।। ওয়াসিফ রিয়াদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ।।

ঘর থেকে বেরুলেই ওদের দেখা যায়। কোথায় নেই ওরা? রাস্তাঘাটে, দোকানে-বাজারে, গার্মেন্টসে-কারখানায় প্রায় সবখানেই আছে। এক-দু’জন নয়- অসংখ্য। পেটের দায়ে, সংসার চালাতে দরিদ্র বাবা-মাকে সাহায্য করতে ওরা শ্রমিকে পরিণত হয়েছে, শ্রম দিচ্ছে। যখন হেসে- খেলে আনন্দে বই হাতে নিয়ে স্কুলে যাবার কথা ছিলো তখন তাদেরকে বিভিন্ন পেশায় দেখা যায়। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে জীবন ধারণের জন্য উপার্জন করছে তারা। আমাদের সমাজে তারা শিশুশ্রমিক নামে পরিচিত।

বাংলাদেশের সকল পর্যায়ে এই শিশুশ্রম দেখা যায়। শুধু তাই নয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতেও শিশুশ্রম চর্চা রয়েছে। যদিও বা শিশুশ্রম নিয়ে দেশে বিভিন্ন আইন পরিচালিত রয়েছে, তারপরেও শিশুশ্রম যেন ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে।

জাতিসংঘ প্রণীত শিশু অধিকার সনদে ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যেককে শিশু বলা হয়েছে। বাংলাদেশে ১৮ বছর হলে সে ভোট দেয়ার অধিকার লাভ করে অর্থাৎ আইনের ভাষায় প্রাপ্তবয়স্ক হয়। এদিকে বাংলাদেশের বিভিন্ন আইনে ১৫ বছরের কম বয়সী প্রত্যেককে শিশু হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সে হিসেবে এ দেশে ১৪ বছরের কম বয়সী সকলেই শিশু। তবে ২০১৩ সালের শিশু আইনে ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সবাইকে শিশু বলে গণ্য করা হবে বলা হয়েছে।

দেশ যখন উন্নয়নের দিকে এগিয়ে চলেছে, তখনো সারা দেশে শিশুশ্রমিকের সংখ্যা বেড়েই চলেছে। আমাদের শিশুদের এক বড় অংশই নানা ধরনের শ্রমে লিপ্ত। কী কাজ করে না তারা? ফুল বিক্রি, পানি বিক্রি, চা-সিগারেট, মুড়ি-চিনাবাদাম বিক্রি, জুতা পালিশ, কুলির কাজ, গ্যারেজের কাজ, রুটি-বিস্কুট তৈরির কারখানায় কাজ, চা-বাগানে কাজ, হোটেল-দোকান-গার্মেন্টসে, নসিমন-করিমন-হিউম্যান হলারে ইত্যাদি ক্ষেত্রে শিশুরা শ্রমিক হিসেবে নিয়োজিত।

দারিদ্র্যের কারণে বাবা-মায়েরা শিশুদের একটু বয়স হলেই কোনো না কোনো কাজে লাগিয়ে দেন। তখন বহু শিশুই আর স্কুলে যেতে পারে না কিংবা গেলেও তাদের ছাড়িয়ে এনে কাজে লাগিয়ে দেয়া হয়। শুধু দেশের কর্ম-ক্ষেত্রগুলোতেই নয় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে এই শিশুশ্রমের মাত্রা বেড়েই চলছে। বাদ যায়নি উত্তরবঙ্গের সেরা শিক্ষাঙ্গন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি)।

বিশ্ববিদ্যালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ছোট-বড় চায়ের দোকান, আইসক্রিম, বাদাম, শরবত, ফুল ইত্যাদি বিক্রির কাজে দেখা যায় শিশুশ্রমিকদের। শুধু তাই নয় ক্যাম্পাসে বিভিন্ন যানবাহন চালাতেও দেখা যায় তাদের।

এ বিষয়ে শিশুশ্রমিকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, তারা সাধারণত দারিদ্র্যতাকে কেন্দ্র করে এ ধরনের পেশায় জড়িত হচ্ছে। অন্যদিকে ব্যবসায়ী মালিকরা শ্রমিক হিসেবে শিশুদের নিয়োগ দেয়ার কারণ জানতে চাইলে বলেন,  প্রাপ্ত-বয়স্ক পুরুষের তুলনায় শিশুদের অনেক কম মজুরিতে পাওয়া যায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় শহিদ মিনারের সামনে বসে একটি চটপটি-ফুসকার দোকান। সেখানে সকাল ৮টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত কাজ করে হামিম। হামিমের বয়স ৮ বছর। পড়াশোনা করার সুযোগ হয়নি তার। কেন কাজ করে জানতে চাইলে হামিম বলেন, বাসায় আমার অসুস্থ বাবা, কাজ করতে পারছে না আর মা চোখে দেখে না। সংসারের খাওয়া খরচ আমাকেই চালাতে হয়। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাজের বিনিময়ে দিন শেষে ১২০ টাকা পাই।

রাবির কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে টুকিটাকি সংলগ্ন একটি চায়ের দোকানে কাজ করে বিশাল। বিশালের বয়স ৯ বছর। কথা বলে জানা যায়, পরিবারের অর্থনৈতিক অস্বচ্ছলতার কারণে কাজ করতে হয় তাকে। প্রতিদিন সকাল ৮টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত এ কাজ করে সে। দিন শেষে ছোট অংকের (মজুরি বলতে অনিচ্ছুক) টাকা পায় সে। সেটা পরিবারের পেছনে খরচ করে।

ক্যাম্পাসে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করে রাব্বী। সকাল হতেই চুলায় বাদাম ভেজে দেন মা। তারপর ক্যাম্পাসেই ঘুরে ঘুরে বাদাম বিক্রি করে সে। দুপুরে খাবার হাতে মা ছুটে আসে ক্যাম্পাসে। একসঙ্গে মা ও ছেলে খাবার ভাগ করে খায়। এভাবেই তাদের মা ছেলের দিন চলে। রাব্বীর মা রাবেয়া খাতুন বলেন, এই ব্যাটাটা (ছেলে) বাপ মইরি যাওয়ার পর থেইকি সংসারের হাল ধইরিছে। এই বয়সীর ছাওয়ালেরা (ছেলেরা) সারাদিন কতো দৌড়ি বেড়ায়, আর আমার রাব্বীক বাদাম লিয়া ছুটতি হয়। ক্যাম্পাসের মামারা (শিক্ষার্থীরা) ওক অনেক আদর করে। আমি হতভাগা মা ওর জন্য কিছুই করতি পারি না। আমি দুয়া করি আমার রাব্বী জানি জীবনে মেলা বড় অয়।

জীবনের চাকা ঘোরাতেই ব্যস্ত শিশুরা

ক্যাম্পাস ঘুরে দেখা গেছে, হামিম, রাব্বী ও বিশালের মতো আরও অনেক শিশু ক্যাম্পাসের বিভিন্ন দোকানে কাজ করে। যে বয়সে তাদের বই-খাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, অন্য শিশুদের মতো মাঠে খেলাধুলা করার কথা, সেই বয়সে তারা কাজে নিয়োজিত। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত কাজ করে দোকান থেকে তারা পায় পঞ্চাশ থেকে দেড়শ টাকা। দিন শেষে তা তুলে দেয় বাবা-মায়ের হাতে। তাদের এই সামান্য রোজগারের টাকায় ঘুরছে সংসারের চাকা।

আইন অমান্য করে শিশুদের দিয়ে কাজ করানো প্রসঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাসিবুল আলম প্রধান বলেন, শিশুদের দিয়ে কোনোভাবেই স্বাস্থ্যহানিকর বা ঝুঁকিপূর্ণ কোনো কাজ করানো যাবে না। এ বিষয়টি ২০০৬ এর শিশু শ্রম আইনে বলা থাকলেও বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক প্রেক্ষাপটে আইনি বিধান ও প্রয়োগের সীমাবদ্ধতার কারণে শিশুদের শ্রমে নিয়োজিত করা হচ্ছে। যার ফলে মানবাধিকার লঙ্ঘন হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, দেশে শিশু শ্রম বন্ধের আইন ও নীতিমালা আছে, কিন্তু আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকার ফলে শিশু শ্রম বন্ধ হচ্ছে না। এছাড়াও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপট থেকে শিশুশ্রম বন্ধ করা দুষ্কর। শ্রম আইন ২০০৬-এর তৃতীয় অধ্যায়ে ৩৪-৪৪ ধারায় বলা হয়েছে ১৮ বছরের কম বয়সীকে কিশোর এবং ১৪ বছরের কম বয়সীকে শিশু হিসেবে ধরা হয়। এতে করে দেখা যাবে দেশের অনেক প্রতিষ্ঠানেই বেআইনিভাবে শিশুশ্রমের অভিযোগের মধ্যে পড়তে হচ্ছে। তবে সেক্ষেত্রে রেজিস্টার চিকিৎসকের কাছে নেয়া সনদপত্র থাকলে তা বেআইনি বলে বিবেচনা করা হবে না। এবং তার কাজের পরিধি হবে বিপদমুক্ত এবং অত্যান্ত সহনশীল।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা অধ্যাপক লায়লা আরজুমন বানু বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে যেসব দোকান রয়েছে তা প্রশাসনের কাছ থেকে ইজারা নিয়েছেন এর মালিকরা। এ সকল দোকানগুলোতে শ্রমিক নিয়োগের ক্ষেত্রে মালিক পক্ষের ভূমিকা থাকে। তারা কাকে দিয়ে দোকানের কাজ পরিচালনা করবেন এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ করতে পারে না। এ ধরনের শিশুশ্রম বন্ধের জন্য প্রত্যেককে নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হতে হবে। তবে কেউ যদি এ বিষয়ে অভিযোগ করে তাহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।