Loading...
উত্তরকাল > বিস্তারিত > ভূরাজনীতি > দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগে সৌদি-চীন গাটছড়া

দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগে সৌদি-চীন গাটছড়া

পড়তে পারবেন 4 মিনিটে

।। শিবলী নোমান ।।


শিবলী নোমান রাজশাহী-ভিত্তিক বাংলাদেশি সাংবাদিক, লেখক ও চলচ্চিত্র নির্মাতা


সম্প্রতি বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রী জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে জানিয়েছেন, গত ৫ বছরে দেশে ২৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বেশি বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। এর মধ্যে ৮ হাজার ১০৭ মিলিয়ন ডলার নিয়ে শীর্ষে রয়েছে চীন। এই তালিকায় তিন নম্বরে আছে সৌদি আরব। তাদের বিনিয়োগ ২ হাজার ৪৬১ মিলিয়ন ডলার।

এর মাসখানেকের মধ্যেই আরেকটি বড় ঘটনা ঘটে। বাংলাদেশে ব্যাপক বিনিয়োগের সম্ভাবনা দেখিয়ে সৌদি আরবের একটি বড়সড় দল আসে। এ সময় দুদেশের মধ্যে দুটি চুক্তি ও ৪টি সমঝোতা সই হয়। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য বলছে, সৌদি আরব ধাপে ধাপে ২৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে চায় এদেশে।

বাংলাদেশের জন্য এই দুটো খবরই আপাত দৃষ্টিতে বেশ ইতিবাচক। বিশেষ করে রাষ্ট্র হিসেবে জন্মের সময় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে অন্যতম বিরোধিতাকারী শক্তিগুলোর বাংলাদেশে এমন উৎসাহী পদচারণায় খানিকটা তৃপ্তির ঢেকুরও চাইলে তোলা যায়!

দক্ষিণ এশিয়ায় শুধু বাংলাদেশই নয়, আরো কয়েকটি রাষ্ট্রে সৌদি বিনিয়োগে নতুন ভূরাজনৈতিক সমীকরণ উঁকি দিতে শুরু করেছে। কারণ, সৌদির এই বিনিয়োগ একা আসছে না। এর পেছনে চীনের “রোড অ্যান্ড বেল্ট” উদ্যোগের শক্ত সমর্থন রয়েছে।

বাংলাদেশে চুক্তি ও সমঝোতা সই করে সৌদি দলটি ঘুরে যাবার পর একজন চীনা কূটনীতিকের সঙ্গে কথা হচ্ছিলো। সরাসরি কিছু না বললেও সৌদি আরবের এই বিনিয়োগকে যে তারা ইতিবাচকভাবেই নিচ্ছেন, তার ইঙ্গিত দিলেন।

সৌদি বিনিয়োগের ব্যাপারে চীনের ইতিবাচকই হওয়ার কথা। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটির সঙ্গে চীনের সাম্প্রতিক সম্পর্ক এক নতুন চেহারা পেয়েছে। ২০১৭ সালে সৌদির পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় প্রথমবারের মতো বলেছিলো যে, তারা তাদের বাজেটের একাংশ ইয়েন দিয়ে পূরণ করতে চায়। মধ্যপ্রাচ্যের এই তেলপ্রধান দেশটি যদি এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করে, তাহলে এর প্রভাব সরাসরি পড়বে মার্কিন ডলারের ওপর। কারণ তেল কেনাবেচার ক্ষেত্রে তখন ডলারের পাশাপাশি ইয়েনও ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হবে। সৌদির এই ঘোষণা প্রথমবারের মতো বুঝিয়ে দেয় যে, সৌদি-চীন সম্পর্কের এক পালাবদল আসন্ন।

দুদেশের মধ্যকার সাম্প্রতিক যোগাযোগ সেই পালাবদলের চেহারাকে ফুটিয়ে তুলেছে। বিশেষ করে দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগের ক্ষেত্রে এই দুই দেশের পারস্পরিক বোঝাপড়া চোখে পড়ার মতো। ২০১৩ সালে চীন যে “রোড অ্যান্ড বেল্ট” কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলো, এই মুহূর্তে তার সবচেয়ে বড় সহযোগী হতে যাচ্ছে সৌদি আরব। ৪৬ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে চীন পাকিস্তানের সঙ্গে যে অর্থনৈতিক করিডোর গড়ে তুলছে সেখানে অন্যতম বিনিয়োগকারী যে সৌদি আরব হতে যাচ্ছে, তা এখন অনেকটাই নিশ্চিত। প্রথম দিকে এই বিনিয়োগকে চীন কীভাবে নেবে তা নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলেও এক পর্যায়ে চীন ঘোষণা দিয়েই জানিয়ে দিয়েছে যে, এই বিনিয়োগকে তারা ইতিবাচকভাবে নিচ্ছে।

পাকিস্তানে সৌদি ক্রাউন প্রিন্সের সবশেষ সফরে দুদেশের মধ্যে ২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার বিনিয়োগের একটি চুক্তি হয়েছে, যার মধ্যে রয়েছে দক্ষিণ-পশ্চিমের বন্দর নগরী গাদারে ১০ বিলিয়ন ডলার ব্যয়ে একটি তেল শোধনাগার স্থাপন। এই প্রকল্পটি আক্ষরিক অর্থে পাকিস্তানে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। বিশেষ করে, চীন ইউরেশিয়া ও আফ্রিকার সঙ্গে যোগাযোগের জন্য যে পরিকল্পনা নিয়ে এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে, সেখানে সৌদি সম্পৃক্ততা এর সম্ভাবনা আরও বাড়িয়ে দেবে নিঃসন্দেহে।

এখানেই শেষ নয়। আফগানিস্তান নিয়েও চীন ও সৌদি আরবের বিনিয়োগ পরিকল্পনা আলোচিত হচ্ছে। বিশেষ করে ন্যাটো-উত্তর আফগান অর্থনীতিতে শক্তি জোগানোর জন্য চীনের একক পরিকল্পনা যেভাবে জাতিসংঘেও গত তিন বছর ধরে যুক্তরাষ্ট্রের বাধার মুখে পড়ছে, তাতে এখানে সৌদি আরবকে অন্তর্ভূক্ত করতে পারলে চীন সেই বাধা কাটিয়ে ওঠার নতুন কৌশল নিতে পারবে।

সৌদি আরব তেলের ওপর আর শুধু নির্ভর করতে চায় না। তারা এখন বাইরে বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক শক্তি তৈরি করতে চায়। তাদের দেশের আমদানি ও রফতানি বাণিজ্য দুই ক্ষেত্রেই অনেকদিন ধরেই শীর্ষ অংশীদার চীন। কাজেই এক্ষেত্রে তারা চীনের পাশে থাকাকেই নিরাপদ মনে করবে, এটাই স্বাভাবিক। আর চীন মধ্যপ্রাচ্যে সৌদি আরবের মাধ্যমে একটি বিশেষ শক্তি বলয়ে যুক্ত হতে চায়। সেক্ষেত্রে এই দুই দেশই নিজেদের পারস্পরিক স্বার্থ নিয়ে কাছাকাছি এসেছে।

এখন প্রশ্ন হচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র দুদেশের এই বিনিয়োগ গাটছড়াকে কোন চোখে দেখবে? আবার চীনের দীর্ঘদিনের বন্ধু হিসেবে পরিচিত ইরান কী করবে? দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের কৌশলগত সহযোগী হয়ে সৌদি আরবের এমন বিনিয়োগে ভারতের প্রতিক্রিয়া কী হবে?

এখন অবধি কেউই খুব স্পষ্ট করে এই ইস্যু নিয়ে কথা বলেনি। যদিও চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর নির্মাণ করলে যে কাশ্মির নিয়ে ভারতের উদ্বেগ আরও বাড়বে, তা নিয়ে সেদেশে অনেক দিন ধরেই আলোচনা চলছে। নিজেদের সীমান্তের খুব কাছের এই প্রকল্পে সৌদি সম্পৃক্ততা ইরান ইতিবাচকভাবে নেবে না সেটাও ধরেই নেয়া যায়। যদিও চীন কদিন আগেই ইরানকে আশ্বস্ত করেছে, তাদের সম্পর্ক অগ্রাধিকার পাবে বলে। আর যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই নয়া মেরুকরণ খানিকটা অস্বস্তিকর বটে। বিশেষ করে, তাদের দীর্ঘদিনের মিত্র সৌদি আরব যদি সত্যি সত্যিই চীনের ট্রিলিয়ন ডলারের “রোড অ্যান্ড বেল্ট” পরিকল্পনার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে যায়, তাহলে মধ্যপ্রাচ্য নিয়ে তাদের কৌশলকে ঢেলে সাজানোর প্রয়োজন হয়ে পড়বে।    

এমন জটিল সব সমীকরণের মধ্যেই বাংলাদেশেও বড় অংকের সৌদি বিনিয়োগকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছে চীন। দক্ষিণ এশিয়ায় কৌশলগত অবস্থানের দিক দিয়ে বাংলাদেশের গুরুত্ব কারো অজানা নয়। চীনের “রোড অ্যান্ড বেল্ট” প্রকল্পের ব্যাপারে দেশটির আগ্রহও আছে। কাজেই এখানেও বিনিয়োগের ক্ষেত্রে চীন-সৌদি গাটছড়া আরও শক্তিশালী হতে পারে। আর সেটা হলে, দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনৈতিক সমীকরণ নতুন করে পাঠ করতে হবে সবাইকেই।

সবশেষ আপডেট

উত্তরকাল

বিশ্বকে জানুন বাংলায়

All original content on these pages is fingerprinted and certified by Digiprove
%d bloggers like this: