Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > মতামত > আমাদের নববর্ষ

আমাদের নববর্ষ

পড়তে পারবেন 7 মিনিটে

।। সনৎকুমার সাহা ।।

বাঙালির বড় সৌভাগ্য ‘সবার পরশে পবিত্র করা’ দুটো দিন তার আছে। একটি একুশে ফেব্রুয়ারি, যার তুল্য অনুরূপ কোনোদিন আর কোথাও আর কেউ স্মরণ করে বলে জানি না। মাতৃভাষার মর্যাদা তুলে ধরার দাবিতে এমন আত্মবিসর্জন এক অনন্য ঘটনা, তা নিশ্চয় নয়। তবে বাহান্নোর একুশে ফেব্রুয়ারি দিনটি যেভাবে এই বাংলাদেশের ইতিহাসের গতিপথ অভ্রান্ত অনিবার্যতায় স্থির করে দেয়, তার তুলনা কোথাও দেখি না।

[interaction id=”5cb2f0b8b712a33da9b0163d”]

বাহান্নোর পর পাকিস্তানি শাসনে সব একুশে ফেব্রুয়ারিতে সারা দেশ মাতে নি। মাতবার মতো অবস্থা ছিল না। কিন্তু বাঙালি মনে তা শপথ জাগিয়ে চলেছে ঠিকই। সবাই সচেতন না থাকলেও অবচেতনে তা ঢেউ তোলে। তার বিস্তার ঘটে। একাত্তরের পর অবাধে সবটা সামনে আসে। আমরা নিজেদের দেখি স্বতঃস্ফূর্ত আবরণ উল্লাসে। এই দেখায় কোনো বিভাজন নেই। মলিনতা নেই। আবার এ কেবল তাদেরই কীর্তি। এবং এতে আমন্ত্রণ সবার।

এই রকম আর একটা দিন বাংলা নববর্ষের। সত্য কথা, পৃথিবীতে আরো অনেক মানুষের অনেক নববর্ষ আছে। একদিনে সব নয়। ইতিহাসের ধারায় বিভিন্ন জায়গায় বিভিন্নভাবে বছরের দিনকাল গুনে তাকে চিনে নেওয়া। হয়তো শুরুতে গোনাও থাকে না। প্রকৃতির আবর্তনে প্রত্যক্ষের একই ছবি চন্দ্র-সূর্য-গ্রহ-তারা নিয়ে আবার যখন ফিরে আসে, তখন বোঝে সবাই নববর্ষ এসেছে। মনে আনন্দের দোলা লাগে। উৎসবের মেজাজ আপনা থেকে তৈরি হয়। তবে মানুষের অভিজ্ঞতা বাড়ে। বছরের দিনগুলো নির্দিষ্ট ছকে ধরা দেয়। কবে বছরের শেষ, আর নতুন বছরের শুরু, তাও একটা দিন ঠিক করে নিলে আগে থেকে হিসেব কষে বলে দেওয়া যায়। তা থেকে আসে সন গণনা। অনেক পরাক্রমশালী ব্যক্তি অথবা ক্রান্তিকারী ঘটনাকে যুগ যুগ ধরে মানুষের কাছে অবিস্মৃত রাখার আকুলতায় ওই সব নাম বা বিষয়কে কোনো কোনো সন গণনায় স্মারক হিসেবে চিনিয়ে দেওয়া হয়। কেউ ঢাক-ঢোল পিটিয়ে জানিয়ে দেয় নিজেরাই। কারো মহিমা বা প্রচার করে অন্যে। সব টেকে না। কিছু থাকে। থাকে শুধু ভৌগোলিক বৃত্তে জনসমুদয়ের বিকাশে প্রথার বিরতিহীন অনুশাসনেও। যাকে বলি ‘বছরকার দিন’ তারই একটা হয়ে যায় এটি। সবগুলো সমান গুরুত্বপূর্ণ নয়। সমান বর্ণময়ও নয়। তবে যা থাকে, তা আগামী দিনের দিকে আমাদের দৃষ্টি মেলে ধরে। বাড়তি মূল্য যোগ হয়, যদি সংস্কৃতি তাকে সেভাবে চেনায়। যদি সংস্কৃতির সৃষ্টিময়তা তাতে প্রাণের স্পর্শ জাগায়। এবং তার আনন্দে মিলতে পারে সকলেই।

এইখানেই আমাদের বাংলা নববর্ষ বিশিষ্ট হয়ে ওঠে। এমনে ঐতিহ্যগতভাবে উপমহাদেশের আর পাঁচটা নববর্ষের মতোই এটি। যদিও এর নিজস্ব ঐতিহাসিক তাৎপর্য আছে। সে বিষয়ে পরে আসছি। কিন্তু আজ এই দিনটি যে আমাদের নান্দনিক সৃষ্টিকলার অনিরুদ্ধ প্রকাশের দিন হয়ে উঠেছে এবং এক অনাবিল উৎসবে মিলিত হতে জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে খোলামনে সবাইকে আহ্বান জানাচ্ছে এটা সম্ভব হয়েছে আমরা আন্তরিকভাবে বাংলাদেশ চেয়েছিলাম বলে, এবং তা অর্জনের পর এখানে মুক্তপ্রাণের সহজ প্রকাশকে অগ্রাধিকার দিতে পেরেছি বলে। আমাদের বাঁধা-ধরা জীবনের চেহারাটাও এতে উল্টে যায়। আগে সম্পূর্ণ মানবিক কোনো উৎসবকেও সবার কাছে গ্রহণযোগ্য করতে তাতে পুজো-আচার একটু ছোঁয়া লাগিয়ে দিতে হতো। যেমন দোলযাত্রা, অথবা এমনকী নববর্ষেও দেবতার নামে শুভারম্ভ। পৌষ-পার্বণেও দেবতার উদ্দেশে নতুন ধানের নবান্নের রীতি। দেবতাকে ওইটুকু ছুঁয়ে থাকি বলে তা একটা প্রণতির ছোঁয়া পায়। নইলে আয়োজন ও লক্ষ্য সবই মানব-মানবী ঘিরে। আজকের বাংলাদেশে দেবতা অবান্তর। উৎসব সবটাই খোলামেলা মানবিক। এবং আনন্দ মানুষের জীবন পরিক্রমায়Ñ জীবনের স্বাদ আহরণ করায়।

অবশ্য স্বপ্ন পূরণের আগে স্বপ্ন জাগাবার কাল একটা গেছে। ১৯৭১-এর আগে আমাদের বাঙালি সত্তা দানা বাঁধুক তা পাকিস্তানি শাসকেরা চায় নি। ওরা চায় নি বলেই আমরা তাকে আরো আঁকড়ে ধরার পথ খুঁজেছি। সমষ্টির বাঙালি প্রকাশ নির্দোষ নববর্ষের আয়োজন। এটা একদিনে বুঝি নি। নববর্ষের আয়োজন আগে যে ছিল না, তা নয়। হালখাতা, বাড়িতে বাড়িতে মিষ্টি মুখ করা, শখ থাকলে কোনো সম্ভ্রান্ত বাড়িতে গানের জলসা বসানো, গুরুজনদের প্রণাম করা- আশীর্বাদ চাওয়া, এইসব। মিলিত রূপ একটা দাঁড়াতো। মিলিত জীবনে সামঞ্জস্যে তার রেশ থাকতো। কিন্তু সমষ্টির উজ্জীবনে তা কোনো কাজে আসতো না। আমরা আমাদের দেখতাম, এই মাত্র। এবং নিশ্চিন্ত থাকতাম। কিন্তু বাংলা ১৩৭০-এর নববর্ষে ঢাকার ছায়ানট একে বাঙালি উৎসবের এক প্রাণবিন্দুর আকার দিল। তারাই যে প্রথম তা অবশ্য বলি না। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ অনেক আগে বর্ষবরণ উৎসব চালু করেন। একই রকম দোলের সর্বজনীন স্ফূর্তিকে ফুটিয়ে তুলে বসন্ত-উৎসব, বর্ষায় বর্ষা-বরণ ও হল-কর্ষণ উৎসব প্রতিষ্ঠার দিন ৭-ই পৌষ মনে রেখে পৌষ-উৎসব। প্রকৃতিতে বিশ্বলীলার আনন্দময় বৈচিত্র্যে মিশে যাবার প্রেরণা তারা মনে জাগায়। যারা দেখে-শোনে-জানে, তাদের সবার। এবং মানব-মানবীর বস্তুগত আর সব সংকীর্ণতা সেসবে মুছে যায়। ছায়ানট এই কথাটাই মনে রাখে তাদের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে। পাকিস্তানি জঙ্গি শাসনের যাঁতাকলে পড়ে যা তারা মুখে বলে না, কিন্তু শুদ্ধশীল নান্দনিকতায় বুঝিয়ে দেয়, তার আবেদন সব বাঙালির কাছে— আত্মস্বরূপে তাদের সৌন্দর্যানুভূতির ঐক্যের কাছে। এইরকম একটা আহ্বানই তখন আমরা শুনতে চাইছিলাম। আরো চাইছিলাম তার সুন্দর উজ্জ্বল কান্তি। ছায়ানট তারই প্রকাশ ঘটায়। রমনার বটমূলে তাদের বর্ষবরণ উৎসব প্রতি বছর জনসমুদ্রের আকার নেয়। তা অপরাজেয় বাংলার প্রাণের বার্তাই ছড়ায়। তার আগুন আলো জ্বালে সবখানে। নববর্ষের উৎসব এখন শুধু বাঙালি বলেই বাঙালির আত্মপরিচয়ের-আত্মজাগরণের উৎসব।

তবে একত্রীকরণে সরলীকরণের বিপদ আছে। সব বাঙালিই যদি আমরা বাঙালি হতেÑ বাঙালি থাকতে চাইতাম, তবে ছিন্নমস্তার তা-বে কেউ পা মেলাতো না। ডুগডুগিতে মারণ-উচাটন শব্দের কেউ বোল তুলতো না। চোখের তারা কাউকে পেছন দিকে টানতো না। তেমন যাদের পাকিস্তানি খায়েশ মেটে নি, তারা আমাদের মানসমুক্তি ঠেকাতে নিত্যদিন চক্রান্তের জাল বুনে চলে। হত্যায়-সন্ত্রাসে মাতে। একুশ শতকে এসেও তারা বিশ্বাসের জিগির তুলে ছায়ানটের বর্তমানে বিশ্বখ্যাত বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে গ্রেনেড হামলা চালিয়ে তা পণ্ড করার চেষ্টা করে। মারা যান বেশ ক’জন। একই রকম গোলাগুলি চলে খুলনায়, নেত্রকোণায় উদীচীর অনুষ্ঠানে। হতাহতের সংখ্যা সে-সবেও কম নয়। বোঝা যায়, উজান ঠেলেই আমাদের এগোনো। বর্ষবরণ অনুষ্ঠান নিয়েও। তবে হেরে যাই নি। রবীন্দ্রনাথের স্বপ্নকল্পনা যে শুদ্ধ মানব-মানবীর কল্যাণ-আকুতিকে সুন্দরের স্পর্শে ফুটিয়ে তোলার, আমাদের বর্ষবরণে সেইটিই প্রাণে দোলা দেয়। সাজিয়ে তুলি আমরাই। অর্থময়ও করি আমরা। বর্তমানে এবং আরো অনেক ভবিষ্যতের বর্তমান মাথায় রেখে। তা নইলে আমাদের নববর্ষ আরো দশটা নববর্ষের মতোই। ইচ্ছা করলে আমরাও তাদের কোনো কোনোটার শামিল হতে পারি। এই উপমহাদেশেও। কিন্তু তারা কেউ বাংলার ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির সঙ্গে ঐকান্তিক নয়।

উপমহাদেশের কথাই ধরা যাক। যতদূর জানা যায়, সব চেয়ে প্রাচীন কলিযুগ পঞ্জিকা। তার হিসেবে এখন ৬০১৬ সাল। কট্টর প্রাচীনতাবাদীদের অন্ধবিশ্বাস, কলিযুগের আরম্ভের সঙ্গে এর মিল। তার আগে গেছে পরপর তিনটে যুগ, সত্য ত্রেতা ও দ্বাপর যুগ। ইতিহাসের নিদর্শনের সঙ্গে এ মেলে না। মহেনজোদারো-হরপ্পার দ্রাবিড় সভ্যতার কাল চার হাজার-সাড়ে চাার হাজার বছর আগের। আর্যদের আগমন সাড়ে তিন থেকে চার হাজার বছরের ভেতরে। তবে এই পঞ্জিকার কাল গণনায় অসঙ্গতি বা ভ্রান্তি তেমন নেই। বঙ্কিমচন্দ্রও তর্কের খাতিরে কোথাও কোথাও এর হিসাব ব্যবহার করেছেন। অবশ্য তা পুরানো বিশ্বাসকে ভাঙবার জন্যেই। বুদ্ধ-নির্বাণ পঞ্জিকা গৌতম বুদ্ধের নির্বাণ প্রাপ্তির দিন থেকে তাদের সাল গণনা শুরু করে। সেই অনুযায়ী এখন ২৫৫৯ সন।

৭৮ খৃস্টপূর্বাব্দ থেকে চালু শতাব্দ। তাতে মনে হয়, বহিরাগত কুষাণ রাজ কণিষ্ক, যার রাজধানী ছিল পুরুষপুর বা আজকের পেশোয়ার, তাঁর রাজত্বকাল থেকে এই সন গণনার শুরু। ভারত স্বাধীন হলে ডক্টর মেঘনাদ সাহার নেতৃত্বে একদল জ্যোতির্বিজ্ঞানী অখ- ভারতীয় পঞ্জিকা একটা খাড়া করেন। তা রাষ্ট্রীয় অনুমোদনও পায়। তাঁরা শতাব্দকেই ভিত্তি হিসেবে বেছে নেন। বোধহয় সরকারিভাবে এখনও তা চালু। এইসব পঞ্জিকার সবগুলোই সৌর বর্ষীয়। কিন্তু হজরত মুহম্মদের মক্কা থেকে মদিনায় হিজরতের সময় থেকে কাল গণনা করা হয়, তা চান্দ্রবর্ষীয়। ফলে তার মাসগুলো প্রতি বছর তের দিন করে পিছিয়ে যায়। পারসিদের সন গণনায় তা হয় না। তাদেরও নওরোজ বা নববর্ষ একটা প্রধান উৎসব। এই উপমহাদেশে এদের সবারই অনুসারী আছে। যেমন আছে আরো বিভিন্ন বিচিত্র পঞ্জিকায় উপমহাদেশের বাইরেও। তবে আজ বিশ্বকর্ম আয়োজনে একতা ও সামঞ্জস্য বিধানের তাগিদ সব জায়গায় সবাইকেই গ্রেগরিয়ান (রোমান) কাল-গণনার ভিত্তিতে পারস্পরিক যোগাযোগের অথবা অতীতের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার ব্যবস্থাকে মেনে চলায় বাধ্য করেছে। আমাদের বাংলাদেশেও। এটা স্বকীয়তা হারানো নয়। সমন্বিত বিশ্ব ব্যাপারে সর্বোত্তম উপায়ে শরিক হওয়া। আমরা যাকে খৃস্টাব্দ বলি, এটা তাই। কারণ, প্রারম্ভিক বিন্দু ধরা হয় যিশু খৃস্টের জন্মের বছরকে। তাঁর জন্মদিন নয়। প্রচলিত পঞ্জিকাই থাকে। শুধু শুরুর বছরটা যিশুখৃস্টের আবির্ভাবের বছরের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া। ইতিহাসের দিন গণনায় বা বর্তমানে দৈনন্দিন কাজের হিসাব রাখায় সাধারণভাবে সব জায়গাতে এটাই প্রাথমিকতা পায়। আঞ্চলিক পঞ্জিকা উঠে যায় না। সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনেক ক্রিয়াকর্মের ধারাবাহিকতা বজায় রাখায় তা কাজে লাগে। যেমন, আমাদের পহেলা বৈশাখ, পঁচিশে বৈশাখ, এগারোই জৈষ্ঠ্য, বাইশে শ্রাবণ, ৭-ই পৌষ, চৈত্র সংক্রান্তি ইত্যাদি। এই রকম অনেক দিন প্রথমত এক পঞ্জিকায় তার গণনানুযায়ী ঠিক করে তা গ্রেগরিয়ান বা রোমান তারিখে পালন করি। এটা এক রকম অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেছে। যেমন, বিভিন্ন ধর্ম পালন উল্লেখ্যযোগ্য দিন সব।

আমাদের বাংলা পঞ্জিকায় একটা বিশেষত্ব আছে, তা খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। চালু হয় এটা মোগল সম্রাট আকবরের আমলে। তবে তাঁর কোনো কীর্তি স্মরণ করে নয়। অথবা তার আগে যে কোনো পঞ্জিকা এখানে ছিল না, তাও নয়। এটা খেয়াল করবার, উপমহাদেশীয় প্রায় সব সন গণনাই শুরু বৈশাখে। কালিদাসের (পঞ্চম শতক) ঋতুসংহারেও আছে ছয় ঋতুতে নর-নারীর প্রণয়লীলায় আবেগ-অনুভূতিতে তাদের আলাদা আলাদা প্রভাব বৈশিষ্ট্যের বর্ণনা। শুরু কিন্তু গ্রীষ্ম দিয়েই। এই রকম চল ছিল বাংলাতেও। বছরের শুরুতে খাজনা আদায়ের ব্যবস্থাকে আকবরের রাজপুত রাজস্ব-উপদেষ্টা টোডরমল প্রাধান্য দেন। সেইসঙ্গে বাংলা সনের পৃথকতাও বজায় রাখতে চাওয়া হয়। মোগল সাম্রাজ্যের ভিন্নতাও। সব মিলিয়ে ঠিক হয়, পয়লা বৈশাখ বছর শুরু হলেও তা গোনা হবে তখন যে হিজরি সন, তার সঙ্গে এক করে। কিন্তু হিজরির গণনা চান্দ্রমাস অনুযায়ী। তাকে এক বছর পূর্ণ হতে লাগে আনুমানিক ৩৫২ দিন। অথচ এখানে চল, পৃথিবীর একবার সূর্য পরিক্রমায় যতদিন লাগে, তাই দিয়ে- ৩৬৫ দিন কয় ঘণ্টা। বছর গণনা তাই ৩৬৫ দিনে। বাড়তি ক ঘণ্টায় যোগ হয় একদিন চার বছর পর পর। বাংলা সন চালুতে এই ব্যবস্থাও অক্ষুণ্ণ থাকে। শুধু সনটা মেলানো হয় হিজরির সঙ্গে। পরিণামে বছর বছর হিজরির সঙ্গে তের দিনের কিছু বেশি করে দূরত্ব তৈরি হয়, যাতে আজ যেখানে বাংলা সন ১৪২২, হিজরি সেখানে ১৪৩৬।

একটা ব্যাপার আছে এই বাংলা সনে। গ্রহ-নক্ষত্র ইত্যাদির সঙ্গে যোগাযোগের ভিত্তিতে মাসের হিসাব করতে গিয়ে কোন মাস দাঁড়ায় মনে রাখা মুশকিল। পাকিস্তান আমলে শাসকেরা চাইছিল দুই বাংলার ভেতর দূরত্ব তৈরি করতে। এইটিকে অজুহাত খাড়া করে ভাষা সাহিত্যের পণ্ডিতদের নিয়ে তারা পঞ্জিকা সংস্কার কমিশন বসায়। তাঁদের সুপারিশ অনুযায়ী মাসের দিন গণনা সরলীকরণের যে ব্যবস্থা হয়, তাতে দাঁড়ায়, প্রথম পাঁচ মাস ৩১ দিনের ও পরের সাত মাস ৩০ দিনের। প্রতি চার বছর পর পর একদিন বাড়তি যোগ হবে ৩০ দিনের এক মাসে। মাসের হিসাব সরল হয়। তবে বাংলা পঞ্জিকা দুটো হয়ে যায়। একই দিনে দুই বাংলায় নববর্ষ খুব কমই পড়ে। তাতে সমস্যা একটু হয় বই কি! তবে সার্বিক বোঝাপড়ায় সৌহার্দ্য থাকলে এটা তেমন গুরুতর বিষয় হয়ে ওঠে না। আর, আন্তর্জাতিক সনই যেখানে সব কাজে প্রবলভাবে কার্যকর, সেখানে বাংলা সনের গণনায় একই ছোট ব্যবধানটাকে বাড়িয়ে দেখার কোনো প্রয়োজন আছে বলে মনে করি না। পয়লা বৈশাখের মহিমা এতে খাটো হয় না। দুই জায়গায় দুদিনে হলেও। বিশেষ করে আমাদের কাছে।

এই দিন আমাদের আত্মপরিচয়ের গৌরব উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করার দিন। সেইসঙ্গে গৌরবের সাংস্কৃতিক পরিচয়ও ফুটিয়ে তোলার দিন। চারুকলা, ললিত কলা, কারুকলা, এসবে তার বিকাশ। উদার ছন্দে-পরমানন্দে আমরা তা মেলে ধরি। আত্মবিশ্বাসও বাড়ে। দৈনন্দিন শত কাজে এর প্রয়োজন আগের মতো নেই। তাতে কিছু যায় আসে না। আপনাকে জানার ও জানানোর শুচিস্নিগ্ধ দিন একটা পাই। বছরে একবার।

মনে করা ঠিক হবে না, আমাদের বেলাতেই একটা একমাত্র, অথবা বৈশিষ্ট্যে তা সবার ওপরে। আসলে সভ্যতায় বৈচিত্র্য যত, নববর্ষও তত। এটা আমাদের তৃপ্তিই দেয়। ‘শত মানুষের ধারায়’ আমরাও শামিল হই। হতে পারাটাই এক বিশাল অর্জন।

কিন্তু এইখানে আর একটা বিষয়ও আমরা খেয়াল করি। নববর্ষের উৎসব বিজু, বৈসাবি এসব আছে পাড়া-পড়শির ভেতরে। অন্দরেও আছে চাকমা, গারো, রাজবংশি, এদের নববর্ষের আলাদা বৈশিষ্ট্য। প্রায় একই সময়ে। কারণ উপমহাদেশে সব জায়গাতে ছয় ঋতুর পরিক্রমা একরকম। নববর্ষও একই ধারায় বৈশাখে। আমরা যদি তাদের বিষয়ে উদাসীন না থেকে তাদের কৃতিকেও পরম সম্মানে ভেতরে টেনে নিই, তাদের আলাদা বৈশিষ্ট্য অক্ষুণœ রেখেই তাও আমাদের সৃষ্টিময়তা বিব্রত হবে না, বরং আরো সমৃদ্ধ হবে। নববর্ষের উৎসব আরো প্রাণবান হবে। গানের সুরে নজরুল ঝুমুর, সাঁওতালি, এদের টেনে নিয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ নৃত্যনাট্যে মণিপুরি মিশিয়ে দিয়েছিলেন। গুরুসদ দত্ত ব্রতচারী নাচে রায় বেশে নিয়ে এসেছিলেন। আমাদের নববর্ষে আলাদা সত্তাতেও তাদের জায়গা দিতে পারি। একইরকম পাহাড়ী সংস্কৃতির উচ্ছ্বাসটাও আরো বর্ণময় হবে। তাহলে নববর্ষ আমাদের আত্মপরিচয়। তবে আনন্দ করা মানে উচ্ছৃঙ্খল হওয়া নয়। অসংযমী উচ্ছ্বাসে বিকারের শিকার হওয়া নয়। যদিও তার প্রলোভন ডাকতে পারে হাতছানি দিয়ে। আমরা যেন আত্মস্থ থাকতে পারি। যেন মানবমুক্তির শ্রেয়বোধে স্থির থাকতে পারি। এই বোধের কারণেই বাংলাদেশের অভ্যুদয়। আমাদের নববর্ষের উৎসব তার অনুসরণে। মূল্যবান পুরাতনের ধারাকে আরো মূল্যবান করে নতুনের পথে এগিয়ে নেবার সংকল্প নিয়ে।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: