Loading...
উত্তরকাল > Content page > শিল্প ও সাহিত্য > অনিঃশেষ রবীন্দ্রনাথ ।। অনুপম হাসান

অনিঃশেষ রবীন্দ্রনাথ ।। অনুপম হাসান

পড়তে পারবেন 2 মিনিটে

আকাশে রবি উদিত হলে, কারো ভালো লাগুক আর নাই লাগুক; কেউ নিন্দা করুক, আর কেউ প্রশংসা করুক— তাতে রবির যায় আসে না। তবে যারা নিন্দা করেন, তাদের চলে না রবির আলোবিহীন। বাতাস যেমন দেখা যায় না, কিন্তু তার অস্তিত্ববিহীন একমুহূর্তও জীবন বাঁচে না; অনুরূপ রবির কিরণ এবং রবীন্দ্রনাথের সার্বজনীন প্রতিভা। এই বিরাট প্রতিভার জন্ম না হলে, বাঙালির পরিচয় বিশ্ব-দরবারে আজ অবধি হতো কিনা, তা সন্দেহের উর্ধ্বে নয়। কেননা, রবীন্দ্রনাথের পরে, অদ্যাবধি বাঙালির ঘরে এতো বড় প্রতিভার জন্ম হয় নি। সেই কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মের দেড়শ’ বছর অতিক্রম করে আজকাল বাঙালি সমাজে প্রায়শ শোনা যায়— ‘রবীন্দ্রনাথ পুরনো হয়ে গেছেন’, ‘এখন আর রবীন্দ্রনাথের দরকার নেই’, অথবা ‘রবীন্দ্রনাথ বাঙালির পিছুটান’ এই জাতীয় কথাবার্তা! অনেকের কাছে তো রবীন্দ্রনাথের দোষ-ত্রুটির সীমা-পরিসীমা নিয়েও বিস্তর তথ্য-উপাত্ত আছে। বিশেষত একালে দু’পাতা পড়া সাহিত্যের কতিপয় অধ্যাপক, তথাকথিত পণ্ডিত-গবেষক রবীন্দ্রনাথের ত্রুটি-বিচ্যুতির সন্ধান করে তাঁকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য আদাজল খেয়ে লেগেছেন। এদের সাথে সাঙ্গাত স্বরূপ জুটেছে হাল আমলের কর্পোরেট ভিউ মিডিয়া। কোনো একটা ছুঁতোয় রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করতে পারলেই হলো— তাদের বাজার কাটতি বেড়ে গেল। আসলে ভিউ মিডিয়ার কর্পোরেট বেণিয়ারা রবীন্দ্র-সমালোচনার মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসতে চায়, বাড়াতে চায় দর্শক; যা প্রকারন্তরে তাদের মুনাফা অর্জনের প্রয়াস।

অন্যদিকে আছে, বাংলা সাহিত্যের কতিপয় অধ্যাপক, যাদের বিদ্যার জোর খুব একটা আছে বলে মনে হয় না। অথচ তারা সেই বিদ্যা নিয়েই করছেন— রবীন্দ্র-সমালোচনা। তারা  একবার ঠাউরে দেখছেন না, তারা যে প্রতিষ্ঠানে অধ্যাপনার সুবাদে রবীন্দ্র-সমালোচনা করছেন, সেই প্রতিষ্ঠানই হয়তো ‘রবীন্দ্র-গবেষণা’ করে হাজার হাজার উচ্চতর গবেষণার সনদপত্র বিতরণ করে ধন্য হচ্ছে। তারপরও সেইসব প্রতিষ্ঠানের তথাকথিত পণ্ডিত-অধ্যাপকবৃন্দের বোধোদয় হচ্ছে না— এ বড়ই আশ্চর্য ও আত্মঘাতী ব্যাপার বটে! প্রশ্ন হচ্ছে, এইসব পণ্ডিরা কেন রবীন্দ্রনাথের সমালোচনা করছেন? আমাদের ধারণা, তাঁরা সস্তা জনপ্রিয়তা অর্জনের উপায় স্বরূপ রবীন্দ্র-সমালোচনার মাধ্যমে আলোচনায় আসতে চান; যার পশ্চাতে আছে তাদের খ্যাতি ও প্রতিষ্ঠার অপপ্রয়াস। বাঙালি সমাজে একটা প্রবাদ আছে, সহসা জনপ্রিয়তা অর্জন করতে চাইলে এমন কোনো মহৎ ও উচ্চ-প্রতিভার সমালোচনা অথবা বেফাঁস মন্তব্য করো— যা আদৌ বিশ্বাসযোগ্য নয়। আসলে দু’পাতা পড়া বিদ্যার জোরে সেইসব কথিত অধ্যাপক-পণ্ডিতরাই রবীন্দ্র-সমালোচনা করেন— যাদের গোপন উদ্দেশ্য হচ্ছে সাহিত্যমহলে আলোচিত হওয়া এবং নিজের পাণ্ডিত্যের প্রতিষ্ঠা।

বলার অপেক্ষা রাখে না, আমাদের বক্তব্য ভিন্নতর; একালের অথবা হাল-ফ্যাশনের বাইরে দাঁড়িয়ে আমরা মনে করি, বাংলা সাহিত্যে এবং বাঙালির জীবনে রবীন্দ্রনাথের প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য এবং অনিঃশেষ। কারণ, এক জীবনে কোনো বাঙালি পাঠক ‘রবীন্দ্রনাথ’ (সমগ্র সাহিত্য) পড়ে শেষ করতে পারবেন বলে, বিশ্বাস নেই। আর যে লেখকের আদ্যোপান্ত পাঠ করা হলো না বা গেলো না, তাঁর সম্বন্ধে যেকোনো ধরনের সমালোচনাই তার পক্ষে অনুচিত। এতো গেল, সমগ্র রবীন্দ্রনাথ পাঠের প্রসঙ্গ; একইসাথে একথাও বলা দরকার, যারা দু’পাতা পড়েছেন— তারা নিশ্চয় জানেন, রবীন্দ্রনাথ এক হাতে কত কী রচনা করেছেন! কবিতা, গল্প, উপন্যাস, নাটক, গান, ভ্রমণকথা, স্মৃতিকথা— কত বিচিত্র শাখায় রবীন্দ্র-প্রতিভার অবাধ বিচরণ। শুধু রচনাই নয়, রবীন্দ্রনাথ তো বাংলা সাহিত্যের অনেক শাখারই পথিকৃৎ; অর্থাৎ তিনিই প্রথম সেই ধারার রচয়িতা। বাংলা ছোটগল্প, গীতিনাট্য, নৃত্যনাট্য প্রভৃতি রবীন্দ্রনাথের হাতে যেমন শুরু হয়েছে, তেমনি তাঁর একক প্রয়াসে এসব ধারা ফুলে-ফলে পূর্ণ বিকশিতও হয়েছে। এমনকি বিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধ্বে বৈশ্বিক সাহিত্য-সংকটে পশ্চিমা সাহিত্যে কাব্যনাটকের জন্ম, তার অনেক আগেই রবীন্দ্রনাথ সেই পথে হেঁটেছেন। এমন বাস্তবতার কথা যারা জানেন, তারা কিভাবে বলবেন— রবীন্দ্রনাথ একালে অপ্রাসঙ্গিক অথবা পুরনো!

এক গীতিবিতানের রবীন্দ্রনাথকেই যেখানে অতিক্রম দুঃসাধ্য মনে হয়, সেখানে গল্পের-উপন্যাসের-কবিতার আরো আরো কত বিচিত্র শাখায় রবীন্দ্রনাথের পদচারণা, সেই রবীন্দ্রনাথকে কিভাবে অস্বীকার করবেন? সেই রবীন্দ্রনাথকে বাঙালির পিছুটান মনে হয় যাদের— তারাই প্রকারন্তরে বাঙালিকে পেছন দিকে টেনে ধরেছেন। আমরা মনে করি, রবীন্দ্রনাথ অনিঃশেষ এবং বাঙালির জীবনে তাঁর প্রয়োজনীয়তা অনিবার্য।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

Follow US

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: