।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।

সদ্য ভেজা মাটি রঙিন হয়েছে কৃষ্ণচূড়ার লাল রঙে। যেন লাল গালিচা। সুপার সাইক্লোন ‘ফণি’ বিদায় নেয়ার পর রাজশাহী নগরীর বড়কুঠি পদ্মার পাড়ের এমন দৃশ্যে মোহিত হওয়া অন্যায় নয়।

কারণ কৃষ্ণচুড়ার রক্তিম ফুল মাটিতে পড়া ছাড়া বড় ধরনের ক্ষতি হয়নি ফণি’র প্রভাবে। আর শেষ পর্যন্ত তেমন একটা ক্ষতি না হওয়ায় স্বস্তি উত্তরবঙ্গসহ দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চল জুড়ে। কিন্তু গত শুক্রবার বিকেলের পর থেকেই উৎকন্ঠা আর উদ্বেগে নির্ঘুম রাত পার করতে হয়েছে এই দুই জনপদের বাসিন্দাদের।

কুষ্টিয়ার মিরপুর উপজেলার ধুবইল গ্রামের কৃষক সাইফুল ইসলাম। মাঠে ৭ বিঘা জমিতে রয়েছে বোরো ধান।সে ধানে পাক ধরেছে।গত বৃহস্পতিবার তিনি প্রথম জানতে পারেন ফনি আঘাত হানতে পারে কুষ্টিয়ায়। এরপর থেকেই শুরু হয়েছিলো উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠার।ঝড়ো হাওয়ায় ধান বিনষ্টের শংকায় তিনি পার করেন নির্ঘুম রাত। অবশেষে ধানের কোন ধরনের ক্ষতি ছাড়াই ফনি আতংক কাটলেও ক্ষোভ তার কৃষি বিভাগের উপর।

সাইফুলের অভিযোগ,ধান উৎপাদনকারী জেলা হিসেবে কুষ্টিয়া দেশের মধ্যে অন্যতম।কিন্তু এই দুর্যোগে কৃষকের পাশে অগ্রীম তথ্য দিয়েও সহায়তা করেনি কৃষি কর্মকর্তারা।

একই উপজেলার নওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বাদল আলী। এবার বোরো ধানের আবাদ তিন বিঘা জমিতে।ঘূর্ণিঝড় ফনি’র প্রভাবে অল্প বাতাসেই নুইয়ে পড়েছে তার ক্ষেতের পাকা ধান।

তিনি জানান, ঝড়ে ধান নুইয়ে পড়ায় বেশ পরিমান ধান মাটিতে ঝরেছে।আবার সেগুলো কাটতেও বেশী মজুর লাগবে। এতে তার সাড়ে চার হাজার টাকার জায়গায় ব্যয় হবে আট হাজার টাকা।

তার দাবি, ঘূর্ণিঝড় কুষ্টিয়ার উপর দিয়ে প্রবাহিত হবে এমন খবর আগেভাগে পেলে আগেই জমি থেকে কেটে ফেলতে পারতেন।কৃষি বিভাগের দ্বায়িত্ব ছিলো চাষীদের অগ্রীম তথ্য দেয়া।

এ বিষয়ে মিরপুর উপজেলা কৃষি কর্মকতা রমেশ চন্দ্র জানান, তারা ব্লক সুপারভাইজারদের মাধ্যমে তথ্য দেয়ার চেষ্টা করলেও সময় স্বল্পতায় সেটি খুব একটা কার্যকর হয়নি। তাদের উচিৎ ছিলো মাইকিং করার।

একই ধরনের দাবী রাজশাহী অঞ্চলের কৃষকের।

শুধু ধান চাষীরা নয় রাজশাহী অঞ্চলের আম চাষীরাও ছিলেন আতংকে।বাড়ন্ত আমে ঝড়ের হাওয়া লাগলে সেগুলো পড়তো মাটিতে। যাই হোক আঘাত হানার আশঙ্কা থাকার পরেও সুপার সাইক্লোন ‘ফণি’ যে শেষ পর্যন্ত এ অঞ্চলে তেমন একটা ক্ষতি করেনি, সে কারণে স্বস্তিতে আম চাষীরা।

শিবপুর এলাকার আমচাষী সাইফুল ইসলাম বলেন, সারারাত আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করেছি যেনো বেশী ঝড় না হয়। কারন শিলাবৃষ্টিতে এমনিতেই গাছে আম কম।ঘূর্ণিঝড় হলে বড় ধরনের লোকসান হতো।

একাধিক আমবাগানী জানান, এসব দূর্যোগে আসলে আমাদের কি করা উচিৎ সে বিষয়ে কোন তথ্য দেয়া হয়না কৃষি বিভাগ থেকে।

ফণি’র তাণ্ডবের একটি ভিডিও ছড়িয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। ভিডিওতে দেখা যায়, ভারতের উড়িষ্যায় নির্মাধীন একটি বহুতল ভবন থেকে ক্রেন পড়েছে পাশের ভবনগুলো ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অথচ একই সময়ে ফণি নিয়ে যখন সর্বোচ্চ সর্তকতা, তখনও রাজশাহীর অনেক নির্মাণাধীন বহুতল ভবনের ছাদে দেখা মিলেছে ইট,খোয়া, টিন, রড, ক্রেনসহ এমন আলগা নির্মানসামগ্রী। শক্তি না হারিয়ে আগের গতিতে এগুলো এসবই হতে পারতো বড় ক্ষতির কারণ।

রাজশাহী নগরীর শরীফ আহমেদ ‍বিল্টু বলেন, উপকূলীয় অঞ্চলের বাইরে যে ঘূর্ণিঝড় নিয়ে বাড়তি সতর্কতা নিতে হয়, সে অভিজ্ঞতা রাজশাহীতে এই প্রথম। এব্যাপারে আগামীতে স্থানীয় প্রশাসন, সেবা সংস্থা ও কৃষি বিভাগকে আরো দ্বায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সাথে দূর্যোগ মেকাবেলায় প্রত্যেককে হতে হবে আরো সচেতন। 

রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ফজলে হোসেন বাদশা বলেন, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতি ও ধরন বদলে যাচ্ছে দূর্যোগের। সেকারনে শুধুমাত্র উপকূলীয় অঞ্চলের মানুষ রক্ষা করতে উদ্যোগ নিলে হবে না,সব অঞ্চলের জনগনকে রক্ষা করতে নানামুখী উদ্যোগ নিতে হবে সরকারের।এরমধ্যে দূর্যোগকালীন সময়ে আবাসন, জরুরী স্বাস্থ্যসেবা, জনগনের উদ্দেশ্যে অগ্রীম তথ্য ও নির্দেশনার নিশ্চিত করতে হবে। একইসাথে এ বিষয়ে জনসাধারনকে আরো সচেতন হওয়ার আহবান জানান তিনি।  

আলোকচিত্র : মাহফুজুর রহমান রুবেল