।। বিশেষ প্রতিনিধিনিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী ।।

পয়লা মেয়াদেই রীতিমতো নগরীর খোলনলচে বদলে ফেলেছিলেন তিনি। মাঝের এক মেয়াদ মেয়র না থাকলেও ২০১৩ সালে তাই নগরবাসীর বিপুল প্রত্যাশা সঙ্গে নিয়ে তিনি ফের নির্বাচিত হন। রাজশাহীকে একটি আধুনিক মহানগর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বড় ধরনের উদ্যোগের স্বপ্ন তিনি দেখিয়েছেন এবারও। কিন্তু সেই এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনই নির্বাচিত হওয়ার এক বছর না পেরোতেই দুই চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন।

[interaction id=”5cb9f6efbb6fb08faf178d8a”]

রাজশাহী সিটি মেয়রের সামনে চ্যালেঞ্জ দুটি হলো, অবৈধ দখল উচ্ছেদে সর্বাত্মক সহায়তা না পাওয়া ও বর্ধিত কর নিয়ে নাগরিক সংগঠনের আপত্তি।   

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, ‘বর্তমান মেয়র মহোদয়ের পরিকল্পনা অনুযায়ী আধুনিক ও বাসযোগ্য নগরী গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই অবৈধ স্থাপনাগুলো সরাতে হবে। একাধিকবার নোটিশ দিয়ে আমরা সেই কাজ শুরু করেছি।’

তিনি জানান, নগরীর প্রধান ফুটপাতগুলোকে দখলমুক্ত করে নগরবাসীর হাঁটার উপযোগী করার কাজটিকে তারা বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। এ কারণে সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিদিনই ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হচ্ছে।

সরেজমিন নগরী ঘুরে দেখা গেছে, এই উচ্ছেদ অভিযান নিয়ে অবৈধ দখলদারদের মধ্যে অসন্তোষ বিরাজ করছে। তারা নানা উপায়ে নিজেদের সংগঠিত করার চেষ্টা চালাচ্ছেন।

রাজশাহী সিটি করপোরেশনের একজন ওয়ার্ড কাউন্সিলর নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘উচ্ছেদ অভিযান শুরুর পর থেকে অনেকেই আসছে, বলছে, যাতে উচ্ছেদ না করা হয়। আমরা বলছি, বোঝাচ্ছি যে, নগরবাসীর ভালোর জন্যই কাজগুলো করা হচ্ছে। কেউ বুঝছে। কেউ বুঝছে না।’

যদিও এসবে থেমে নেই সিটি করপোরেশন। ১৫ এপ্রিল থেকে প্রতিদিনই তারা উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করছে। ফুটপাতে অবৈধ দোকানপাট বা স্থাপনার পাশাপাশি রাস্তায় নির্মাণ সামগ্রী রাখার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। উচ্ছেদের পাশাপাশি করা হচ্ছে জরিমানাও।

সিটি করপোরেশনের সাধারণ সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, ফুটপাতে স্থায়ীভাবে কিছুই রাখা যাবে না। যারা ব্যবসা করেন, তারা বিকেল ৪টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত ফুটপাতে ব্যবসা করতে পারবেন। তবে নির্ধারিত সময় শেষে আবার ব্যবসা সামগ্রী তুলে নিয়ে যেতে হবে তাদের।

ইস্যু যখন বর্ধিত কর

রাজশাহী সিটি করপোরেশন যখন নিজেদের আর্থিক সংগতি ফেরাতে কর আদায়ে জোর দিচ্ছে, তখন বর্ধিত করের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে একটি ব্যবসায়ী সংগঠন। ইতোমধ্যে তারা বর্ধিত কর কমানোর দাবিতে কর্মসূচিও শুরু করেছে। সংগঠনটির নাম রাজশাহী ব্যবসায়ী সমন্বয় পরিষদ।

সংগঠনের সভাপতি মো. সামসুদ্দিন দাবি করেন, নগরে হোল্ডিং ট্যক্স কয়েক গুণ নয়, কয়েকশ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘যে হোল্ডিএর ট্যাক্স ছিলো ৪ হাজার ৬০০ টাকা, তা এখন প্রায় ৫২ হাজার টাকা করা হয়েছে। যার তথ্য-প্রমাণ আমাদের কাছে রয়েছে। অথচ ঢাকার মতো শহরেও এতো ট্যাক্স দিতে হয় না বা এভাবে ট্যাক্স বৃদ্ধি করা হয় না।’

ব্যবসায়ী সংগঠনের এই নেতা আরো বলেন, ‘আমরা সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমান মেয়রের সাথে আলোচনায় বসতে গত ২৭ মার্চ তারিখ নির্ধারণ করি। তবে মেয়র সাহেবের পিএ মিটিংয়ের আগে জানিয়ে দেন অন্য গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠান থাকায় ওই দিন বসা সম্ভব হবে না মেয়রের। নতুন ডেট পরে জানিয়ে দেয়া হবে। আর এখন পর্যন্ত সেই ডেট তারা জানায় নি।’

এদিকে রাসিকের দেয়া তথ্য মতে, রাজশাহী নগরে ৬০ হাজারের উপরে বাড়িতে হোল্ডিং নম্বর রয়েছে। আর এই হোল্ডিংগুলো প্রতিবছর নিয়ম মেনে রাসিককে কর দিলে তা থেকে ১০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। তবে হোল্ডিংগুলোর মালিকেরা নিয়মিত কর না দেয়ায় প্রতিষ্ঠানটি গত ১৭-১৮ অর্থ বছরে এই খাত থেকে আয় করতে পেরেছে মাত্র ৬ কোটি টাকা।

বিষয়টি জানতে রাসিকের রাজস্ব কর্মকর্তা আবু সালেহ মো. নূর-ঈ-সাইদের সঙ্গে কথা বলা হলে তিনি জানান রাসিকের জনসংযোগ কর্মকর্তার মাধ্যমে পরে বিস্তারিত জানান হবে।

মেয়র যা বললেন

জানতে চাইলে রাজশাহী সিটি মেয়র এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন উত্তরকালকে বলেন, ‘নাগরিকদের সুবিধার্থেই অবৈধ দখল উচ্ছেদ করছি আমরা। এখানে কারো সমস্যা হওয়ার কথা নয়। বরং নগরীকে গড়ে তুলতে সবারই সহায়তা করা উচিত।’

তিনি বলেন, ‘গুটিকয়েক মানুষের জন্য নগরবাসীর সমস্যা সৃষ্টি করা যাবে না। আমরা যদি শুরু থেকেই এগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে না পারি, তাহলে একদিন আমাদের পরিণতিও আজকের ঢাকার মতো হতে পারে। কাজেই এসব ভাবতে হবে সবাইকে।’

সিটি করপোরেশনের চলমান অভিযান সফল করতে তিনি গণমাধ্যমের সার্বিক সহায়তা চেয়ে বলেন, ‘মানুষের কাছে এ বিষয়ে সঠিক তথ্যগুলো পৌঁছে দিয়ে জনমত তৈরিতে মিডিয়ার ভূমিকা রাখা উচিত।’

বর্ধিত করের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে লিটন জানান, এই ইস্যুটি একটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করা হয়েছে। সেখানে ব্যক্তিগত রিভিউর সুযোগও আছে। কাজেই নগরবাসীর বড় অংশই এ নিয়ে খুব একটা বিরোধিতা করছেন না বলে তিনি মনে করেন।

তিনি বলেন, ‘সিটি করপোরেশনকে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী করতে না পারলে উন্নয়নের অনেক পরিকল্পনাই থমকে যায়। সেকারণে হোল্ডিং ট্যাক্স ঠিকঠাকভাবে পরিশোধ করাটা খুবই জরুরি।’

মেয়র বলেন, ‘কর নিয়ে যারা কথা বলছেন, তাদের বেশিরভাগই কীসের ভিত্তিতে বলছেন আমি জানি না। তবে কয়েকজন সিনিয়র সিটিজেন এ ব্যাপারে আমার সঙ্গে কথা বলতে চান বলে জেনেছি। আমি ঢাকা থেকে ফিরেই তাদের সঙ্গে বসে কথা বলবো।’

এই দুই ইস্যুতে কিছুটা প্রতিবন্ধকতা থাকলেও এগুলো সব দূর হয়ে যাবে বলে আশাবাদী মেয়র লিটন।