই অস্তিত্ব সচেতনরূপে অভিজ্ঞতার চেতনায় সিঞ্চিত হয়। শিক্ষার্থী চিন্তা, শব্দ বা বর্ণনার অতীত সেই পুলক-শান্তির অভিজ্ঞতা লাভ করে। আলোকপ্রাপ্তরা কেবল এটুকুই বলে থাকেন: সমগ্রই এক, একই সমগ্র। জেন এই অভিজ্ঞতাকে বলে নির্বাণ।

প্রাগৈতিহাসিক যুগ থেকে আজ যন্ত্রমানবের যুগ অবধি একটি ভালো গল্পের ভেতরের উত্থান পতন মানুষের চেতনায় হানা দিয়ে আসছে। আবার এ কথাও বলা যায় যে জেন গল্পগুলো কিছু মনীষীর জীবনের টুকরো কাহিনি, টুকরো জীবনী, টুকরো আত্মজীবনী। জেন গুরুরা এসব চিত্তাকর্ষক ও মননে নাড়া দেয়ার গল্প কেবল মঠবাসী ভিক্ষুদের জন্য রেখে গেছেন তা নয়। গল্পগুলো মুখ থেকে মুখে বয়ে চলার মত গল্প। যেকোনো স্থানে এক নজরে পড়ে ফেলার মত গল্প। জেন-এর ব্যাখ্যা দেয়া যতটা কঠিন গল্পগুলো বলে যাওয়া যেন ততটাই সহজ।

অলঙ্করণ : রাজিব রায়

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

Follow US

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: