।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।।

রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়ক ঘেঁষে মোহনপুর উপজেলার নন্দনহাট গ্রাম। সেখানকার বাসিন্দা ছাত্তার আলী মাড়াই শেষে ধান থেকে চিটা বাছাই করছিলেন জমির পাশের উচুঁ জায়গায়।

সাথে তার পরিবারের সদস্যরা। জমি থেকে বাড়িতে নিলে খরচ বাড়বে। তাই জমির পাশেই মাড়াই-এর ব্যবস্থা। ধানের প্রসঙ্গে বড্ড অভিমান তার। আর হতাশা পুরো পরিবারে। কারণ একটাই, ধান চাষ করে লাভের বদলে লোকসান।

কৃষক ছাত্তার আলী জানালেন, ধানের মণ জাত ভেদে ৬০০ থেকে সাড়ে ৭০০ টাকা। অথচ শ্রমিকের মজুরি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। সাথে জমি চাষ, বীজ বপন, নিড়ানি, সার সবমিলিয়ে বিঘায় ব্যয় ১৪ হাজার টাকা। যেখানে উৎপাদিত ধানের মুল্য ১৩ থেকে সাড়ে ১৩ হাজার টাকা।

তার স্ত্রী শেফালীর মতে, পুরো পরিবার যে শ্রম দিচ্ছে ধান ঘরে তুলতে, সেটির কানাকড়ি দাম নেই। সে দাম ধরলে লোকসান আরও বেশি।

একই উপজেলার পাকুড়িয়া গ্রামের আবু তাহের। ৩ বিঘা জমিতে ফলিয়েছেন ধান। লিজের জমিতে ব্যয় ১৮ হাজার টাকা। বিঘা প্রতি লোকসান ৫ হাজার টাকা।

ধান চাষ ছাড়তে চান বলে উল্লেখ করে আবু তাহের জানান, একবছরের জন্য লিজ নিতে জমির মালিককে দিতে হয় ৮ হাজার টাকা। অর্থাৎ দুই মৌসুমে ভাগ করলে এক মৌসুমে জমির জন্য ব্যয় ৪ হাজার টাকা।

আবু তাহেরের সাথে যখন কথা হচ্ছিল তখন পাশের ধান ক্ষেতে চলছিলো জমির মালিক আর শ্রমিকদের মধ্যে তর্কাতর্কি।

শ্রমিকদের দাবি, প্রত্যেককে দিতে হবে এক প্যাকেট করে সিগারেট। আর বয়স্ক জমির মালিকের দাবি, মজুরি আর দু’বেলার খাবার ছাড়া তিনি অন্য কিছু দেবেন না। এনিয়ে বচসার একপর্যায়ে ধান না কেটে ক্ষেত ছাড়লেন শ্রমিকরা। ক্ষেতে দাঁড়িয়ে নিরুপায় কৃষক।

তার অভিমত, ৫৫০ টাকার মজুরি আর দুই বেলার খাবার হিসেব করলে দাঁড়ায় ৬১০ টাকা। তার সাথে চল্লিশ টাকার সিগারেট যোগ করলে দাঁড়ায় ৬৫০ টাকা। শ্রমিকদের এই বাড়াবাড়ি তিনি মানতে পারছেন না।

বাড়তি মজুরির সাথে শ্রমিকদের এমন শর্তে বিপাকে চাষিরা। আর এ চিত্র পুরো রাজশাহীর গ্রামাঞ্চলে। ক্ষেতে পাকা ধান, কিন্তু অভাব কৃষি শ্রমিকের। এ সংকটে মজুরি বেড়ে এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যাতে ধান উৎপাদন খরচে দিশেহারা চাষিরা।

তারা বলছেন, ধানের ক্ষেতে কাজ করার জন্য শ্রমিকের বড় অভাব। বাড়তি টাকা দিয়েও মিলছে না কৃষি শ্রমিক। অনেক ক্ষেত্রে অগ্রিম পারিশ্রমিকও দিতে হচ্ছে তাদের।

চাষিদের দাবি, সম্প্রতি বয়ে যাওয়া কালবৈশাখী ঝড়ে অনেক ক্ষেতের ধান নুয়ে পড়েছে। তাতেও ব্যয় বেড়েছে।

তারা জানান, গত কয়েক বছর ধানের উৎপাদন বেড়েছে। কিন্তু সে সুফল কৃষকের ঘরে পৌছায় না। কৃষক পর্যায়ে সুফল পৌছাতে প্রয়োজন, সেচ ও সারের খরচ কমানোর সরকারি উদ্যোগ।

কৃষক ও কৃষি বিভাগ প্রদত্ত তথ্যমতে, গড়ে এক বিঘা ধান উৎপাদনে জমি চাষে ৫০০, বীজ কেনা ও চারা রোপনে ১ হাজার, ক্ষেতে নিড়ানি দিতে ১ হাজার, সার ও কীটনাশক কিনতে সাড়ে ৩ হাজার, সেচ বাবদ ২ হাজার, ধান কাটা ৪ হাজার, ধান বাড়ী নিতে ১ হাজার, মাড়াই করতে ১ হাজার- সবমিলিয়ে ১৪ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়। এই ব্যয়ের পর বর্তমান বাজারে তের বা সাড়ে তের হাজার টাকা আয়। আর লিজের জমি হলে এর সাথে কমে আরো ৪ হাজার টাকা।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারন অধিদপ্তর এর উপপরিচালক শামসুল হক জানান, এমন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে সরকারিভাবে ধান ক্রয় শুরু হলে কিছুটা হলেও নায্য দাম পেতো কৃষক।

তিনি বলেন, ৫০ ভাগ কমিশনে কৃষকদের আধুনিক কৃষি যন্ত্র প্রদান এবং ক্ষেতে পরিমিত সার ও পানি ব্যবহারে চাষিদের প্রশিক্ষনে নানা উদ্যোগ নিচ্ছে সরকার।

কৃষি বিভাগের তথ্যে, রাজশাহীতে এবার বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদিত হয়েছে ৭০ হাজার ১’শ হেক্টর জমিতে। গত সোমবার পর্যন্ত ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছিলো  ৪৫ ভাগ ধান।

আলোকচিত্র : মাহফুজুর রহমান রুবেল

Berger Viracare