।।ওয়াসিফ রিয়াদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।।

ছোটবেলা থেকেই ভাবি খুব কাছ থেকে সাগরের ঢেউ দেখব। সাগর তীরে উপচেপড়া বড় বড় ঢেউয়ে গা ভাসিয়ে দেবো। যতো দিন যাচ্ছিলো সাগরের প্রতি প্রবল এ আকর্ষণ যেন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো। এসব জল্পনা-কল্পনা বাস্তবে রূপ নিলো ‘ন্যাশনাল ক্যাম্পাস জার্নালিস্ট ফেস্ট-২০১৯’ এর একটি অনুষ্ঠানে গিয়ে। এ বছরের ১৮ এবং ১৯ মার্চ এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিলো চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতি (চবিসাস)। অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের সকল বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত সাংবাদিকদের এক হবার সুযোগ হয়। আমরা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় রিপোর্টার্স ইউনিটি (রুরু) থেকে ১১ জন সেই অনুষ্ঠানে অংশ নিই। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে (চবি) অনুষ্ঠানটির উদ্বোধন করা হয় এবং সমাপনী অনুষ্ঠিত হয় কক্সবাজারের কেন্দ্রীয় সাংস্কৃতিক কেন্দ্রে। এই অনুষ্ঠানকে উপলক্ষ করেই আমাদের সমুদ্র ভ্রমণের সূচনা ঘটে। অনুষ্ঠান শেষে লাবনি পয়েন্টে গিয়ে সমুদ্রের ঢেউ উপভোগ করি। প্রথমবারের মতো কাছ থেকে সমুদ্র দেখার সে অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সেদিন মধ্যরাত পর্যন্ত সৈমুদ্র সৈকতে কাটিয়েছিলাম। শীতল বাতাস আর সমুদ্রের গর্জন অন্যরকম অনুভূতির সঞ্চার করেছিলো। সমুদ্রতীরে আছড়ে পড়া ভয়ংকর ঢেউয়ের গর্জনে বুক কেঁপে উঠলেও যেন নেশার মতো কাছে টানে প্রতিনিয়ত।

কক্সবাজারের সৌন্দর্য উপভোগ শেষে আমাদের পরবর্তী গন্তব্য ছিলো সেন্টমার্টিন। তাই ‘মেরিনড্রাইভ’ ধরে টেকনাফ যাবার জন্য আগের রাতেই ‘চাঁদের গাড়ি’ ভাড়া করে রাখলাম। হোটেলে রাত কাটিয়ে পরদিন সকালের রওনা দিলাম দেশের একমাত্র প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে। এ ড্রাইভের একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হচ্ছে- একদিকে পাহাড় অন্যদিকে সমুদ্র এবং মাঝখান দিয়ে চলে গেছে আঁকা-বাঁকা রাস্তা। চাঁদের গাড়ি নিয়ে আমরা সেই রাস্তা ধরে এগুতে থাকি। পাহাড় আর সাগরের মাঝপথ দিয়ে আমরা যেন বিদ্যুৎগতিতে ছুটে চলছিলাম। বাতাসে চুলগুলো এলোমেলোভাবে উড়ছিলো আর সে সুন্দর মুহুর্ত বন্দি হচ্ছিলো ক্যামেরায়। দীর্ঘ ৬ ঘণ্টার জার্নি শেষে আমরা টেকনাফ পৌঁছালাম। ততক্ষণে সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। সেখানে একটি হোটেলে রাত কাটালাম। পরদিন সকালে সবাই রেডি হলাম লঞ্চে করে সেন্টমার্টিনে যাওয়ার জন্য। বলে রাখা ভালো, টেকনাফ থেকে শুধু সকাল সাড়ে নয়টাতেই লঞ্চ ছেড়ে যায়। আর সেন্টমার্টিন থেকে টেকনাফের উদ্দেশ্যে লঞ্চ ছাড়ে বিকেল তিনটায়। আমরা সকাল ৯টার আগেই টেকনাফের লঞ্চঘাটে পৌঁছে গেলাম। টিকিট সংগ্রহ করে উঠে পড়লাম ‘কেয়ারি সিন্দাবাদ’ নামক লঞ্চে। বঙ্গোপসাগরের বুকে ভেসে ওঠা ১২ বর্গ কিলোমিটারের সেন্টমার্টিন দ্বীপে যাওয়ার অভিজ্ঞতা এটিই প্রথম।

লঞ্চ ছাড়তেই কোথা থেকে যেন শত শত গাঙচিল জাহাজের পিছু নেয়া শুরু করলো। অনেকেই রুটি, বিস্কুট ছুড়ে দিচ্ছিলো সেই গাঙচিলের দিকে। আর গাঙচিলগুলো সে খাবার মুখে পুড়ে নিচ্ছিলো। প্রায় দেড় ঘণ্টা গাঙচিলগুলো আমাদের পিছু ছুটলো। মানুষের ছুড়ে দেয়া খাবার পানিতে ভেসে ভেসে, উড়ে উড়ে লুফে নেয়া সে দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করছিলো অনেকেই। এমন অপরূপ দৃশ্য দেখার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত কেউ কল্পনা করতে পারবে বলে মনে হয় না। পরে নাফনদী এবং বঙ্গোপসাগরের সন্ধীক্ষণে আসার পর পাখিগুলো থেমে যায়।

দীর্ঘ ৩ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করার পর আমরা এসে পৌঁছালাম কাঙ্ক্ষিত সেই সেন্টমার্টিন দ্বীপে। সমুদ্রের মাঝে ভেসে ওঠা ছোট্ট এই দ্বীপে কয়েক হাজার মানুষের স্থায়ী বসবাস। প্রতিদিন হাজারও পর্যটক এখানে আসে এবং তাদের দিয়েই জীবিকানির্বাহ করছে এখানকার স্থায়ী বাসিন্দারা। এখানে অনেক কম খরচেই বাসা ভাড়া পাওয়া যায়। আমরা ২টি রুম ভাড়া নিলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে বেড়িয়ে পরলাম। পুরো বিকেল ঘুরলাম সমুদ্রের তীরে। অনেক দিনের আশা ছিলো সমুদ্র তীরে বসে চাঁদ দেখার। অবিশ্বাস্য হলেও সেদিন রাতেই সুপারমুন উঠেছিল। লঞ্চঘাটে বসে আমরা চাঁদ এবং সমুদ্র উপভোগ করছিলাম আর পাশাপাশি চলছিলো গলা ছেড়ে গান। চাঁদ-সমুদ্রের গভীর মিতালির এরকম একটা রাত না কাটালে বুঝতেই পারতাম না-জীবন কতটা সুন্দর হতে পারে।

আমাদের পরবর্র্তী পরিকল্পনা ছিলো ছেড়াদ্বীপ যাওয়া। সেন্টমার্টিন দ্বীপ থেকে বিচ্ছিন্ন অংশটিই ছেড়াদ্বীপ নামে পরিচিত। পরদিন সকালে লাইফ বোটে করে আমরা ছেড়া দ্বীপের উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। প্রায় ৩০ মিনিট সমুদ্র পাড়ি দিয়ে পৌঁছাই সেখানে। আমার দেখা সব থেকে বড় ঢেউ দেখেছিলাম ছেড়াদ্বীপের শেষপ্রান্তে। বড় বড় পাথর আর সেই পাথরে আছড়ে পড়া ঢেউ, সাথে ভয়ঙ্কর গর্জন। কী যে অদ্ভুত ভালো লাগা কাজ করছিলো তা বলে বোঝানো যাবে না। ছেড়াদ্বীপের শেষ প্রান্তে না আসলে সমুদ্র দেখবার স্বাদ মেটানো সম্ভব নয়। যদি প্রশ্ন করো ছেড়াদ্বীপের শেষ প্রান্তে গিয়ে কি সমুদ্র দেখবার স্বাদ মিটেছে? উত্তরে আমি বলব, আবারও যেতে চাই সমুদ্রে ভেসে ওঠা ছোট্ট সেই দ্বীপ সেন্টমার্টিন।