Loading...
উত্তরকাল > Content page > মতামত > পাকিস্তানি ধারায় প্রত্যাবর্তন ও শাসক-শোষকের দু’হাত

পাকিস্তানি ধারায় প্রত্যাবর্তন ও শাসক-শোষকের দু’হাত

পড়তে পারবেন 7 মিনিটে

।। সাইফুল ইসলাম ।।

শাসক-শোষকের দু’হাত ভরা পরিকল্পনা- কীভাবে শাসন করবে, তাদের পক্ষে জনমত সৃষ্টি করবে কীভাবে, জনগণ বিক্ষুব্ধ হয়ে উঠলে কী করতে হবে, গণআন্দোলন অপ্রতিরোধ্য হলে অথবা গণঅভ্যূত্থান ঘটে গেলে জনগণের সে বিজয়কে ছিনিয়ে নিতে হবে কেমন করে- সব পরিকল্পনা তাদের মাথায় গিজ গিজ করে।

এ সব করতে অর্থ ঢেলে দক্ষ লোকও রাখা আছে শাসক-শোষকের। কিন্তু জনগণের নুন আনতে পান্তা ফুরায়- তাদের মাথায় এতো পরিকল্পনা নেই। তারা দানাজল খেয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে সুখে শান্তিতে দিন কাটাতে চায়। সে কাজেই সারাদিন সংগ্রাম করতে হয় তাদের। কঠিন জীবন সংগ্রামের পর শাসক-শোষকের হাত থেকে রক্ষা পাবার সূক্ষ্ম সূক্ষ্ম পরিকল্পনা করবে কখন?

দেশে দেশে নিজের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো কিছু মানুষ থাকে, তারাই শাসক-শোষকের হাত থেকে জনগণকে রক্ষার জন্য ঢাল হয়ে কাজ করে। যে কোনও ষড়যন্ত্র রুখে দেওয়ার দায়িত্ব নেয় তারাই। কিন্তু সে শক্তি গড়ে না ওঠা পর্যন্ত জনগণ বসে থাকে না, তারা লড়ে যায়। লড়তে লড়তে জনগণ যখন বিজয়ের দুয়ারে পৌঁছে, তখন শাসক-শোষকেরা এক হাতে জনগণকে বিজয়ী হতে সহায়তা করে, অন্য হাতে সে বিজয় ছিনিয়ে নেওয়ার নীল নকশা বাস্তবায়নে মাঠে নামে। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের জয় পরাজয়কে সামনে রেখে আলোচনা করলে বিষয়টি সহজবোধ্য হতে পারে।

১৯৬৫ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ সংঘটিত হয়। এ সময় পূর্ব বাঙলার মানুষ অবাক হয়ে দেখে যে, ‘পূর্ব পাকিস্তান’কে রক্ষার কোনও প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাই পাকিস্তান সরকারের নেই। সাধারণ মানুষের মনে হতে থাকে যে, ভারতের দয়ার ওপর পূর্ব বাংলায় ‘পাকিস্তান’-এর সার্বভৌমত্ব টিকে আছে। এ থেকে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠীর ওপর আস্থা নষ্ট হতে শুরু করে সাধারণ মানুষের।

১৯৬৬ সালে আওয়ামী লীগের নেতা শেখ মুজিবুর রহমান জাতির সামনে বাঙালির বাঁচার দাবি ৬ দফা হাজির করেন, এক ধরণের যাদু ছিল তাঁর এই দাবিনামায়। দুই বিপরীত শক্তি অর্থাৎ যারা পাকিস্তানকে শক্তিশালী দেখতে চায় তারা এবং যারা বাঙলার স্বাধীনতা চায় তারা- উভয় পক্ষই এ দাবির সমর্থক হয়ে উঠতে শুরু করে।

পাকিস্তান রেডিওতে সে সময় একটি দেশাত্মবোধক গান বাজানো হতো, যার প্রথম দু’টি লাইন ছিল- ‘পাখি তার দু’টি ডানা, হাওয়াতে মেলে দিয়ে।’ গানে উপমা হিসেবে পূর্ব আর পশ্চিম পাকিস্তানকে পাখির দু’টি ডানা হিসেবে কল্পনা করা হয়। ৬ দফার পাকিস্তান ভাবধারার সমর্থকরা এ গানের উপমা তুলে ধরে যুক্তি দেখাতেন যে, দু’টি ডানার একটি যদি দূর্বল হয় তবে সে পাখি কখনোই উড়তে পারবে না।

৬ দফা দাবি মেনে নেওয়া হলে পাকিস্তানের বৈষম্য দূর করে দু’টি ডানাকে শক্তপোক্ত করবে, তাই শাসক গোষ্ঠীর উচিত এ দাবি মেনে নিয়ে পাকিস্তানকে একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রে পরিণত করা। আওয়ামী লীগের ভিতরের মুসলিম জাতীয়তাবাদের সমর্থকরা এ মত পোষণ করতেন। আর আওয়ামী লীগের যারা ‘একবার বিদায় দে মা ঘুরে আসি’ গানে মুগ্ধ হয়ে বাংলার স্বাধীনতা চাইতেন তারা এক ধাপ এগিয়ে প্রচার করতেন, ৬ দফা না মানলে স্বাধীনতার পথ ধরবে পূর্ব বাংলা।

এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠন তখনকার পূর্ব পাকিস্তান ছাত্রলীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য ছিলেন অসাম্প্রদায়িক স্বাধীনতাপন্থি, আর সংখ্যালঘিষ্ঠ সদস্য মুসলিম জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে পাকিস্তানি ভাবধারার স্বায়ত্বশাসনপন্থি।

অপরদিকে, পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য পাকিস্তানপন্থি আর সংখ্যালগিষ্ঠ সদস্য স্বাধীনতাপন্থি। উভয় পক্ষের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এতে সহজেই বোঝা যায়, ৬ দফার ঝাণ্ডাতলে টুকটাক ঠোকঠুকিসহ স্বায়ত্বশাসন নিয়ে পাকিস্তানপন্থি ও স্বাধীনতাপন্থি উভয়েই ৬ দফা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন।

স্বাধীনতাপন্থিদের সুসময় আসে ১ মার্চ ১৯৭১ সালে। ওই দিন দুপুরে পাকিস্তানের সামরিক জান্তা পূর্ব নির্ধারিত ৩ মার্চের পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করে। পাকিস্তানপন্থি বাঙালিদের পাকিস্তানের ক্ষমতা দখলের স্বপ্ন ভেঙে যায়, তারাও ভাবতে বাধ্য হয় স্বাধীনতার কথা। ডাক দেওয়া হয় পাকিস্তানকে অসহযোগিতার।

মার্চের ২ ও ৩ তারিখে স্বাধীনতার পতাকা উত্তোলন, ইশতেহার পাঠ, ৭ মার্চে রেসকোর্সে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ভাষন স্বাধীনতার পথচলাকে বেগবান করে। অসহযোগ আন্দোলন চলাকালে বেসামরিক প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ অর্থাৎ বাঙালি সিএসপি/ইপিসিএস অফিসারেরাও যোগ দেন আন্দোলনে। তাদের পরামর্শে অসহযোগ আন্দোলনের বিভিন্ন সার্কুলার জারি করা হয় বলে কথিত আছে। বাদ যায় না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনীও।

শুধু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বাঙালি সদস্যরা কঠোর শৃঙ্খলায় আবদ্ধ থাকায় তাদের মধ্যে থেকে ‘জয় বাংলা’ ধ্বনি শুনতে পাওয়া যায় না, তবে তারাও যে স্বাধীনতার জন্য উসখুস করছে তা টের পাওয়া যায়। ২৫ মার্চের কালরাত্রিতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বাঙালিদের ওপর হামলে পড়ায় স্বাধীনতার বিকল্প পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে যায়। এভাবেই মুসলিম পাকিস্তানি ভাবধারা ও অসাম্প্রদিক বাঙালি ধারা- উভয় পক্ষই জড়িয়ে পড়ে মুক্তিযুদ্ধে।

পাকিস্তানিদের রক্তাক্ত-চাপ মুক্তিযুদ্ধে নতুন মাত্রা যুক্ত করে, পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে অবস্থানরত বাঙালিদের একটি অংশ যোগ দেয় মুক্তিযুদ্ধে। আর সশস্ত্র বাহিনীর অংশ জনতার কাতারে চলে আসায় বাঙালিরা আরো সাহসী হয়ে ওঠে।

তবে, ২৫ মার্চের পর অসহযোগ আন্দোলনে যুক্ত হওয়া বেসামরিক প্রশাসনের কর্মকর্তারা প্রায় সবাই ফিরে যায় পাকিস্তানি প্রশাসনে। উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, ২১৮ জন বাঙালি সিএসপি অফিসারের মধ্যে ১৪ জন, ৬০৫ জন ইপিসিএস অফিসারের মধ্যে ৬২ জন মাত্র স্বাধীন বাংলাদেশ সরকারে যুক্ত হন।

ঢাকায় অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তান সচিবালয়ে কর্মরত সিএসপি/ইপিসিএস কর্মচারীরা ২৭ মার্চ সচিবালয়ে যোগ দেন এবং মফস্বলে থাকা সিএসপি-ইপিসিএস কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দোদুল্যমান করে ফেলেন, ফলে অনেকের মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার ইচ্ছা বা সুযোগ থাকলেও তারা সে সুযোগ গ্রহণ করেননি।

তারা জেলা-মহুকুমায় পাকিস্তান সেনাবাহিনী না আসা পর্যন্ত মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেন এবং এক সময় তাদের এলাকা ছেড়ে যেতে পরামর্শ দেন। পরে পাকিস্তান বাহিনী যখন আসে তখন তারা পাকিস্তানের পতাকা তুলে সৈন্যদের সহযোগিতায় এগিয়ে আসেন।

অনেকের স্মৃতিচারণে জানা যায় যে, তারা বাজারের ব্যাগে লুঙ্গি, সার্ট, স্যান্ডেল রাখতেন যাতে সুযোগ পেলে বা প্রয়োজন পড়লেই পালিয়ে যাওয়া যায়।

যাইহোক, পাকিস্তান প্রশাসনে যে সব বাঙালি চাকরি করেছেন তারা বেশ ভয়ে ভয়েই ছিলেন। অপরদিকে, প্রবাসী সরকারের সঙ্গে যুক্ত হওয়া সিএসপি-ইপিসিএস কর্মকর্তারা পাকিস্তান সরকারের সচিবালয়ের মতোই একটি সচিবালয় গড়ে তোলেন। এদের কেউই যুগ্মসচিবের উপরের পদে ছিলেন না। তারা মনে করতেন যে, সচিবালয় চালাতে সচিব লাগে, তাই প্রবাসী সরকারের সচিবালয় সাজাতে যোগদানকারী কর্মকর্তাদের পদোন্নতি দিয়ে উপরের পদে নিয়ে যাওয়া হয়। আর এটা করতে গিয়ে যোগদানকারী প্রায় সব কর্মকর্তাকেই একটি, দু’টি বা তিনটি করে প্রমোশন দেওয়া হয়।

পাকিস্তান সেনাবাহিনী ত্যাগ করে যাওয়াদের নিয়ে নবগঠিত বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও একইভাবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। এখানেও উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, সেনা, ইপিআর, পুলিশ, আনসার বাহিনীরও বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা পাকিস্তানের পক্ষেই থেকে যান বা থেকে যেতে বাধ্য হন।

বলা বাহুল্য, যারা পাকিস্তান সরকারের বিভিন্ন প্রশাসন থেকে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়েছেন, তারা পাকিস্তান থেকেই কাজ শিখেছেন এবং বাংলাদেশকেও পাকিস্তানের মতোই একটি রাষ্ট্র হিসেবে দেখতে চেয়েছেন। বাংলাদেশকে নতুন দেশ হিসেবে সাজানোর চিন্তা তাদের না থাকাটাই ছিল স্বাভাবিক। অথচ বাংলার জনগণ তখন স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে যে এ লড়াইয়ে বিজয়ী হলেই তারা পাবে একটি শোষন মুক্ত নতুন বাংলাদেশ, যেখানে থাকবে না কোনও শোষন-নিপীড়ন।

মুসলিম জাতীয়তাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক বাঙালি জাতীয়তাবাদ- এ দু’পক্ষের যৌথ চেষ্টায় স্বাধীনতা যুদ্ধ চলতে থাকে, পাশাপাশি চলতে থাকে ঠোকাঠুকিও। যুদ্ধ চলাকালেই মুসলিম জাতীয়তাবাদী ধারার কট্টর সমর্থক প্রবাসী সরকারের মন্ত্রী খোন্দকার মোশতাকের বিরুদ্ধে অভিযোগ ওঠে, তিনি পাকিস্তান ও মার্কিনিদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করে চলেছেন। এ কারণে তার কর্মকাণ্ডকেও ঘেরাটোপে আটকে ফেলা হয়।

সে সময়ে মুক্তিযুদ্ধকে ক্ষতিগ্রস্থ করে, ব্যক্তি স্বার্থের কাছে মুক্তিযুদ্ধও গৌন হয়ে যায়, এমন কাণ্ডও ঘটতে দেখা গেছে। যেমন, একটি পাকিস্তানি দূতাবাসের বাঙালি কর্মচারীদের বাংলাদেশের পক্ষে আনতে ‘চাকরির নিশ্চয়তা, সুযোগ-সুবিধা, এমনকি তাদের অর্থনৈতিক ও চাকরির নিরাপত্তা’ নিশ্চিত করতে হয়, তারপরেই তারা মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করতে রাজী হন।

এ ঘটনায় মুক্তিযুদ্ধ লাভবান হয়, জনগণের মধ্যে আশাবাদ ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু এও বোঝা যায় যে, দূতাবাসে কর্মরতরা, বিশেষ করে তাদের প্রধান ব্যক্তি দেশের স্বাধীনতার চেয়ে ব্যক্তি স্বার্থকেই প্রাধান্য দিয়েছেন।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে আশা ছড়াচ্ছিল, রনাঙ্গণে মুক্তিযোদ্ধাদের জোগাচ্ছিল সাহস। অথচ এই গুরুত্বপূর্ণ স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের কর্মচারীদের একটি অংশ নিজেদের সুযোগসুবিধার জন্য ধর্মঘট ডেকে অন্তত তিন দিন প্রচার বন্ধ রাখতে বাধ্য করেন।

এমন শত শত ঘটনার উল্লেখ করা যেতে পারে যা প্রমাণ করে যে, মুক্তিযুদ্ধ নয়, স্বাধীনতার প্রশ্ন নয়, নিজেদের দিকটাও বড় করে দেখেছেন অনেকে। এ সব ঘটনা প্রমাণ করে যে, মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি ভাবধারার অনেকেই ঘাপটি মেরে ছিল, যারা চাইতো ক্ষতিগ্রস্থ করতে।

১৯৭১ সালের নভেম্বরের তৃতীয় সপ্তায় যখন নিশ্চিত হওয়া গেল যে, খুব দ্রুতই মুক্ত হবে বাংলাদেশ, তখন শুরু হলো নতুন খেলা। এ সময়ে পালিয়ে যাচ্ছিল পাকিস্তানি প্রশাসনে যুক্ত থাকা কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাজাকার, আল-বদর, শান্তি কমিটির সদস্যরা।

অপরদিকে দেশের ভিতরে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা একের পর এক বিভিন্ন থানা, মহুকুমা এমনকি জেলাও নিয়ন্ত্রণে নিতে সক্ষম হচ্ছিল। মুক্তিযোদ্ধারা কোথাও কোথাও পাকিস্তান সরকারের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও স্বাধীনতা বিরোধীদের আটক করতে থাকে অন্তত ক্ষমতাহীন করে। জনগণও উৎসাহ নিয়ে স্বাধীনতা বিরোধীদের ধরে এনে জনযোদ্ধাদের হাতে সোপর্দ করতে থাকে। অধিকাংশ স্থানে ব্যাংক, বীমা, স্কুল-কলেজ, দোকান-পাট চালু করে দেয় মুক্তিযোদ্ধারাই। আটকদের কেউ কেউ নিহতও হয় মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। মুক্ত এলাকায় মুক্তিযোদ্ধারা কোথাও যৌথ নেতৃত্বে কোথাও একক নেতৃত্বে চালু করে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশাসন।

তখন দেশের ভিতরে জনগণের আশ্রয়ে-প্রশ্রয়ে থেকে যারা যুদ্ধ করছিল, তাদের রাশ টেনে ধরা হতে থাকে। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে বার বার প্রচার করা হতে থাকে ‘আইন নিজের হাতে তুলে’ না নেওয়ার জন্য। দু’একটি ঘটনা উদ্ধৃতি দিয়ে প্রচার হতে থাকে যে, জনযোদ্ধারা ব্যক্তিগত শত্রু নিধনে নিজেদের নিয়োজিত করছে। অপরদিকে, প্রবাসী সরকারের সচিব পর্যায়ে আলোচনা হয় যে, পাকিস্তান সরকারে যে সব বাঙালি কর্মরত আছেন তারা স্বাধীনতার ‘গোপনমিত্র’।

পরিস্থিতিতে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর মুক্ত হয় বাংলাদেশ। বহু আকাঙ্ক্ষিত বিজয় পায় জনগণ।

এদিকে, কলকাতায় থাকা অবস্থায়ই প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে নিয়োগ দেওয়া হয় জেলা ও মহুকুমা প্রশাসক। ১৮ ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকারের সংস্থাপন সচিব পাবনার সাবেক জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ নুরুল কাদের প্রবাসী সরকারের পক্ষ থেকে ঢাকা বিমান বন্দরে নামেন। এ সময় তাকে অভ্যর্থনা জানান, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের ঢাকার ডিসি আহমদ ফরিদ ও পাকিস্তানের বিদেশ মন্ত্রনালয়ের কর্মকর্তা ফারুক চৌধুরী।

এরপর নুরুল কাদের যান পূর্ব পাকিস্তান সরকারের সচিবালয়ে। তিনি সভা করে সবাইকে আশ্বস্ত করেন যে, পাকিস্তানকে বিশেষ সহযোগিতাকারী ছাড়া অন্য কারো বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এ সময় তিনি উপস্থিত/অনুপস্থিত সকল কর্মকর্তা-কর্মচারীকে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে কাজে যোগদানের অনুরোধ জানান।

বিজয়ের মাত্র ৪৮ ঘন্টার ব্যবধানে পূর্ব পাকিস্তান সচিবালয়ের সাইনবোর্ড বদলে হয়ে যায় বাংলাদেশ সচিবালয়। তবে, পূর্ব পাকিস্তান সরকারের মুখ্য সচিব শফিউল আজমসহ স্বল্প কয়েক জন সিনিয়র সচিবের কাজে যোগদানের সুযোগ রুদ্ধ করা হয়। কিন্তু তাদের কোনও বিচারের মুখোমুখি করা হয় না।

যাই হোক, নিয়োগ পাওয়া জেলা ও মহুকুমা প্রশাসকেরা তাদের স্ব স্ব কর্মস্থলে যোগদান করেন। মুক্তিযোদ্ধারা বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে এক সময় তাদের অস্ত্র জমা দিয়ে যে যার কাজে ফিরে যান। এ কাজটি সম্পূর্ণ করতে প্রবাসী সরকারের প্রায় দুই মাস সময় লাগে। তবে, দুই/তিন মাসের মধ্যেই সে নিয়োগ পাওয়া মহুকুমা ও জেলা প্রশাসকদের প্রায় সবাইকে আবারো বদলি করা হয়।

কিন্তু নবগঠিত বাংলাদেশ সচিবালয় কাজ শুরু করে একটি ছোট্ট জটিলতা নিয়ে যা পরবর্তীতে বাংলাদেশের জন্য বিপদ হয়ে দেখা দেয়। জটিলতাটি হলো, স্বাধীন বাংলা সরকারের সচিবালয় গঠন করতে যোগদান করা সিএসপি/ইপিসিএসদের সবাইকে পদোন্নতি দিতে হয়েছিল। কিন্তু প্রবাসী সরকারের ‘গোপনমিত্র’রা পদোন্নতির সেই সুযোগ পাননি।

প্রথমাবস্থায় তারা চাকরি হারানো বা পাকিস্তানকে সহযোগিতার জন্য বিচারের ভয়ে ছিলেন ভীত-সন্ত্রস্ত। ফলে অনেক সিনিয়র সিএসপি/ইপিসিএস অফিসার মুক্তিযোদ্ধা সিএসপি/ইপিসিএসদের জুনিয়র হয়ে পড়েন। কিন্তু চাকরি রক্ষার্থে অথবা ভয়ে এটা মেনে নেন। এতে পাকিস্তানে কর্মরতরা বাংলাদেশ সচিবালয়ে যোগ দিলেও এক ধরণের হীনমন্যতায় ভূগতে থাকেন। তাদের মধ্যে সৃষ্টি হয় এক ধরণের ক্ষোভও। তারা যখন বুঝতে পারেন যে, তাদের ছাড়া বাংলাদেশ সচিবালয় অচল তখন তারা কৌশলী হয়ে সরকারকে অসহযোগিতা, এমনকি বিপথগামীও করতে থাকেন।

পাকিস্তান প্রত্যাগতরা দেশে আসতে শুরু করলে বিষয়টি আরো জটিল হতে থাকে। এদিকে, সচিবালায়সহ বিভিন্ন স্থানে প্রচার হতে থাকে যে, মুক্তিযোদ্ধা অফিসারেরা জানেন না কিছুই, এদের তেমন অভিজ্ঞতাও নেই, শুধু স্বাধীনতা যুদ্ধে যোগ দেওয়ায় তারা উপরের পদ দখল করে অহংকারী হয়ে উঠেছে। এ ধরণের ক্ষোভ-বিক্ষোভ বুকে নিয়ে নব্য স্বাধীন দেশের সচিবালয় যাত্রা শুরু করে। আর ওদের সংখ্যা ছিল মুক্তিযোদ্ধা অফিসারদের চেয়ে অনেক গুণ বেশী।

ধীরে ধীরে মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তারা খসে পড়তে শুরু করেন সচিবালয় থেকে। এ বিষয়ে বীর মুক্তিযোদ্ধা এইচটি ইমাম-সিএসপি তার বিখ্যাত গ্রন্থ বাংলাদেশ সরকার ১৯৭১- এ বিস্তারিত লিখেছেন।

একই ঘটনা ঘটে বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতেও। জুনিয়র অফিসারেরা মুক্তিযুদ্ধে যোগ দিয়ে হয়ে ওঠেন সিনিয়র। অথচ মুক্তিযুদ্ধে যোগ না দিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে অবস্থান করে অনেক সিনিয়র অফিসার হয়ে পড়েন জুনিয়র। পাকিস্তানি ধাঁচের বাংলাদেশ সচিবালয় ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী গঠন করতে গিয়ে ‘গোপন মিত্র’ আর মুক্তিযোদ্ধাদের সমন্বয় করাও সম্ভব হয় না। সহজেই পাকিস্তানি ভাবধারা গ্রাস করে ফেলে প্রশাসন ও সেনাবাহিনীকে। আর তা ছড়িয়ে পড়তে থাকে জনগণের মধ্যেও। সচিবালয় আর সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা আনতে না পারায় দেশের পরিস্থিতিও হয়ে পড়ে জটিল থেকে জটিলতর।

যাকে ঘিরে সংগঠিত হয়েছিল বাঙালি জাতি, বাঙালি জাতির সেই অবিসংবাদিত নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট ভোর রাতে। সেদিন থেকেই মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অর্জিত বাংলাদেশ বেতার হয়ে যায় পাকিস্তানি ধাঁচের রেডিও বাংলাদেশ। নির্বাসিত হয় মুক্তিযুদ্ধের শ্লোগান জয় বাংলা। মুক্তিযোদ্ধা সিএসপি/ইপিসিএসদের পদাবনতি ঘটে। চাকরি ফিরে পান পূর্ব পাকিস্তানের চিফ সেক্রেটারি শফিউল আজম। কারাগারে যেতে হয় এইচটি ইমামকে। পুনর্গঠন করা হয় বেসামরিক ও সামরিক প্রশাসন। জেঁকে বসে সামরিক শাসন। ১৯৭১ সালে জনগণের অর্জিত বিজয় চূড়ান্তভাবে লুণ্ঠিত হয়। ফিরে আসে পাকিস্তানি ধারার রাজনীতি।


সাইফুল ইসলাম দীর্ঘ সময় সাংবাদিকতা করেছেন। ছড়া ও উপন্যাস লিখেছেন। বর্তমানে সিরাজগঞ্জ গণহত্যা অনুসন্ধান কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে কাজ করছেন।


সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

Follow US

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: