Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ভূরাজনীতি > যুক্তরাষ্ট্র কি ডিয়েগো গার্সিয়ার ‘গোপন’ সামরিক ঘাটি হারাতে চলেছে?

যুক্তরাষ্ট্র কি ডিয়েগো গার্সিয়ার ‘গোপন’ সামরিক ঘাটি হারাতে চলেছে?

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। জেনি মার্শ ।।


জেনি মার্শ সিএনএন’র সিনিয়র ডিজিটাল প্রযোজক হিসেবে হংকং-এ কর্মরত আছেন।


১৯৭৯ সালে ইরানের শাহের উৎখাতের পর মার্কিন সামরিক ঘাটি হিসেবে ডিয়েগো গার্সিয়ার বিশাল বিস্তৃতি ঘটানো হয়। ১৯৮৬ সাল থেকে পুরোদমে তা কাজ শুরু করে। ভিয়েতনাম যুদ্ধের পর আর কোনো মার্কিন সামরিক ঘাটির এতোটা বিস্তৃতি ঘটানো হয়নি, যতটা এখানে হয়েছে।  

সেড্রিক লেইটন এখন সিএনএন’র সামরিক বিশ্লেষক। ১৯৯০ সালের দিকে তিনি ওয়েস্টার্ন প্যাসিফিকের গুয়াম দ্বীপের মার্কিন সামরিক ঘাটিতে দায়িত্বরত ছিলেন। সেখান থেকে তিনি ডিয়েগো গার্সিয়ায় নানা রকম সহায়তা পাঠাতেন। তিনি বলেন, মার্কিন সেনারা প্রথম যে কাজটি করে, সেটি হলো, তারা ডিয়েগো গার্সিয়ার পোতাশ্রয়টি গভীর করে।

এখন সেই পোতাশ্রয়টি একটি এয়ারক্র্যাফট কেরিয়ারের জন্য যথেষ্ট বড়। এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের সমান একেকটি জাহাজ সেখানকার লেগুনে রয়েছে। যেগুলোর প্রত্যেকটি পর্যাপ্ত অস্ত্র ও জ্বালানি রয়েছে। নৌব্রিগেডের জন্য সরবরাহ সামগ্রীও রয়েছে সেখানে।

মার্কিন সেনারা এখানে ১২ হাজার ফুট (দুই মাইল) দীর্ঘ একটি রানওয়ে তৈরি করেছে, যেখানে বি ওয়ান, বি টু ও বি ফিফটি টু বোম্বার বিমান অনায়াসেই ওঠানামা করতে পারে।

নাইন ইলেভেনের হামলার কয়েক সপ্তার মধ্যে এখানে অতিরিক্ত ২ হাজার বিমান বাহিনীর সদস্য মোতায়েন করা হয়। তাদের জন্য ৩০ একর জুড়ে আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়, যার নাম দেয়া হয় ক্যাম্প জাস্টিস।

লেইটনের মতে, ডিয়েগো গার্সিয়া মার্কিন সেনাবাহিনীর গ্লোবাল পজিশনিং সিস্টেম চালানোর জন্য একটি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ স্টেশন। সে কারণে পৃথিবীর যেখানেই যেকোনো সংঘাতের ক্ষেত্রে ডিয়েগো গার্সিয়া ব্যবহারিক ও যোগাযোগের দিক দিয়ে খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

ডিয়েগো গার্সিয়াকে মজা করে বলা হয়, এটা আসলে একটি ভাসমান এয়ারক্র্যাফট কেরিয়ার। গুয়াম দ্বীপের ক্ষেত্রেও একই কথা বলা যায়। কিন্তু গুয়াম অ্যান্ডারসনে স্থানীয় অধিবাসী আছে, একটি বেসামরিক বিমানবন্দর রয়েছে। গুয়াম মধ্যপ্রাচ্যের অতোটা কাছে নয়, যতটা ডিয়েগো গার্সিয়া। আর সবচেয়ে বড় কথা, গুয়াম এমন গহীন দ্বীপ নয়, যতটা বিরান ডিয়েগো গার্সিয়া।

আর এই বিরান-গহীন হওয়ার কারণেই ডিয়েগো গার্সিয়াকে ঘিরে তৈরি হয়েছে নানা রহস্য। লেইটন জানান, গুয়ামে মার্কিন সেনারা তাদের স্ত্রী কিংবা স্বামীদের নিয়ে যেতে পারেন। কিন্তু ৩৮ মাইল দীর্ঘ গার্সিয়ায় যারা কাজ করেন, তারা তা পারেন না। তাদেরকে একাই যেতে হয়।

কোনো সাংবাদিক সেখানে ঢুকতে পারেন না। প্রেসিডেন্ট বুশকে বহনকারী বিমান যখন একবার ডিয়েগো গার্সিয়ায় রিফুয়েলিংয়ের জন্য থেমেছিলো, তখন টাইম ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিক চট করে টারমাকে নেমে পড়েছিলেন। তিনি এই দ্বীপটিকে ‘কংক্রিটের স্বর্গ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন।

দায়িত্বরত সামরিক কর্মকর্তাদের বাইরে কেবলমাত্র কিছু মরিশিয়ান ও ফিলিপিনোর সেখানে যাওয়ার অনুমতি আছে, যারা মার্কিন সেনাদের জন্য রান্না বা সাফাইয়ের কাজ করে থাকে।

যুক্তরাষ্ট্রের যেকোনো সামরিক ঘাটির তুলনায় ডিয়েগো গার্সিয়ার নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা অনেক বেশি। এমনকি গুয়ানতামো বে’র নিরাপত্তাও এর তুলনায় কিছুই নয়। আর এ কারণেই ডিয়েগো গার্সিয়াকে নিয়ে রহস্যের কমতি নেই। কী হচ্ছে এখানে, সে প্রশ্নেরও শেষ নেই।

অনেক আলোচনার পর ২০০৮ সালে ব্রিটিশ সরকার স্বীকার করে যে, ২০০২ সালে সিআইএ বন্দিদের নিয়ে দুটি ফ্লাইটে করে ডিয়েগো গার্সিয়ায় যায়।

২০০২ থেকে ২০০৫ সাল পর্যন্ত মার্কিন স্টেট সেক্রেটারি কলিন পাওয়েলের চিফ অব স্টাফ ছিলেন লরেন্স উইকারসন। পরে তিনি ভাইস নিউজকে জানান, সিআইএ ইঙ্গিত দিয়েছে যে ডিয়েগো গার্সিয়াতে তারা জিজ্ঞাসাবাদের কাজ করেছে।

যদিও ২০১৪ সালে মার্কিন সিনেটে ৫ বছরের তদন্ত শেষে সিআইএ’র জিজ্ঞাসাবাদের কৌশল নিয়ে যে আলোচনা ওঠে, সেখানে ডিয়েগো গার্সিয়ার নাম আসেনি।

২০০৮ সালে সিআইএ’র ডিরেক্টর মিখাইল হেইডেন এক বিবৃতিতে বলেন, “বহু বছর ধরে মিডিয়ার একটা ধারণা যে ডিয়েগো গার্সিয়ায় সিআইএ’র বন্দিশালা আছে। কিন্তু সেটি ঠিক নয়। আমরা বন্দিদের সেখানে নিয়ে নির্যাতন করি এমন অভিযোগও আছে। অথচ সেটিও মিথ্যা।” যদিও এখনও পর্যন্ত মানবাধিকার কর্মীদের এ বিষয়ে তদন্তের জন্য সেখানে যাওয়ার কোনো অনুমতি দেয়া হয়নি।

ফেব্রুয়ারির শেষ দিকে আন্তর্জাতিক আদালত যে পর্যবেক্ষণ দিয়েছে তা কোনো বাধ্যবাধকতামূলক আদেশ নয়। তার মানে ব্রিটেন চাইলে তা আমলে নাও নিতে পারে।

ব্রিটেনের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ এই মামলাটি আন্তর্জাতিক আদালতে পাঠিয়েছিলো। এখন আবার আদালতের পর্যবেক্ষণ সেখানেই ফিরে এলো। আফ্রিকার পূর্ব উপকূল থেকে ২ হাজার মাইল দূরের এই দ্বীপ ব্রিটেন না মরিশাসের, তা নিয়ে আবারও জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে বিতর্ক উঠবে।

চ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে আন্তর্জাতিক আইন বিষয়ে বিশেষজ্ঞ স্টিফেন রবার্ট অ্যালেন। তিনি বলেন, “ব্রিটেন যদি আদালতের এই রুলিংকে আমলে না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়, তাহলে তা হবে খুবই উল্লেখযোগ্য একটি ঘটনা। বেক্সিট-উত্তর এই সময়ে ব্রিটেন কীভাবে এই রুলিং গ্রহণ করে তা খুবই গুরুত্বপূর্ণ।”

ইমানুয়েল অ্যালি ২১ বছর বয়সী আইনের ছাত্র। বাস করে লন্ডনে। তার পরিবার চ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ থেকে উচ্ছেদের পর তার জন্ম হয় মরিশাসে। তার মতে, “প্রশ্নটা এখন আর শুধু ফেরার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। কারণ বহু বছর হয়ে গেছে। প্রশ্নটা হলো, একটা দেশ থাকা যেখােনে আপনি যেতে পারবেন। আর সেটা আর কোনো সামরিক ঘাটি নেই, তা জানাটা খুবই আনন্দের।”

সেড্রিক লেইটন মনে করেন যে, দ্বীপের মালিকানা যদি মরিশাসের হাতেও যায়, তাহলেও মার্কিন সামরিক ঘাটি তুলে দেয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ। কারণ এই ঘাটির বিনিময়ে দ্বীপের মালিক অর্থ পাবে এবং অতি অবশ্যই সামরিক নিরাপত্তা পাবে।

কিন্তু মরিশাস সেই একই রাষ্ট্রকে এই দ্বীপটি লিজ দেবে, তা বলা যাবে না। মনে রাখতে হবে, এটা ভারত মহাসাগরে এবং এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতা রয়েছে ভীষণভাবে।

সিএনএন থেকে অনূদিত। খানিকটা সংক্ষেপিত।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: