।। মওদুদ রানা, রাজশাহী ।। 

রাজশাহী মহানগরের ডিঙ্গাডোবার বাগানবাড়ি এলাকা। সেখানে খ্রিষ্টান সম্প্রদায়ের উপাসনালয় ক্যাথিড্রাল চার্চ। চার্চের সামনে সরু সড়কের দুপাশজুড়ে খ্রিষ্টানপল্লি। বৈশাখের মধ্য দুপুরে সড়কের পাশের একটু ফাঁকা জায়গায় অলস সময় পার করছেন প্রবীণরা। আর চার্চের সামনে একে অন্যকে রঙ মাখাতে ব্যস্ত শিশু ও তরুণীরা। তবে সেখানে আনন্দ অনেকটাই মলিন ও নিষ্প্রভ। শিশুদের চোখে খুশির ঝিলিকের পরিবর্তে উদ্বেগের ছায়া। কথা হয় আশা বিশ্বাসসহ অনেকের সঙ্গে। তারা জানান, বড়দিনের পরেই জাঁকজমক ভাবে পালিত হয় ইস্টার সানডে।

দিনটিতে নতুন সাজে ছোট–বড় সবাই পুনরুত্থানের খ্রিষ্টযাগে, তথা উপাসনায় অংশগ্রহণ করে। গির্জাঘর থাকে খ্রিষ্টভক্ত দিয়ে পূর্ণ। চিরকুমার যাজকের (ফাদার) পরিচালনায় আড়ম্বরপূর্ণ খ্রিষ্টযাগ বা নামাজ বা পূজা-উপাসনার পরেই চলে আপন আপন কৃষ্টিতে ইস্টারের শুভেচ্ছা বিনিময়। ঘরে ঘরে আয়োজন করা হয় দই, চিড়া, মুড়ি-মুড়কির মতো হরেক রকম মুখরোচক আহারসামগ্রীর। এতে অংশগ্রহণ করে ঘরের সবাই ও পাড়া–প্রতিবেশী। এই আসরে অনেক সময়ই নিমন্ত্রিত হয় হিন্দু, মুসলমান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ভাইবোনেরাও।

ইস্টার মহোৎসব খ্রিষ্টানদের, কিন্তু উৎসব ও উৎসবের আনন্দ সবার। সেকারণে গেল বছরেও তাদের পল্লিতে ছিলো ৭ দিন ধরে নানা আয়োজন। কিন্তু এবার উদ্‌যাপনের পরিবর্তে শঙ্কার ছায়া। অনুষ্ঠান হয়েছে নামে মাত্র। গত দুদিন ধরেই প্রার্থনা করেছেন শ্রীলংকায় হামলায় নিহত ও আহতদের স্মরণে। খ্রিষ্টানপল্লির প্রবীণরা মর্মাহত ন্যাক্কারজনক এ হামলায়। হামলা নয় শান্তি চান তারা। জানালেন, শ্রীলংকায় হামলার ঘটনায় ভয় কাজ করছে পুরো এলাকায়। কারণ উত্তরের এ জনপদে রয়েছে জঙ্গীবাদী হামলার অতীত ইতিহাস। আশার কথা আইনশৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা। সেটিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন এখানকার বাসিন্দারা।

স্যামুয়েল টুডু ও বিমল টুডু জানালেন, অনুষ্ঠান উপলক্ষে রোববার সকাল থেকেই পুলিশ মোতায়েন ছিলো। তবে শ্রীলংকায় হামলার ঘটনার পরে পুলিশ বারেবারে টহল দিয়েছে। সার্বক্ষণিক না থাকলেও সোমবার সকালে পুলিশ ও র‌্যাব সদস্যরা এসেছিল খ্রিষ্টানপল্লিতে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে গোয়েন্দা সংস্থাগুলোও।

তবে ভীতি আর শঙ্কায় বেশি আতংকিত হয়ে পড়েছে নগরের রাজপাড়ার সিটি চার্চ এলাকার খ্রিষ্টান সম্প্রদায়। সোমবার দুপুরে সিটি চার্চ এলাকায় প্রবেশ করতেই চোখে পড়ে সুনাশান নিরবতা। গেট থেকে সামনে এগুতে হন্তদন্ত হয়ে আসেন সেখানকার মধ্যবয়সী এক ব্যক্তি। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঐ ব্যক্তি জানান, অপরিচিত মানুষের সাথে কথা বলতেও ভয় তাদের। এখানকার বাসিন্দাদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে অপরিচিত কারো সাথে কথা বলা এমনকি রাতে বাইরে বের হওয়া যাবে না। পুলিশ, র‌্যাবসহ গোয়েন্দা সংস্থাগুলো অব্যাহত নজরদারি রয়েছে বলে জানান তিনি।

এ ব্যাপারে রাজশাহী মহানগরের বাগানপাড়া চার্চের ফাদার পল গোমেজ বলেন, রাজশাহীতে ১৬টি খ্রিষ্টানপল্লি ও ৮টি সংস্থা রয়েছে। সেখানকার বাসিন্দাদের সতর্কতার সঙ্গে থাকতে বলা হয়েছে। প্রশাসনের ফোন নম্বর প্রত্যেককে দেয়া হয়েছে। এলাকায় অপরিচিত কেউ আসলেই আইনশৃংখলার রক্ষাকারী বাহিনীকে জানানোর নির্দেশনা দেয়া রয়েছে।

তিনি জানান, শ্রীলংকায় হামলায় নিহত ও আহতদের স্মরণে বিশেষ প্রার্থনা করা হয়েছে।

রাজশাহী নগর পুলিশের উপকমিশনার আমির জাফর বলেন, বিষয়টি সর্বে্বাচ্চ গুরুত্বসহকারে দেখা হচ্ছে। পোশাকে পুলিশ সার্বক্ষণিক না থাকলেও সাদা পোশাকে পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। গোয়েন্দা তৎপরতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। একই সঙ্গে খ্রিষ্টানপল্লির ফাদারদের সঙ্গেও কথা বলা হচ্ছে। এটি চলমান থাকবে।

আলোকচিত্র : মাহফুজুর রহমান রুবেল