।। বিশেষ প্রতিনিধি, রাজশাহী ও নিজস্ব প্রতিবেদক, ঢাকা ।।

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের পদত্যাগের পর জামায়াত থেকে বহিস্কৃত নেতা মজিবুর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বেই আসছে নতুন একটি সংগঠন। আগামী ২৭ এপ্রিল এর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।

এরই মধ্যে মঞ্জুর সঙ্গে জামায়াত ছেড়ে আসা অনেকেই সম্পৃক্ত হয়েছেন। দলে এখনো রয়েছেন, কিন্তু সংস্কার চান, এমন তরুণ নেতাদের একটি অংশের সঙ্গেও আলাপ-আলোচনা চলছে।

মেসেঞ্জার ও ইমেইলে মঞ্জুর বার্তা

নতুন সংগঠনের কয়েক দফা প্রস্তুতি বৈঠকের পর অতি সম্প্রতি শিবিরের সাবেক সভাপতি মঞ্জু জামায়াতের অনেক নেতাকর্মীর কাছে মেসেঞ্জার ও ইমেইলে একটি দীর্ঘ বার্তা পাঠিয়েছেন।

উত্তরকাল’র সঙ্গে আলাপকালে জামায়াতের একাধিক নেতা এই বার্তা পাওয়ার কথা স্বীকার করেছেন। নাম পরিচয় প্রকাশ না করার শর্তে তাদের একজন বার্তাটি হুবহু উত্তরকালকে প্রেরণ করেন।

‘একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের ঘোষণা’ শিরোনামে ওই বার্তায় যা বলা হয়েছে, তা হুবহু এমন-

১) পৃথিবীর বিভিন্ন দেশের ইসলামী আন্দোলনে সংস্কারের যে ধারা ৮০র দশকে শুরু হয়েছিল তার স্পন্দন বাংলাদেশেও সঞ্চারিত হয়। ঐতিহাসিক পথ পরিক্রমা পেরিয়ে আমরা সেই ধারারই প্রতিনিধিত্ব করছি।

২) একটা লম্বা সময় ধরে এই ধারার লোকেরা চেষ্টা করেছে ভেতর থেকে সংস্কার করার জন্য। আদর্শিক নীতি ও নিয়ম মেনে সেসব যথাযথ ফোরামে তুলে ধরা হয়েছে। কিছু গবেষণামূলক প্রবন্ধ, ডাটা ভিত্তিক তথ্য, সুনির্দিষ্ট পর্যালোচনা ও প্রস্তাবনা লিখিত আকারে বিভিন্ন ফোরাম ও নীতি নির্ধারকদের নিকট উপস্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু কোন চেষ্টাই ফলপ্রসূ হয়নি। বিভিন্ন সময় ও পর্যায়ে সংস্কারবাদী আখ্যা দিয়ে বরং এসবের প্রবক্তা ও সমর্থনকারীদের কোনঠাসা করা হয়েছে এবং ক্রমান্বয়ে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেয়া হয়েছে।

৩) একটা সময়ে এসে এটা সুস্পস্ট হয়েছে যে ভেতর থেকে সংস্কারের কোন সুযোগ নেই। যারা সংস্কার চান তাদের কে হয় ধীরে ধীরে নিস্ক্রিয় হয়ে যেতে হবে অথবা সংগঠন থেকে বের হয়ে গিয়ে নিজেদের নতুন করে স্বতন্ত্র কোন পদক্ষেপ নিতে হবে।

৪) সংগঠন থেকে বের হয়ে গিয়ে নিজস্ব সংস্কার চিন্তার আলোকে নতুন ধারা তৈরী করা খুবই কঠিন একটি কাজ। অতীতে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেউ কোন পদক্ষেপ নিয়ে সফল হননি এরকম একটা কথা সমাজে প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। তাছাড়া বেরিয়ে যাওয়া লোকদের নানা অপবাদে অভিষিক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো এবং তাদের মনোবল ভেঙ্গে দেয়ার চেষ্টা করাটাও ছিল একটা কার্যকর অস্ত্র। অতীতে যারা সংস্কারের কাজ করেছেন তারাও অনেকে সংগঠিত হয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেননি। ফলে বাস্তবিক পক্ষে সংস্কারমূলক কোন রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সফল ভাবে এগোয়নি।

সংস্কার হচ্ছে না, ক্ষমাও চাইবে না জামায়াত

৫) বর্তমানে আমরা যারা সংস্কারবাদী হিসেবে কিছুটা আলোচিত-সমালোচিত তাদের নিয়ে এখন বেশ আশা-নিরাশার দোলা শুরু হয়েছে। আমরা কী করবো? কী করতে চাই? আদৌ কিছু করতে পারবো কিনা? আমাদের সুনির্দিষ্ট চিন্তা ভাবনা কী? কারা আসবে আমাদের ডাকে? আমাদের কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা কাঠামো বা লিখিত বক্তব্য আছে কিনা? অর্থনৈতিক সামর্থ্য কী— ইত্যাদি নিয়ে ব্যাপক কথাবার্তা হচ্ছে।

৬) আমরা এখন পর্যন্ত দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের চিন্তাশীল জনগণের কাছ থেকে যে সাড়া পেয়েছি তা অভূতপূর্ব। প্রতিদিন বিভিন্ন ব্যাক্তি বা গ্রুপের কাছ থেকে আমরা আলোচনার আহবান পাচ্ছি। কিন্তু বেশীরভাগ লোকই হচ্ছে তারা সফল কিছু করতে পারলে আমাদের সাথী হতে চায়। তারা পেছন থেকে আমাদের সাহায্য করতে চায়। আমরা যদি নিজেদের পথ ঘোষনা করতে পারি, সেই পথের উপর দাঁড়াতে পারি তাহলে তারা আমাদের সাথে শামীল হবার ইচ্ছা পোষন করেন।

৭) জনসাধারণের এই অভিপ্রায় ও ইচ্ছা খুবই স্বাভাবিক। তবে তারা যে উদ্যোক্তা না হয়ে অনুসারী, সাহায্যকারী হতে চায় সেটাও বা কম গুরুত্বপূর্ণ নয়।

[interaction id=”5cb847976fdf9a4308e42904″]

৮) বর্তমান পরিস্থিতিতে আমরা কী করতে পারি এ বিষয়ে আলাপ করতে গিয়ে আমরা যে সকল পরামর্শ পেয়েছি সেগুলোর সারসংক্ষেপ হলো—-

ক) মানুষ পরিবর্তনের জন্য মুখিয়ে আছে। তারা নতুন কোন পরিবর্তনমূলক পদক্ষেপ চায়।

খ) তাড়াহুড়ো করে কিছু করা সংগত হবেনা আবার বেশী দেরী করাও চলবেনা।

গ) ভাবনা চিন্তা করে আপাতত: যা প্রস্তুতি আছে তা দিয়ে কিছু একটা সাংগঠনিক রুপ দাঁড় করানো উচিত। অন্যথায় লোকেরা সংগঠিত হবার কোন উৎস পাবেনা। বিভিন্ন রকম তৎপরতা দিয়ে লোকদের সক্রিয় রাখা ও সংগঠিত করার মাধ্যমে এগুতে হবে।

ঘ) সংঘাত বা ঝুঁকিপূর্ণ পরিস্থিতি এড়িয়ে চলা। কোন উস্কানী বা নেতিবাচক মন্তব্য ও কথার জবাব যুক্তি, কৌশল এবং মার্জিত পন্থায় দেয়ার চেষ্টা করা।

জামায়াতের নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে আসছেন ছাত্রশিবিরের ৪ সাবেক নেতা

৯) সার্বিক বিচারে আমাদের এখন উচিত নিজেদের কে সংগঠিত করা। সার্বক্ষণিক সক্রিয়দের নিয়ে একটা টীম তৈরী করা। যোগাযোগ বৃদ্ধি করা এবং আন্ত:সংযোগের ব্যাপ্তি ঘটানো। আপাতত: একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের কথা স্পষ্ট করে ঘোষনা দেয়া। কাঠামো এবং লিখিত প্রস্তাবনা, বক্তব্য, বয়ান ইত্যাদি সবাই মিলে তৈরী করা। বাংলাদেশের মানুষ কে সেই উদ্যোগে শামীল হবার আহবান জানানো। সকল ধরনের প্রশ্নের জবাব দেয়া।

১০) এই উদ্যোগ তখনই সফল হবে যখন এর সাথে সংশ্লিষ্ট সকলে এটাকে নিজের একান্ত সংকল্প হিসেবে গ্রহণ করবে। নিজ নিজ অবস্থান থেকে এই কাজে নিজেকে উৎসর্গ করার দৃঢ সিদ্ধান্ত ও মনোবল ব্যক্ত করবে। উপরোক্ত বিশ্লেষণের আলোকে আমরা বর্তমান যে অবস্থা ও অবস্থানে আছি সেখান থেকেই আগামী ২৭ এপ্রিল একটি ঘোষনা প্রদানের চিন্তা করছি। যেখানে আমরা বলবো যে আমরা আজ থেকে একটি নতুন রাজনৈতিক উদ্যোগের কাজ শুরু করছি।

নতুন দলের প্রাক্কালে প্রকাশনা

মজিবুর রহমান মঞ্জুর ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্র জানিয়েছে, নতুন দল গঠনের প্রাক্কালে জোর দেয়া হয়েছে কিছু বৃদ্ধিবৃত্তিক কাজের ওপর। এসব কাজই রাজনৈতিকভাবে পরবর্তীতে দলটিকে সংগঠিত করবে।

ইতোমধ্যে তারা ‘সুশাসন, উন্নয়ন ও মানবাধিকার চাই’ শিরোনামে একটি পুস্তিকা প্রকাশ করেছেন। পুস্তিকাটি জামায়াত ও শিবিরের বিভিন্ন স্তরের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বাইরের মানুষদের মাঝেও বিতরণ করা হচ্ছে।

পুস্তিকাটির ভূমিকায় বলা হয়েছে- ‘‘বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এদেশে আল্লাহর আইন ও সৎলোকের শাসন কায়েমের স্বপ্ন ও রাস্তা দেখিয়েছে লক্ষ কোটি জনতাকে। আমরাও সেই স্বপ্নকে বুকে ধারণ করে অনেক রাস্তা পাড়ি দিয়েছি। কিন্তু চলার পথে অনেক বিষয়ে কোরআন এবং হাদীসের পরিপন্থী কাজ ও সিদ্ধান্ত আমাদের ব্যথিত করে। বিভিন্ন মহলে হাজারো বার পরামর্শ দিয়েও কোন কাজ হয় না। কিছু কিছু সিস্টেম এ দলের নেতাদের স্বৈরাচারী করে তুলেছে, পরামর্শভিত্তিক সংগঠন বলে বারবার চিৎকার করলেও এখানে হক কথা, হক পরামর্শ দিতে গেলে তারা আর নেতৃত্বে আগাতে পারেনি, ছিটকে পড়েছে বহুদূর।’’

এই পুস্তিকায় কোরআন-হাদিসের আলোকে জামায়াতের বিভিন্ন ভুল উল্লেখ করা হয়েছে।

অন্য দলের সঙ্গেও যোগাযোগ

মঞ্জুর ঘনিষ্ঠ সূত্রটি জানিয়েছে, জামায়াতের বাইরেও অন্য দলের অনেকের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ স্থাপন হয়েছে। বিশেষ করে বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাদের সঙ্গে আলাপ এগিয়েছে।

সূত্রটি দাবি করে, বিএনপির একজন প্রভাবশালী কেন্দ্রীয় নেতার নেতৃত্বে দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতা-কর্মীদের একটি অংশ তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারেন।

২৫ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবে মঞ্জুর সঞ্চালনায় বক্তব্য দিতে দেখা যায় ড. কামাল হোসেনকে।

সূত্রটি আরও জানায়, ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গেও তাদের একটি বোঝাপড়া তৈরি হয়েছে।

নিউজিল্যান্ডের মসজিদে সন্ত্রাসী হামলায় হতাহতদের স্মরণে গত ২৫ মার্চ জাতীয় প্রেসক্লাবে এক শোকসভা আয়োজন করেন মজিবুর রহমান মঞ্জু। সেখানে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের শীর্ষ নেতা ড. কামাল হোসেন, বাসদ সম্পাদক খালেকুজ্জামান, ড. আসিফ নজরুলসহ বেশ কজন বিশিষ্ট নাগরিককে দেখা যায়।

পুরনো দ্বন্দ্বে দলত্যাগীরা থাকছেন উদ্যোগে

১৯৮২ সালের পরে ২০০৯ সালে বড় রকমের দ্বন্দ্ব তৈরি হয় জামায়াতে ইসলামীর ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবিরের মধ্যে। মূলত একাত্তরের ভূমিকা প্রশ্নে এই দ্বন্দ্ব শুরু হয়।

সেই সময় সংগঠনটির কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল শিশির মনির এই দ্বন্দ্বের কারণেই রেওয়াজ অনুযায়ী পরে আর সভাপতি হতে পারেননি। দ্বিতীয় মেয়াদে সভাপতি হন রেজাউল করিম।

সেক্রেটারি মনোনীত হন ডা. আবদুল্লাহ আল মামুন। কিন্তু তাতেও শেষ রক্ষা হয়নি। দ্বন্দ্ব বরং আরো প্রকট হয়ে ওঠে।

তৎকালীন সভাপতি রেজাউল করিমের বিরুদ্ধে আর্থিক অনিয়ম-মিথ্যাচারসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ এনে সাধারণ সম্পাদক ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনসহ ২৫ সদস্য পদত্যাগ করেন। সেই সময় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটের বেশিরভাগ নেতা পদত্যাগ করেন।

পরবর্তীতে এই নেতাদের কাউকেই আর জামায়াতের গুরুত্বপূর্ণ কোনো রাজনৈতিক তৎপরতায় সম্পৃক্ত করা হয়নি। বিশেষ করে শিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুর রহমান, সাধারণ সম্পাদক শিশির মনির, ডা. আবদুল্লাহ আল মামুনসহ তাদের অনুসারীদের কোনঠাসা করে ফেলা হয়। এই নেতাদের বেশিরভাগই এখন দেশের বাইরে। মঞ্জু তার নতুন উদ্যোগে তাদের সবাইকেই পাচ্ছেন বলে সূত্র জানিয়েছে।

সূত্রটি আরও জানায়, গেলো সপ্তায় মঞ্জুর সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছে ছাত্র সংঘ থেকে শিবির প্রতষ্ঠাকালীন সেক্রেটারি জেনারেল আবদুল বারীর সঙ্গে। বর্তমানে তিনি নিউইয়র্কে বসবাস করছেন। এই উদ্যোগের ব্যাপারে তার মনোভাবও ইতিবাচক।

কী করবেন ব্যারিস্টার রাজ্জাক?

একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়ে তার পদত্যাগের মধ্য দিয়েই জামায়াতের সংকট প্রকাশ্যে আসে। সেই ব্যারিস্টার রাজ্জাক এখন লন্ডনে।

১১ এপ্রিল লন্ডনে ব্যারিস্টার রাজ্জাকের আলোচনা

গত ১১ এপ্রিল সেখানে ‘অ্যান ইভিনিং উইথ ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক’ নামের এক অনুষ্ঠানে জামায়াতের এই সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, “ভবিষ্যতে রাজনীতিতে যোগ দেওয়ার কোনও ইচ্ছে আমার নেই। ভবিষ্যতে নতুন কোনও রাজনৈতিক দল করারও ইচ্ছে নেই।”

জানতে চাইলে মজিবুর রহমান মঞ্জু বলেন, “আমরা এখনো উনাকে (ব্যারিস্টার রাজ্জাক) এ বিষয়ে ‘অ্যাপ্রোচ’ করিনি। ভবিষ্যতে করতেই পারি। আবার বিজ্ঞ মানুষ হিসেবে তার কাছ থেকে পরামর্শও নিতে পারি।”

জামায়াতের কারও সঙ্গে এই উদ্যোগ নিয়ে কোনো বৈঠক করেননি বলে দাবি করে মঞ্জু জানান, তিনি নিজে শিবিরের সাবেক সভাপতি। তাই শিবিরের অনেকেই থাকতে পারেন। এছাড়াও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, ডাক্তার ও রাজনৈতিক ব্যক্তিরা এতে সম্পৃক্ত থাকবেন বলে জানান তিনি।

তবে তিনি বলেন, “জামায়াতে যারা আমাদের মতো করে ভাবেন, .তারাও থাকতে পারেন। কিন্তু জামায়াত ভাঙার কোনো পরিকল্পনা আমাদের নেই। আমরা প্রধানত তরুণদের একটি প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা করছি।”