Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ৩

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ৩

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

সার্ভাইকাল ক্যানসার প্রতিরোধী ভ্যাকসিন

।। ডা. সায়ন পাল ।।

দেয়ালজোড়া একটা বইয়ের আলমারি আছে টিটুদাদের ড্রইংরুমে। বাংলা-ইংরেজি বিভিন্ন ধরনের বইয়ে ঠাসা। একটাও ডাক্তারি বই নেই ওতে।

অন্যপ্রান্তে একটা সুদৃশ্য ল্যাম্পশেড অফ হোয়াইট রঙের ড্রইংরুমে একটা আশ্চর্য আলো আঁধারি সৃষ্টি করে।

টিটুদার ঘরে আরেকটা দেয়ালজোড়া আলমারি। সেটা ডাক্তারি বই, জার্নাল, নোটস- এই সবে ভর্তি।

একটা চিকেনের পাঞ্জাবি আর পাজামা পড়ে টিটুদা তার ফেভারিট আর্মচেয়ারে বসে চোখ বুজে শুনছে, পাশে রাখা ব্লুটুথ স্পিকার থেকে ভেসে আসা পন্ডিত রবিশংকরের সেতার; রাগ ইমন।

আমায় দেখে মিউজিকের ভলিউম কম করে জিজ্ঞেস করল, “বাপরে, নিচতলা থেকে ওপর তলায় আসতে এত সাজগোজ? দারুন দেখাচ্ছে কিন্তু!”

আমাদের ফ্ল্যাট টিটুদাদের ঠিক নিচেরটা। আসলে নববর্ষের একটা অনুষ্ঠান থেকে আসছি। একটা সাদা খোলের টাঙ্গাইল শাড়ি, সঙ্গে হালকা মেকআপ, একটা ছোট্ট টিপ। আমি জানি, টিটুদার চোখ ফেরানো কঠিন।

বলল, “চল, ব্যালকনিতে যাই, সুন্দর সন্ধ্যা নেমেছে।”

টিটুদার এই চারতলার ব্যালকনি থেকে অনেকটা দেখা যায়। সামনে বিশাল মাঠ, প্রচুর গাছপালা আমাদের কলোনিতে। বৈশাখ মাসের সন্ধ্যে বেলায় এলোমেলো হাওয়া বইছে, বাগান থেকে ভেসে আসছে গন্ধরাজের সুবাস। বোধহয় কালবৈশাখী আসবে।

আমি জিজ্ঞেস করলাম, “সান্তনা মাসি এসেছিল?”

“ও হ্যাঁ এসেছিল। সুমন নিয়ে এসেছিল। অসুখটা এখনো শরীরের অন্য জায়গায় ছড়ায়নি। আশা করছি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে।”

“ওকে কি অপারেশন করতে হবে?”

“এই সার্ভাইকাল ক্যানসার জরায়ুমুখের ক্যানসার যদি আর্লি স্টেজে ধরা পড়ে তাহলে অপারেশন করতে হয় আর তারপর প্রয়োজন মতো রেডিওথেরাপি দিতে হয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রেডিওথেরাপির সাথে কেমোথেরাপিও যুক্ত করতে হয়। আর যদি একটু অ্যাডভান্স স্টেজে ধরা পড়ে, তাহলে শুধু রেডিওথেরাপি আর কেমোথেরাপি সাহায্যে চিকিৎসা করা হয়। রেডিওথেরাপি আবার দুইভাবে দেওয়া হয়, এক্সটার্নাল বিম রেডিওথেরাপি; মানে একটা বড় মেশিনের সাহায্যে দূর থেকে শরীরের ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। অথবা ব্রাকিথেরাপি।”

“ব্রাকিথেরাপিটা আবার কী?”

“ব্রাকিথেরাপি হলো শরীরের মধ্যে যেখানে টিউমার বা ক্যান্সারটা আছে, সেখানে একটা নলের মাধ্যমে রেডিও অ্যাকটিভ সোর্স ঢুকিয়ে দিয়ে ভেতর থেকে রেডিয়েশন দেয়া।”

“তাতে লাভ কী?”

রেডিয়েশন ট্রিটমেন্টের মূল পদ্ধতি হলো ক্যান্সার কোষকে যত বেশি সম্ভব রেডিয়েশন ডোজ দেয়া আর তার চারপাশের নরমাল টিস্যুগুলোকে যত বেশি সম্ভব রেডিয়েশন থেকে বাঁচানো। এবার যদি টিউমার এর মধ্যে ঢুকে রেডিয়েশন ডোজ দেয়া যায়, তাহলে রেডিয়েশন শুধু টিউমারের মধ্যেই থাকবে। আশেপাশের নরমাল টিস্যুতে যাবে না।

“দেখ, রেডিয়েশন ট্রিটমেন্টের মূল পদ্ধতি হলো ক্যান্সার কোষকে যত বেশি সম্ভব রেডিয়েশন ডোজ দেয়া আর তার চারপাশের নরমাল টিস্যুগুলোকে যত বেশি সম্ভব রেডিয়েশন থেকে বাঁচানো। এবার যদি টিউমার এর মধ্যে ঢুকে রেডিয়েশন ডোজ দেয়া যায়, তাহলে রেডিয়েশন শুধু টিউমারের মধ্যেই থাকবে। আশেপাশের নরমাল টিস্যুতে যাবে না। কেননা এই রেডিও অ্যাকটিভ সোর্স বা মেটেরিয়ালটার রেডিয়েশন রেঞ্জ বা সীমা আমরা জানি কয়েক মিলিমিটার। কাজেই এই বৈশিষ্ট্য বা প্রপার্টিকে কাজে লাগিয়ে অনেক বেশি ডোজ টিউমারে দেয়া যায় আর নরমাল টিস্যু বাঁচানো যায়।”

“বাহ দারুন ব্যাপার”

“দারুন তো বটেই। তবে এতেও সার্জারির মত স্কিল লাগে। এটা খানিকটা ছোটখাটো অপারেশন এর মত।”

“তুমি করো এটা?”

“অবশ্যই। এইটা আমার একটা প্রিয় বিষয়।”

“এখন সান্তনা মাসির কী চিকিৎসা হবে?”

“ওর ক্যান্সারটা একটু অ্যাডভান্স। তাই অপারেশন হবে না, শুধু রেডিওথেরাপি আর কেমোথেরাপি দিয়ে চিকিৎসা হবে মাস দেড়েক। তারপর ব্রাকিথেরাপি করা হবে, যেটা বললাম এতক্ষণ। তাতেই সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাওয়া উচিত।”

“যাক বাবা। সুস্থ হয়ে যাক। এত ভালো মানুষ সান্তনা মাসি। এত কষ্ট করে সুমনকে মানুষ করেছে। তা এইটা কি কোনোভাবে প্রিভেন্ট করা যায় না? তুমি যে বলছিলে ভাইরাস দিয়ে হয়?”

“হ্যাঁ এটা ইন্টারেস্টিং ব্যাপার, সার্ভাইকাল ক্যানসার হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস ভ্যাকসিন দিয়ে প্রিভেন্ট করা যায়।”

“তো কাদের দিতে হবে এই ভ্যাকসিন?”

“আগের দিন যেমন বললাম, এই ভাইরাসটা পুরুষ পার্টনার থেকে মহিলাদের আসে যৌন মিলনের মাধ্যমে। তাই ভ্যাকসিনটা যদি মহিলাদের যৌন জীবন শুরু করার আগে দেওয়া যায় তাহলে প্রটেকশনের চান্স বেশি। সাধারণত ন’দশ বছর থেকে শুরু করে ২৬ বছর বয়সের কিশোরী এবং সদ্য যুবতী মেয়েদের এই ভ্যাকসিনটা দেয়া উচিত।“

“আর যারা সেক্সুয়ালি অ্যাক্টিভ, বিবাহিত তাদের তাহলে দেয়া যাবে না?”

“না ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। তাদেরও দেয়া যাবে। কেননা একটা চান্স থেকেই যায় যে তারা এখনো সেই ভাইরাসে আক্রান্ত হয় নি অথবা যে নির্দিষ্ট প্রজাতি দিয়ে এই ক্যান্সার হয়, এইচপিভি ভাইরাসের সেই প্রজাতির দ্বারা আক্রান্ত হয় নি।”

“বুঝতে পারলাম। তা নারীরা বুঝবে কী করে যে তাদের এই ক্যান্সারটা হয়েছে? বা ডাক্তার বাবুর কাছে কখন যাওয়া উচিত?”

ভ্যাকসিনটা যদি মহিলাদের যৌন জীবন শুরু করার আগে দেওয়া যায় তাহলে প্রটেকশনের চান্স বেশি। সাধারণত ন’দশ বছর থেকে শুরু করে ২৬ বছর বয়সের কিশোরী এবং সদ্য যুবতী মেয়েদের এই ভ্যাকসিনটা দেয়া উচিত।

“এটাই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। যেকোনো ধরনের পোস্টমেনোপজাল ব্লিডিং অর্থাৎ মাসিক পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর নারীদের যদি কোনো ধরনের রক্তপাত হয়। অথবা দুর্গন্ধযুক্ত সাদা অথবা জলীয় স্রাব হয় বা যৌন মিলনের পর রক্তপাত হয়। এবং অনিয়মিত মাসিক হয় অথবা ইন্ট্রা মেনস্ট্রুয়াল ব্লিডিং হয়, মানে দুটো মাসিকের মাঝখানে হঠাৎ রক্তপাত হয়। এইসঙ্গে তলপেটে ব্যথা হয় , কোমরের দিকে ব্যথা হয়, তাহলে অবশ্যই ডাক্তারবাবুর পরামর্শ নেয়া উচিত।”

“কিন্তু, টিটুদা, এরমধ্যে তো অনেকগুলোই নারীদের হামেশাই হয়ে থাকে। এবং তারা এগুলো পাত্তাই দেয় না। কত রকম অসুখেই তো এই সিমটমগুলো হয়।”

“তা মানছি, নারীদের অন্য অনেক অসুখেও এই সিমটম হতে পারে, কিন্তু সবার আগে আমাদের উচিত ক্যানসার এর সম্ভাবনাকে বাতিল করার জন্য প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করা। কেননা দেরি হলে অসুখটার স্টেজ বেড়ে যাবে।”

“এই যে তোমরা বল, বা টিভিতে সিনেমা হলে লাগাতার বলে চলা হয়েছে স্মোকিং, মানে ধূমপান বা মদ, অন্যান্য নেশা-এগুলো ক্যান্সারের কারণ। তো, এই ক্যান্সারেও কি এর একটা ভূমিকা আছে?”

“আছেই তো! ধূমপান, তামাক এগুলি ডাইরেক্টলি ক্যান্সারের কারণ । বিশেষ করে টোবাকো মানে তামাক ইন এনি ফর্ম, মানে ধর গুটকা, জর্দা, খৈনি, বিড়ি-সিগারেট, গুড়াকু, সমস্ত ফরম এই ক্যান্সারের কারণ। এইসব নেশার জন্যই তো দেশে কম বয়সীদের মধ্যে ক্যান্সারের সংখ্যা এত বেড়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে মুখের আর গলার ক্যান্সার।”

“কিন্তু টিটুদা, আমার ঠাকুরদা তো ৮৪ বছর বয়সে মারা গিয়েছেন হার্ট অ্যাটাকে। উনি তো চেইনস্মোকার ছিলেন। কই ওনার তো ক্যান্সার হয়নি?”

“ভেরি ইন্টেলিজেন্ট কোশ্চেন। এই যুক্তিটাই তামাক ব্যবহারকারীরা দিয়ে থাকে। আর খানিকটা এই প্রশ্নটার জবাব খোঁজা ছিল আমার পোস্ট গ্রাজুয়েশন থিসিস টপিক। এর পেছনে আছে জেনেটিক পলিমরফিজম। শরীরের মেটাবলিক এনভারমেন্টকে এই পলিমরফিজম পরিবর্তিত করে দেয়।”

“টিটুদা, এবার বড় জটিল হয়ে যাচ্ছে আলোচনা। এগুলো কিছুই বুঝতে পারছি না।”

“ঠিক বলেছিস। এমনও দিনে কি এসব কথা বলা হয়?”

ঝড়উঠেছে। মন কেমন করা বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে আসছে টিটুদার গা থেকে মৃদু পুরুষালী পারফিউমের গন্ধ। বাগান থেকে ভেসে আসা গন্ধরাজের গন্ধ তার সাথে মিশে মাতাল করে দিচ্ছে চারপাশ।

জিজ্ঞেস করলাম, “এমনও দিনে তাহলে কী বলা যায়?”

টিটু দা বলল, “এমনও দিনে তারে বলা যায়, এমনও ঘনঘোর বরিষায়, বাকিটা বুঝতে পারছিস নিশ্চয়ই?”

ব্লুটুথ স্পিকার থেকে পণ্ডিত রবি শংকর শেষ হয়ে এবার শুরু হয়েছে ওস্তাদ আমজাদ আলী খান, রাগ হংসধ্বনি। মাথা রাখলাম টিটু দার কাঁধে।

বললাম, “বুঝতে তো অনেকদিনই পেরেছি, এতদিন বলোনি কেনো?”

“কী বলি নি? জেনেটিক পলিমরফিজম? সেটা কাল বলব।”

টিটুদার মুখে দুষ্টু দুষ্টু হাসি। ছদ্মরাগে ধুম ধাম কিল বসালাম টিটুদার পিঠে।

ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখবেন উত্তরকালে

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: