।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

নারীদের নিয়ে গঠিত একটি অভিযাত্রী দল গঙ্গা নদীতে প্লাস্টিক দূষণ সম্পর্কে গবেষণায় নামছেন। ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া (ডব্লিউআইআই), ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং ওয়াইল্ড টিম একত্রে এই ‘সি টু সোর্স: গঙ্গা’ নদী অভিযানটিতে কাজ করবেন তারা।

সোমবার (৬ মে) গণমাধ্যমে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

কীভাবে উৎস থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সমুদ্রে চলে যায় এবং প্লাস্টিক  কীভাবে যাওয়া-আসা করে, কোথায় জমে ও সংযুক্ত হয় সেটা আরও ভালোভাবে বোঝা ও ডকুমেন্টেশন করার জন্য এবং এ সম্পর্কিত গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞানের অভাব পূরণের জন্যই ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এই অভিযানটির যাত্রা শুরু। এই অভিযানটির মাধ্যমে দুই নদীপ্রবাহের মধ্যস্থিত বিভাগ-রেখা বা ওয়াটারসেড -এ প্লাস্টিক বর্জ্য কীভাবে জমা হয় সেটা বৈজ্ঞানিক উপায়ে নথিগত করা এবং সর্বব্যাপী সমাধান বের করার এক অনন্য ও অদ্বিতীয় সুযোগ সৃষ্টি করবে।

একবার ব্যবহারযোগ্য প্লাস্টিক বর্জ্য সারা বিশ্বের জন্য একটি ভয়াবহ সমস্যা। প্রতি বছর আনুমানিক ৯ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক সমুদ্রে জমা হয়। এর পেছনে নদীগুলো একটি বড় ভূমিকা রাখে, কারণ প্লাস্টিক অবশেষ নদী থেকে সমুদ্রে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে নদীগুলো কনভেয়র বেল্টের মতো কাজ করে।

‘সি টু সোর্স: গঙ্গা’ শীর্ষক অভিযানটি কয়েকটি আন্তর্জাতিক নদী বিষয়ক অভিযানের মধ্যে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের জন্য ‘প্ল্যানেট অর প্লাস্টিক?’ উদ্যোগের প্রথম অংশ। এই উদ্যোগের প্রধান লক্ষ্য হলো একবার করে ব্যবহার করা হয় এমন প্লাস্টিক  ব্যাপকভাবে কমিয়ে ফেলা, যা প্রতিনিয়ত সাগরে এসে জমা হচ্ছে। গত বসন্তে গঙ্গায় প্রাথমিক অভিযানের পর অভিযাত্রী দলটি বর্ষা মৌসুমে এই অভিযান পরিচালনা করার পরিকল্পনা করেছে যাতে করে ঋতু পরিবর্তনের প্রভাব বোঝা যায়।

ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির অপারেটিং প্রোগ্রামের ভাইস প্রেসিডেন্ট ভেলেরি ক্রেইগ বলেন, প্লাস্টিক  বর্জ্য সংকট সমাধানে নতুন নতুন সল্যুশন সরবরাহ করতে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক বদ্ধপরিকর। এই সমস্যা সমাধানে বিশ্বের বড় বড় বিশেষজ্ঞদের এ ধরনের অভিযানে কাজে লাগানোর বড় সুযোগ। আমি খুবই আনন্দিত যে, এই ধরনের অভিযানের ফলে বিশ্বব্যাপী নারীরা বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল এবং গণিত বিষয়ে এগিয়ে যাবে। বিশেষ করে তারা আমাদের সহায়তা করছে- কীভাবে জলসীমানা দিয়ে প্লাস্টিক  প্রবাহিত হচ্ছে এবং শেষমেশ সাগরে প্লাস্টিক বর্জ্য প্রতিরোধের একটি উপায়ও বলে দিচ্ছে।

এ সমস্যা সমাধানে বিজ্ঞান ও তথ্যভিত্তিক স্থানীয় সল্যুশন তৈরির সক্ষমতা অর্জনে ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের ফেলো জেনা জ্যামবেক এবং হিদার কোন্ডেওয়ের নেতৃত্বে বিজ্ঞানী ও প্রকৌশলীদের ১৫ সদস্যের একটি দল আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সাথে কাজ করবে। ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের এক্সপ্লোরার এমিলি ডানকান, ইমোজেন নাপার ও লিলিগোল সেডাঘাট এবং ভারতের ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ইউনিভার্সিটি অব এক্সিটার, ইউনিভার্সিটি অব জর্জিয়া, ইউনিভার্সিটি অব প্লেমাউথ, ডব্লিউএলএল, ওয়াল্ডটিম, জুলোজিক্যাল সোসাইটি অব লন্ডন ও অন্যান্য ইনস্টিটিউশনের প্রতিনিধিদের নিয়ে গঠিত আন্তর্জাতিক দলের সাথে কাজ করবেন জ্যামবেক ও কোল্ডেওয়ে। ইসাবেলা ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান এবং বাংলাদেশের পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব কবীর বিন আনোয়ার এই প্রকল্পের প্রতি ইতোমধ্যে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন এবং এই দলটি যখন বাংলাদেশে কাজ করবে তখন তাদের নারী সহকর্মীদের ইন্টার্ন হিসেবে দলে অংশ নেয়ার পরিকল্পনা করছেন। সমুদ্রে বর্জের উৎসমুখ থেকেই প্লাস্টিক  দূষণ কমানোর প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে, পরিবেশবান্ধব উপায়ে সমুদ্রকে প্লাস্টিক মুক্ত করাই দলটির প্রধান লক্ষ্য।

“সি টু সোর্স: গঙ্গা” অভিযাত্রী দল ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়া (ডাব্লিউআইআই) -এর বিশেষজ্ঞদের সাথে একসাথে কাজ করবে। ড. বিনোদ মাথুর, ড. এস. এ. হুসাইন, ড. আঞ্জু বারোথ, ড. জে. এ. জনসন, ড. রুচি বাড়োলা এবং ড. বিটপি সিনহা এই অভিযান পরিকল্পনায় বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা দিবেন।

দেহরাদুনের ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ার পরিচালক ড. মাথুর বলেন, আমরা ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক সোসাইটির সাথে এই পার্টনারশিপ নিয়ে খুবই আশাবাদী ও আনন্দিত। এই চুক্তিটি সম্প্রতি ওয়াইল্ডলাইফ ইন্সটিটিউট অফ ইন্ডিয়ার বিজ্ঞানী ও গবেষকদের পক্ষ থেকে নেয়া বিশুদ্ধ গঙ্গার জন্য জাতীয় মিশনের আওতায় ‘জীব বৈচিত্র্য ও গঙ্গার পুনরুজ্জীবন’ প্রকল্প প্রধান উদ্যোগগুলোর উপর ভিত্তি করে নেয়া।

এই প্রকল্পটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং বিজ্ঞানের উন্নত গবেষণাকেন্দ্র দ্বারা সমর্থিত যা প্রফেসর ড. জি. এম ভূঁইয়া এবং প্রফেসর ড. মো: আনোয়ারুল ইসলামের নির্দেশনায় পরিচালিত হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, প্রফেসর ড. মো: আখতারুজ্জামান বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ন্যাশনাল জিওগ্রাফিকের সাথে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে সহযোগিতা করতে পেরে অনেক আনন্দিত। আমাদের অঞ্চল ও এর বাইরেও প্লাস্টিক দূষণ কমাতে অভিযাত্রী দলের সাথে কাজ করার জন্য আগ্রহের সাথে অপেক্ষা করছি।

দ্য ‘সি টু সোর্স: গঙ্গা’ অভিযান প্লাস্টিক  দূষণকে ভূমি, পানি ও মানুষ এই তিনটি মাত্রায় বিভক্ত করেছে। ভূমিতে কর্মরত দলটি বিভিন্ন সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত প্লাস্টিকের পরিমাণ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ, ব্যবহারের পর প্লাস্টিক  বর্জ্য সংগ্রহ ও পরিচালন পদ্ধতি, এবং পরিবেশে প্লাস্টিকের ধরন ও গতিবিধি পরিমাপ করবে। পানিতে কর্মরত দলটি বাতাস, পানি, পলল ও নদী নির্ভর জীবদের মধ্যে প্লাস্টিক  দূষণের মাত্রা সম্পর্কে অধ্যয়ন করবে। আর্থসামাজিক দলটি অভিযানের আওতাভুক্ত স্থানীয় সম্প্রদায়গুলোতে প্লাস্টিক  দূষণ সম্পর্কে সচেতনতা ও ধারণা একটি জরিপ সম্পন্ন করবে, পাশাপাশি গৃহস্থালি প্লাস্টিক  বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং এই সমস্যার স্থানীয় সমাধান পদ্ধতি সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জন করবে। এই অভিযানের সময় দলটি স্থানীয় অংশীদারদের সাথে তাদের বৈজ্ঞানিক ফলাফল প্রবন্ধ আকারে প্রকাশ করবে যার মাধ্যমে তারা প্লাস্টিক দূষণ এবং আচরণ পরিবর্তন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করবে।

এটি এখন পর্যন্ত ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক অভিযানে সবচেয়ে বড় নারী দল যারা এই প্রথম পলল, পানি, বাতাস, ও ভূমিতে প্লাস্টিক  দূষণের উপর চার-মাত্রিক সমন্বিত তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করবে। প্লাস্টিকের বর্জ্যকে আরও ভালভাবে বোঝার জন্য এবং সমাধানগুলি অবহিত করার জন্য এই আন্তঃবিষয়ক দলটি উদ্ভাবনী প্রযুক্তিকে ব্যবহার করছে। এই দ্রুত মূল্যায়ন পদ্ধতি থেকে প্রাপ্ত ফলাফল ভবিষ্যতে বিশ্বব্যাপী অভিযানের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এই প্রাথমিক অভিযানটি বঙ্গোপসাগর থেকে শুরু হয়ে পদ্মা নদীর মধ্য হয়ে হিমালয়ের পাদদেশে গঙ্গা নদীর উৎসে গিয়ে শেষ হবে।