।। বার্তাকক্ষ প্রতিবেদন ।।

ভারত মহাসাগরের চ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ ব্রিটেনের ছেড়ে দেয়া উচিত বলে সম্প্রতি জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক বিচার আদালত উপদেশমূলক মতামত দিয়েছে। ফেব্রুয়ারির শেষ নাগাদ নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত এই আদালত তাদের মতামতে উল্লেখ করে, এটি ব্রিটেন বেআইনি প্রক্রিয়ায় অধিকৃত করে এবং সে কারণে যত দ্রুত সম্ভব এই দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ মরিশাসের হাতে ছেড়ে দেয়া উচিত। আর এই মতামতের কারণেই প্রশ্নের মুখে পড়েছে এই দ্বীপপুঞ্জের অংশ ডিয়েগো গার্সিয়ায় অবস্থিত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত সামরিক ঘাটির বৈধতা।

আন্তর্জাতিক আদালতের পর্যবেক্ষণের অনুলিপি দেখতে এখানে ক্লিক করুন

চ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ মরিশাসের উত্তরপূর্বাঞ্চলের ৭৫০ কিলোমিটার দূরে ভারত মহাসাগরে অবস্থিত। ১৯৬৫ সালে মরিশাসকে ৩০ লাখ পাউন্ডে এ দ্বীপপুঞ্জ ব্রিটেনের কাছে বিক্রি করতে হয়, যাতে মরিশাসের স্বাধীনতায় স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পরে ব্রিটিশ শাসনে দ্বীপপুঞ্জের বাসিন্দাদের বহিষ্কার করা হয় এবং ডিয়েগো গার্সিয়া দ্বীপে মার্কিন সামরিক ঘাঁটি স্থাপন করা হয়। ব্রিটেনের কাছ থেকে যুক্তরাষ্ট্র এই দ্বীপটি ৫০ বছরের জন্য লিজ নিয়েছিলো। ২০১৭ সালে সেই লিজের মেয়াদ আরও ২০ বছরের জন্য বাড়ানো হয়।

ডিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাটি

চাগোস দ্বীপপুঞ্জে ব্রিটেনের অবৈধ দখল অবসানে বহুবার তাগিদ দেয় আফ্রিকান দেশগুলো। এই দ্বীপপুঞ্জের সার্বভৌমত্ব ফেরত না পেলে আফ্রিকার পুরোপুরি স্বাধীনতা সম্পন্ন হবে না বলে মনে করে আফ্রিকান দেশগুলো। সেই সময় থেকেই এ নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে আইনি লড়াই চলছে। অন্যদিকে ডিয়েগো গার্সিয়া হয়ে উঠেছে ভারত মহাসাগরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত ঘাটি।

জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে নেয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জ নিয়ে এই মামলাটি আন্তর্জাতিক আদালতে নিষ্পত্তির জন্য পাঠানো হয়। আন্তর্জাতিক আদালত তাদের মতামত দেয়ার পর ইস্যুটি আবার সাধারণ পরিষদে যাবে।

হেগের আদালতের বিচারক আব্দুলকায়ি আহমেদ ইউসুফ বলেন, চাগোস দ্বীপপুঞ্জে ইংল্যান্ডের প্রশাসন তাদের আইনবহির্ভূত কার্যকলাপ অব্যাহত রেখেছে। তিনি আরো বলেন, চাগোস দ্বীপপুঞ্জে ইংল্যান্ড তাদের প্রশাসনের কার্যকলাপ শেষ করতে বাধ্য।

ডিয়েগো গার্সিয়া নিয়ে তথ্যচিত্র

আদালতের এই পর্যবেক্ষণকে নাকচ করে দিয়েছেন ব্রিটেনের ইউরোপ-অ্যামেরিকা বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অ্যালান ডানকান। তিনি বলেছেন, “এটি শুধুমাত্র আন্তর্জাতিক আদালতের একটি পর্যবেক্ষণ মাত্র। আইনগত কোনো বাধ্যবাধকতা এখানে নেই।” তিনি এই মামলায় আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ার নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেন, “এটি ব্রিটেন ও মরিশাসের দ্বিপাক্ষিক সমস্যা। এর সমাধান করতে হলে অবশ্যই এখানে ব্রিটেনকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।”

ডিয়েগো গার্সিয়া এয়ার টার্মিনাল

তবে আন্তর্জাতিক আদালতের এই পর্যবেক্ষণ সাধুবাদ পেয়েছে ব্রিটিশ বিরোধী দল লেবার পার্টির জেরেমি করবেনের কাছে। তিনি বলেছেন, “বহু বছর আগে মরিশাসের মানুষদের সঙ্গে অন্যায় করা হয়েছিলো। ভালো লাগছে যে, আন্তর্জাতিক আদালত এবার একটা ন্যায়বিচারের পথ খুললো।”

মরিশাসের প্রধানমন্ত্রী প্রভিন্দ জুগনাথ আন্তর্জাতিক আদালতের এই মতামতের প্রতি ব্রিটেনকে শ্রদ্ধাশীল হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

বিশ্লেষকরা বলছেন, আদালতের এই পর্যবেক্ষণের আইনি বাধ্যবাধকতা না থাকলেও যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাটি স্থাপন প্রক্রিয়াকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। মার্কিন বিশ্লেষকরা এখন যুক্তরাষ্ট্রকে পরামর্শ দিচ্ছে, তাদের ঘাটি রক্ষা করতে মরিশাসের সঙ্গে আলোচনা শুরু করতে।

স্টিলিং আ ন্যাশন : যেভাবে বিতাড়িত হয়েছিলেন চ্যাগোস দ্বীপপুঞ্জের মানুষ

‘দ্য গ্রেট গেম ইস্ট’ বইয়ের আলোচিত লেখক ও ভূরাজনৈতিক বিশ্লেষক বার্টিল লিন্টার লিখেছেন, “আন্তর্জাতিক আদালতের এই রায় আগামীতে অনেক প্রশ্ন তুলবে। যদিও আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে, মরিশাস ডিয়েগো গার্সিয়ায় মার্কিন ঘাটি উচ্ছেদে তেমন একটা উচ্চকিত এখনই হবে না। সেটা যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কিছুটা আশার কথা হতে পারে।”

দক্ষিণ চীন সাগর বিশেষজ্ঞ মার্ক জে. ভ্যালেন্সিয়া লিখেছেন, “যুক্তরাষ্ট্রের উচিত হবে আন্তর্জাতিক আদালতের এই পর্যবেক্ষণের প্রতি সম্মান জানিয়ে দক্ষিণ চীন সাগর নিয়ে একই আদালতের রায়ে চীনের বিপরীত অবস্থানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা। চীন যেহেতু সেই সময় দক্ষিণ চীন সাগর মামলাকে দ্বিপাক্ষিক বলে উপস্থাপন করেছিলো, সে কারণেই এবারও ব্রিটেন একই যুক্তিতে এই মামলাটিকেও দ্বিপাক্ষিক বলে উপস্থাপন করতে পারে।”