।। ফিলা সিউ, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট, বেইজিং ।।


  • বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, তাদের দেশ বেইজিং থেকে নেয়া ঋণ পরিশোধের মতো অর্থনৈতিক শক্তি অর্জন করেছে।
  • কিন্তু তিনি যোগ করেন যে, ঢাকা আরও প্রবৃদ্ধির জন্য পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের মতো অন্য অর্থায়ন মডেল খুঁজছে।

চীনের কাছে ঋণ নয়, ভবিষ্যৎ উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে বিকল্প অর্থায়ন চায় বাংলাদেশ। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম একথা বলেন।

বৃহস্পতিবার চীনের রাজধানী বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে বেল্ট অ্যান্ড রোড ফোরামের সম্মেলন। শাহরিয়ার আলম সেই সম্মেলনে যোগ দিতে অবস্থান করছেন বেইজিংয়ে।

তার আগে মঙ্গলবার সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টকে দেয়া এই সাক্ষাৎকারে টানা দ্বিতীয়বারের মতো দায়িত্বপালনকারী পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, “যেসব দেশ উচ্চ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জন করছে না, তাদের জন্য যেকোনো অংকের ঋণ বিপজ্জনক হতে পারে।”

চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড উদ্যোগের সঙ্গে সম্পর্কিত ঋণ শোধ করার মতো অর্থনৈতিক শক্তি বাংলাদেশ অর্জন করেছে উল্লেখ করেন তিনি।

২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের বাংলাদেশ সফরকালে দুদেশের মধ্যে বিনিয়োগ ও ঋণ সংক্রান্ত ২৭টি চুক্তি সই হয়েছিলো। অর্থের অংকে তা ছিলো প্রায় দুহাজর চারশ কোটি ডলার।

সে সময় প্রশ্ন উঠেছিলো যে, দক্ষিণ এশিয়ার রাষ্ট্রটির ক্ষেত্রে এই ঋণ ফাঁদ হয়ে দেখা দিতে পারে। যদিও এমন আলোচনাকে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা দূতাবাসারে উপ-প্রধান চেন ওয়েই পুরোপুরি ভিত্তিহীন ও ভুলবোঝার ফল বলে উড়িয়ে দেন।

এবারের বেল্ট অ্যান্ড রোড ফোরামে ঢাকা কি আরো ঋণ চাওয়ার পরিকল্পনা করছে? এমন প্রশ্ন করা হলে শাহরিয়ার আলম জানান, তার সরকারের কখনোই এমন ইচ্ছা নেই এবং আর ঋণও চাইবে না।

তিনি বলেন, “আমরা অনেক কোম্পানি ও দেশের সঙ্গে অনেক প্রকল্প সই করেছি। ব্যাপারটা প্রতিযোগিতামূলক। আমরা তাদেরকেই বেছে নিচ্ছি যারা বাংলাদেশে তাদের প্রকল্প দাঁড় করাতে পারবে এবং নিজেরাই নিজেদের প্রয়োজনীয় ঋণ নিয়ে আসবে। এটা আমাদের জন্য সবচেয়ে লাগসই উপায়।”

রাজশাহী-৬ আসন থেকে সংসদে নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রিপরিষদে ঠাঁই পাওয়া এই নেতা বলেন, “সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের মতো আর্থিক মডেল নিয়েও আমরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছি।”

তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “ধরুন, কোনো এক বিদেশি কোম্পানি আমাদের দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করলো এবং উৎপাদিত বিদ্যুৎ বিক্রি করে খরচ তুলে নিলো। সুনির্দিষ্ট একটা সময় পর বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকানা যাবে সরকারের হাতে।”

শাহরিয়ার বলেন, “আমরা নতুন অর্থনৈতিক পদ্ধতি বা কৌশল প্রণয়ন করছি, যা দিয়ে আমরা ভবিষ্যতে অর্থায়ন করতে চাই।”

চলতি অর্থবছরে ঢাকা ৮.১৩ শতাংশ জাতীয় প্রবৃদ্ধি অর্জনের আশা করছে। আগের বছর তা ছিল ৭.৮৬ শতাংশ। এই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশকে এবছর এশিয়ার সবচেয়ে দ্রুত বিকাশমান অর্থনীতিতে পরিণত করবে। 

বাংলাদেশের তথ্যমন্ত্রী ড. হাসান মাহমুদের মতে, ১০ বছর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর থেকে উন্নয়নমূলক প্রকল্পগুলোতে বিদেশি ঋণের চেয়ে জাতীয় বাজেট থেকে ব্যয় বেড়েছে।

তিনি বাংলাদেশকে দেয়া ভারতের ৮২০ কোটি ডলারের ঋণের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, “চীনের সঙ্গে আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে এবং অন্য অনেক দেশের সঙ্গেও আমাদের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আছে।”

তথ্যমন্ত্রীর যোগ করেন, “আমরা কোনো একটি দেশের ওপর নির্ভরশীল হতে চাই না।”   

ঢাকায় চীনা দূতাবাসের চেন ওয়েই পৃথক এক সাক্ষাতকারে বলেন, বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের বেশির ভাগই বিশ্বব্যাংক ও এডিবির। তুলনামূলক বিবেচনায় চীনা ঋণ খুবই সামান্য।

তিনি চীনকে বাংলাদেশের এক নম্বর বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে বর্ণনা করেন। গত বছর দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য ১ হাজার ৮৭৪ কোটি ডলারে পৌঁছেছে বলে উল্লেখ করে তিনি বলেন, যা ২০১৭ সালের তুলনায় ১৬.৮ শতাংশ বেশি। গত বছর এপ্রিলে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ছিল ১০০ কোটি ডলার। ঢাকা ট্রিবিউন নামের পত্রিকার মতে, গত বছর চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের মোট বাণিজ্য ঘাটতি ছিল ৭৬৬ কোটি ডলার।

চেন ওয়েই বলেছেন, চীনের কাছে বাংলাদেশ যেসব পণ্য রপ্তানি করে তার মধ্যে ৯৭ শতাংশের জন্য শুল্কমুক্ত সুবিধা দেয়ার বিষয়ে উভয় পক্ষ শিগগিরই সিদ্ধান্ত নেবে। 

ওয়াশিংটনভিত্তিক উইলসন সেন্টারের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক বিশেষজ্ঞ মাইকেল কুগেলম্যান বলেন, বাংলাদেশের বর্ধনশীল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি তাদেরকে শ্রীলঙ্কা ও পাকিস্তানের মতো দেশের থেকে নিরাপদ করেছে, যারা চীনের কাছে ঋণের দায়ে আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা।

তিনি বলেন, “এর অর্থ হলো, বেল্ট অ্যান্ড রোড পরিকল্পনায় জড়িত কিছু দরিদ্র দেশের তুলনায় বাংলাদেশ আরো ঋণ নেয়ার সক্ষমতা রাখে।”

“কিন্তু শেষ কথা হলো, এসব ঋণ বাংলাদেশের মতো তুলনামূলক স্থিতিশীল অর্থনৈতিক অবস্থানের রাষ্ট্রের জন্য চাপ তৈরি করে। ঢাকার ভাবনায় সেই ঝুঁকি থেকে সতর্কতার ব্যাপারটি রাখা দরকার।”

নয়াদিল্লির সেন্টার অব পলিসি রিসার্চের অধ্যাপক ব্রহ্ম চেলানি ইঙ্গিত দেন যে, বাংলাদেশ সফরের সময় চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিং যেসব ঋণচুক্তি করেছেন তার কোনো কোনোটিতে ২০১৭ সালে চীন সুদের হার বৃদ্ধি করার উদ্যোগ নিয়েছিলো। যদিও দুই সরকারের মধ্যে নমনীয় শর্তে অর্থায়নের চুক্তি ছিলো সেগুলো। পরে সেগুলো বাণিজ্যিক ঋণে পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চালানো হয়।

তিনি বলেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড পরিকল্পনা ছোট রাষ্ট্রগুলোর ওপর কৌশলে ও অর্থনৈতিকভাবে প্রয়োগ করে তাদেরকে নিজেদের কক্ষপথে নিতে চীন কীভাবে চেষ্টা চালাচ্ছে, এই উদ্যোগ সেটাকেই বড় করে তোলে। বাংলাদেশ এক্ষেত্রে একটি সতর্ক নীতি অবলম্বন করেছে। তারা চীনের ঋণের ফাঁদে না পড়ে অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সহযোগিতা চেয়েছে। 

অবশ্য ঢাকা কীভাবে চীনা ঋণ ব্যবহার করছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ‘দ্য ফিউচার ইজ এশিয়ান’ বইয়ের লেখক ড. পরাগ খান্না।

তিনি বলেন, “তারা কি বৈচিত্র্যপূর্ণ অর্থনৈতিক কাজে কিংবা কর্মসংস্থান তৈরির কাজে এসব অর্থ বিনিয়োগ করছে? নাকি ওই অর্থ নষ্ট করা হচ্ছে?” তিনি মনে করেন, বেল্ট অ্যান্ড রোড পরিকল্পনায় চীন ও সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সবাই উপকৃত হবে। কারণ এ থেকে বাণিজ্যিক করিডোর গড়ে উঠবে।

প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের ঢাকা সফরকালে বাংলাদেশকে কী পরিমাণ ঋণের প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছিলো সে বিষয়ে কথা বলতে চাননি ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসের চেন ওয়েই।

তিনি বলেন, “বেল্ট অ্যান্ড রোড ফোরামে চীন ও বাংলাদেশের মধ্যে বেশ কিছু বাণিজ্যিক চুক্তি সই হবে, কোনো ঋণ চুক্তি হবে না।”