Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ২

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ২

পড়তে পারবেন 5 মিনিটে

।। ডা. সায়ন পাল ।।

রানিং ট্রাক প্যান্ট, রেড টি শার্ট আর রানিং শ্যু পড়ে টিটুদা দৌড়াচ্ছে লেকের চার ধারে। আমি জানি, অলরেডি টিটুদার ৪ পাক ঘোরা হয়ে গেছে।

ভোর সাড়ে পাঁচটায় শুরু করে রোজ ১০ কিলোমিটার দৌড়ায়। টিটুদা ম্যারাথন রানার, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ম্যারাথন দৌড়ে বেড়ায়। দৌড়ে সঙ্গ নিলাম, আমিও স্টেট লেভেল সুইমার, দৌড়াতে আমিও পারি।

টিটু দার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম, পেশীবহুল বলিষ্ঠ বাহুতে বাধা রয়েছে মোবাইল, এই মোবাইলে টিটুদা তার টাইম অ্যান্ড ডিস্টেন্স এর হিসেব রাখে।

আমায় দেখে হাত নাড়লো।

দৌড়াতে দৌড়াতে জিজ্ঞেস করলাম, “টার্গেটেড থেরাপি, হরমোনাল থেরাপি, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এগুলো কী, বললে না তো!”

টিটুদা হাসলো। বলল, “এইগুলো শোনার জন্য তুই ভোর পাঁচটায় আমার সাথে দৌড়তে এসেছিস?”

হেসে বললাম, “হ্যাঁ তো। তোমার কথা শুনতেই তো এই ভুবন পেরিয়ে আসা।”

টিটুদা মুচকি হেসে শুরু করলো, “রেডিওথেরাপি হল এক্স রে অথবা গামা রে দিয়ে ক্যান্সারের কোষগুলোকে মেরে ফেলা। বিখ্যাত বিজ্ঞানী রন্টজেন ১৮৯৫ সালে এক্স রে আবিষ্কার করেন, তারপর রাদারফোর্ড, বেকারেল, মেরি কুরি, পিয়ের কুরি এইসব বিখ্যাত বিজ্ঞানীদের প্রচেষ্টায় রেডিও অ্যাকটিভ রেগুলো আবিষ্কার হয় এবং মানুষ বুঝতে পারে এই রেগুলো শরীরের ভেতর ঢুকে ক্যান্সারের কোষকে মেরে দিতে পারে। তাই বিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই এই এক্স রে বা অন্য তেজস্ক্রিয় রশ্মিগুলোকে ক্যান্সারের চিকিৎসার কাজে ব্যবহার করা শুরু হয়।

বললাম, “কিন্তু শুনি এর অনেক সাইডএফেক্ট!”

“এটা একটা মিথ। আসলে গত দু’দশকে রেডিওথেরাপির আমূল পরিবর্তন হয়েছে।রেডিওথেরাপি প্ল্যানিংয়ে কম্পিউটারের ব্যবহার এবং অত্যাধুনিক ইমেজিং যেমন সিটি স্ক্যান এমআরআই পেট সিটি স্ক্যান আবিষ্কার এবং রেডিওথেরাপিতে ব্যবহৃত হওয়ার কারণে এখন রেডিওথেরাপি চিকিৎসা খুবই টার্গেটেড, মানে শুধু ক্যান্সার সেলকে মেরে ফেলা সম্ভব সুস্থ কোষগুলোকে বাঁচিয়ে।”

টিটুদা বলতে থাকলেন, “নতুন নতুন টেকনোলজির মাধ্যমে যেগুলো সুস্থ কোষ বা শরীরের অঙ্গ, সেগুলোকে বাঁচিয়ে ক্যান্সার কোষগুলোকে মেরে ফেলা সম্ভব হচ্ছে। তার ফলে সাইডএফেক্ট অনেকটাই কমে গেছে। অনেক বেশি ডোজ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে এবং রোগী খুব তাড়াতাড়ি তার রোজকার রুটিনে ফিরে যেতে পারছে। সবচেয়ে বড় কথা এইটা একদম পেইনলেস বা ব্যথাহীন চিকিৎসা। শতকরা ৭০ ভাগ সলিড টিউমার মানে ব্লাড ক্যান্সার ছাড়া অন্যান্য ক্যান্সারে রেডিওথেরাপি ব্যবহৃত হয়। এবং সার্জারির মতো এটাও একটা মেইন কিউরেটিভ ট্রিটমেন্ট, মানে ক্যান্সারকে সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলার জন্য মূল চিকিৎসা। রেডিওথেরাপি ছাড়া কোনো ক্যান্সার ডিপার্টমেন্ট, ক্যান্সার পেসেন্টকে সম্পূর্ণ সারিয়ে তোলার উপযুক্ত হয় না।”

“আর কেমোথেরাপি, হরমোন থেরাপি, টার্গেট থেরাপি?”

“কেমোথেরাপি হলো ওষুধের মাধ্যমে ক্যান্সারের কোষগুলোকে মেরে ফেলার চিকিৎসা। এটা ইনজেকশন এর মাধ্যমে হতে পারে অথবা খাওয়ার ট্যাবলেটও হতে পারে। মূলতঃ রক্ত সম্পর্কিত ক্যান্সারে, ব্লাড ক্যান্সার অথবা লিম্ফোমা এই ধরনের ক্যান্সারে কেমোথেরাপি মূল চিকিৎসা। আর অন্যান্য টিউমার মানে দেহের অন্যান্য অংশের ক্যান্সারের ক্ষেত্রে কেমোথেরাপি সার্জারি অথবা রেডিওথেরাপির সহযোগী হিসেবে কাজ করে।”

“হরমোন থেরাপি হলো”, টিটুদা থামলেন না, “যে সমস্ত ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি হরমোন ডিপেন্ডেন্ট মানে হরমোনের ওপর নির্ভরশীল সেইসব ক্যান্সারের কোষের বৃদ্ধি সেই হরমোন সাপ্রেস করে; মানে তার উৎপাদন বন্ধ করে অথবা ওষুধ দিয়ে তার কার্যকরিতা বন্ধ করে থামিয়ে দেওয়া সম্ভব।”

“যেমন? দুই একটা উদাহরণ দাও?”

“যেমন ব্রেস্ট ক্যান্সার যেগুলো হরমোন রিসেপ্টর পজেটিভ। আর প্রোস্টেট ক্যান্সার। ব্রেস্ট ক্যান্সার ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের ওপর নির্ভরশীল আর প্রোস্টেট ক্যান্সার এন্ড্রোজেন নামক হরমোনের উপর নির্ভরশীল। তাই ইস্ট্রোজেন হরমোন অবদমিত করে ব্রেস্ট ক্যান্সারের বৃদ্ধি বন্ধ করা যায় আর এন্ড্রোজেন হরমোন অবদমিত করে প্রোস্টেট ক্যান্সারের বৃদ্ধি বন্ধ করা যায়।”

“বুঝলাম। আর টার্গেটেড থেরাপি?”

“এই গত কয়েক দশকে মলিকুলার বায়োলজি আর জেনেটিক্সের অভূতপূর্ব উন্নতি হয়েছে। আমরা এখন জানি যে, গ্রোথ সিগনাল বা কোষের বৃদ্ধির জন্য কী কী জরুরি মলিকিউল আছে, আর সেগুলো ক্যান্সার কোষের কোথায় কোথায় গিয়ে লাগে, যার ফলে গ্রোথ সিগনাল ক্যান্সার কোষের ডিএনএ তে পৌঁছায় এবং ক্যান্সার কোষের বৃদ্ধি হয়। এবার যদি এই গ্রোথ সিগনালকে অথবা গ্রোথ সিগনাল যেখানে গিয়ে লাগে এই দুটোর মধ্যে একটাকে অথবা দুটোকেই ব্লক করা যায়, তাহলে ক্যান্সারের বৃদ্ধি হবে না। এটাকে বলে টার্গেটেড থেরাপি।“

“আর ইমুনোথেরাপি?”

“ওরে বাবা এটাও জানিস?” মুচকি হেসে বলতে শুরু করল, “এই ব্যাপারটা একটু জটিল।আমাদের শরীরের ইমিউন মেকানিজম বা প্রতিরোধ ক্ষমতা কোনো বিকৃত মানে গতকাল যে বললাম মিউটেশন সেই মিউটেশন ঘটে যাওয়া কোষকে মেরে ফেলতে চেষ্টা করে।সমস্ত ক্যান্সার কোষ আমাদের শরীরের স্বাভাবিক ইমিউন মেকানিজম বা প্রতিরোধ ক্ষমতাকে অতিক্রম করে অমরত্ব লাভ করে। মানে ক্রমাগত বাড়তে থাকে আরকী। এবার যদি শরীরের এই ইমিউন মেকানিজমকে কোনোভাবে পরিবর্তিত করে ক্যান্সার সেলটাকে মেরে ফেলা যায় তাকে বলে ইমুনোথেরাপি। খুব সহজ করে বললাম, ব্যাপারটা আসলে অনেক জটিল।”

“বাব্বাহ! এ তো পুরো হাইটেক যুদ্ধ!”

“যুদ্ধই তো। ক্যান্সারের বিরুদ্ধে প্রাণপণ যুদ্ধ। আর নিত্য-নতুন আমাদের কাছে নতুন নতুন অস্ত্র আসছে, তাই ক্যান্সার আর মৃত্যু পরোয়ানা নয় ক্যান্সারকে আমরা জয় করতে পারি।”

টিটুদার চোখে-মুখে একটা অদ্ভুত দীপ্তি, চোখ দুটো জ্বলজ্বল করছে খুব আবেগের সাথে কথাগুলো বলা।

আমাদের পাড়ার কিছু ছেলে মেয়ে পার্কের এক কোণে আড্ডা দিচ্ছে। আর আমাদের হিংসুটে চোখে দেখছে, ওদের জ্বালিয়ে দেওয়ার জন্য টিটুদার আরো কাছাকাছি এগিয়ে গেলাম।

হঠাৎ দৌড় থামিয়ে টিটুদা দেখি পাশের রাস্তার দিকে যাচ্ছে। নজরে পড়ল আমাদের পাড়ার কাজের মাসি সান্তনা মাসি আর তার ছেলে সুমন হাতে কিছু কাগজপত্র নিয়ে চলেছে।

টিটু দা বলল, “মাসি আজ কিন্তু হাসপাতালে আসবেই, কাল এলে না কেন?”

সান্তনা মাসী বললো, “কাল ছুটি পাই নি বাবা ,আজ অবশ্যই আসব। এই দেখ, সব কাগজপত্র সঙ্গে নিয়েছি।”

সান্তনা মাসির ছেলে কলেজে পড়ে। সুমন বললো, “টিটু দা আজ আমি নিশ্চয়ই নিয়ে যাব।”

আমি সান্তনা মাসিকে জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে মাসি?”

“ওই সার্ভিক্স ক্যান্সার না কী টিটু বলল।”

অজান্তেই মুখ থেকে বেরিয়ে এলো, “সে কী?”

টিটু দা থামিয়ে বললো, “চিন্তা নেই। চিকিৎসা করালে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে যাবে। আজ এসে আমার সাথে দেখা করবে।”

সান্তনা মাসিদের বিদায় জানিয়ে আমরা আবার উঠে এলাম পার্কে জগিং ট্রাকে।

মনটা ভারী হয়েছিল। বললাম, “এই সার্ভিক্স ক্যান্সারটা আবার কী?”

“মহিলাদের জরায়ুর মুখকে সার্ভিক্স বলে। এই আমাদের দেশে এইটা মহিলাদের খুব কমন একটা ক্যান্সার।”

“এটা কেমন করে হয়?”

“বিভিন্ন কারণ আছে, কতগুলো উল্লেখযোগ্য হলো কম বয়সে বিয়ে, সঠিকভাবে বলতে গেলে কম বয়সে সেক্সুয়াল অ্যাক্টিভিটি মানে যৌনজীবন শুরু হওয়া, অনেকগুলো বাচ্চা হওয়া। সাধারণত নিম্নবিত্ত বা নিম্ন মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রা, এর সাথে জড়িত থাকে অপরিচ্ছন্নতা। মাল্টিপল সেক্সুয়াল পার্টনার মানে একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক”

“আমাদের সান্তনা মাসি তো নিপাট ঘরোয়া মহিলা!”

“ধুর বোকা! যেগুলো বললাম সেগুলো রিস্ক ফ্যাক্টর। তার মানে এই নয় যে যার ক্যান্সার হয়েছে তার এই সবগুলো রিস্ক ফ্যাক্টর থাকতেই হবে। এছাড়াও একটা ইম্পরট্যান্ট কজেটিভ এজেন্ট মানে একটা কারণ আছে। সেটা হল হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস যাকে আমরা বলি এইচপিভি। এটা এক ধরনের ভাইরাস যে ভাইরাস সংক্রমণ সার্ভিক্স ক্যান্সার উৎপন্ন করতে পারে। এই ভাইরাসটা কিন্তু পুরুষের থেকে মহিলাদের কাছে আসে। তাই একাধিক ব্যক্তির সঙ্গে যৌন সম্পর্ক এই ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার চান্স বাড়িয়ে দেয়।”

“সে কী! ভাইরাস দিয়ে ক্যান্সার? ভয়ঙ্কর ব্যাপার!”

“হ্যাঁ ভয়ঙ্কর আবার সেই সঙ্গে একদিক থেকে সুবিধা, মানে যদি এই ভাইরাসটা সংক্রমণ প্রতিরোধ করা যায় তাহলে সার্ভিক্স ক্যান্সার হবে না।“

উৎসাহিত হয়ে বললাম, “এটা তো বেশ। তা এই ভাইরাস সংক্রমণ কীভাবে প্রতিরোধ করা যাবে?”

“চল ১০ কিলোমিটার শেষ, এইবার আমাকে রেডি হয়ে হসপিটাল যেতে হবে। বাকিটা আবার কাল। অবশ্য তুই যদি সন্ধ্যেবেলা আসিস আর আমার স্পেশাল চা টা খাওয়াস, তাহলে আগেই জেনে যাবি।” বলে রাস্তা পার হওয়ার জন্য আমার দিকে হাত বাড়ালো টিটুদা। ছোটবেলা থেকে এই হাতটা আমি ধরে আসছি কিন্তু এখনো প্রতিবার সেই শিহরনটাই হয় যে শিহরনটা হঠাৎ একদিন আমার কিশোরী বেলায় শুরু হয়েছিল

বললাম, “সন্ধ্যেবেলা আসছি তাহলে।”

হাতে মৃদু চাপ দিয়ে টিটুদা বলল, “অপেক্ষা করব। চল সিগন্যাল গ্রিন। এবার না হলে দেরি হয়ে যাবে।”


ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখবেন উত্তরকালে


সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: