Loading...

শৈশবের বর্ষবরণ

পড়তে পারবেন 2 মিনিটে

।। অনুপম হীরা মণ্ডল ।।

আমাদের শৈশবের বর্ষবরণ উৎসব ছিল খুব আকর্ষণীয়। গ্রামের সব মানুষই এই উৎসবে সামিল হতো। চৈত্র সংক্রান্তির দিন পনের আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু হতো। গ্রামের বালক-তরুণ-যুবকেরা প্রস্তুতি নিতো চড়কের জন্য। ঢাকী আগেই চলে আসতো। গ্রামের মণ্ডপ থেকে নামানো হতো চড়কের পাট। প্রায় দিন পনের এই পাট নদীতে ভাসিয়ে রাখা হতো। সন্ধ্যায় চলতো সিঁদুর, চন্দন, ফুলের মালা দিয়ে পাটপুজো।

চড়ক হতো গ্রামের বাইরে। একদিন রাতের বেলা হতো পাটস্নান। ছেলেদের কাছে এটা ছিল এক ভয়ের ও কৌতূহলের অনুষ্ঠান। নানাজনে নানা ভুত-প্রেত-ডাকিনী-যোগিনী সেজে পাটের স্নানে বাধা দিতো। একজন সন্ন্যাসী পাটের যাত্রাপথে গিয়ে মন্ত্র পড়তেন। এভাবে মন্ত্র পড়ে এক একটি অশুভ শক্তিকে দূর করে পাটকে স্নানে নিয়ে যাওয়া হতো। এ ছিল এক ভয়ঙ্কর অনুষ্ঠান! রাতের আধারে গ্রামের বাইরে নদী ও পুকুরে হতো এই অনুষ্ঠান।
দিন পনের আগে থেকেই পাট নিয়ে সন্ন্যাসীদল ও বালা বাড়িতে বাড়িতে ঘুরতো। তখন সন্ন্যাসীদের ডাব, কাঁচা আম, খেঁজুর ইত্যাদি দান করা হতো। সন্ন্যাসীদল ও বালা সেগুলো নিয়ে বালার শ্লোক বলতেন। শ্লোকের মধ্যে গৃহস্বামীর কল্যাণ কামনা করা হতো। এর পর শীর্ষসহ ফলগুলো গোয়াল ঘরে ঝুলিয়ে রাখা হতো। গ্রামের লোকের বিশ্বাস ছিল যে, সন্ন্যাসীরা ডাকগাছে উঠলে ফল ভালো ধরবে তাই তাদেরকে ডাবগাছে উঠে ডাব পাড়ার জন্য আহ্বান করা হতো। সন্ন্যাসীরা ডাবগাছে উঠে ডাবপেড়ে খেতেন ও গৃহস্বামীকে আশীর্বাদ করতেন।

চৈত্র সংক্রান্তি উপলক্ষ্যে গ্রামের গঠিত হতো অষ্টকের দল। ছেলেরা মেয়ে সেজে এই গানের ছোকড়া হতো। নেচে নেচে তারা বাড়ি বাড়ি গিয়ে গান শুনাতো। এর সঙ্গে চলতো বালা-সন্ন্যাসীর বালাগান। চড়কের দিন খেঁজুর গাছ তলায় হতো নীলের গান। বালা নেচে নেচে নীলের গান গাইতো। সঙ্গে পড়তো ঢাকের বাড়ি। পুরো গাছ তলায় ধুপের ধোঁয়ায় ছেঁয়ে যেতো। সন্ন্যাসীরা নেচে নেচে গান গেয়ে শিবের কাছে মানদ করতেন। মানত শেষে শুরু হতো চড়ক ঘুর্ণি ও খেঁজুর ভাঙা।

পহেলা বৈখাখের সকালেই গরু-মহিষগুলোকে নিয়ে নদী বা পুকুরে স্নান করানো হতো। এরপর গোয়াল ঘর পরিষ্কার করে সেখানে আতপচাউল, দুধ, চিনি দিয়ে পায়েশ রান্না করা হতো। এই পায়েশ কলা পাতায় বেড়ে, ফুল-জল-ধান-দুর্বা দিয়ে ভগবতী পুজো করা হতো। ভগবতী পুজো হলো গৃহদেবী। তাঁর আর এক রূপ লক্ষ্মী। প্রতিটি গার্হস্থ্য পরিবারে এই উৎসব পালিত হতো।

পহেলা বৈখাখের দিন হালের গরুকে তেল-সিঁদুর-চন্দন দিয়ে মাঠে নেওয়া হতো। এই দিন কেউ গাভীর দুধ খেতো না। যতোটুকু দুধ হতো তার পুরোটা দিয়ে পায়েশ রান্না করা হতো। নিয়ম ছিল প্রতিবেশিদের বাড়িতে রান্না করা পায়েশ বিলানো। প্রতিটি বাড়িতে পহেলা বৈশাখে পায়েশ রান্না করার জন্য অতি যত্নে কিছু চাল সংরক্ষণ করা হতো। আগে থেকেই বিশেষ জাতের ধান কিংবা চাল সংগ্রহ করে রাখা হতো।

চৈত্র সংক্রান্তি থেকেই মেলা শুরু হতো। চলতো পহেলা বৈশাখ পর্যন্ত। মেলা থেকে প্রায় সাবই তালপাতার পাখা, আর তৈজসপত্র কিনতো। আমাদের কাছে চৈত্র সংক্রান্তি মেলা অর্থই হলো আম কাটার ছুরি আর তালের রস খাওয়ার উৎসব। মেলাতে তরমুজ উঠতো প্রচুর। সে সময় তরমুজের দাম খুব বেশি ছিল না। আমরা ছোট প্রায় সাবই মেলায় তরমুজ কিনে খেতাম। মেলাতে তরমুজ কেটে বিক্রি হতো। মেলায় উঠতো নতুন মউরি। শীষসহ মউরি কিনে আমরা রাস্তা দিয়ে খেয়ে বেড়াতাম। চৈত্র সংক্রান্তির মেলায় সব থেকে মজা হতো ছোটদের।

চৈত্র সংক্রান্তি তথা বৈশাখী মেলাতে প্রায় প্রতি বাড়িতে মিষ্টি কেনা হতো। এই সময় শুকনো মিষ্টির খুব কদর ছিল। নানা রঙ-বেরঙের হাঁড়িতে করে মিষ্টি কিনে সবাই বাড়ি ফিরতো। সে সময় চিতিতে হাঁড়ির খুব কদর ছিল। কুমারদের কাছ থেকে ময়রারা আগেই চিত্রিত হাঁড়ি কিনে রাখতো। আবার কেউ কেউ মেলায় মৃৎশিল্পী বা কুমারদের কাছে গিয়ে বাছাই করে চিত্রিত হাঁড়ি কিনতো। এখন মিষ্টির প্যাকেট এসে চিত্রিত হাঁড়ির কদর কমে গেছে।

আমাদের শৈশবের মেলাটি এখনো টিকে আছে। তবে এর রূপের পরিবর্তন ঘটেছে। গ্রামের শিশু-কিশোরেরা মেলাটিতে আগ্রহ নিয়ে হাজির হয়। কেবল আমরাই হানো শৈশবকে কেবল নগর জীবনে বসে রোমন্থন করছি। মাঝে মাঝে মনে হয় আবার যদি সেই শৈশব ফিরে পেতাম। আবার যদি ফিরে যেতে পারতাম শৈশবের সেই বৈশাখী মেলায়।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

Follow US

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: