Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > শিল্প ও সাহিত্য > লোরকাগাথা ।। রহমান হেনরী

লোরকাগাথা ।। রহমান হেনরী

পড়তে পারবেন 5 মিনিটে

একথা বলাই বাহুল্য যে, কবি হলেন এমন এক মানুষ, যার লিখিত বা কথিত প্রতিটি শব্দ ও বাক্যই কবিতা। কবি সর্বদাই নিজের ভেতরে এক নরক নিয়ে বেঁচে থাকেন, নিউরনে জমাকৃত স্মৃতিগুলোই সৃষ্টি করে সেই নরক; যার ভেতর দিয়ে বেরিয়ে আসে কবির দৈনন্দিন শব্দ ও কথা।

জগদ্বিখ্যাত স্পেনিশ কবি লোরকাকে নিয়ে কিছু বলার শুরুতেই এ কথাগুলো মনে পড়ছে। লোরকা ছিলেন নাট্যকার ও কবি। তা সত্ত্বেও, অসাধারণ কাব্যভাষা ও নাটকীয় মৃত্যুই তার বিশ্বময় আলোচিত হয়ে ওঠার প্রধান দুটি বিষয়।

লোরকাকে বলা হয় গ্রানাদার কবি। পুরোনাম: ফেদেরিকো দেল সেগরাদো কোরাজন দে জেসাস গার্সিয়া লোরকা। তবে তিনি ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকা নামে সুপরিচিত এবং মূল হিস্পানিওলে: ফেদেরিকো ইয়ার্সিয়া লোরকা। বিশ শতকে, স্পেনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কবি ও নাট্যকার তিনি।

লোরকার জন্মস্থান আন্দালুসিয়া

লোরকা সম্পর্কে একথাই বলা যায় যে, তিনি কেবল বিশ্বজনীন স্পেনীয় কবিই নন, বিশ্বজুড়ে তার খ্যাতিও স্পেনকে মর্যাদার আসনে বসিয়েছে; আর তার জন্মাঞ্চল আন্দালুসিয়া হয়ে উঠেছে এক কাব্য-ব্যঞ্জনাময় নাম। জলপাইবাগানে ঠাঁসা অপরূপ ভূনিসর্গ, আর ডুমুরবন, শাদা চুনকামের বাড়িঘরগুলোর মধ্যে জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত, বুলফাইটার ও জিপসীদের চলাচল; সব মিলিয়ে এক চিত্রল আন্দালুসিয়া জেগে আছে কবিতার রসাস্বাদনপটু পাঠকের অন্তরলোকে। দক্ষিণ-পশ্চিম স্পেনের গ্রানাদার উপকণ্ঠে অবস্থিত লোরকার জন্মস্থল আন্দালুসিয়া তার কবিতা ও নাটকের পশ্চাদভূমি; তিনি আন্দালুসিয়াকে পুনর্জন্ম দিয়েছিলেন তার রচনায়। লোরকার রচনাবলিতে আন্দালুসিয়ার নিসর্গই তার লোকাল কালার হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে বারবার। ফলে অনেকের কাছে তিনি আন্দালুসিয়ান কবি হিসেবেও পরিচিত।

গ্রানাদা

বিশ শতকীয় পৃথিবীর সবচেয়ে মেধাবী, উদ্ভাবনী ও সৃজনশীল এই কবিকে স্পেনের গৃহযুদ্ধ ও তৎপরবর্তী মর্মান্তিক ঘটনাবলিই পৃথিবীর সামনে টেনে এনেছে। ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ৫ জুন গ্রানাদার এক সম্পন্ন কৃষক পরিবারে জন্মানো লোরকাকে তার কৃষ্টিময় জননী পিয়ানো বাজাতে ও গান গাইতে শিখিয়েছিলেন, যা তার পরবর্তী জীবনকে ব্যাপক প্রভাবিত করে।

ছাত্রজীবনেই মাদ্রিদে এসে লোরকার বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিলো চিত্রশিল্পী দালি ও চলচ্চিত্রকার লুই বুনুয়েলের মতো প্রাতিস্বিক মেধাবীদের সঙ্গে। লোরকা তার নিজস্বতা বিসর্জন না দিয়েও এঁদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি তাৎক্ষণিক খ্যাতি পেয়েছিলেন নিজ দেশে এবং গোটা লাতিন আমেরিকায়; এবং অনুদিত হয়ে জনপ্রিয়তায় ছড়িয়ে পড়েছিলেন ফ্রান্সে ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে; ১৯২৮ সালে প্রকাশিত তার কবিতাগ্রন্থ Gypsy Ballads তাকে এই খ্যাতি এনে দেয়।

থিয়েটারের মানুষ হিসেবে গোটা স্পেন চষে বেড়িয়েছেন লোরকা। তার ত্রয়ী নাটকের মাধ্যমে স্পেনের দক্ষিণপন্থিদের অনেকেই তার শত্রু হয়ে ওঠে। কিউবা ও নিউইয়র্কে অবস্থানকালের অভিজ্ঞতায় ১৯৩০ এর দশকের মার্কিন জীবন বাস্তবতা ও বস্তুবাদের ওপর আলোক প্রক্ষেপন করে তিনি রচনা করেন Poet in New York (১৯৪০)।

জেনারেল ফ্রাঙ্কো যখন রিপাবলিকান সরকারকে হটিয়ে ১৯৩৬ সালে ক্ষমতাসীন হন, শুরুতেই পতন ঘটে গ্রানাদার। ফ্রাঙ্কো, কার্ল মার্ক্স-এর অনুসারীদের বিরুদ্ধে ক্রুসেড ঘোষণা করেন। ফ্রাঙ্কোর কোপানলে গ্রানাদায় মোট ৩০,০০০ মানুষের প্রাণ বলি গিয়েছিলো। লোরকা তাদেরই একজন।

ফ্র্যাঙ্কো

১৯৩৬ সালে, স্পেনের গৃহযুদ্ধ শুরুর প্রথমপর্বেই লোরকাকে হত্যা করা হয়। তার দেহাবশেষ কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় নি। ধারণা করা হয়, ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করার পর চাকু ও হাতুড়ির ব্যবহারে তার দেহ টুকরো টুকরো করা হয়েছিল এবং মাথা থেঁতলে দেয়া হয়েছিলো।

মর্মান্তিকভাবে নিহত হবার পর লোরকার বেশ কিছু নাটক ও কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়। স্পেনের স্থানীয় ইতিহাসবেত্তা ও গবেষক, মিগুয়েল পেরেজ সম্প্রতি লোরকার কবর খুঁজে পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন। যা হোক, সে এক ভিন্ন প্রসঙ্গ।

লোরকার প্রথম কবিতাগ্রন্থ ‘কবিতার বই’ নামেই প্রকাশিত হয় ১৯২১ সালে। এসব কবিতা তিনি লিখেছিলেন ১৯১৮-১৯২১ সালের মধ্যেই। এটি ছিলো, মূলত, তার কবিতার একটি সংগ্রহ। তার ভাই ফ্রান্সিসকোর সঙ্গে পরামর্শ করে তিনি এ গ্রন্থেও কবিতাগুলো বাছাই করেন।

১৯২৯ সালের জুন মাসে লোরকা ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য পাঠের উদ্দেশ্যে কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে যান; কিন্তু সামার সেশনের ওই পাঠ তিনি শেষ করেন নি, বরং শিক্ষাসমাপনী পরীক্ষাতেই অংশ নেন নি। সে সময় তার কবিতাগ্রন্থ ‘জিপসীদের গাথা’ (Gypsy Ballads) স্পেনে বেস্ট সেলার হয়েছে; কিন্তু কোনও কোনও সমালোচক বলছেন, লোরকার কাব্যপ্রতিভা সস্তা জনপ্রিয়তাকামী।

কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি পড়তে গিয়ে লোরকা ১০ মাস সেখানে অবস্থান করেন। শিক্ষাগ্রহণ সম্পন্ন না করলেও, সে সময় তার হাতে রচিত হয়েছিলো তার বিখ্যাত কবিতাকৃতির অন্যতম ‘নিউইয়র্কে কবি’ (Poet in New York) গ্রন্থটি। ১৯৩০ সালের মার্চে লোরকা নিউইয়র্ক ত্যাগ করেন।

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার সঙ্গে সমভাষী আরেক জগদ্বিখ্যাত কবি পাবলো নেরুদার সখ্য গড়ে উঠেছিলো। ১৯৩০-এর মাঝামাঝি পাবলো নেরুদা কূটনীতিক হিসেবে বার্সেলোনায় যান। সেখানে, একটি অনুষ্ঠানে কবিতা পাঠের জন্য, লোরকাই নেরুদার নাম ঘোষণা করেন এবং সমবেতদেও সামনে তাকে পরিচয় করিয়ে দেন। এর ভেতর দিয়েই স্পেনে পাবলো নেরুদার কবি জীবন সূচিত হয়।

আর্হেন্তিনার (বাংলায় প্রচলিত আর্জেন্টিনা) বুয়েনস এইরেসে, লোরকা ও পাবলো নেরুদার সাক্ষাৎ ঘটে আরেক লাতিন কিংবদন্তি হোর্হে লুই বোর্হেসের সঙ্গে। লোরকার সাহিত্যকর্ম নিয়ে এ দুই মহান লেখকের দুধরনের প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়। নেরুদা লোরকাকে ভূয়সী প্রশংসা করলেও, হোর্হে লুই বোর্হেস তার রচনাবলির কট্টর সমালোচক। বোর্হেসের মতে, গার্সিয়া লোরকার সাহিত্যকর্ম বালখিল্যে ঠাঁসা। অন্যদিকে, ‘ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার জন্য গাথা’ শীর্ষক দীর্ঘ কবিতা শুরু করছেন, এভাবে—

‘নির্জন এক গৃহকোণে যদি পারতাম আমি ভয়ে চিৎকার করতে
যদি পারতাম আমার চোখ দুটোকে তুলে নিতে আর খেয়ে ফেলতে
তোমার শোকবিহ্বল কমলাবরণ কন্ঠস্বও আর তোমার ওইসব কবিতা
যারা বেরিয়ে আসছে আর্তনাদে, ওগুলোর জন্য, সেটাই করতাম আমি।’

প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তির এক নাটকীয় অথচ সংক্ষিপ্ত জীবনে বেঁচেছিলেন লোরকা। ফ্যাসিস্ট ফ্রাঙ্কোর লোকেদের হাতে এক মর্মান্তিক মৃত্যুর ভেতর দিয়ে তার জীবনাবসান ঘটলেও, অব্যাহতভাবে তিনি নিন্দিত ও নন্দিত হচ্ছেন, আজকের দিনেও।

ফেদেরিকো গার্সিয়া লোরকার প্রণয়ও রহস্যাবৃত। ব্যক্তিগত জীবনে সমকামিতার চর্চাও তাকে এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড় করিয়েছে। বিশ্ববিখ্যাত চিত্রশিল্পী সালভেদর দালির সঙ্গে তার সমকামী বন্ধুত্ব গড়ে উঠলেও, লোরকার গোপন প্রণয় সম্পর্কে তার মৃত্যুও বহু বছর পর, মাত্র ২০১০ সালে গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্যাদি পাওয়া গেছে। হুয়ান রেমিজে দে লুকাস নামক এক কিশোরের সঙ্গে প্রাগযৌবনে লোরকা আবেগীয় প্রণয়ের সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। মাদ্রিদে বসে, তাকে নিয়ে জনপ্রশাসন ও নাট্যকলা অধ্যয়নের জন্য মেহিকোতে পাড়ি জমানোর পরিকল্পনাও করেছিলেন লোরকা। কিন্তু লুকাস তখন মামা-বাবাকে ছেড়ে দেশত্যাগ করার বয়সী ছিলেন না, ফলে তাদের সে পরিকল্পনা সফল হয় নি। পরিকল্পনা ভেস্তে যাবার পর, লোরকা গ্রানাদায় ফিরে গিয়েছিলেন।

লুকাস ছিলেন একজন জার্নালিস্ট ও চিত্রকলা সমালোচক; যিনি ২০১০ সালে, মৃত্যুর দিন পর্যন্ত লোরকার কিছু স্মৃতি সংগোপনে আগলে রেখেছিলেন। এগুলো হলো: লোরকার কয়েকটি ড্রয়িং, বেশকিছু চিঠি, একটা কবিতা এবং একটা খেরোখাতা। মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্তে এগুলো তিনি তার এক বোনকে হস্তান্তর করেন। যতদূর জানা যায়, ১৯৩৬ সালের জুন মাসে লোরকা ও লুকাস পরস্পরকে শেষবারের মত বিদায় জানিয়েছিলেন আটোচা রেল স্টেশনে; তখন লুকাসের বয়স মাত্র ১৯ বছর। সেটা ছিলো এ কারণে যে, লুকাস যাচ্ছিলেন আলবাসেটে অবস্থানরত তার মা-বাবার থেকে অনুমতি নিতে; কেননা, তিনি কবির সঙ্গে মেহিকো যেতে চান। অন্যদিকে, লোরকা মেহিকোতে যাবার আগে তার মা-বাবার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে যাচ্ছিলেন। ঘটনাক্রমে এটাই হয়ে উঠেছিলো এ দুজনের শেষ বিদায়ের মুহূর্ত। ১৯৩৬ সালের আগস্ট মাসেই লোরকার জীবনাবসান ঘটে। লোরকা ও লুকাসের এই প্রণয়-কাহিনি নিয়ে ম্যানুয়েল ফ্রান্সিকো রেইনা ‘অগোচর প্রেম’ (Los amoresoscuros, or, The dark loves) নামে একটি উপন্যাস রচনা করেছেন।

তারই রচিত ছোট্ট, সুন্দর এই কবিতাটি দিয়ে, জগতের নিন্দিত-নন্দিত ও বিতর্কিত এই মহান কবির স্মরণকথায় ইতি টানা যাক:

এভাবেই শেষ হচ্ছে

শুকনো ভূতলে
ওইসব শতশত প্রেমিক
ঘুমিয়ে পড়লো চিরতরে।
আন্দালুসিয়ার রয়েছে
দীর্ঘ, রক্তবর্ণ সড়কসমূহ।
কর্ডোবা, সবুজ জলপাই
গাছগুলোকে নিয়ে শতেক ছেদবিন্দুতে
স্মরণ করছে তাদের।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: