Loading...
উত্তরকাল > Content page > ঘরে বাইরে > ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ১

ক্যান্সার সম্পর্কে জানুন টিটুদার কাছ থেকে: পর্ব ১

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। ডা.  সায়ন পাল ।।

টাই এর নটটা হালকা করে দিয়ে টিটু দা জিজ্ঞেস করল, “কতক্ষণ?”

টিটু  দা  পড়ে আছে ফরমাল ব্ল্যাক ট্রাউজার আর লাইট ব্লু শার্ট, সঙ্গে মানানসই গারো নীল সিল্কের টাই।

টিটু দা একজন ইয়াং অনকোলজিস্ট, মানে ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ। এই বয়সেই বেশ কটা দেশি বিদেশি ডিগ্রি জোগাড় করে ফেলেছে ,আর দেশজুড়ে নিজের একটা পরিচিতি প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছে। আজ দিল্লি তো কাল মুম্বাই আবার পরের হপ্তায় হয়তো ভিয়েনা। বিভিন্ন ক্যান্সার সম্বন্ধীয় কনফারেন্স থেকে ওকে ডেকে পাঠায়।

উত্তর না পেয়ে সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে টিটু দা আবার জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে? মনটা খারাপ মনে হচ্ছে?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ টিটু দা, মনটা ভারি খারাপ হয়ে আছে। আমাদের এক কলিগ এখন বিয়ের পর ব্যাঙ্গালোরে হাজবেন্ডের সাথে থাকে। ওর ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরা পড়েছে।  ওর বাচ্চাটার মাত্র দুবছর বয়স। ও মারা গেলে বাচ্চাটার কী হবে?”

টিটু দা বলল, “মারা যাওয়ার কথা ভাবছিস কেন? ব্রেস্ট ক্যান্সার সম্পূর্ণরূপে সেরে যায়। ওর দরকার সঠিক চিকিৎসা।”

আমি মুখ তুলে চাইলাম। টিটুদার পেছনে বুক সেলফএ গাদা গাদা বই, টিটু দা র নিখুঁত কামানো গাল থেকে একটা সবুজ আভা, চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, মুখে একটা স্মিত হাসি লেগেই আছে। ওর দিকে চাইলে পেশেন্টের মন ভালো হয়ে যেতে বাধ্য। এইজন্যই টিটুদাকে দেখলেই আমার বুকের ধুকপুকানি বেড়ে যায়।

আমি বললাম, “বলছো সম্পূর্ণ সেরে যাবে?”

টিটুদা বলল, “অবশ্যই। যদি একদম লাস্ট স্স্টেজ না হয়, যদি লাস্ট  স্টেজ ও হয় তাও উনাকে অনেক দিন বাঁচিয়ে রাখা সম্ভব।”

“একটু বুঝিয়ে বলবে প্লিজ?” আমি দর্শনের ছাত্রী। জটিল চিকিৎসা শাস্ত্রীয় ব্যাপারে কিছুই বুঝি না।  কিন্তু টিটুদা এমন সহজভাবে বুঝিয়ে দিতে পারে, যে অশিক্ষিত মানুষও সম্পূর্ণভাবে ব্যাপারটা চট করে বুঝে যায়।

টিটুদা বলল “ শোন তবে। কিন্তু তার আগে তোর সেই স্পেশাল মকাইবাড়ি দার্জিলিং চা-টা চাই।“

“এক্ষুনি আনছি,” রান্নাঘরে গিয়ে ঝটপট বানিয়ে ফেললাম দার্জিলিং চা, ছোট থেকে এই বাড়িতে আমার অবাধ যাতায়াত।

দার্জিলিং চা চুমুক দিয়ে টিটুদা শুরু করলো,

“প্রথমে একটু জেনে রাখ ক্যান্সার টা আসলে কী? আমাদের শরীর বিভিন্ন ধরনের টিস্যু দিয়ে তৈরি ,সেই টিস্যুগুলো আবার কোষ বা সেল দিয়ে তৈরি , এগুলোর একটা নির্দিষ্ট লাইভ বা জীবন থাকে। মানে একটা নির্দিষ্ট সময় পর সেই কোষগুলোর মৃত্যু হয় অথবা সেই টিস্যুগুলো গ্রোথ বা বৃদ্ধি থেমে যায়। এবার কোনো কারণে যদি সেই কোষগুলোর অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি হয় তবে সেগুলি একটি টিউমার সৃষ্টি করে। এইবার জানতে হবে শরীরের প্রত্যেকটা কোষের কার্যকারিতা এবং জীবন  নিয়ন্ত্রণ করে ডিএনএ। এই ডিএনএতে নির্দিষ্ট সিগন্যাল থাকে বা সহজ করে বোঝাতে গেলে একটা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকে যাতে সেই কোষ  বিভাজন অথবা বৃদ্ধি অনিয়ন্ত্রিত না হয়। এবার বিভিন্ন কারণে এই ডিএনএতে বিভিন্ন ধরনের আঘাত আসে; সেই আঘাতে এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সেই কোষ বা টিস্যু তার অনিয়ন্ত্রিত গ্রোথ হয়, এবং তা নরমাল টিস্যু মানে শরীরের স্বাভাবিক টিস্যুগুলোকেসরিয়ে নিজেরা সেই জায়গাটা নিয়ে নেয় এবং স্বাভাবিক টিস্যুগুলোর কার্যকারিতা নষ্ট করে সেই মানুষটাকে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে দেয়।”

টিটুদা কে থামিয়ে বললাম, “ আঘাত মানে? ব্যথা?”

টিটু দা হেসে বলল “ঠিক তা নয়, আমরা বলি ইনসাল্ট। বিভিন্ন ধরনের রাসায়নিক, রশ্মি, দূষিত পদার্থ, বিভিন্ন ধরনের নেশার বস্তু ক্রমাগত ডিএনএকে এই আঘাত করে চলেছে, কিন্তু আমাদের শরীরে তাকে সারিয়ে তোলার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু যখন আঘাত গুরুতর হয় অথবা ক্রমাগত হয় তখন আমাদের শরীর আর তাকে সারিয়ে তুলতে পারে না, ফলে ক্যান্সার হয়।”

বললাম, “ বুঝতে পারলাম। কিন্তু  ব্রেস্ট বা স্তন ক্যান্সার কেন হয় এটা বল।”

“দেখ, আমরা বলি ক্যান্সার হওয়ার অনেকগুলো কারণ আছে। এগুলো মাল্টি ফ্যাক্টরিয়াল। মূলত ব্রেস্ট ক্যান্সার ইস্ট্রোজেন নামক হরমোনের ওপর নির্ভরশীল। সেজন্য শরীরে অত্যধিক মেদ থাকা, অথবা শারীরিক পরিশ্রম না করা, নেশা করা, সিগারেট মদ খাওয়া, বাচ্চাকাচ্চা না হওয়া, মাসিক তাড়াতাড়ি শুরু হওয়া ও বেশি বয়সে শেষ হওয়া, বাচ্চাকে বুকের দুধ না খাওয়ানো- এগুলো কিছুটা ব্রেস্ট ক্যান্সার ডেভলপমেন্টে সাহায্য করে। আবার কিছু ক্ষেত্রে তা বংশানুক্রমিক হয়। বিআরসিএ বলে একটা জিন আছে। সেই জিনটা যদি মিউটেশন হয়ে থাকে, মিউটেশন মানে গোদা বাংলায় পরিবর্তিত হয়ে থাকে, তাহলে সেই ফ্যামিলিতে ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার চান্স থাকে, আবার মা অথবা বোন যদি কখনো ব্রেস্ট ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে থাকেন, তা হলেও ব্রেস্ট ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাব্যতা বেড়ে যায়।”

জিজ্ঞেস করলাম, “তোমরা যে বলো, আর্লি ডায়াগনোসিস, তাড়াতাড়ি ধরা পড়লে ক্যানসার সেরে যাবে! তো আর্লি ডায়াগনোসিস কী করে হবে ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে?”

টিটু দা চোখ তুলে তাকালো ,বুদ্ধিদীপ্ত ঝকঝকে চোখ, বলল, “ গুড কোশ্চেন”

“ব্রেস্ট ক্যান্সার আর্লি ডায়াগনোসিস করা অপেক্ষাকৃত সহজ। প্রথমত যা করতে হবে তা হল সমস্ত সুস্থ মহিলাকে নিজের ব্রেস্ট নিজেই পরীক্ষা করতে হবে, মাসে অন্তত একবার, তার একটা নির্দিষ্ট পদ্ধতি আছে একে বলে সেল্ফ ব্রেস্ট এক্সামিনেশন?”

“সেটা তারা শিখবে কী করে?”

“ইউটিউব এ বা ইন্টারনেটে অজস্র ভিডিও আছে অথবা কোনো ডাক্তারের কাছে গেলে উনি শিখিয়ে দেবেন।এছাড়া যেটা করা উচিত, বছরে একবার মেমোগ্রাফি বলে একটা পরীক্ষা, এটা এক ধরনের এক্সরে, স্তনের, সাধারণত এই পরীক্ষা ৩৫ বছর অথবা তার বেশি মহিলাদের করলে ব্রেস্ট ক্যান্সার ধরতে পারার হার বেশি। তৃতীয়তঃ সমস্ত মহিলার উচিত বছরে এক অন্তত একবার ডাক্তার বাবুর কাছে ক্লিনিক্যাল এক্সামিনেশন করানো, যদি পরিবারে ব্রেস্ট ক্যান্সারের নজির থাকে তাহলে আরো ঘন ঘন পরামর্শ নেওয়া উচিত।”

“আমার বন্ধুর যে ক্যান্সার ডায়াগনোসিস হলো এবার তার কী করা উচিত?”

“প্রথমত তাকে অতিসত্বর একটি হাসপাতালে যেতে হবে যেখানে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ক্যান্সার ডিপার্টমেন্ট আছে, মানে রেডিওলজি, প্যাথলজি, রেডিয়েশন অনকোলজি, ক্যান্সার সার্জারি এবং মেডিকেল অনকোলজি বিভাগ এবং বিশেষজ্ঞ আছেন। মনে রাখবি ক্যান্সারের চিকিৎসা মাল্টিডিসিপ্লিনারি। মানে কোনো একজন বিশেষজ্ঞের পক্ষে সম্পূর্ণ ক্যান্সার চিকিৎসা করা সম্ভব নয়, দু-একটি বিচ্ছিন্ন ক্যানসারকে ছাড়া। অতএব অবশ্যই একটি ক্যান্সার ডিপার্ট্মেন্ট পরামর্শ নিতে হবে, ব্রেস্ট ক্যান্সারের চিকিৎসা সাধারণত অপারেশন, কেমোথেরাপি, রেডিওথেরাপি এবং কিছু ক্ষেত্রে হরমোনাল থেরাপি আর টার্গেট থেরাপি বলে একটা চিকিৎসা। এইবার ক্যান্সারের স্টেজ এবং নেচার বা বৈশিষ্ট্যের উপর নির্ভর করে কোনটা আগে কোনটা পরে তা নির্ধারণ করা হয়। তবে একটা জিনিস বলতে পারি, এই ট্রিটমেন্টটা অনেকটা লম্বা। বেশ কয়েক মাস ধরে করতে হয় এবং কেউ যদি ক্যান্সার বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ মেনে সঠিকভাবে চিকিৎসাটা সম্পূর্ণ করে তাহলে অসুখটা সম্পূর্ণ ভালো যাওয়া সম্ভব। আমি যখন টাটা মেমোরিয়াল হসপিটালে আমার ট্রেনিং নিচ্ছিলাম, তখন কুড়ি ৩০, এমনকি ৪০ বছর আগে চিকিৎসা হওয়া ক্যন্সার পেশেন্টদেরও দেখেছি যারা এখন সম্পূর্ণ সুস্থ এবং স্বাভাবিক জীবন যাপন করে আসছেন, সংসার করে আসছেন, নিজেদের কর্মক্ষেত্রে সফল হয়েছেন এবং সুখী জীবন যাপন করছেন। ক্যান্সার তাদের কাছে একটা স্মৃতি ছাড়া কিছুই নয়।

মুগ্ধ হয়ে শুনছিলাম। মুখের ওপর পড়ে আসা একটা বেয়াড়া চুলের গুচ্ছ তর্জনী দিয়ে কানের পিছনে সরিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “এই রেডিয়েশন থেরাপি, কেমোথেরাপি, সার্জারি, হরমোনাল থেরাপি, টার্গেট থেরাপি এগুলো কী, তা একটু বুঝিয়ে বলবে?”

টিটু দা বলল, “একদিনেই সব জেনে নিবি? এখন আর স্নান না করে থাকতে পারছি না। বাকিটা কাল হবে।”

টিটু দা ১২ ঘন্টা ডিউটি করে এসেছে, কথায় কথায় খেয়াল ছিল না; অপ্রস্তুত হয়ে বললাম, “নিশ্চয়ই নিশ্চয়ই, তোমাকে বড্ড বিরক্ত করলাম।”

বেডরুমের দিকে যেতে যেতে৬ ফুট লম্বা ছিপছিপে টিটু দা ঘাড় ঘুরিয়ে মুচকি হেসে বলল, “তুই বিরক্ত করলে আমার ভালই লাগে, কাল আসিস বাকিটা শোনাবো।”


ডা. সায়ন পাল
ক্যান্সার বিশেষজ্ঞ, অ্যাপোলো ক্যান্সার ইনস্টিটিউট, অ্যাপোলো হেলথ  সিটি হসপিটাল হায়দ্রাবাদ, ইন্ডিয়া
ইমেইল: drsayanpaul@gmail.com
প্রতি রোববার ধারাবাহিকভাবে লিখবেন উত্তরকালে


সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

Follow US

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: