।। ওয়াসিফ রিয়াদ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ।।

একই গ্লাসে সাত স্তরে সাত রঙের চায়ের কথা অনেকেরই জানা। এ চা জিভে জলের বদলে বিস্ময় জাগায় বেশি। শৈল্পিক ও আকর্ষণীয় এ চায়ের নামডাক অনেক আগেই বাংলাদেশের সীমানা পেরিয়ে গেছে। শ্রীমঙ্গলে যারা বেড়াতে আসেন তারা সাতরঙা চায়ের স্বাদ নিতে ভোলেন না। আমরাও ভুলিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) নৃবিজ্ঞান বিভাগের উদ্যোগে ১৯তম ব্যাচের মাঠকর্মের স্থান নির্ধারণ করা হয়েছিল সিলেটের মৌলোভীবাজার। তিনদিনের মাঠকর্ম শেষে ফেরার পথে আমরা লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে যাই। উদ্যানে প্রবেশের পরই দেখতে পাই ছোট একটি টিলার ওপর ছাউনি দিয়ে পর্যটকদের বসার জায়গা তৈরি করা হয়েছে। আর সেখানেই মিলছে সিলেটের সেই বিখ্যাত ‘সাত রঙের চা’।

স্তরে স্তরে বিন্যাসিত এই চা বিভিন্ন ধরনের মসলার সংমিশ্রণে তৈরি করা হয়। চায়ের স্তর অনুযায়ী ক্রয় মূল্যও ভিন্ন। সেখানে সাত স্তরের চা ৭০ টাকা, ছয় স্তরের ৬০ টাকা, পাঁচ স্তরের ৫০ টাকা, চার স্তরের ৪০ টাকা, তিন স্তরের ৩০ টাকা, দুই স্তরের চা ২০ টাকা, হাই স্পেশাল চা ২০ টাকা, গ্রিন চা ৫ টাকা।

প্রথমবারের মতো সাত রঙের চা খেয়েছেন নৃবিজ্ঞান বিভাগের সানজিদা নাওয়ার সুপ্তি। ভিন্ন রকমের চা খাওয়ার অনুভূতি সম্পর্কে বলেন, অনেক দিন থেকে সাত রঙের চা’র কথা শুনতাম। এর আগে কখনও খাওয়ার সুযোগ হয়নি। আমি খুবই আনন্দিত যে এবার সবাই মিলে এক সাথে এই চা খেয়েছি। এই চা’র আলাদা একটি বৈশিষ্ট আছে যা দর্শনার্থীদের আকর্ষণ করে।

শুধু শিক্ষার্থী নয় শিক্ষকদেরও মন কেড়েছে এই চা। নৃবিজ্ঞান বিভাগের সহকারি অধ্যাপক গোলাম ফারুক সরকার শাহ্জালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করেছেন। দীর্ঘদিন সিলেটে থাকবার সুযোগ হলেও তাঁর এই চা খাওয়ার সুযোগ হয়নি। অনুভূতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা আমার ব্যর্থতা যে সিলেটে দীর্ঘদিন থাকার পরেও সাত রঙের চায়ের স্বাদ গ্রহণ করা হয়নি। তবে আমি অনেক আনন্দিত যে এবার আমার ছাত্র-ছাত্রীদের এখানে নিয়ে আসার মাধ্যমে আমারও এই চা পান করার সুযোগ হয়েছে।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রমেশ রাম গৌড় প্রায় এক যুগেরও বেশি সময় ধরে সপ্তবর্ণের এ চা বানিয়ে যাচ্ছেন। দোকান দেয়ার পর নিজে গবেষণা করে ২০০২ সালে এক গ্লাসে দুই-রঙা চা আবিষ্কার করেন। তখন রমেশের এই দুই রঙের চা পান করতে শহরের মানুষ খেতে শুরু করলেন। একে একে পর্যটকরাও তার এই ভিন্ন রকম চা পান করতে দোকানে ভিড় জমাতেন। ব্যবসা ভালো চলতে শুরু করলো ধীরে ধীরে গবেষণা করে চায়ের স্তর বাড়াতে শুরু করেন। এ পর্যন্ত তার চা সাত রঙের দশ লেয়ারে এসে দাঁড়িয়েছে। ধীরে ধীরে রমেশ রাম গৌড়ের সুনাম বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। তার এ বিস্ময়কর আবিষ্কারের খবর দেশে-বিদেশে ছড়িয়ে পড়তে থাকে।

লন্ডনের বিখ্যাত দি গার্ডিয়ান পত্রিকায় তাকে নিয়ে প্রতিবেদন করে। লন্ডন আমেরিকাসহ মধ্যপ্রাচ্যের অনেক শীর্ষ স্থানীয় টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে রমেশের সাক্ষাৎকার। আর এই থেকেই ভাগ্য বদলে যায় রমেশের। লন্ডনের ধনাঢ্য ব্যবসায়ী জর্জ মরিসন বাংলাদেশে ঘুরতে এসে রমেশের এই চা পান করেন এবং তাকে লন্ডনে তার প্রতিষ্ঠানে মোটা অংকের বেতনে চাকরির প্রস্তাব দেন। কিন্তু তিনি চাকরির সেই প্রস্তাব ফিরিয়ে দিয়েছেন।

বাংলাদেশের শীর্ষ স্থানীয় ব্যবসায়ী, আমলা সাংবাদিক শীর্ষ স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তি থেকে শুরু করে বাংলাদেশে নিযুক্ত বিশ্বের প্রায় বেশিরভাগ দেশের রাষ্ট্রদূত তার হাতে তৈরি করা এই বিস্ময়কর চা পান করেছেন। তাঁর আশা ছিলো প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে সে নিজ হাতে চা বানিয়ে এই সাত রঙের চা পান করাবেন। তাঁর সেই স্বপ্নও পূরণ হয়েছে। শ্রীমঙ্গলে নবনির্মিত একটি সরকারি হাসপাতাল উদ্বোধন এসে রমেশের নিজ হাতে তৈরি করা এই সাত রঙের চা পান করে অনেক প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।